মতামত

কেমন ছিল শান্তিবাহিনীর সশস্ত্র সংগ্রাম?

0
শান্তিবাহিনীর সদস্য। সংগৃহিত ছবি

মিল্টন চাকমা, সংগঠক, দীঘিনালা ইউনিট, ইউপিডিএফ



জনসংহতি সমিতির সশস্ত্র সংগঠন শান্তিবাহিনীর জন্ম হয় ১৯৭৩ সালের ৭ জানুয়ারি। ১৯৭৫ সালে প্রধান সেনাপতি সন্তু লারমার পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হওয়ার আগ পর্যন্ত ছিল শান্তিবাহিনীর সশস্ত্র সংগ্রামের প্রস্তুতি কাল। ১৯৭৬ থেকে ১৯৮০ সাল পর্যন্ত শান্তিবাহিনীর সশস্ত্র যুদ্ধের প্রথম পর্ব। চার বছরের এই পর্বে সন্তু লারমা ছিলেন না, তিনি ছিলেন জেলে।

এ সময় বেশ কয়েকটি সফল সামরিক একশন হয় এবং এতে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী বেশ বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। বাংলাদেশ সরকার শান্তিবাহিনীর হামলা মোকাবিলার জন্য সমতল জেলা থেকে বাঙালি মুসলমান পুনর্বাসন কর্মসূচি গ্রহণ করে। এবার শান্তিবাহিনী সরকারের এই সেটলার পুনর্বাসন কর্মসূচি বানচাল করে দিতে তাদের ওপর হামলা শুরু করে। এই পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য জিয়াউর রহমান বুদ্ধি করে সন্তু লারমাকে গোপন বোঝাপড়ার ভিত্তিতে মুক্তি দেয়।

সন্তু লারমা ছাড়া পেয়ে প্রথম যে কাজটি করেন সেটা হলো বাঙালি মুসলমান সেটলারদের ওপর হামলা বন্ধ করা। তিনি সেটলারদের পুনর্বাসন কর্মসূচি প্রতিরোধের জন্য দেবজ্যোতি চাকমার নেতৃত্বে গঠিত টাস্ক ফোর্স ভেঙে দেন। এর ফলে বাংলাদেশ সরকার বিনা বাধায় সেটলারদের পুনর্বাসন কার্যক্রম সম্পন্ন করার সময় ও সুযোগ পেয়ে যায়।

এরপর ১৯৮২ – ১৯৮৫ সালে জেএসএস-শান্তিবাহিনীতে ভাঙন ও গৃহযুদ্ধ সংঘটিত হয়। প্রীতি গ্রুপ আন্দোলন থেকে ইস্তফা দিয়ে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর কাছে আত্মসমর্পন করে। এর ফলে সন্তু লারমার নেতৃত্বাধীন লাম্বা গ্রুপ পুরো পার্বত্য চট্টগ্রামে একচ্ছত্র আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়। বাদি গ্রুপের ইচ্ছা থাকলে তারাও বর্তমান সন্তু লারমার মতো সেনাবাহিনীর সহায়তায় গৃহযুদ্ধ বা ভ্রাতৃঘাতী সংঘাত চালিয়ে নিতে পারতো। কিন্তু তারা সেটা করেনি। তারা অন্যদেরকে আন্দোলন করার সুযোগ দিয়েছে। কিন্তু লারমা গ্রুপ সেই সুযোগ কাজে লাগাতে পারেনি।

১৯৮৬ সাল থেকে ১৯৯২ সালের ১০ আগস্ট পর্যন্ত সাড়ে ছয় বছর ছিল শান্তিবাহিনীর দ্বিতীয় দফা সশস্ত্র সংগ্রামের কাল। তবে এই সময় লাম্বা গ্রুপ অপ্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠলেও বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে কার্যত কোন সশস্ত্র সংগ্রাম গড়ে তুলতে পারেনি। তারা বড় ধরনের কোন সামরিক একশন পরিচালনা করতে ব্যর্থ হয়। এবার সন্তু লারমা সেটলারদের পুনর্বাসন প্রতিহত করার জন্য গঠিত ও পরে বিলুপ্ত টাক্স ফোর্সটি আবার পুনরুজ্জীবিত করেন। কিন্তু ততক্ষণে চেঙ্গী-মাইনী-কাচালং-শঙ্খ-ফেনী নদীর জল বহূদূর গড়িয়ে যায়। সরকার শান্তিবাহিনীর লাম্বা-বাদি গৃহযুদ্ধের সুযোগ নিয়ে সেটলার পুনর্বাসন কার্যক্রম সফলভাবে সম্পন্ন করতে সক্ষম হয়। সেনাবাহিনীও তাদের অবস্থান শক্ত ও সুসংহত করে।

শান্তিবাহিনীর সদস্যরা সেনাবাহিনীর ওপর সফল অভিযান পরিচালনায় ব্যর্থ হলে বাঙালি সেটলারদের ওপর নতুন করে হামলা শুরু করে দেয়। কিন্তু ইত্যবছরে সেটলারদের অবস্থান অনেক বেশি সুদৃঢ় হয়ে গিয়েছিল। তারা শান্তিবাহিনীর হামলার জবাবে সেনাবাহিনীর সাথে মিলে পাহাড়িদের বসতিতে পাল্টা হামলা চালায়। ফলে নিরীহ পাহাড়িরা দুই পক্ষের যাঁতাকলে পড়ে প্রাণের ভয়ে নিজেদের ঘরবাড়ি ও জমিজমা ফেলে পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়। আর সেটলাররা এই সুযোগে পাহাড়িদের বাড়িঘর ও জমিজমাসহ সকল সম্পত্তি বেদখল করে নেয়। এভাবে পাবলাখালি, বোয়ালখালি, মেরুং, লংগদু, ভূষণছড়া, রামগড়, মানিকছড়িসহ বিভিন্ন জায়গা থেকে পাহাড়িরা উৎখাত হয়, তাদের সকল জমি হারায়, যা এখনও পর্যন্ত উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি।

বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সাথে যুদ্ধে পেরে না উঠলে জেএসএস-শান্তিবাহিনী ১৯৯২ সালের ১০ আগস্ট থেকে একতরফা যুদ্ধ বিরতি ঘোষণা করে এবং সেই পর থেকে লাগাতার যুদ্ধ বিরতি চলতে থাকে ১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর পার্বত্য চুক্তি স্বাক্ষর হওয়ার আগ পর্যন্ত। ১৯৯৮ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি আত্মসমর্পনের মাধ্যমে শান্তিবাহিনীর আনুষ্ঠানিক বিলুপ্তি ঘটে।

নিরপেক্ষ ও নৈর্ব্যক্তিকভাবে জেএসএসের সশস্ত্র সংগ্রাম বিশ্লেষণ করলে নিম্নোক্ত সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া যায়:

১) শান্তিবাহিনীর সশস্ত্র যুদ্ধ ছিল ভেরী লো ইনটেনসিটি ওয়ারফেয়ার। প্রথমদিকে অবিভক্ত জেএসএসের সময়কালে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর অসংগঠিত অবস্থার সুযোগে কিছু সফল একশন হলেও দ্বিতীয় পর্বে সন্তু লারমার নেতৃত্বে শান্তিবাহিনী কার্যত কোন সফল সামরিক অভিযান পরিচালনা করতে পারেনি। তার সামরিক একশন প্রধানত বাঙালি সেটলারদের ওপর হামলার মধ্যে সীমিত ছিল। সেটলারদের ওপর হামলা বিষয়ে তার সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে ভুল লক্ষ্য করা যায়। যখন সেটলাররা পার্বত্য চট্টগ্রামে এসে প্রথম বসতি শুরু করছিল, তখন তাদের ওপর আক্রমণ করে সরকারের পুনর্বাসন পরিকল্পনা ভণ্ডুল করে দেয়া ছিল অধিক যুক্তিসঙ্গত। কিন্তু তিনি কেন সেটা না করে তাদের ওপর হামলা বন্ধের নির্দেশ দেন তা বোধগম্য নয়।

২) ২২ বছরের সশস্ত্র সংগ্রামের সময় শান্তিবাহিনী যুদ্ধে লিপ্ত ছিল দুই পর্বে সর্বসাকুল্যে মাত্র সাড়ে দশ বছর। বাকি সময় হয় ভ্রাতৃঘাতি সংঘাতে, মিজো বিদ্রোহী ও সর্বহারাদের সাথে যুদ্ধে নতুবা যুদ্ধবিরতেতে কেটে যায়। এর মধ্যে সন্তু লারমার নেতৃত্বে শান্তিবাহিনীর সশস্ত্র যুদ্ধ চলে সাড়ে ৬ বছর। বাকি চার বছর অবিভক্ত জেএসএসের নেতৃত্বে যুদ্ধ চলেছিল।

৩) জনগণকে আগে রাজনৈতিকভাবে সচেতন ও সংগঠিত না করে এবং যথাযথ প্রস্তুতি না নিয়ে সশস্ত্র সংগ্রাম শুরু করা ছিল জেএসএসের একটি বড় ধরনের রাজনৈতিক ভুল ও অপরিণামদর্শী সিদ্ধান্ত, যা জেএসএসের অনেক কেন্দ্রীয় নেতা ব্যক্তিগত আলোচনায় স্বীকার করেছেন।

৪) অপরিণত সময়ে সশস্ত্র সংগ্রাম শুরু করার কারণে সেটলারদের পুনর্বাসন হয়েছে। অথচ শান্তিবাহিনী বাংলাদেশ সরকারের সেটলার পুনর্বাসন কর্মসূচি বানচাল করে দিতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে।

৫) মোটা দাগে, শান্তিবাহিনীর সশস্ত্র সংগ্রাম ব্যর্থ হয়েছে। জেএসএসের সশস্ত্র সংগ্রামের কারণে জুম্ম জনগণের ক্ষতি ছাড়া কোন লাভ হয়নি। জেএসএস-শান্তিবাহিনীর সশস্ত্র সংগ্রামের ফল হিসেবে জুম্মরা পেয়েছে ৪ লক্ষ মুসলমান বাঙালি সেটলার, আর হারিয়েছে হাজার হাজার একর জমি, ঘরবাড়ি ও গ্রামের পর গ্রাম।

(১২ জানুয়ারি ২০২৬)

লেখাটি ইউপিডিএফের অফিসিয়াল ফেসবুক পেইজ থেকে সংগৃহিত।



This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. AcceptRead More