কাউখালীতে পিসিপি ও এইচডব্লিউএফের উপজেলা শাখার যৌথ কাউন্সিল সম্পন্ন

0


কাউখালী প্রতিনিধি, সিএইচটি নিউজ
সোমবার, ২৩ মার্চ ২০২৬

রাঙামাটির কাউখালীতে বৃহত্তর পার্বত্য চট্টগ্রাম পাহাড়ি ছাত্র পরিষদ (পিসিপি) ও হিল উইমেন্স ফেডারেশন (এইচডব্লিউএফ)-এর যৌথ কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হয়েছে। এতে পিসিপি’র কাউখালী উপজেলা শাখার ১৭তম ও এইচডব্লিউএফ’র ৮ম কাউন্সিল সম্পন্ন করে নতুন কমিটি গঠন করা হয়েছে।

আজ সোমবার (২৩ মার্চ ২০২৬) কাউখালী উপজেলার ডাবুয়া এলাকায় দিনব্যাপী এই কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হয়।

কাউন্সিলে ব্যানার স্লোগান হলো, “পূর্ণস্বায়ত্তশাসনই পার্বত্য চট্টগ্রামের একমাত্র সমস্যা সমাধান।

কাউন্সিলের ১ম অধিবেশন শুরুতে দলীয় সঙ্গীত “পাহাড়ি ছাত্র-ছাত্রী দল” গানটি পরিবেশনের মধ্য দিয়ে জাতীয় ও দলীয় পতাকা উত্তোলন করা হয়।

জাতীয় পতাকা উত্তোলন করেন পিসিপি’র কেন্দ্রীয় সহ-সভাপতি কুনেন্টু চাকমা, পিসিপি’র পতাকা উত্তোলন করেন জিপল চাকমা ও হিল উইমেন্স ফেডারেশনের পতাকা উত্তোলন করেন নন্দা চাকমা।

এরপর পার্বত্য চট্টগ্রামে নিপীড়িত জনগণের ন্যায্য অধিকার আদায়ের সংগ্রামে যারা শহীদ হয়েছেন তাদের শ্রদ্ধা ও সম্মান জানিয়ে দাঁড়িয়ে এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয়।


শাসকগোষ্ঠীর মিলিত ষড়যন্ত্র নস্যাৎ করে আসুন জাতির বৃহত্তর স্বার্থে ঐক্য গড়ে তুলি, অস্তিত্ব রক্ষার সংগ্রামকে এগিয়ে নিই” এই আহ্বানে অনুষ্ঠিত যৌথ কাউন্সিল অধিবেশনে পিসিপি’র কাাউখালি উপজেলা শাখার সভাপতি জিপল চাকমার সভাপতিত্বে ও সহ-সাধারণ সম্পাদক সুজেচ চাকমার সঞ্চালনায় স্বাগত বক্তব্য রাখেন  হিল উইমেন্স ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক একামনি চাকমা।

এতে অন্যান্যদের মধ্যে আরো বক্তব্য রাখেন, পিসিপি’র কেন্দ্রীয় সহসভাপতি কুনেন্টু চাকমা ও রাঙামাটি জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক দিপায়ন চাকমা, হিল উইমেন্স ফেডারেশনের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক রিতা চাকমা, রাঙামাটি জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক রিতা চাকমা ও কাউখালী উপজেলা শাখার সহ সভাপতি নন্দা চাকমা এবং গণতান্ত্রিক যুব ফোরামের রাঙামাটি জেলা সাধারণ সম্পাদক থুইনুমং মার্মা ও উপজেলা সভাপতি ক্যথুই মার্মা প্রমুখ।

ছাত্রনেতা কুনেন্টু চাকমা বলেন, ১৯৮৯ সালে লংগুদুর নির্মম গণহত্যার প্রতিবাদের মধ্য দিয়ে বৃহত্তর চট্টগ্রাম পাহাড়ি ছাত্র পরিষদ প্রতিষ্ঠা লাভ করে। প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে পাহাড়ি ছাত্র পরিষদ আপোষহীনভাবে অন্যায়-অবিচার, দমন-পীড়নের বিরুদ্ধে আন্দোলন চালিয়ে আসছে। নিপীড়িত জুম্ম জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠা না হওয়া পর্যন্ত এ আন্দোলন চলবে।


তিনি আরো বলেন, বাংলাদেশে বিভিন্ন সরকারের শাসন ক্ষমতার পালাবদল হলেও  পার্বত্য চট্টগ্রামে জুম্ম জনগণের ভাগ্যের কোন পরিবর্তন হয়নি। বিগত সময়ে ফ্যাসিস্ট হাসিনার আমলে ২০১৫ সালে দমনমূলক ‌‌‌১১ দফা নির্দেশনা জারির মাধ্যমে পার্বত্য চট্টগ্রামে জুম্ম জনগণের দমন-পীড়নের মাত্রা বৃদ্ধি করা হয়। চব্বিশের জুলাই গণঅভ্যুত্থানে হাসিনা সরকার পতন হলেও ১১ নির্দেশনা বহাল রয়েছে। হাসিনা পতনের পরে পার্বত্য চট্টগ্রামের জুম্ম জনগণ আশা করেছিল তাদের ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠা হবে এবং গণতান্ত্রিক পরিবেশ তৈরি হবে, কিন্তু তা হয়নি। এখনো সমতলে এক শাসন আর পার্বত্য চট্টগ্রামে আরেক শাসন ব্যবস্থা জারি রাখা হয়েছে।

তিনি বলেন, পাহাড়ি ছাত্র পরিষদ জুম্ম জনগণের পূর্ণস্বায়ত্তশাসন অধিকার আদায়ের লক্ষ্যে সংগ্রাম করে যাচ্ছে। এই সংগ্রামকে বেগবান করার জন্য ছাত্র, নারী, যুব সমাজকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে হয়ে সংগ্রামে সামিল হতে হবে।

দীপায়ন চাকমা বলেন, জন্মলগ্ন থেকে দমন-পীড়নের বিরুদ্ধে পিসিপি’র যে আপোষহীন সংগ্রাম তা ভবিষ্যতেও অব্যাহতভাবে চালিয়ে যেতে হবে। আমাদের এই লড়াই অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই, নিপীড়ন-বঞ্চনা থেকে মুক্তির লড়াই। বাঁচার মতো বাঁচতে হলে সংগ্রামই একমাত্র মুক্তির পথ। শুধুমাত্র সার্টিফিকেট ও ডিগ্রি অর্জন করে অধিকার অর্জিত হবে না। অধিকার অর্জনের জন্য এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সুন্দর ভবিষ্যৎ গড়ে তুলতে রাজপথে লড়াইয়ের জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে।


তিনি বলেন, শাসকের রাষ্ট্রযন্ত্র পিসিপি’র অকুতোভয় নেতা-কর্মীদের খুন, গুম, জেল-জুলুমসহ কোন কিছু বাকী রাখেনি। তারপরও পিসিপি’র লড়াই-সংগ্রামের অগ্রযাত্রা থামানো যায়নি, ভবিষ্যতেও থামানো যাবে না। পিসিপি’র লড়াকু সৈনিকরা সাহসিকতার সাথে সহযোদ্ধা হারানোর শোককে শক্তিতে পরিণত করে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে।

তিনি জাতীয় অস্তিত্ব রক্ষার আন্দোলনে সামিল হওয়ার জন্য ছাত্র সমাজের প্রতি আহ্বান জানান।

এইচডব্লিএফ নেত্রী রিতা চাকমা বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামে শাসকগোষ্ঠীর মিলিত ষড়যন্ত্র, দমন-পীড়ন, অব্যাহত ভূমি বেদখল, নারী ধর্ষণের বিরুদ্ধে পাহাড়ের সকল সামাজিক ও রাজনৈতিক সংগঠনসমূহকে ঐক্যবদ্ধভাবে আন্দোলন গড়ে তোলার মাধ্যমে রুখে দাঁড়াতে হবে। জাতির অস্তিত্ব রক্ষায় আন্দোলনকে এগিয়ে নিতে পাহাড়ে ছাত্র-যুব-নারী সমাজকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে সংগ্রামের মাধ্যমে অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে।


তিনি আরও বলেন, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি সরকার গঠনের পর সীতাকুণ্ডে সাত বছরের এক শিশুকে ও নরসিংদীতে এক নারীকে ধর্ষণের শিকার হতে হয়েছে। বর্তমানে ছাত্রসমাজ ও নারীদের প্রলোভন দেখিয়ে নানাভাবে বিভ্রান্তি ও ফাঁদে ফেলার ষড়ডন্ত্রণ চলছে। পার্বত্য চট্টগ্রামে নারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে পূর্ণস্বায়ত্তশাসন অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে হবে। 

তিনি বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামে সকল অন্যায় অত্যাচার তখনই থামবে যখন ছাত্র, নারী-যুব সমাজ ঐক্যবদ্ধ হয়ে আন্দোলন সংগ্রামে যুক্ত হয়ে প্রতিবাদ-প্রতিরোধ করতে সক্ষম হবে। পার্বত্য চট্টগ্রামে যারা আমাদের ভূমি বেদখল করছে,  মা বোনদের ধর্ষণ করছে তাদের বিচার একদিন পার্বত্য চট্টগ্রামের মাটিতে হবে।

কাউন্সিলের ২য় অধিবেশনে পুরোনো কমিটি বিলুপ্ত ঘোষণা করে প্রস্তাবনা আকার সুজেচ চাকমাকে সভাপতি, অংথোয়াইচিং মার্মাকেসাধারণ সম্পাদক ও দয়ারণ চাকমাকে সাংগঠনিক সম্পাদক নির্বাচিত করে পিসিপি’র ২৭ সদস্যের নতুন কমিটি এবং একা চাকমাকে সভাপতি, মামনি মার্মাকে সাধারণ সম্পাদক ও প্রান্তি চাকমাকে সাংগঠনিক সম্পাদক নির্বাচিত করে হিল উইমেন্স ফেডারেশনের ১৭ সদস্যের নতুন কমিটি হাউজে উপস্থাপন করা হয়।  

কাউন্সিল অধিবেশনে উপস্থিত প্রতিনিধিরা তুমুল করতালির মাধ্যমে প্রস্তাবিত কমিটিদ্বয়কে পাশ করেন।

এরপর পিসিপি’র নতুন কমিটির সদস্যদের শপথ বাক্য পাঠ করান কুনেন্টু চাকমা ও এইচডব্লিউএফ’র নতুন কমিটির সদস্যদের শপথ বাক্য পাঠ করেন রিপনা চাকমা।



পরে বিদায়ী কমিটির সদস্যদের ও নতুন কমিটির সদস্যদেরকে কেন্দ্রীয়, জেলা, উপজেলা নেতা কর্মীরা ফুলেল শুভেচ্ছা জানান।

এরপর মামুনি মার্মার সঞ্চালনায় বিদায়ী কমিটিদ্বয়ের পক্ষ থেকে বক্তব্য দেন পিসিপি’র বিদায়ী কমিটির সভাপতি জিপল চাকমা ও সাধারণ সম্পাদক রনেল চাকমা এবং এইচডব্লিউএফ’র বিদায়ী কমিটির সহ-সভাপতি নন্দা চাকমা ও সহ-সাধারণ সম্পাদক সানুবাই মার্মা।

কাউন্সিলে বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও শাখা কমিটি থেকে তিন শতাধিক প্রতিনিধি-পর্যবেক্ষক এবং কলেজ শিক্ষার্থী, সমর্থক-শুভাকাঙ্ক্ষী অংশগ্রহণ করেন।




This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. AcceptRead More