বুধবার, ১৪ নভেম্বর, ২০১৮
সংবাদ শিরোনাম

পাহাড়ে খুনোখুনি আর কত: প্রথম আলোর সম্পাদকীয় মন্তব্যের সাথে ভিন্নমত

সত্যার্থী ত্রিপুরা, কলোন চাকমা

‘পাহাড়ে খুনোখুনি আর কত’ শিরোনামে প্রথম আলো গতকাল সোমবার (২০ আগষ্ট ২০১৮) একটি সম্পাদকীয় প্রকাশ করেছে, যেখানে ২০১৫ সালের পর নতুন করে শুরু হওয়া ‘রক্তপাতের নতুন অধ্যায়ের’ জন্য উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। আমরা পত্রিকাটির এই উদ্বেগের সাথে সম্পূর্ণ একমত পোষণ করি এবং সম্পাদকীয় মন্তব্যের জন্য ধন্যবাদ জানাচ্ছি।

তবে পাহাড়ে সংঘাতের মূল কারণ হিসেবে প্রথম আলোর উক্ত সম্পাদকীয়তে যে বিষয়টিকে চিহ্নিত করা হয়েছে এবং তার ভিত্তিতে যে সুপারিশ করা হয়েছে তার সাথে আমরা মোটেই একমত হতে পারছি না। পত্রিকাটি লিখেছে: ‘চলমান বিরোধ-সংঘাতের প্রধান কারণ পাহাড়ি সংগঠনগুলোর মতাদর্শগত ভিন্নতা নয়, বরং চাঁদাবাজির উদ্দেশ্যে এলাকায় আধিপত্য বিস্তারের প্রতিযোগিতা। পাহাড়ে চাঁদাবাজি অবশ্যই বন্ধ করতে হবে। সেজন্য আইন প্রয়োগের ব্যবস্থাকে আরও দক্ষ, সৎ, সক্রিয় ও ফলপ্রসু হতে হবে।’

পার্বত্য চট্টগ্রামে পাহাড়িদের প্রথম পরিপূর্ণ রাজনৈতিক দল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয় জনসংহতি সমিতি, জুম্ম জাতীয়তাবাদ ছিল যার মতাদর্শগত ভিত্তি। এ দলটি দুই যুগের বেশী সশস্ত্র সংগ্রাম চালানোর পর ১৯৯৭ সালে সরকারের সাথে চুক্তি সম্পাদন করে। এর এক বছর পর জুম্ম জনগণের স্বায়ত্তশাসনের আন্দোলনকে এগিয়ে নেয়ার লক্ষ্য নিয়ে গঠিত হয় ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট বা ইউপিডিএফ। কাজেই দুই পার্টির মতবিরোধের ভিত্তি হলো সম্পূর্ণ রাজনৈতিক। আর প্রত্যেক রাজনৈতিক দলের একটি অবশ্যই মতাদর্শিক ভিত্তি থাকেই। এ দলগুলোর বিরুদ্ধে ‘চাঁদাবাজির উদ্দেশ্যে এলাকায় আধিপত্য বিস্তারের’ অভিযোগ হলো শাসকগোষ্ঠীর রাজনৈতিক অপপ্রচারণা ছাড়া আর কিছুই নয়, যার উদ্দেশ্য হলো পার্বত্য চট্টগ্রামে সেনা-উপস্থিতি ও নিপীড়নকে আড়াল করা ও বৈধতা দেয়া।

জেএসএস ও ইউপিডিএফের মধ্যে যে সংঘাতের সূচনা হয় প্রথমদিকে তাতে চাঁদাবাজির কোন প্রশ্ন ছিল না এবং সে সময় কেউ চাঁদাবাজির অভিযোগ উত্থাপন করেনি। পার্বত্য চুক্তির আলোকেই তখন এই সংঘাতকে বোঝার ও বিশ্লেষণের চেষ্টা করা হতো। উক্ত দুই পার্টির মধ্যে রাজনৈতিক মতবিরোধ বৈরী রূপ নিয়ে রক্তাক্ত সংঘাতের দিকে যাওয়ার প্রধান কারণ হলো শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে ভিন্নমত দমনের চেষ্টা। ইউপিডিএফ পার্বত্য চুক্তিকে অসম্পূর্ণ ও এতে জনগণের মৌলিক দাবিগুলো পূরণ করা হয়নি বলে সমালোচনা ও প্রত্যাখ্যান করেছিল। তাদের এই অবস্থান ছিল গণতান্ত্রিক অধিকারের সীমার মধ্যে। কিন্তু অনেকে দীর্ঘ সশস্ত্র ও অনিয়মতান্ত্রিক পন্থায় সংগ্রামে লিপ্ত থাকার কারণে ইউপিডিএফের এই ভিন্নমত প্রকাশের স্বাধীনতাকে মেনে নেয়ার মতো উদার গণতান্ত্রিক মানসিকতা দেখাতে ব্যর্থ হয় এবং তারা পুরো পার্টিকে বলপ্রয়োগের মাধ্যমে নির্মূল করতে উঠেপড়ে লেগে যায়। রক্তাক্ত সংঘাতের মূল কারণ হলো এটাই।

কিন্তু প্রথম আলোর সম্পাদকীয় সংঘাতের এই মূল কারণ চিহ্নিত করতে চরমভাবে ব্যর্থ হয়েছে এবং সংঘাতের জন্য প্রচ্ছন্নভাবে ইউপিডিএফের উপর দায় চাপানোর প্রয়াস পেয়েছে। এতে বলা হয়েছে: ‘কিন্তু এই চুক্তির বিষয়ে পার্বত্য জনগোষ্ঠীর বিভিন্ন সংগঠনের মধ্যে মতবিরোধ দেখা দেয়, ইউপিডিএফ চুক্তিটির বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়। ফলে পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর বিভিন্ন অংশের মধ্যে সংঘাত সহিংসতায় ২০১৫ সাল পর্যন্ত কয়েক শ মানুষের মৃত্যু ঘটে।’ প্রথম আলোর এই মন্তব্যটি পড়ে পাঠকের মনে এই ধারণা হওয়া স্বাভাবিক যে, ‘ইউপিডিএফ চুক্তিটির বিরুদ্ধে অবস্থান’ নেয়ার কারণেই সংঘাতে বহু লোকের প্রাণহানি ঘটেছে। কিন্তু এই বক্তব্য যে বিভ্রান্তিকর ও অসত্য তা উপরের আলোচনা থেকে স্পষ্ট। ইউপিডিএফ তার গণতান্ত্রিক অধিকার প্রয়োগ করে চুক্তির সমালোচনা করলে তাতে সংঘাত হবে কেন? মনে হয় প্রথম আলো এখানে ইউপিডিএফ-কে তার গণতান্ত্রিক অধিকার দিতে নারাজ। অপরদিকে যারা ইউপিডিএফের মত প্রকাশের স্বাধীনতাকে শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে অগণতান্ত্রিক পন্থায় দমন করতে চেয়েছে তাদের ব্যাপারে প্রথম আলো শুরু থেকে আজ পর্যন্ত রহস্যজনকভাবে নীরব। সৎ ও নিরপেক্ষ বিশ্লেষণের মাধ্যমে পার্বত্য চট্টগ্রামের ঘটনাবলী তুলে ধরা নয়, বরং দৃশ্যত প্রথম আলো পার্বত্য চুক্তি প্রশ্নে একটি সুনির্দিষ্ট রাজনৈতিক অবস্থান গ্রহণ করেছে এবং সেই অবস্থান থেকে পক্ষগুলোর মধ্যেকার সংঘাতসহ সবকিছু বিচার করে থাকে, যার ফলে ইউপিডিএফের মতো দলগুলো মিডিয়া-অবিচারের শিকার হয়।

এবার সাম্প্রতিক সংঘাত সম্পর্কে কিছু বলা আবশ্যক মনে করি। প্রথম আলো লিখেছে: ‘কিন্তু গত বছরের নভেম্বরে ইউপিডিএফ ভেঙে ইউপিডিএফ গণতান্ত্রিক নামে আরেকটি সংগঠনের জন্ম হওয়ার পর ডিসেম্বর থেকে আবার সহিংসতা শুরু হয়।’ প্রথমত, তথাকথিত ‘ইউপিডিএফ গণতান্ত্রিক’ বর্তমানে কিছু মিডিয়া কর্মীর কল্পনায় সীমাবদ্ধ থাকলেও এর জন্ম রহস্য ও তার কীর্তিকলাপ সম্পর্কে সামান্য হলেও এখানে আলোচনা হওয়া দরকার। এটা বর্তমানে সবাই জানে যে, ‘ইউপিডিএফ গণতান্ত্রিক’ তথা নব্য মুখোশ বাহিনী হলো সেনাবাহিনীরই সৃষ্টি এবং ইউপিডিএফ-কে দমন করার লক্ষ্যেই এর জন্ম দেয়া হয়েছে। এদের জন্ম-পরবর্তী কার্যক্রমের প্রতি একটু লক্ষ্য করলেই তা স্পষ্ট বোঝা যায়। (অতীতেও পাহাড়ে আন্দোলন দমনের জন্য ১৯৯৫ সালে ‘পিসিপি-পিজিপি সন্ত্রাস প্রতিরোধ কমিটি বা পিপিএসপিসি নামে একটি ঠ্যাঙারে বাহিনী গঠন করা হয়েছিল। এরপর ২০০৯ সালে লক্ষ্মীছড়িতে ইউপিডিএফের বিরুদ্ধে লেলিয়ে দেয়ার জন্য সৃষ্টি করা হয় সিএইচটিএনএফ, যা বোরকা পার্টি নামে পরিচিতি লাভ করে।)

যে কেউ আইনের সীমার মধ্যে থেকে যে কোন নামে সংগঠন বা দল গঠন করতে পারে। ইউপিডিএফ-এর নীতি আদর্শ প্রত্যাখ্যন করে যদি কেউ অন্য কোন দল গঠন করে তাতে আমাদের কোন আপত্তি নেই এবং ইউপিডিএফ নেতাদেরও আপত্তি থাকবে বলে আমাদের মনে হয় না। কারণ ইউপিডিএফ গণতান্ত্রিক আন্দোলনের প্রক্রিয়ার মাধ্যমে গড়ে ওঠা একটি দল। কিন্তু যদি কেউ কোন সংগঠন বা দল গঠন করে গণতান্ত্রিকভাবে কার্যক্রম না চালিয়ে হত্যালীলায় মেতে ওঠে, ইউপিডিএফের নেতাকর্মী ও সমর্থকদের খুন, অপহরণ ও ঘরছাড়া করে, সন্ত্রাস চালায়, তাহলে তা আমরা কিছুতেই মেনে নিতে পারি না। অথচ ‘ইউপিডিএফ গণতান্ত্রিক’ নামধারী গোষ্ঠীটি রাঙামাটির নান্যাচরে সেনা জোনের পাশে অবস্থান নিয়ে ও অন্যত্র সেনাবাহিনীর প্রত্যক্ষ সহায়তায় তাই করে চলেছে। তাদের জন্ম যেন কেবল ইউপিডিএফ-এর লোকজনকে খুন-গুম-অপহরণ করা। অথচ প্রথম আলো এই সত্যকে দেখেও না দেখার ভাণ করে রাজাকার পত্রিকা নয়া দিগন্তের সাথে যেন প্রতিযোগিতায় নেমে পার্বত্য চট্টগ্রামে জুম্ম রাজাকারের ভূমিকায় অবতীর্ণ সেনা-মদদপুষ্ট নব্য মুখোশবাহিনীকে (তাদের ভাষায় ইউপিডিএফ গণতান্ত্রিক) একটি রাজনৈতিক দলের মর্যাদা দিয়ে এমনভাবে তাকে প্রমোট করছে, যা অত্যন্ত লজ্জাজনক ও দুঃখজনক এবং তা তাদেরকে হত্যাকাণ্ডে উৎসাহিত করারই সামিল। অথচ শুরু থেকেই যদি প্রথম আলোসহ সকল মিডিয়ায় সন্ত্রাসী নব্য মুখোশ বাহিনীর সদস্যরা নিন্দিত, ঘৃনিত এবং তাদের আসল রূপে চিত্রিত হতো — যেভাবে ইসলামী জঙ্গীদের চিত্রিত করা হয় — তাহলে তারা অবশ্যই সংযত হতে বাধ্য হতো এবং হয়তো তার ফলে স্বনির্ভর-পেরাছড়া হত্যাযজ্ঞ সহ আরো অনেক হত্যাকাণ্ড এড়ানো যেতো। তাই স্বাভাবিকভাবে প্রশ্ন জাগে, নব্য মুখোশ বাহিনীকে উৎসাহিত করার কারণে তাদের এসব বর্বর হত্যাকাণ্ডের দায় প্রথম আলো সহ অন্যন্য মিডিয়ার ওপরও কিছুটা হলেও কি পড়ে না?

আসল কথা হলো, পাহাড়ের সংঘাতে কারণ কখনো চাঁদাবাজি নয়, বরং তা হলো সর্বাংশে রাজনৈতিক। তাই মূল সমস্যাকে আড়াল করে ‘চাঁদাবাজি’ বন্ধ করতে ‘আইন প্রয়োগের ব্যবস্থাকে আরও দক্ষ, সৎ, সক্রিয় ও ফলপ্রসু’ করার মাধ্যমে সমস্যার কোন সমাধান হবে না। বরং তা পাহাড়ে ইউপিডিএফের মতো ন্যায্য অধিকারের জন্য গণতান্ত্রিক সংগ্রামে লিপ্ত দল ও সংগঠনগুলোকে দমনের হাতিয়ারে পরিণত হতে পারে।

আজ সবার কাছে দিবালোকের মতো স্পষ্ট, পাহাড়ে সাম্প্রতিক রক্তাক্ত সহিংসতার মূল কারণ হলো একাত্তরে স্বাধীনতা যুদ্ধের সময়কালের মতো জুম্ম রাজাকার সৃষ্টি করে তাদের লেলিয়ে দিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রামের জনগণের ন্যায়সঙ্গত আন্দোলন দমনের চেষ্টা। একাত্তরে রাজাকার-আলবদররা বাহিনী যেভাবে হানাদার পাক বাহিনীর ছত্রছায়ায় হত্যাযজ্ঞ, খুন, নারী নির্যাতনসহ বিভিন্ন মানবতা বিরোধী অপরাধ সংঘটিত করেছিল, বর্তমানে পাহাড়ে জেএসএস সংস্কারবাদী ও নব্য মুখোশ বাহিনী হুবহু তাই করে চলেছে।

আমাদের প্রশ্ন, সংস্কারবাদী-নব্য মুখোশ বাহিনীর মতো জুম্ম রাজাকাররা সেনা ক্যাম্পের পাশে আস্তানা গেড়ে প্রশাসনের নাকের ডগায় হত্যা, অপহরণ, সন্ত্রাস চালানোর পরও তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া না হলে কীভাবে পাহাড়ে সংঘাত-রক্তপাত বন্ধ হবে? ইউপিডিএফ-এর নেতাকর্মীদের খুন করার জন্য এসব সন্ত্রাসীদের হাতে অস্ত্র গোলাবারুদ যোগান দেয়া হলে কীভাবে পাহাড়ে শান্তি আসবে? খুনের সাথে জড়িতদের গ্রেফতার না করে তাদেরকে জেলা শহরে প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াতে দেয়া হলে এবং অন্যদিকে ইউপিডিএফের নেতাকর্মীদের উপর দমনপীড়ন চালানো হলে কীভাবে স্বনির্ভর-পেরাছড়া হত্যাকাণ্ডের মতো ঘটনা বন্ধ হবে? যেমন স্বনির্ভর-পেরাছড়া হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় খুনীদের গ্রেফতারের চেষ্টা না করে বরং তাদের রক্ষা করতে ইউপিডিএফ-প্রভাবিত এলাকায় টহল জোরদার করা হয়েছে, যাতে হত্যাকাণ্ডের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ সংগঠিত হতে না পারে। কয়েক মাস আগে খাগড়াছড়িতে বিশিষ্ট সমাজসেবক সূর্য বিকাশ চাকমা হত্যার পরও সেরকমই করা হয়েছিল। সূর্য বাবু খুন হন খাগড়াছড়ি জেলা শহরের দক্ষিণে আপার পেরাছড়ায়, আর সেনাবাহিনী সেদিকে না গিয়ে টহল দিতে যায় শহরের উত্তরে ইউপিডিএফ-সমর্থিত এলাকায়।

মোট কথা, জেএসএস সংস্কারবাদী ও নব্য মুখোশ বাহিনীর মতো জুম্ম রাজাকার সৃষ্টি করে তাদেরকে লেলিয়ে দিয়ে জনগণের ন্যায়সঙ্গত গণতান্ত্রিক আন্দোলন দমনের নীতি পরিহার করা না হলে সংঘাত-রক্তপাত, বৃথা প্রাণহানি কখনোই বন্ধ হবে না। আমাদের প্রত্যাশা প্রথম আলো এ জলজ্যান্ত সত্যটি বুঝতে সক্ষম হবে এবং সে সত্যের নিরিখে পাহাড়ের পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করতে সচেষ্ট হবে। (সমাপ্ত)
———————–
সিএইচটিনিউজ ডটকম’র প্রচারিত কোন সংবাদ, তথ্য, ছবি ব্যবহারের প্রয়োজন দেখা দিলে যথাযথ সূত্র উল্লেখপূর্বক ব্যবহার করুন।


Print Friendly, PDF & Email

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.