পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রশাসনে পাহাড়ি অন্তর্ভুক্তি জরুরী

0
15

সুরেশ ত্রিপুরা


পার্বত্য চট্টগ্রাম — যা এক সময় কার্পাস মহল নামে পরিচিত ছিল — বর্তমানে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের অন্তর্ভুক্ত। ব্রিটিশরা ১৮৬০ সালে এ অঞ্চলে প্রত্যক্ষ উপনিবেশিক শাসন কায়েম করে। তার আগে ১৭৭২ সাল থেকে ১৭৮৭ সাল পর্যন্ত ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসনের বিরুদ্ধে এ অঞ্চলের জনগণ প্রতিরোধ যুদ্ধ সংগঠিত করেছিলেন। পার্বত্য চট্টগ্রাম রাজ্যটি শাসনের সময় ব্রিটিশরা বুঝেছিলেন যে, বিভিন্ন দিক দিয়ে এ অঞ্চলটি ইতিপূর্বে তাদের অধিকৃত বাংলা আলাদা। তাই তারা বাংলায় যে ধরনের প্রশাসন গড়ে তুলেছিলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামে সে ধরনের প্রশাসনিক ব্যবস্থা কায়েম করেননি। এ অঞ্চলে কীভাবে শাসন কার্য চালাতে হবে তা গভর্ণমেন্ট অব বেঙ্গলের ১৮৬০ সনের ২০ জুনের ৩৩০০ নং পত্রে নির্দেশনা দেয়া হয়েছিল। যেমন: ১) হাকিম (বা বিচারক) ও পাহাড়ি বিচারপ্রার্থীর মধ্যে কোন মধ্যস্থ ব্যক্তি না রাখা; পাহাড়ি ও পাহাড়ির মধ্যে বিবাদের ক্ষেত্রে উকিল, মোক্তার নিয়োগ নিষিদ্ধ করা। ২) নিখরচা ও সরল বিচার পদ্ধতি প্রচলনের জন্য আইনের মর্মবাণী দ্বারা চালিত হওয়া এবং ইকুইটি বা ন্যায়পরতা মেনে চলা, স্ট্যাম্পের ব্যবহারের প্রয়োজনীয়তা না রাখা, প্রকৃত ও প্রয়োজনীয় খরচের চেয়ে যাতে (বাদীর) বেশী ব্যয় না হয় তার ব্যবস্থা করা। এক কথায় সরলতম ও সবচেয়ে দ্রুততম পদ্ধতিতে ন্যায়বিচারের বিধান করা। ৩) পাহাড়ি জনগণের প্রথা ও বিভিন্ন সংস্কারগুলোকে পালন ও সম্মান করা। রাজা ও তাদের প্রজাদের মধ্যেকার বিষয়ে যত কম হস্তক্ষেপ করা যায় তা চেষ্টা করা। (Capt. T. H. Lewin: The Hill Tracts of Chittagong and the Dwellers Therein; with Comparative Vocabularies of the Hill Dialect, p. 24)

ক্যাপ্টেন লুইনের উক্ত বর্ণনা থেকে বোঝা যায়, ব্রিটিশরা পার্বত্য চট্টগ্রামে যে শাসন পদ্ধতি চালু করেছিল তা ছিল অত্যন্ত সহজ, সরল ও কার্যকর। অর্থাৎ এখানকার পাহাড়ি জনগণের উপযোগী করেই তারা প্রশাসনিক কাঠামো, পদ্ধতি ও ব্যবস্থা চালু করেছিল। লুইনের উক্ত গ্রন্থে আরও জানা যায় যে, পরের দিকে এই পদ্ধতি থেকে বিচ্যুত হলে উকিল মোক্তাররা ধীরে ধীরে বিচার প্রক্রিয়ায় ঢুকে পড়ে। এর ফল হয় এই যে, উকিল-মোক্তার ও ব্যবসায়ী শ্রেণী যৌথভাবে সরলপ্রাণ পাহাড়িদেরকে অর্থনৈতিক শোষণে জর্জরিত ও সর্বস্বান্ত করে। এ অবস্থা লাঘবের জন্য পরে ব্রিটিশরা বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করতে বাধ্য হয়।

ব্রিটিশ উপনিবেশিক যুগে পাহাড়িদের স্বাধীনতা খর্ব করা হলেও তাদেরকে যথেষ্ট মাত্রায় স্বায়ত্তশাসন ভোগ করতে দেয়া হয়েছিল এবং প্রশাসনেও তাদের উল্লেখযোগ্য অংশগ্রহণ বজায় ছিল। পার্বত্য চট্টগ্রামের জন্য ব্রিটিশরা ১৮৮১ সালে একটি স্বতন্ত্র পুলিশ বাহিনী গঠন করে, যা চিটাগাং হিল ট্র্যাক্টস ফ্রন্টিয়ার পুলিশ নামে পরিচিত। শীর্ষপদ ছাড়া এই পুলিশ বাহিনীর কর্মকর্তা ও সদস্যরা ছিল সকলে পাহাড়ি। অপরদিকে বিচারিক প্রশাসনের ক্ষেত্রে পাহাড়িদের মধ্যে প্রচলিত নিজস্ব বিচার ব্যবস্থাকে স্বীকৃতি দেয়া হয়। রাজা ও হেডম্যানদেরকে রাজস্ব প্রশাসনে অন্তর্ভুক্ত করা হয়।

অথচ দুঃখজনক যে, বর্তমান স্বাধীন বাংলাদেশ আমলে পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রশাসনে পাহাড়িদের অংশগ্রহণ নেই বললেই চলে। পাকিস্তান আমলেই পার্বত্য চট্টগ্রামের ফ্রন্টিয়ার পুলিশ বাহিনীকে ভেঙে দেয়া হয়। সেই পর থেকে এ অঞ্চলের জন্য আর স্বতন্ত্র পুলিশ বাহিনী নেই। পার্বত্য চট্টগ্রামে নিয়োজিত পুলিশের মধ্যে পাহাড়ি নেই বললেই চলে। তিন জেলায় তিন পুলিশ সুপার এবং সকল থানায় ওসি ও অন্যান্য কর্মকর্তারাও অপাহাড়ি (দু’ এক জনের ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম থাকতে পারে, তবে তা ধর্তব্যের মধ্যে পড়ে না)। জেলা প্রশাসকদের কার্যালয়েও একই চিত্র। তিন জেলার সকল ডেপুটি কমিশনারগণ বাঙালি, এমনকি ডিসি অফিসসমূহের অন্যান্য সকল কর্মকর্তারাও অপাহাড়ি। তিন জেলার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের মধ্যে একজনও পাহাড়ি নেই, সকলেই অপাহাড়ি। ২০০৩ সাল থেকে তিন পার্বত্য জেলায় সমতলের মতো জজ আদালত চালু করা হয়েছে, কিন্তু আদালতের বিচারকের আসনে যারা আসীন, তারাও সবাই অপাহাড়ি।

স্বাধীনতার পর থেকে সাধারণ প্রশাসন পরিচালনার ক্ষেত্রে পাহাড়িদের এভাবে বঞ্চিত রাখা হয়েছে, যা চরম বৈষম্যমূলক, সুশাসনের পরিপন্থী এবং পাহাড়িদের প্রতি বৈমাতাসুলভ মনোভাবের বহিঃপ্রকাশ ছাড়া কিছুই নয়। প্রশাসনের সকল স্তরের উচ্চপদে পাহাড়ি না থাকার কারণে সাধারণ পাহাড়ি লোকজন প্রশাসনের দ্বারস্থ হতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে না; এমনকি ভয় পায়, সংকোচ ও ইতস্তত বোধ করে। কোন বিষয়ে সাহায্য নেওয়ার ক্ষেত্রেও তারা থানা পুলিশের ওপর আস্থা ও ভরসা রাখতে পারে না, একারণে মামলা করতে কিংবা অন্য কোন প্রয়োজনে তাদের দ্বারস্থ হতে আগ্রহী হয় না। এছাড়া ভাষাগত সমস্যা তো রয়েছেই। এক কথায় প্রশাসনে স্বজাতির কর্মকর্তা না থাকায় তারা প্রশাসনকে নিজেদের বলে ভাবতে পারে না।

এই অবস্থায় পার্বত্য চট্টগ্রামে প্রশাসনকে সহজ ও পাহাড়ি-বান্ধব করা সরকারের জন্য একটি জরুরী কর্তব্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ জন্য সরকারকে অবশ্যই উপনিবেশিক দৃষ্টিভঙ্গি ত্যাগ করতে হবে। ব্রিটিশরাও প্রথম দিকে প্রশাসনের উচ্চপদে স্থানীয় ভারতীয়দের নিযুক্ত না করলেও পরে তারা সেই নীতি পরিত্যাগ করেছিল। পার্বত্য চট্টগ্রামেও প্রশাসনের উচ্চপদসহ সকল স্তরে পাাহড়িদের নিয়োগ দেয়ার ব্যবস্থা করা এখন সময়ের দাবি। বাংলাদেশে সরকারের জনপ্রশাসন সংক্রান্ত যে নীতিই থাকুক, এটা মনে রাখতে হবে যে পার্বত্য চট্টগ্রামের ঐতিহাসিক, আইনগত ও প্রশাসনিক প্রেক্ষাপট সম্পূর্ণ ভিন্ন এবং সেটা হিসেবে রেখেই এখানকার প্রশাসনিক বিষয়গুলো ঠিক করতে হবে।#


সিএইচটি নিউজে প্রকাশিত প্রচারিত কোন সংবাদ, তথ্য, ছবি ,ভিডিও, কনটেন্ট ব্যবহার করতে হলে কপিরাইট আইন অনুসরণ করে ব্যবহার করুন।


সিএইচটি নিউজের ইউটিউব চ্যানেলটি সাবস্ক্রাইব করুন

Print Friendly, PDF & Email

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.