শিক্ষা দিবস উপলক্ষে বিভিন্ন দাবিতে মানিকছড়িতে পাহাড়ি ছাত্র পরিষদের ছাত্র সমাবেশ

0


মানিকছড়ি প্রতিনিধি, সিএইচটি নিউজ

বুধবার, ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬

মহান শিক্ষা দিবস উপলক্ষে “শিক্ষাঙ্গনে গোয়েন্দা নজরদারি ও সেনা খবরদারি বন্ধ করা, স্কুল ভবন ক্যাম্প বানিয়ে পড়ালেখায় ব্যাঘাত ও জনমনে আতঙ্ক সৃষ্টি না করা, সেনা অভিযানের নামে দমন-পীড়ন বন্ধ করা এবং শিক্ষার পরিবেশ ফিরিয়ে আনার” দাবিতে খাগড়াছড়ি জেলার মানিকছড়িতে ছাত্র সমাবেশ করেছে বৃহত্তর পার্বত্য চট্টগ্রাম পাহাড়ি ছাত্র পরিষদ(পিসিপি), খাগড়াছড়ি জেলা শাখা।

আজ বুধবার (১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬), বেলা ২:০০টায় মানিকছড়ি উপজেলার গিরিমৈত্রী সরকারি ডিগ্রি কলেজ গেইট প্রাঙ্গনে এই ছাত্র সমাবেশের আয়োজন করা হয়। সমাবেশ শুরুর আগে একটি মিছিল কলেজ গেইট থেকে শুরু হয়ে মানিকছড়ি উপজেলা পরিষদ এলাকা ঘুরে আসে।

ছাত্র সমাবেশে পাহাড়ি ছাত্র পরিষদ খাগড়াছড়ি জেলা শাখার সভাপতি তৃষ্ণাঙ্কর চাকমার সভাপতিত্বে ও সাধারণ সম্পাদক প্রাঞ্জল চাকমার সঞ্চালনায় বক্তব্য দেন সংগঠনের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক সোহেল চাকমা, গণতান্ত্রিক যুব ফোরামের খাগড়াছড়ি জেলা সদস্য রিকেন চাকমা। স্বাগত বক্তব্য দেন পাহাড়ি ছাত্র পরিষদের মানিকছড়ি উপজেলা শাখা সভাপতি আনু মারমা।

ছাত্রনেতা সোহেল চাকমা বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামসহ সারা দেশের বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থাকে অগণতান্ত্রিক, বেসরকারীকরণ ও বাণিজ্যিকীকরণ করে রাখা হয়েছে। বর্তমানে কোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে মুক্তচিন্তা করার মতো গণতান্ত্রিক পরিবেশ নেই। অন্যদিকে পার্বত্য চট্টগ্রামের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে রয়েছে কড়া সেনা নজরদারি এবং সরকারি গোপন নির্দেশনা।

পার্বত্য চট্টগ্রামে পাহাড়ি শিক্ষার্থীরা কোথাও নিরাপদ নয় উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে সেনা-গোয়েন্দা নজরদারি জারি রাখা হয়েছে। জাতিগত নিপীড়নের অংশ হিসেবে বহিরাগত শিক্ষকের দ্বারা পাহাড়ি শিক্ষার্থীরা ধর্ষণ, হেনস্তা ও বুলিংয়ের শিকার হচ্ছে। ২০১৭ সালে নান্যাচরে কলেজ ছাত্র রমেল চাকমাকে সেনাবাহিনী কর্তৃক নির্যাতন চালিয়ে হত্যা করা হয়েছিল। পার্বত্য চট্টগ্রামের এমন এক শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতিতে পাহাড়ি ছাত্রসমাজকে চুপ করে বসে থাকলে হবে না। ১৯৬২ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর পাকিস্তানি শাসন-শোষণ ও শিক্ষা সংকোচন নীতির বিরুদ্ধে ছাত্রসমাজ যেভাবে রুখে দাঁড়িয়েছিল, সেভাবে আমাদেরও রুখে দাঁড়িয়ে পার্বত্য চট্টগ্রামের বর্তমান পরিস্থিতির পরিবর্তন ঘটাতে হবে। জাতীয় অস্তিত্ব রক্ষার্থে শিক্ষার্থীদের মূল ভূমিকা পালন করতে হবে।

তিনি আরো বলেন, গত ১০ সেপ্টেম্বর ‘পার্বত্য চট্টগ্রাম সমস্যা সমধান’র নামে তথাকথিত কমিটি গঠনের বিষয়টিও আমরা দেখেছি। আশির দশকে জিয়াউর রহমানের শাসনামলেও একইভাবে কমিটি গঠন করে পার্বত্য চট্টগ্রামে লক্ষ লক্ষ বাঙালি সেটলারকে পুনর্বাসন করা হয়েছিল। পার্বত্য চট্টগ্রামের জনগণের পক্ষ থেকে সরকারের গঠিত কমিটি আমরা প্রত্যাখ্যান করছি।

বিএনপি সরকার পার্বত্য চট্টগ্রামের সমস্যা সমাধানের নামে সেনা ও গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে যে উদ্যোগ গ্রহণ করছে, তা নিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রামের জনগণ উদ্বিগ্ন। আশির দশকে যে প্রক্রিয়ায় পার্বত্য চট্টগ্রামে সেটলার পুনর্বাসন করা হয়েছিল, সরকার একই ধরনের ষড়যন্ত্র শুরু করেছে বলে তিনি অভিযোগ করেন।

তিনি বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ে কোন সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে সেনা ও গোয়েন্দা সংস্থার খবরদারি অবসান করে স্থানীয় জনগণ, সুশীল সমাজ, জনপ্রতিনিধি ও প্রথাগত নেতৃবৃন্দকে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।

ছাত্রনেতা সোহেল চাকমা আরও বলেন, ১৯৬২ সালের শরীফ শিক্ষা কমিশনের প্রস্তাবিত শিক্ষানীতিতে শিক্ষাকে অধিকার হিসেবে না দেখে বাণিজ্য হিসেবে দেখা হয়েছিল। তাই তৎকালীন ছাত্রসমাজ এই শিক্ষা কমিশনের শিক্ষানীতিকে প্রতিক্রিয়াশীল শিক্ষানীতি হিসেবে আখ্যায়িত করেছিল। এই শিক্ষানীতির বিরুদ্ধে ছাত্র-জনতা ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন গড়ে তোলে। পরে সামরিক সরকার আইয়ুব খান তা স্থগিত করতে বাধ্য হয়।

তিনি বলেন, পিসিপি ২০০১ সাল থেকে সংখ্যালঘু জাতিসত্তার নিজ মাতৃভাভাষায় প্রাথমিক স্তরে শিক্ষা লাভের অধিকার নিশ্চিত করাসহ শিক্ষা-সংক্রান্ত পাঁচ দফা দাবি বাস্তবায়নের জন্য সরকারের কাছে স্মারকলিপি পেশ, বিক্ষোভ মিছিল-সমাবেশ, প্রতীকী ক্লাস এবং ক্লাস বর্জনের মতো কর্মসূচি দিয়েছে। সর্বশেষ ২০১১ সালে তৎকালীন শিক্ষামন্ত্রী পিসিপি’র দাবিকে যৌক্তিক বলে স্বীকার করে বাস্তবায়নের আশ্বাস দেন। ২০১৭ সাল থেকে প্রাথমিকভাবে চাকমা, ত্রিপুরা, মারমা, মণিপুরী ও গারো এই পাঁচটি ভাষায় প্রাথমিক স্তরে নিজস্ব মাতৃভাষায় পাঠ্যপুস্তক প্রণয়ন করা হলেও অন্যান্য জাতিসত্তার বিষয়ে সরকার এখনো কোনো উদ্যোগ গ্রহণ করেনি এবং পিসিপি’র শিক্ষা সংক্রান্ত ৫ দফা দাবিও পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন করেনি বলে তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করেন।

যুবনেতা রিকেন চাকমা বলেন, শিক্ষক নিয়োগের নামে পার্বত্য চট্টগ্রামে জেলা পরিষদগুলোর মাধ্যমে দুর্নীতি, তদবির ও অবৈধ বাণিজ্য চলছে। এই পরিষদকে সরকার দলীয় পুনর্বাসন কেন্দ্র বানিয়ে প্রাথমিক-মাধ্যমিক শিক্ষা ব্যবস্থা ধ্বংস করা হচ্ছে।

তিনি আরও বলেন, ছাত্র-যুব সমাজকে আন্দোলনবিমুখ করার লক্ষ্যে নানা রকমের নেশা দ্রব্য ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে। পার্বত্য চট্টগ্রামে জাতীয় কমিটি গঠনের নামে গোয়েন্দা সংস্থা ও সামরিক কর্মকর্তাদের একচেটিয়া দায়িত্ব প্রদান করে নতুন করে ষড়যন্ত্র করা হচ্ছে। শাসকগোষ্ঠীর এই সকল ষড়যন্ত্র নস্যাৎ করে দেওয়ার জন্য ছাত্র-যুব সমাজকে আন্দোলনে এগিয়ে আসতে হবে।

স্বাগত বক্তব্য আনু মারমা বলেন, সরকার পরিবর্তনের পর জনগণের মধ্যে শিক্ষা ব্যবস্থায় পরিবর্তনের প্রত্যাশা তৈরি হলেও পার্বত্য চট্টগ্রামের শিক্ষার্থীদের বাস্তব সংকট এখনো কাটেনি। ২০২৬ সালের এসএসসি পরীক্ষায় পাহাড়ের শিক্ষার্থীদের অকৃতকার্য ও ঝরে পড়ার বিষয়টি এই অঞ্চলের শিক্ষা ব্যবস্থার গভীর সংকটকে তুলে ধরে।

সভাপতির বক্তব্যে তৃষ্ণাঙ্কর চাকমা বলেন, বাংলাদেশের ছাত্র আন্দোলনের ইতিহাসে ১৭ সেপ্টেম্বর গুরুত্বপূর্ণ একটি দিন। ১৯৬২ সালে তৎকালীন পাকিস্তান শাসনামলে বিতর্কিত শরীফ কমিশনের চাপিয়ে দেওয়া শিক্ষানীতির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতে ছাত্রসমাজ ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন গড়ে তুলেছিল। বাংলা ভাষাকে খর্ব করে উর্দু ও আরবি ভাষায় শিক্ষা এবং শিক্ষাকে বাণিজ্যিকীকরণের নীতি সে সময়কার ছাত্রসমাজ মেনে নেয়নি।

বর্তমানে পার্বত্য চট্টগ্রামে শিক্ষা ব্যবস্থা খুবই নাজুক উল্লেখ করে তিনি বলেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে চরম শিক্ষক সংকট রয়েছে। ঘুষ-দুর্নীতির মাধ্যমে অদক্ষ শিক্ষক নিয়োগ দিয়ে পাহাড়ি শিক্ষার্থীরা সঠিক পাঠদান ও সুশিক্ষা পাওয়া থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। শুধু তাই নয়, পার্বত্য চট্টগ্রামে রাষ্ট্রীয় দমন-পীড়নের মাত্রা দিন বেড়ে চলেছে। পার্বত্য চট্টগ্রামের এমন এক শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতিতে পাহাড়ি ছাত্রসমাজকে চুপ করে বসে থাকলে হবে না। অস্তিত্ব রক্ষার জন্য আন্দোলনে সামিল হতে হবে।

তিনি অবিলম্বে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে গোয়েন্দা নজরদারি ও সেনা খবরদারি বন্ধ করা, স্কুল ভবন ক্যাম্প বানিয়ে পড়ালেখায় ব্যাঘাত ও জনমনে আতঙ্ক সৃষ্টি না করা, সেনা অভিযানের নামে দমন-পীড়ন বন্ধ করা এবং শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ নিশ্চিত করাসহ পিসিপি’র শিক্ষা সংক্রান্ত ৫ দফা দাবি পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নের জন্য সরকারের কাছে জোর দাবি জানান।

পিসিপি’র শিক্ষা সংক্রান্ত দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে, সকল জাতিসত্তার মাতৃভাষায় প্রাথমিক শিক্ষা লাভের অধিকার নিশ্চিত করা; স্কুল কলেজের পাঠ্যপুস্তকে জাতিসত্তার প্রতি অবমাননাকর বক্তব্য বাদ দেওয়া; পাহাড়ি জাতিসত্তার বীরত্বব্যঞ্জক কাহিনী ও সঠিক সংগ্রামী ইতিহাস স্কুল কলেজের পাঠ্যক্রমে অন্তর্ভুক্ত করা; বাংলাদেশের সকল জাতিসত্তার সংক্ষিপ্ত সঠিক তথ্য সম্বলিত পরিচিতিমূলক রচনা বাংলাদেশের জাতীয় শিক্ষাক্রমে অন্তর্ভুক্ত করা এবং পার্বত্য কোটা বাতিল করে পাহাড়িদের জন্য বিশেষ কোটা চালু করা।

উল্লেখ্য, ১৯৬২ সালে শরীফ শিক্ষা কমিশনের শিক্ষা সংকোচন নীতির বিরুদ্ধে আন্দোলনে নামে ছাত্রসমাজ। ধারাবাহিক আন্দোলন চলার সময় ওই বছর ১৭ সেপ্টেম্বর আন্দোলনকারীদের ওপর হামলা ও গুলি চালায় পুলিশ। এতে নিহত হন ওয়াজিউল্লাহ, গোলাম মোস্তফা, বাবুলসহ অনেকে। তাদের স্মরণে বাংলাদেশে প্রতিবছর ১৭ সেপ্টেম্বরকে ‘মহান শিক্ষা দিবস’ হিসেবে পালন হয়ে থাকে।



This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. AcceptRead More