আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস আজ

0

প্রতীকী ছবি

সিএইচটি নিউজ ডেস্ক
শনিবার, ৩০ আগস্ট ২০২৫

আজ ৩০ আগস্ট আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস। প্রতি বছর এই দিনে বিশ্বব্যাপী গুম হওয়া ব্যক্তিদের স্মরণ এবং তাদের পরিবারের প্রতি সমবেদনা প্রকাশ করা হয়। পাশাপাশি গুম হওয়া ব্যক্তিদের উদ্ধার এবং এ ধরনের ঘটনা প্রতিরোধে জড়িতদের বিচারের আওতায় এনে শাস্তি নিশ্চিত করার দাবি জানানো হয়।

২০০৬ সালের ২০ ডিসেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে গুম হওয়া ব্যক্তিদের জন্য একটি প্রস্তাব আন্তর্জাতিক সনদ হিসেবে গৃহীত হয়। ২০১০ সালের ডিসেম্বরে ‘ইন্টারন্যাশনাল কনভেনশন ফর প্রটেকশন অব অল পারসন্স অ্যাগেইনস্ট এনফোর্সড ডিসঅ্যাপিয়্যারেন্স’ শীর্ষক সম্মেলনের আন্তর্জাতিক সনদে ৩০ আগস্টকে ‘আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস’ হিসেবে ঘোষণা করা হয়। সামগ্রিকভাবে এই সনদের লক্ষ্য গুম বন্ধের পাশাপাশি এই অপরাধের জন্য দায়মুক্তি বন্ধ করা, ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা ও ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের সহায়তা দেওয়া।  ২০১১ সাল থেকে প্রতি বছর ৩০ আগস্ট গুম হওয়া মানুষগুলোকে স্মরণ এবং সেই সঙ্গে তাদের পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানানোর জন্য দিবসটি পালন করা হচ্ছে বিশ্বব্যাপী।

রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় গুমের অভিযোগ নিয়ে গত দেড় দশকের বেশি সময় ধরে আন্তর্জাতিক পরিসরে বাংলাদেশের সমালোচনা রয়েছে। শেখ হাসিনার সরকারের পতনের পর ‘আয়নাঘর’ হিসেবে পরিচিত গোপন বন্দিশালা থেকে দীর্ঘ সময় পর পার্বত্য চট্টগ্রামের আঞ্চলিক রাজনৈতিক দলের নেতা মাইকেল চাকমাসহ বেশ কয়েকজন ব্যক্তি মুক্ত হওয়ার পর গুমের বিষয়টি জোরালোভাবে সামনে আসে। মুক্তি পাওয়া ব্যক্তিরা বিভিন্ন মিডিয়ায় তাদের ওপর চলা নিপীড়ন ও গোপন বন্দিশালার বিস্তারিত বিবরণ তুলে ধরেন।

মাইকেল চাকমা গুমের শিকার হন ২০১৯ সালের ৯ এপ্রিল রাজধানীর কল্যাণপুর এলাকা থেকে। দীর্ঘ ৫ বছর ৪ মাস গুম করে রাখার পর গতবছর ৭ আগস্ট ভোররাতে তাকে হাত ও চোখ বাঁধা অবস্থায় চট্টগ্রামের মীরসরাই উপজেলার করেরহাট এলাকায় ছেড়ে দেওয়া হয়।

শেখ হাসিনার গত ১৫ বছরের শাসকালে বাংলাদেশে ৭শর বেশি মানুষ গুম হওয়ার ঘটনা ঘটেছে বলে বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠনের রিপোর্টে তুলে ধরা হয়েছে। এর মধ্যে তিন শতাধিক মানুষের খোঁজ এখনো পাওয়া যায়নি।

এছাড়া দীর্ঘ ২৯ বছরেও খোঁজ পাওয়া যায়নি পার্বত্য চট্টগ্রামের নারী নেত্রী কল্পনা চাকমার। ১৯৯৬ সালের ১২ জুন সেনাবাহিনীর কর্মকর্তা লে. ফেরদৌসের নেতৃত্বে বাঘাইছড়ির লাল্যাঘোনার নিজ বাড়ি থেকে অপহরণ করা হয় কল্পনা চাকমাকে। তাঁর সন্ধানের দাবিতে এখনো প্রতিবাদ-বিক্ষোভ অব্যাহত রয়েছে।

জাতিসঙ্ঘের গুমবিরোধী সনদে গুমকে মানবতাবিরোধী অপরাধ হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে। এই সনদের যথাযথভাবে প্রয়োগ হচ্ছে কি না, তা দেখভালের জন্য জাতিসংঘেরই ১০ সদস্যবিশিষ্ট একটি কমিটি কাজ করে থাকে। এ কমিটি পক্ষভুক্ত রাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রতিবেদন যাচাই করে। সনদের ৩৩ অনুচ্ছেদে বলা আছে, সনদের পক্ষভুক্ত কোনো দেশে যদি গুমের ঘটনা ঘটে, তবে ওই দেশের পরিস্থিতি দেখার জন্য কমিটির সদস্যরা সেদেশ সফরও করতে পারেন।

বাংলাদেশ জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক নয়টি সনদের মধ্যে আটটিতে সই করলেও বিগত হাসিনা সরকার গুমবিরোধী সনদে সই করেনি। চব্বিশের জুলাই গণঅভ্যুত্থানে হাসিনা সরকারের পতনের পর ড. ইউনূসের নেতৃত্বে গঠিত অন্তর্বর্তী সরকার গত বছর গুমবিরোধী আন্তর্জাতিক সনদে স্বাক্ষর করে। এ সনদে এখন পর্যন্ত বিশ্বের ৭৫টি দেশ এই সনদে যুক্ত হয়েছে।

অন্তর্বর্তী সরকার গুম সংক্রান্ত একটি তদন্ত কমিশন গঠন করেছে। ইতোমধ্যে কমিশন সরকারের কাছে রিপোর্টও জমা দিয়েছে। কমিশনের রিপোর্টে গুমের ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে।

গুম কমিশনের সূত্রে জানা গেছে, এ পর্যন্ত ১৮৫০টি অভিযোগ জমা পড়েছে কমিশনে। সেগুলো বিশ্লেষণের কাজ চলমান আছে। অভিযোগগুলোর মধ্যে ৩৩০ জন এখনো গুম রয়েছেন, যাদের ২১১ জনই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মাধ্যমে গুমের শিকার। আর যারা ফিরেছেন তাদের ২৫৩ জনের বিষয়ে একটি রিপোর্ট সরকারের কাছে দিয়েছে কমিশন। সেখানে গুমের শিকার ওইসব ব্যক্তিদের ওপর নির্যাতনের ধরন কেমন ছিল তার বিস্তারিত তুলে ধরা হয়েছে।

কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকার এক বছরেও গুমের ঘটনার বিচার ও গুম হওয়া সাড়ে তিন শতাধিক ব্যক্তির কোন খোঁজ সরকার এখনো দিতে পারেনি। 

তবে সম্প্রতি অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা পরিষদ ‘গুম প্রতিরোধ, প্রতিকার ও সুরক্ষা অধ্যাদেশ, ২০২৫’-এর খসড়া নীতিগত অনুমোদন দিয়েছে। এতে গুম করার অপরাধে মৃত্যুদণ্ডসহ কঠোর শাস্তির বিধান প্রস্তাব করা হয়েছে। এ ছাড়া গুম সংক্রান্ত বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠন এবং অভিযোগ গঠনের ১২০ দিনের মধ্যে বিচার সম্পন্নের বাধ্যবাধকতা রাখা হয়েছে খসড়া অধ্যাদেশে।



This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. AcceptRead More