ইউপিডিএফের আপোষহীন লড়াই-সংগ্রামের ২৬ বছর

0

সিএইচটি নিউজ ডেস্ক
বৃহস্পতিবার, ২৬ ডিসেম্বর ২০২৪

আজ ২৬ ডিসেম্বর ২০২৪ পার্বত্য চট্টগ্রামে পূর্ণস্বায়ত্তশাসনের দাবিতে আন্দোলনরত রাজনৈতিক দল ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (ইউপিডিএফ) এর ২৬তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী। ১৯৯৮ সালের আজকের এই দিনে ঢাকায় পার্বত্য চট্টগ্রামের তিন গণতান্ত্রিক সংগঠন (পাহাড়ি ছাত্র পরিষদ, পাহাড়ি গণপরিষদ ও হিল উইমেন্স ফেডারেশন) এর যৌথ উদ্যোগে এক পার্টি প্রস্তুতি সম্মেলনের মাধ্যমে গঠিত হয় ইউপিডিএফ। গঠনলগ্ন থেকে নানা চড়াই-উৎরাই পেরিয়ে দলটি আপোষহীন লড়াই-সংগ্রামের ২৬ বছর পূর্ণ করলো।

শুরু থেকেই শাসকগোষ্ঠীর রোষানলে পড়তে হয় ইউপিডিএফকে। ১৯৯৯ সালের ২২ এপ্রিল খাগড়াছড়িতে হামলা চালিয়ে ইউপিডিএফভূক্ত সংগঠনগুলোর সম্মেলনে ভণ্ডুল, একই বছর ২৬ ডিসেম্বর চট্টগ্রামের লালদীঘি ময়দানে ইউপিডিএফের প্রথম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী অনুষ্ঠান বানচাল করে দেওয়া হয়েছে। এভাবে একের পর এক ষড়যন্ত্র ও নিষ্ঠুর রাজনৈতিক দমন-পীড়ন মোকাবেলা করে অভিষ্ট লক্ষ্য পূর্ণস্বায়ত্তশাসন আদায়ে অবিচলভাবে লড়াই-সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছে ইউপিডিএফ।

পার্বত্য চট্টগ্রামে ভূমি বেদখল, নারী নির্যাতন, অন্যায় দমন-পীড়নসহ সকল ধরনের নিপীড়ন-নির্যাতনের বিরুদ্ধে ইউপিডিএফ সব সময় সোচ্চার ভূমিকা পালন করে যাচ্ছে। অব্যাহত দমন-পীড়ন, জেল-জুলুম, এ পর্যন্ত সাড়ে তিনশ’র অধিক নেতা-কর্মী-সমর্থক খুন-গুমের শিকার হওয়ার পরও ইউপিডিএফ দমে যায়নি।

ইউপিডিএফ পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসরত জাতিসত্তাসমূহের অধিকার প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ের পাশাপাশি দেশের কৃষক, শ্রমিক, মেহনতি জনগণসহ সমতলের সকল জাতিসত্তাসমূহের ভাগ্য পরিবর্তনের লড়াইয়েও সমানভাবে সক্রিয় ভূমিকা পালন করে যাচ্ছে। ফিলিস্তিনসহ বিশ্বের সকল নিপীড়িত জনগণের সাথেও ইউপিডিএফ একাত্মতা প্রদর্শন করে থাকে।

একটি গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দল হিসেবে ইউপিডিএফ দেশের অষ্টম, নবম, দশম ও একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেছে। এতে দলটি বিপুল জনসমর্থন লাভ করতে সক্ষম হয়েছে।

শুধু তাই নয়, দলটি গত ৭ জানুয়ারি ২০২৪ ফ্যাসিস্ট হাসিনার আয়োজিত বিতর্কিত দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন (ডামি নির্বাচন হিসেবে খ্যাত) বয়কট করে পার্বত্য চট্টগ্রামে ২৭টি ভোটকেন্দ্র (খাগড়াছড়ি ১৯ ও রাঙামাটি ৮) শূন্যভোট করার নজিরবিহীন দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। যা ইতিপূর্বে বাংলাদেশের ইতিহাসে কোথাও এমন দৃষ্টান্ত নেই।

বিগত ২০০৬ সালে জাতীয় কংগ্রেস আয়োজনের মাধ্যমে ইউপিডিএফ ৬ দফা মৌলিক দাবিনামা, ১৬ দফা সম্পুরক দাবিনামা ও ২০ দফা কর্মসূচি গ্রহণ করে। তারই ভিত্তিতে ইউপিডিএফ তার কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে।

ইউপিডিএফ’র মৌলিক দাবিনামাগুলো হচ্ছে– ১. পররাষ্ট্র, মূদ্রা, প্রতিরক্ষা ও ভারী শিল্প ব্যতীত রাষ্ট্রীয় প্রশাসনের সকল বিষয় পার্বত্য চট্টগ্রামের স্থায়ী বাসিন্দাদের প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিত একটি আঞ্চলিক সংস্থার নিকট হস্তান্তরিত করার মাধ্যমে পূর্ণস্বায়ত্তশাসন কায়েম করা; ২. পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসরত চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা, মুরুং, খুমি, চাক, খিয়াং, লুসাই, পাংখো, বম, তনচংগ্যা, সাঁওতাল, গুর্খা, অহোমী ও রাখাইন জাতিসত্তাগুলোকে সংবিধানে স্বীকৃতি প্রদান করা এবং বাংলাদেশে বসবাসরত সকল জাতি ও জাতিসত্তা সমানাধিকার ও সমমর্যাদা ভোগ করবে এই নিশ্চয়তা সংবিধানে লিপিবদ্ধ করা; ৩. বাংলাদেশের জাতীয় সংসদে সংখ্যালঘু জাতিসত্তাগুলোর জন্য সংরক্ষিত আসনের (মহিলা আসনসহ) বিধান করা ও উক্ত আসনসমূহে সরাসরি নির্বাচনের মাধ্যমে প্রতিনিধি নির্বাচনের ব্যবস্থা করা;  ৪. অপারেশন উত্তরণের নামে বলবৎ সেনাশাসন বন্ধ করে সেনাবাহিনীকে পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে প্রত্যাহার করা; ৫. রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে পুনর্বাসিত সেটলারদেরকে জাতিগত নিপীড়নের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার বন্ধ করা এবং তাদেরকে পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে সরিয়ে নিয়ে তাদের স্ব স্ব জেলায় অথবা অন্য কোন সমতল জেলায় জীবিকার নিশ্চয়তাসহ সম্মানজনক পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা। নতুন সেটলার অনুপ্রবেশ ও পুনর্বাসন বন্ধ করা ও ৬. প্রথাগত ভূমি অধিকারের স্বীকৃতি ও পার্বত্য চট্টগ্রামে ভূমি ব্যবস্থাপনার পূর্ণ অধিকার প্রদান করা।

পার্বত্য চট্টগ্রামে নিপীড়িত জনগণের বৃহত্তর ঐক্য প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে পূর্ণস্বায়ত্তশাসন আদায়ের লড়াই চালিয়ে যেতে ইউপিডিএফ বদ্ধ পরিকর। যতই নিপীড়ন-নির্যাতন নেমে আসুক না কেন ইউপিডিএফের ন্যায়সঙ্গত আন্দোলন কিছুতেই স্তব্ধ করা যাবে না– এমনই প্রত্যয় দলটির নেতা-কর্মীদের।

এদিকে, ২৬তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে ইউপিডিএফ সভাপতি প্রসিত খীসা সংবাদ মাধ্যমে জনগণের উদ্দেশ্যে এক বার্তা দিয়েছেন।

প্রদত্ত বার্তায় তিনি ড. ইউনুসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে অত্যন্ত দুর্বল, এ সরকারের অধীনে পার্বত্য চট্টগ্রামের জাতিসত্তাসমূহ অনিশ্চয়তা, আতঙ্ক ও নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে। দেশের অন্যত্রও অবস্থা সংকটাপন্ন। দ্রব্যমূল্যের উর্ধ্বগতি ও অব্যবস্থার কারণে গার্মেন্টেসের শ্রমিক, পেশাজীবী ও সাধারণ খেটে-খাওয়া মানুষের জীবন ধারণ ক্রমেই কঠিন হয়ে পড়ছে। সরকারের দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের অপরিণামদর্শী মন্তব্য ও কর্মকাণ্ডের কারণে দেশের অভ্যন্তরে নানা বিতর্ক, সংকট তৈরি হচ্ছে এবং প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সাথে সম্পর্কেও টানাপোড়ন চলছে বলে মন্তব্য করেছেন।

বার্তায় তিনি ফ্যাসিস্ট হাসিনা উৎখাত হলেও পার্বত্য চট্টগ্রামের পরিস্থিতির কোন পরিবর্তন হয়নি, বরং ফ্যাসিস্ট সরকারের দোসররা গুরুত্বপূর্ণ সংস্থায় বহাল তবিয়তে থেকে আগের মতোই নাশকতা চালিয়ে যাচ্ছে বলে মন্তব্য করেন এবং নিজেদের অধিকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে সংগঠিত হওয়ার আহ্বান জানান।

প্রদত্ত বার্তায় প্রসিত খীসা পার্বত্য চট্টগ্রাম নিয়ে উগ্র সাম্প্রদায়িক জঙ্গীবাদী গোষ্ঠীসমূহের উস্কানিমূলক কথাবার্তা ও আগ্রাসী তৎপরতার ব্যাপারেও গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন এবং দেশের গণতান্ত্রিক শক্তিকে এ ধরনের অপতৎপরতার ব্যাপারে সজাগ থাকার আহ্বান জানান।

প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে পার্বত্য চট্টগ্রামের বিভিন্ন জায়গায় ইউপিডিএফ-এর দলীয় পতাকা উত্তোলন, অস্থায়ী স্মৃতিস্তম্ভে পুষ্পস্তবক অর্পণ করে শহীদদের শ্রদ্ধা নিবেদন, শিশু র‌্যালি, আলোচনা সভা, মতবিনিময়-চা চক্র সহ নানা কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে বলে জানা গেছে। 

প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীকে উপলক্ষ করে ইতোমধ্যে বিভিন্ন স্থানে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা অভিযান, সেতু নির্মাণ-রাস্তা সংস্কার, জনগণের কাজে সহযোগিতা প্রদানসহ জনসেবামূলক নানা কার্যক্রম, গ্রাফিতি অঙ্কন, দেওয়াল লিখন-চিকা মারা, পোস্টারিং, ফেস্টুন টাঙানো, কয়েকটি স্থানে শিশু র‌্যালি ও আলোচনা সভা সম্পন্ন হয়েছে বলে জানা গেছে।



This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. AcceptRead More