মুক্তমত

চট্টগ্রাম ডিভিশনের জিওসি’র যুদ্ধের আহ্বান প্রসঙ্গে কিছু কথা

0
263

তুগুন চাকমা


জিওসি মেজর জেনারেল সাইফুল আবেদীন। ভিডিও থেকে সংগৃহিত ছবি

গত ২৬ মে ২০২২ রাঙামাটিতে আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নের আঞ্চলিক সদর দপ্তরের ভিত্তি প্রস্তর স্থাপন অনুষ্ঠানে চট্টগ্রামের ২৪ পদাতিক ডিভিশনের জিওসি মেজর জেনারেল সাইফুল আবেদীন পাহাড়ি আন্দোলনকারীদের উদ্দেশ্যে সামনা সামনি সশস্ত্র যুদ্ধের আহ্বান জানিয়েছেন এবং হুমকি-ধমকি দিয়েছেন। এতে তিনি সেনাবাহিনীকে আধুনিক দাবি করে বলেছেন, “যদি যুদ্ধ করতে চান আসুন যুদ্ধ করি। আপনারা এক হাজার, দুই হাজার তিন হাজার লোক নিয়ে আর এ ক’টা অস্ত্র নিয়ে আমাদের সাথে যদি যুদ্ধ করতে চান আধা ঘন্টা টিকতে পারবেন না”। আসলে তার এই আহ্বান ছিল নিজের হতাশা প্রকাশ ও দুর্বলতা ঢাকার চেষ্টা। কারণ তিনি পার্বত্য চট্টগ্রামের জায়গাগুলো দুর্গম হওয়ার কারণে তারা তেমন সুবিধে করতে পারছেন না বলে নিজেদের দুর্বলতাও প্রকাশ করেছেন।

তবে তিনি ছাড়াও ঐ অনুষ্ঠানে পুলিশ প্রধান বেনজীর আহমেদও (যিনি দেশে বিচার বহির্ভুত হত্যার দায়ে আমেরিকার নিষেধাজ্ঞাপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের একজন) একইভাবে হুমকিমূলক কথাবার্তা বলেছেন। যদিও পার্বত্য চট্টগ্রামে সেনা খবরদারিতে পুলিশ বাহিনী একেবারেই অসহায়। আর সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীসহ আওয়ামী লীগ এমপি-মন্ত্রীদের সুরও ছিল একই প্রকৃতির। খাগড়াছড়ি আসনের এমপি কুজেন্দ্র লাল ত্রিপুরা তো আগ বাড়িয়ে সেটলারদের স্থায়ীভাবে পুনর্বাসনের দাবিও তুলেছেন!

তবে এখানে জিওসি সাহেবের কথার উপরই মূলত আলোকপাত করার চেষ্টা করবো। জিওসি সাইফুল আবেদীন সাহেব তার কথাবার্তায় সেটলারদের পক্ষ নিয়ে যেমনি উগ্র সাম্প্রদায়িকতার মুখোশ খুলে ফেলেছেন, একইভাবে তিনি পাহাড়িদের আন্ত-সম্প্রদায়গত বিষয়েও বিদ্বেষপ্রসূত ও বিভেদমূলক বক্তব্যও দিয়েছেন। এমনকি পাহাড়ি কোটা সম্পর্কেও সাম্প্রদায়িক কথাবার্তা বলেছেন। তিনি চুক্তি সম্পর্কেও জ্ঞান দেয়ার চেষ্টা করেছেন (চুক্তি বিষয়ে তার যে বক্তব্য সে বিষয়ে যারা এতে স্বাক্ষর করেছেন তারাই এর জবাব দেবেন আশা করি)। এতে করে জিওসি সাহেব অনুষ্ঠানে উপস্থিত রাজা দেবাশীষ রায়সহ সকল পাহাড়িদেরকে এক প্রকার অপমান করেই ছেড়েছেন।

একজন সিনিয়র সেনা কমান্ডার হিসেবে তিনি সম্পূর্ণ সাম্প্রদায়িক মনোভাব নিয়ে যে ভাষায় কথাবার্তা বলেছেন তা কেবল একজন মাস্তানের পক্ষেই মানানসই। গলির মাস্তানরাই কেবল এমনভাবে হুমকি দিয়ে কথা বলতে পারে। দায়িত্বশীল কোন ব্যক্তি এমন কথা বলতে পারেন না। তবে পার্বত্য চট্টগ্রামে সেনাবাহিনী যে মাস্তানগিরি করে সেটাও তার উক্ত বক্তব্যের মাধ্যমে পরিষ্কার হয়েছে।

এদিকে জিওসি’র এই বক্তব্যটি ঘিরে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুক এখন সরগরম চলছে। পাহাড়ি তরুণ প্রজন্ম জিওসি’র এই বক্তব্যকে ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করেছে। অনেকে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানাচ্ছেন।

দীর্ঘ প্রায় ৫ দশক ধরেই তো কাউন্টার ইন্সার্জেন্সি, অপারেশন দাবানল, অপারেশন উত্তরণের নামে, নিরাপত্তার নামে, শান্তি-শৃঙ্খলা রক্ষার নামে পার্বত্য চট্টগ্রামে লক্ষ লক্ষ সেনাবাহিনীর সদস্য নিয়োজিত রয়েছে। সেখানে তারা ‘মানুষ নয় মাটি চাই’ নীতি গ্রহণ করে নিষ্ঠুর দমন-পীড়ন জারি রেখেছে (যা এক সময় পাকিস্তানী হানাদারদের এই নীতি ছিল, কিন্তু ৭১ সালে জনগণের লড়াইয়ের মুখে তাদেরকে পরাজয় বরণ করতে হয়েছিল)। এই দীর্ঘ সময়ের মাঝপথে শান্তিবাহিনীর সশস্ত্র সংগ্রাম চলেছে। এই সংগ্রাম মোকাবেলায় সেনাবাহিনী পাহাড়ি জনগণের ওপর যত রকমের নিপীড়ন দরকার সবই করেছে। কিন্তু দেখা গেছে, তারা পার্বত্য চট্টগ্রামে আন্দোলন দমাতে ও পাহড়িদের ধ্বংস করে দিতে ব্যর্থ হয়েছে। কারণ শান্তিবাহিনীর সশস্ত্র সংগ্রামের পাশাপাশি নব্বই দশকে এসে ছাত্র-তরুণরা বৃহত্তর পরিসরে ছাত্র-গণআন্দোলন গড়ে তুলেছে, যা আজো চলমান রয়েছে।

জিওসি’র মতো সেনাবাহিনীর কমাণ্ডারগণ যতই হম্বিতম্বি করুক না কেন, সশস্ত্র আন্দোলনের সময় দেখা গেছে সেনাবাহিনীর বিশাল গ্রুপও শান্তিবাহিনীর কয়েকজন সশস্ত্র সদস্যের হাতে মার খেয়েছে, ধরাশায়ী হয়েছে (গণতান্ত্রিক আন্দোলনেও তাদের ধরাশায়ী হওয়ার অনেক উদাহরণ রয়েছে)। কিন্তু সেনাবাহিনী শান্তিবাহিনী সদস্যদের কোন কিছু করতে না পারার তাড়নায় প্রতিশোধ নিয়েছে সাধারণ পাহাড়িদের ওপর। তারা নিরীহ পাহাড়িদের ওপর হত্যাকাণ্ড চালিয়েছে। নিরস্ত্র লোকজনকে ধরে ধরে নির্যাতন করেছে। মাসের পর মাস অন্ধকার গর্তে ঢুকিয়ে রেখেছে। জেলে দিয়েছে। অর্থনৈতিক অবরোধ সৃষ্টি করেছে। এতে সেনাবাহিনীর দ্বারা শত শত নিরীহ মানুষকে হত্যার শিকার হয়েছেন। হাজার হাজার নিরীহ মানুষ নির্মম নিপীড়ন-নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। যাকে ‘মরা গরুর বাঘ’ কিংবা দুর্বলের ওপর সবলের অত্যাচার হিসেবে উল্লেখ করা যায়। তাদের (সেনাবাহিনীর) সেই প্রতিশোধ পরায়ণ মানসিকতার এখনো পরিবর্তন হয়নি।

১৯৯৭ সালে পার্বত্য চুক্তি স্বাক্ষরিত হবার পরও সেখানে তারা অপারেশন উত্তরণের নামে সেনাশাসন জারি রেখেছে। এর মাধ্যমে তারা প্রতিনিয়ত খুন-গুমসহ নিপীড়ন-নির্যাতন চালিয়ে যাচ্ছে। চুক্তির পর থেকে কত সংখ্যক সাধারণ মানুষ যে নিপীড়নের শিকার হয়েছেন তা বর্ণনাতীত। তবে শত দমন-পীড়নেও পাহাড়িদের অধিকার আদায়ের আন্দোলন দমাতে না পেরে হতাশ হয়ে এখন তারা আধুনিক অস্ত্রের ভয় দেখিয়ে হুমকি ধমকিসহ যুদ্ধের আহ্বানের মতো উদ্ভত ধরনের প্রলাপ বকতে শুরু করেছে। যা দেশের আইন ও সংবিধানের পরিপন্থি।

কিন্তু এই সময়ে এসে জিওসি সাহেবের এমন উস্কানিমূলক কথাবার্তা বলার উদ্দেশ্য কি হতে পারে তাও বিবেচ্য বিষয়। প্রথমত এর উদ্দেশ্য হতে পারে আন্দোলনকারীদের ফাঁদে ফেলে একটা পরিস্থিতি সৃষ্টি করা যাতে করে তারা সামরিক উপস্থিতিকে জায়েজ করতে পারে (যেহেতু সেনাবাহিনীর পরিত্যক্ত ক্যাম্পে সেনা সদস্যদের মোতায়েন না করে আর্মড পুলিশ মোতায়েন করছে সরকার, এতে তাদের মনে কষ্ট লাগতে পারে)। দ্বিতীয়ত, তিনি যেহেতু অবসরে যাবেন সেহেতু পরবর্তীতে আওয়ামী লীগের টিকেট লাভ করে মন্ত্রী-তন্ত্রী হবার ধান্ধা থাকতে পারে। আর তৃতীয়ত হতে পারে পার্বত্য চট্টগ্রামে তাদের কায়েমী স্বার্থ রক্ষা ও পর্যটন ব্যবসা নিরাপদ রাখার একটা অপকৌশল। যার কারণে তারা নিজেদের পাশাপাশি মুখোশ বাহিনীসহ কিছু সশস্ত্র ঠ্যাঙারে বাহিনী সৃষ্টি করে অরাজকতা তৈরি করে রেখেছে। যদিও এই সশস্ত্র সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে সেনাবাহিনীর আদর আপ্যায়ন ছাড়া কোন অ্যাকশন নেই।

মনে করিয়ে দিতে চাই , পার্বত্য চট্টগ্রামে অন্যায়-অবিচার করার কারণে অতীতে অনেক সেনা অফিসারকে প্রায়চিত্ত ভোগ করতে হয়েছে। এখন যারা হম্বিতম্বি করছেন তাদেরকেও একদিন একই প্রায়চিত্ত ভোগ করতে হবে।

শেষে সরকার ও সেনাবাহিনীকে এটাও মনে রাখতে বলবো যে, পাহাড়ি জনগণের ভয় পাওয়ার আর কিছুই নেই। তারা দীর্ঘসময় শরণার্থী জীবন-যাপন করতে বাধ্য হয়েছেন, হাজার হাজার একর জমি-জমা হারিয়েছেন, শত শত বাপ-ভাই, মা-বোনকে হারিয়েছেন। শত নিপীড়ন-নির্যাতন, অন্যায়-অত্যাচারে পোড় খাওয়া জনগণকে দমানো বা ধ্বংস করা এত সহজ নয়। তাই, যত প্রকার বাহিনী মোতায়েন করা হোক না কেন, যতই নিপীড়ন-নির্যাতন, দমন-পীড়ন জারি রাখা হোক না কেন, পার্বত্য চট্টগ্রামের মুক্তিকামী জনতা ও ছাত্র-যুব-নারী সমাজ জাতীয় অস্তিত্ব রক্ষার্থে ন্যায়সঙ্গতভাবে লড়াই চালিয়ে যেতে বদ্ধ পরিকর। ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠা না হওয়া পর্যন্ত কোন অপশক্তি এই লড়াইকে থামাতে পারবে না। একটি বিজ্ঞাপনের ভাষায় বলি ‘যতই চাপাচাপি করেন কোন লাভ নাই”। অস্তিত্ব রক্ষার ন্যায়সঙ্গত লড়াই চলবেই।

২৮ মে ২০২২

* লেখক অধিকার সচেতন একজন নাগরি

[মুক্তমত বিভাগে প্রকাশিত লেখাগুলো লেখক/লেখকদের নিজস্ব মতামতই প্রতিফলিত ]


সিএইচটি নিউজে প্রকাশিত প্রচারিত কোন সংবাদ, তথ্য, ছবি ,ভিডিও, কনটেন্ট ব্যবহার করতে হলে কপিরাইট আইন অনুসরণ করে ব্যবহার করুন।


সিএইচটি নিউজের ইউটিউব চ্যানেলটি সাবস্ক্রাইব করুন

Print Friendly, PDF & Email

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.