ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন
খাগড়াছড়ি আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী ধর্ম জ্যোতি চাকমার ৯ প্রতিশ্রুতি ও অঙ্গীকার

খাগড়াছড়ি প্রতিনিধি, সিএইচটি নিউজ
বুধবার, ২৮ জানুয়ারি ২০২৬
আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ অনুষ্ঠেয় ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ২৯৮ নং খাগড়াছড়ি সংসদীয় আসনে নাগরিক সমাজের মনোনীত স্বতন্ত্র প্রার্থী ধর্ম জ্যোতি চাকমা তার নির্বাচনী ইশতেহারে ৯ দফা প্রতিশ্রুতি ও অঙ্গীকার তুলে ধরেছেন। তিনি ঘোড়া মার্কা নিয়ে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।
তার ইশতেহারের শ্লোগান “পাহাড়ের মানুষ একসাথে, সমানভাবে, মর্যাদার সঙ্গে”।
ইশতেহারের শুরুতে তিনি বলেছেন, “আমি কারোর ব্যানার নিয়ে নামিনি। আমি দাঁড়িয়েছি খাগড়াছড়ির মানুষের পাশে সে পাহাড়ি ‘আদিবাসী’ হোক কিংবা বাঙালি। গ্রাম হোক কিংবা শহর- আমরা সবাই এই মাটির সন্তান। এই ইশতেহার কোনো প্রতিশ্রুতির তালিকা নয়- এটি বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকে উঠে আসা দায়বদ্ধতার দলিল”।
ইশতেহারে ধর্মজ্যোতি চাকমার প্রতিশ্রুতি ও অঙ্গীকারগুলো নিম্নরূপ:
১. ভূমি ও ন্যায়ের প্রশ্ন: খাগড়াছড়ি ও পার্বত্য চট্টগ্রামে সবার অধিকার নিশ্চিতকরণ
বাংলাদেশের সংবিধান এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম সংক্রান্ত বিশেষ আইনসমূহ (যেমন: পার্বত্য চট্টগ্রাম শাসনবিধি, ১৯০০; পার্বত্য জেলা পরিষদ আইনসমূহ; পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ আইন; ভূমি কমিশন আইন ইত্যাদি)- এর প্রতি পূর্ণ সম্মান নিশ্চিত করে সকল নাগরিকের অধিকার প্রতিষ্ঠা। পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসী জনগোষ্ঠী, যাদের সংখ্যা বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার ১ শতাংশেরও কম, তাদের স্বতন্ত্র সংস্কৃতি, পরিচয় ও বৈচিত্র্য সংরক্ষণের লক্ষ্যে বিশেষ অধিকার আরও সুদৃঢ় ও কার্যকর করা, তাদের নাজুক অবস্থান বিবেচনায় রেখে। বাংলাদেশের অন্যান্য অঞ্চলের মতো পার্বত্য চট্টগ্রামেও পূর্ণ গণতন্ত্র ও গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা নিশ্চিতকরণ। পার্বত্য অঞ্চলের সকল জনগণের সার্বিক উন্নয়নের জন্য স্থায়ী শাস্তি, স্থিতিশীলতা ও সহাবস্থান প্রতিষ্ঠায় সক্রিয় উদ্যোগ গ্রহণ ও কার্যকর অবদান রাখা।
২. শান্তি, নিরাপত্তা ও মানবিক প্রশাসন
নিরাপত্তার নামে যেন সাধারণ পাহাড়ি জনগণ ভয়, সন্দেহ ও হয়রানির শিকার না হয় সে বিষয়ে সংসদে সুস্পষ্ট ও দৃঢ় অবস্থান গ্রহণ। নিরীহ নাগরিকদের হয়রানি, বেআইনি গ্রেপ্তার এবং গুম-নিখোঁজের ঘটনার বিরুদ্ধে মানবাধিকারভিত্তিক কার্যকর নজরদারি ও জবাবদিহি নিশ্চিতকরণ। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও জনগণের মধ্যে পারস্পরিক আস্থা ও বিশ্বসভিত্তিক সম্পর্ক গড়ে তোলার জন্য কাঠামোগত উদ্যোগ গ্রহণ।
৩. শিক্ষা: পাহাড়ের ভবিষ্যৎ নির্মাণ
প্রত্যন্ত পাহাড়ি এলাকায় আবাসিক বিদ্যালয়, হোস্টেল ও উপবৃত্তি কর্মসূচির সম্প্রসারণ। ‘আদিবাসী’ শিক্ষার্থীদের জন্য মাতৃভাষাভিত্তিক প্রথমিক শিক্ষা কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন। বাঙালি ও ‘আদিবাসী’ সব শিক্ষার্থীর জন্য সমমানের ও মানসম্মত শিক্ষাসুবিধা নিশ্চিতকরণ। কারিগরি ও প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ কেন্দ্র স্থাপন।
৪. স্বাস্থ্য: পাহাড়ে বাঁচার অধিকার
উপজেলা ও দুর্গম এলাকায় ২৪ ঘণ্টা কার্যকর ও মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতকরণ। পাহাড়ি নারীদের জন্য মাতৃত্বকালীন বিশেষায়িত স্বাস্থ্য কর্মসূচি চালু ও সম্প্রসারণ। জরুরি চিকিৎসাসেবার জন্য এয়ার ও নৌ অ্যাম্বুলেন্স ব্যবস্থার প্রবর্তন ও কার্যকর বাস্তবায়নের দাবি। ওয়ান স্টপ ক্রাইসিস সেন্টার (OSC) স্থাপনে ভূমিকা রাখা।
৫. কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক মুক্তি
পাহাড়ভিত্তিক কৃষি, ফল, বাঁশ, বনজ সম্পদ ও পর্যটনখাতকে কেন্দ্র করে স্থানীয় পর্যায়ে টেকসই কর্মসংস্থান সৃষ্টি। পাহাড়ি যুবক-যুবতীদের জন্য স্টার্টআপ ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য বিশেষ তহবিল গঠন। নারী উদ্যোক্তাদের জন্য সহজ শর্তে ঋণসুবিধা ও দক্ষতাভিত্তিক প্রশিক্ষণ প্রদান। কোনো উন্নয়ন প্রকল্পে স্থানীয় জনগণকে বাদ দিয়ে ঠিকাদারি প্রক্রিয়া গ্রহণ না করার নীতিগত অঙ্গীকার।
৬. সংস্কৃতি, ধর্ম ও সামাজিক মর্যাদা
পাহাড়ি আদিবাসী সংস্কৃতি, ভাষা ও ধর্মীয় ঐতিহ্য সংরক্ষণে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি, সুরক্ষা ও পর্যাপ্ত বাজেট বরাদ্দ নিশ্চিতকরণ। বৌদ্ধ, খ্রিস্টান, হিন্দু ও মুসলমান- সব ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের জন্য সমান নিরাপত্তা, স্বাধীনতা ও মর্যাদা নিশ্চিতকরণ। উৎসব, সংস্কৃতি ও ইতিহাসকে দায়িত্বশীল পর্যটনের সঙ্গে যুক্ত করে সম্মানজনক ও টেকসই আয়ের সুযোগ সৃষ্টি ।
৭. প্রাণ বৈচিত্র ও পরিবেশ রক্ষা
বিলুপ্তপ্রায় বন্য পশু-পাখি রক্ষার্থে জনসচেতনা বাড়ানো। অবৈধভাবে পাহাড় কাটা, পাথর ও বালু উত্তোলন বন্ধ করা। নদী-নালা ও বনের ঝিরিতে বিষ দিয়ে মাছ চিংড়ি ধরা বন্ধ করা। পলিথিন প্লাস্টিক দূষণের ব্যাপারে জনগণকে সংগঠিত করা। অসচেতন পর্যটকদের দ্বারা যত্রতত্র পলিথিন প্লাস্টিক ছড়ানোর মাধ্যমে পাহাড় যাতে বিপদগ্রস্ত না হয়, সে ব্যাপারে ভূমিকা রাখা।
৮. নারীর অধিকার ও যুব সমাজ
পাহাড়ি ও বাঙালি নারীদের বিরুদ্ধে সহিংসতা প্রতিরোধে বিশেষ আইন ও বিদ্যমান আইনের কঠোর প্রয়োগ তদারকি ও জবাবদিহি নিশ্চিতকরণ।
যুব সমাজকে সন্ত্রাস, মাদক, অপসংস্কৃতির বিষবাষ্প ও নীতিহীন সুবিধাবাদী বিভ্রান্ত রাজনীতি থেকে দূরে রাখতে ক্রীড়া, সংস্কৃতি, দক্ষতা উন্নয়ন ও নেতৃত্ব বিকাশমূলক কর্মসূচি বাস্তবায়ন।
৯. স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য হিসেবে আমার অঙ্গীকারসমূহ
আমি কোন ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর প্রতিনিধি নই আমি খাগড়াছড়ির বিবেকের প্রতিনিধি হতে চাই। সংসদে ভয় নয়, সাহসের সঙ্গে প্রশ্ন তুলব। অন্যায়ের সঙ্গে কোনো আপস করব না। দল নয়- মানুষই হবে আমার শক্তি ও মূল ভিত্তি। পাহাড়ি-বাঙালি বিভাজনের রাজনীতি প্রত্যাখ্যান করে সহাবস্থান, পারস্পরিক সম্মান ও ন্যায়ের রাজনীতির পক্ষে দৃঢ় অবস্থান নেবো।
ইশতেহারে শেষ কথা হিসেবে তিনি বলেন, “খাগড়াছড়ি কোনো পরীক্ষাগার নয়- এটি মানুষের ঘর, স্বপ্ন ও ভবিষ্যৎ। আমি চাই, এই পাহাড়ে কেউ দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক হয়ে বাঁচবে না, এই পাহাড়ে কেউ ন্যায্য পাওনা থেকে বঞ্চিত হবে না। আপনার ভোট কোনো দলকে নয়- আপনার ভোট হোক খাগড়াছড়ির সম্মান, শান্তি ও নিরাপদ ভবিষ্যতের পক্ষে।”
উল্লেখ্য, আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ সারাদেশে একযোগে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। খাগড়াছড়ি আসনে তিন জন স্বতন্ত্র প্রার্থীসহ ১১ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। এতে ঘোড়া মার্কা নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন স্বতন্ত্র প্রার্থী ধর্ম জ্যোতি চাকমা।
এ আসনে মোট ভোটার সংখ্যা ৫ লাখ ৫৪ হাজার ১১৪ জন। তার মধ্যে পুরুষ ভোটার সংখ্যা ২ লাখ ৮০ হাজার ২০৬ জন, নারী ভোটার ২ লাখ ৭৩ হাজার ৯০৪ জন এবং তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার রয়েছেন ৪ জন।
সিএইচটি নিউজে প্রকাশিত প্রচারিত কোন সংবাদ, তথ্য, ছবি ,ভিডিও, কনটেন্ট ব্যবহার করতে হলে কপিরাইট আইন অনুসরণ করে ব্যবহার করুন।
