খাগড়াছড়িতে ‘রক্তাক্ত জুলাই’ ও ‘স্বনির্ভর হত্যাকাণ্ডে’ শহীদদের সম্মানে স্মরণসভা ও প্রদীপ প্রজ্জলন
সন্ত্রাসীদের হামলায় এইচডব্লিউএফ নেত্রী রিতা চাকমা আহত

খাগড়াছড়ি প্রতিনিধি, সিএইচটি নিউজ
সোমবার, ১৯ আগস্ট ২০২৪
‘রক্তাক্ত জুলাই ২০২৪’ ও ‘স্বনির্ভর হত্যাকাণ্ড ২০১৮’-এ নিহত আবু সাঈদ-মুগ্ধ, তপন-এল্টন-পলাশসহ ফ্যাসিস্ট হাসিনার আমলে নিহত সকল শহীদদের সম্মানে স্মরণসভা ও প্রদীপ প্রজ্জ্বলন অনুষ্ঠান করে দমন-পীড়নের বিরুদ্ধে পাহাড়ের প্রতিবাদী ছাত্র-যুব-নারী সমাজ।
রবিবার (১৮ আগস্ট ২০২৪) বিকালে খাগড়াছড়ি জেলা সদরের চেঙ্গী স্কোয়ারে এ কর্মসূচি পালন করা হয়। সন্ধ্যায় প্রদীপ প্রজ্জ্বলনের মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠান শেষ হয়। অনুষ্ঠানে বিভিন্ন এলাকা থেকে ছাত্র-ছাত্রী, যুবক-যুবতীসহ বিভিন্ন বয়সের লোকজন অংশগ্রহণ করেন।
অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন বৃহত্তর পার্বত্য চট্টগ্রাম পাহাড়ি ছাত্র পরিষদ(পিসিপি) খাগড়াছড়ি জেলা শাখার সভাপতি শান্ত চাকমা।

অনুষ্ঠান শুরুতে ২০২৮ সালের ১৮ আগস্ট স্বনির্ভর হত্যাকাণ্ডে শহীদ তপন-এল্টন যুব-নেতা পলাশসহ ও ২০২৪-এ কোটা সংস্কার আন্দোলনে শহীদ আবু সাইদ, মুগ্ধসহ পার্বত্য চট্টগ্রামে অধিকার আদায়ের আন্দোলনে শহীদ বিপুল, সুনীল, লিটন সকল বীর শহীদদের স্মরণে সাইরেন বাজিয়ে ২ মিনিট নিরবতা পালন করা হয়।
স্মরণ অনুষ্ঠানে সাংস্কৃতিক স্কোয়াডের পরিবেশনায় একটি প্রতিবাদী নৃত্যনাট্য পরিবেশনা করা হয়।
সমাবেশে বক্তব্য দেন, হিল উইমেন্স ফেডারেশনের খাগড়াছড়ি জেলা আহ্বায়ক এন্টি চাকমা, বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলনের চট্টগ্রাম নগর সমন্বয়ক ও বাংলাদেশ ছাত্র ফেডারেশনের চট্টগ্রাম মহানগর শাখার সভাপতি সাইফুর রুদ্র, পিসিপি’র কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য ও চট্টগ্রাম মহানগর শাখার সাধারণ সম্পাদক অমিত চাকমা।

স্মরণসভায় বক্তব্য রাখছেন সাইফুর রুদ্র
ছাত্র ফেডারেশনের চট্টগ্রাম মহানগর শাখার সভাপতি সাইফুল রুদ্র বলেন, আজকের এই দিনে শহীদ তপন-এল্টন-পলাশ, আবু সাইদ- মুগ্ধ হতে শুরু করে সকল বীর শহীদদের গভীর স্মরণ করে বলতে চাই, সারা বাংলাদেশে যখন ছাত্রদের ‘কোটা সংস্কার’ আন্দোলন তুঙ্গে ছিল তখন বান্দরবানে ছাত্ররা আন্দোলন করতে চেয়েছিল। রাস্তায় নামলে তাদের মেরে তুলে দেয়া হয়েছে। কারা তুলে দিয়েছে আপনারা জানেন। বাংলাদেশে দ্বৈত শাসন ব্যবস্থা চলছে। সমতলে এক শাসন আর পার্বত্য চট্টগ্রামে অঘোষিত সেনাশাসন জারি রয়েছে।

তিনি বলেন, ছাত্র সমাজের গণঅভ্যুত্থানের জোয়ারে টিকতে না পেরে ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতন হয়েছে। ফ্যাসিস্ট হাসিনা পতন হওয়ায় ২০১৯ সালের ৯ এপ্রিল গুম হওয়া মাইকেল চাকমাকে আমরা ফিরে পেয়েছি।
তিনি আরো বলেন, এই জালিম ফ্যাসিস্ট হাসিনা সরকার ১৯৯৬ সালে কল্পনা চাকমাকে গুম করে। আমরা এখনো তার কোন হদিশ পাইনি। সরকারকে অবিলম্বে কল্পনা চাকমার সন্ধান দিতে হবে।
জুলাইয়ে ছাত্র আন্দোলন বুঝিয়ে দিয়েছে শাসকের বিরুদ্ধে কিভাবে ঐক্যবদ্ধভাবে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হয়। তাই এখান থেকে বলতে চাই পাহাড় এবং সমতলে ছাত্র সমাজের মধ্য ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে।
সাইফুর রুদ্র আরো বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামে ভূমি সমস্যা রয়েছে। বিভিন্ন কোম্পানি নামে বেনামে পাহাড়িদের হাজার হাজার একর ভূমি বেদখল করেছে। পার্বত্য চট্টগ্রামসহ সারা বাংলাদেশে ৪৫টি অধিক জাতিসত্তার বসাবাস। কিন্তু সব জাতিসত্তার নেই সাংবিধানিক স্বীকৃতি। তিনি অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের কাছে সকল জাতিসত্তাকে সাংবিধানিক স্বীকৃতি দেয়ার দাবি জানান।

স্মরণসভায় বক্তব্য রাখছেন এন্টি চাকমা
হিল উইমেন্স ফেডারেশন নেত্রী এন্টি চাকমা বলেন, শাসকশ্রেণীর তৈরি করে দেয়া ঠ্যাঙাড়ে বাহিনী দিয়ে স্বনির্ভর হত্যাকাণ্ড করানো হয়েছিলো। পার্বত্য চট্টগ্রামের এ রকম হত্যাকাণ্ড বহুদিনের। যারা শান্তি শৃঙ্খলা রক্ষায় নিয়োজিত যাদের উপর আমাদের ভরসা থাকার কথা তাদের মদতেই এসকল হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হচ্ছে। পার্বত্য চট্টগ্রামের উদীয়মান তরুন নেতৃত্বকে ধ্বংস করে দেয়ার জন্য সেনাবাহিনী ঠ্যাঙাড়ে বাহিনী গঠন করে খুন, গুমসহ অরাজক পরিস্থিতি তৈরি করে রেখেছে। শিক্ষার্থীদের গ্রাফিতি অংকনের সময় সেনাবাহিনীর বাধা, হামলা ও রং তুলি লাথি মেরে ফেলে দেয়া হয়েছে। আজ সেনাশাসনের মধ্য দিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রামে মত প্রকাশের অধিকার, স্বাধীনভাবে চলাফেরার অধিকারটুকু পর্যন্ত কেড়ে নেয়া হয়েছে। তবে এই শাসন নিপীড়ন তারা বেশী দিন টিকিয়ে রাখা যাবে না। পার্বত্য চট্টগ্রামের ছাত্র-জনতা মরতে শিখেছে, লড়াই সংগ্রাম করতে শিখেছে এবং এই লড়াই সংগ্রামের মধ্য দিয়েই তারা পার্বত্য চট্টগ্রামকে শাসন নিপীড়ন থেকে মুক্ত করবে।

স্মরণসভায় বক্তব্য রাখছেন অমিত চাকমা
পিসিপি নেতা অমিত চাকমা বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামের বর্তমান শাসন ব্যবস্থার উপর দাঁড়িয়ে এখানকার ভূমিপুত্ররা অনিরাপদ। এখানে প্রতিনিয়ত ভূমিবেদখল, হত্যা, খুন, গুম, ধর্ষনের মধ্যে দিয়ে দিনাতিপাত করতে হয়। এসবের বিরুদ্ধে তপন, এল্টন পলাশরা রুখে দাড়িয়েছিল। অমর বিকাশ, মিঠুন, বিপুল, সুনীল, লিটন, রূপকদেরকে হত্যা, কল্পনা চাকমাকে অপহরণ ও মাইকেল চাকমাকে দীর্ঘ পাচ বছরের অধিক আয়নাঘরে বন্দি করে রাখার মধ্য দিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রামের লড়াই সংগ্রামকে স্তিমিত করার চেষ্টা করা হয়েছিল। শাসকশ্রেণী মিঠুন, তপন, এল্টন-পলাশদেরকে হত্যা করতে পারলেও তাদের চেতনাকে আজও স্তিমিত করতে পারেনি। পার্বত্য চট্টগ্রামের ছাত্রজনতা তাদের চেতনাকে বুকে ধারন করে আজও লড়াই সংগ্রাম করে যাচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, তপন, এল্টন, পলাশদের লাশের সামনে দাড়িয়ে ছাত্রজনতা লড়াই সংগ্রামে রাজপথে থাকার যে শপথ নিয়েছিল, তা মৃত্যু আগ পর্যন্ত পালন করবে।
বক্তারা আরও বলেন, গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে সমতলে কিছুটা গণতান্ত্রিক পরিবেশ কায়েম হলেও পার্বত্য চট্টগ্রামে এখনো পর্যন্ত অগণতান্ত্রিক ও অবৈধ সেনাশাসন অব্যাহত রয়েছে। পার্বত্যা চট্টগ্রামে সেনাশাসন জারি রেখে দেশে প্রকৃত গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হতে পারে না।


সমাবেশ শেষে সন্ধ্যায় শহীদ তপন, এল্টন, পলাশ, আবু সাঈদ, মুগ্ধসহ সকল শহীদদের সম্মানে চেঙ্গীস্কোয়ারে শহীদদের প্রকৃতিতে প্রদীপ প্রজ্জ্বলন করা হয়। এ সময় উপস্থিত সকলে প্রজ্জ্বলিত মোমবাতি হাতে দাঁড়িয়ে শ্লোগানে শ্লোগানে চেঙ্গী স্কোয়ার এলাকা আন্দোলিত করে তোলেন।
এদিকে, কর্মসূচি শেষে চলে যাবার মুহুর্তে একদল দুর্বৃত্ত গুলি ও ইট-পাটকেল দিয়ে অংশগ্রহণকারী ছাত্র-জনতার ওপর হামলা চালায়। এতে হিল উইমেন্স ফেডারেশনের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক রিতা চাকমা চোখে আঘাতপ্রাপ্ত হয়ে আহত হন। এছাড়া আরো কয়েজনও আঘাতপ্রাপ্ত হয়েছেন বলে জানা গেছে। স্বনির্ভর হত্যাকাণ্ডে জড়িত সেনা মদদপুষ্ট সন্ত্রাসীরাই এ হামলায় জড়িত থাকতে পারে বলে কর্মসূচি আয়োজকরা জানিয়েছেন।

সিএইচটি নিউজে প্রকাশিত প্রচারিত কোন সংবাদ, তথ্য, ছবি ,ভিডিও, কনটেন্ট ব্যবহার করতে হলে কপিরাইট আইন অনুসরণ করে ব্যবহার করুন।