খাগড়াছড়ি আসনে দালালি ও বিশ্বাসঘাতকতার পরাজয়

0


ভাষ্যকার, সিএইচটি নিউজ

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ২৯৮ নং খাগড়াছড়ি আসনের প্রাথমিক ফলাফল পাওয়া গেছে, যা নিম্নরূপ:

ওয়াদুদ ভূঁইয়া (ধানের শীষ)- ১,৫১,০৪০ ভোট

ধর্মজ্যোতি চাকমা (ঘোড়া)- ৬৮,৩১৫ ভোট

এয়াকুব আলী (দাঁড়িপাল্লা)- ৫৮,৪৫৪ ভোট

সমীরণ দেওয়ান (ফুটবল)- ৪৭,৯১০ ভোট।

(বাকি ৭ জনের ভোটের হিসাব এই আলোচনায় তেমন প্রাসঙ্গিক নয় বলে উল্লেখ করা হল না।)

ঘোড়া প্রতীকের পরাজয়ের কারণ বহুবিধ, যা গভীরভাবে বিশ্লেষণ করা দরকার। এখানে সংক্ষেপে মূল ছয়টি কারণ চিহ্নিত করে আলোচনা করা হল।

এক) জেএসএস সন্তু গ্রুপ ও সংস্কারবাদীদের জাতীয় স্বার্থের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা। সন্তু গ্রুপ খাগড়াছড়ির নাগরিক সমাজের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় মনোনীত প্রার্থী ধর্মজ্যোতি চাকমাকে সমর্থন না দিয়ে কুখ্যাত দালাল সমীরণ দেওয়ানকে নির্বাচনে দাঁড় করিয়ে ওয়াদুদ ভূঁইয়ার বিজয় নিশ্চিত করে দেয়। শুধু তাই নয়, তারা হুমকি দিয়ে নাগরিক সমাজের নেতাদেরকে তাদের কার্যক্রম গুটিয়ে ফেলতে বাধ্য করে এবং সমীরণ দেওয়ানের পক্ষে উগ্র-উন্মত্তভাবে প্রচারণা চালায়। তারা ধর্মজ্যোতি চাকমার কাছ থেকে জোর করে মনোনয়ন পত্র প্রত্যাহারের আবেদনে স্বাক্ষর নেয়, নির্বাচন থেকে সরে যাওয়ার জন্য তাকে ও তার পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের ওপর অনবরত চাপ হুমকি দেয় এবং তাকে অপহরণের চেষ্টা চালায়। এ কারণে প্রাণের ভয়ে তিনি কয়েকদিন আত্মগোপনে যেতে বাধ্য হন।

অপরদিকে সংস্কারবাদীরা শুরুতে নাগরিক সমাজের মনোনীত প্রার্থীকে সমর্থন দেয়ার অঙ্গীকার করলেও পরে অজ্ঞাত কারণে তারা তাদের সেই অবস্থান থেকে সরে যায় এবং দালালটির পক্ষে প্রচারণা চালায়। তারাও ঘোড়ার সমর্থকদের হুমকি দেয় ও চাপ প্রয়োগ করে। এভাবে জুম্ম ভোটের বিভক্তি ও ওয়াদুদ ভূঁইয়ার জয় নিষ্কণ্টক হয়ে যায়।

দুই) সেটেলার ভোটার সংখ্যা বৃদ্ধি নির্বাচনের ফলাফলে প্রভাব ফেলেছে। খাগড়াছড়ি আসনে মোট ভোটার সংখ্যা ৫,৫৪,১১৪ জন। তার মধ্যে বাঙালি ও সেটেলার ২,৮২,৯৮৬ জন এবং পাহাড়ি ২,৭১,১২৭ জন (চাকমা ১,৩৫,৯১৫, ত্রিপুরা ৭৬,৪৩০, মারমা ৫৭,৫৮৭, অন্যান্য ১,১৯২)।

খাগড়াছড়ি জেলা রিটার্নিং কর্মকর্তা কর্তৃক ঘোষিত নির্বাচনী ফলাফল।

২০০১ ও ২০০৮ সালের নির্বাচনেও সেটেলার ভোটার সংখ্যা বেশি ছিল না। গত ২৮ বছর ধরে জেএসএস সন্তু গ্রুপের শুরু করা ভ্রাতৃঘাতী সংঘাতের সুযোগে খাগড়াছড়ি, রাঙ্গামাটি ও বান্দরবানে সেটেলারদের অনুপ্রবেশ ঘটে। সন্তু লারমার কারণে যখন জেএসএস – ইউপিডিএফ নিজেদের মধ্যে হানাহানিতে ব্যস্ত তখন সেটেলাররা তাদের জনসংখ্যা বাড়াতে তৎপর হয়। ভ্রাতৃঘাতী সংঘাত না থাকলে সেটেলাররা এই সুযোগ পেত না এবং তাদের অনুপ্রবেশের বিরুদ্ধে গণ প্রতিরোধ গড়ে তোলা সম্ভব হত। কিন্তু সন্তু গ্রুপের আত্মঘাতী ও জাতীয় স্বার্থের পক্ষে হানিকর ভ্রাতৃঘাতী সংঘাত নীতি সেটেলারদের জন্য মহা সুযোগ সৃষ্টি করে দেয়।

উল্লেখ্য, এই একই সন্তু লারমার কারণে ১৯৮০ দশকে শুরু হওয়া লাম্বা-বাদি গৃহযুদ্ধের সময় বাংলাদেশ সরকার সেটেলারদেরকে সহজে পার্বত্য চট্টগ্রামে এনে পুনর্বাসন করতে সক্ষম হয়েছিল।

তিন) নির্বাচনের এই ফলাফল হলো জেএসএস সন্তু গ্রুপের ৩৫ বছরের আত্মঘাতী, অপরিণামদর্শী ও লেজ-ধরা রাজনীতির অনিবার্য পরিণতি। ১৯৯১ সালের নির্বাচন থেকে তারা কখনও আওয়ামী লীগ ও কখনও বিএনপিকে ভোট দিতে জনগণকে বাধ্য করে আসছে। তাদের এই সুবিধাবাদী ও দালালি রাজনীতির কারণে জুম্মদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ আওয়ামী লীগ ও বিএনপিতে জড়িয়ে পড়েছে। বলা ভাল এরা আওয়ামী লীগের জয়জয়কারের সময় আওয়ামী লীগ এবং বিএনপির উত্থানের সময় বিএনপির সাথে যুক্ত হয়। এরা পুরোপুরি জাতীয় চেতনাবোধ শূন্য এবং কেবল আন্দোলনবিমুখ নয়, তারা আন্দোলন-বিরোধীও। তারা নির্বাচনে জুম্মদের জাতীয় স্বার্থের বিরুদ্ধে গিয়ে আওয়ামী লীগ, বিএনপির মতো চরম প্রতিক্রিয়াশীল দলগুলোর মনোনীত প্রার্থীদের জিতিয়ে দিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে।

এতে অবাক হওয়ার কিছু নেই। বদ্ধ জলাশয়ে শেওলা জন্মে। গত ৩৫ বছরে জেএসএস কোন আন্দোলন করেনি, অন্যকেও আন্দোলন করতে বাধা দিয়েছে, ভ্রাতৃ হত্যায় সর্বশক্তি নিয়োগ করেছে।

ইউপিডিএফ যদি কিছু মাত্রায় হলেও আন্দোলন জারী না রাখতো, তাহলে যারা আজ ধর্ম জ্যোতি চাকমাকে ভোট দিয়ে স্বজাত প্রেম ও দেশাত্ববোধের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত রেখেছে, তারাও এতদিন আওয়ামী লীগ, বিএনপিতে ভিড়ে যেতো।

চার) ঘোড়া ও বল প্রতীকের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা বা সত্যিকার অর্থে জুম্ম দলগুলোর মধ্যে অনৈক্য ও অন্তর্দ্বন্দ্বের কারণে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক জুম্ম ভোটার হতাশ হয়ে ভোটদানে বিরত ছিল। বলাবাহুল্য এতে সেটেলার প্রার্থী ওয়াদুদ ভূঁইয়ার সুবিধা হয়।

পাঁচ) জেএসএস সন্তু গ্রুপের হুমকি মোকাবিলায় ব্যস্ত থাকার কারণে ইউপিডিএফ ও অন্য অনেকের পক্ষে সর্বশক্তি নিয়ে নির্বাচনের মাঠে নামা সম্ভব হয়নি। ফলে মোট পাহাড়ি ভোটারদের অর্ধেক ভোট দিতে যাননি। আমরা যদি ধরে নিই, পাহাড়িদের মধ্যে যারা বিএনপিকে ভোট দিয়েছে তাদের সংখ্যা ৪০,০০০, তাহলে নির্বাচনে ভোট দেয়া মোট পাহাড়ির সংখ্যা হবে (৬৮,৩১৫ ঘোড়া + ৪৭,৯১০ ফুটবল + ৪০,০০০ ধানের শীষ) = ১,৫৬,২১৫ জন। (সমীরণ দেওয়ান বাঙালি ভোট পেয়েছেন বলে মনে হয় না, যদি পেয়েও থাকেন, তাহলে তা খুবই নগণ্য হবে।) এখন খাগড়াছড়ি আসনে মোট পাহাড়ি বা জুম্ম ভোটার হলো ২,৭১,১২৭ জন। সুতরাং কমপক্ষে ১,১৪,৯১২ (২,৭১,১২৭ – ১,৫৬,২১৫) জন পাহাড়ি ভোটার হতাশ হয়ে বা অন্যান্য কারণে ভোট দিতে যাননি।

এই বিশাল সংখ্যক ভোটারদের এক তৃতীয়াংশকে যদি ভোটকেন্দ্রে নিয়ে যাওয়া সম্ভব হতো এবং সমীরণ দেওয়ানকে প্রার্থী হিসেবে দাঁড় করানো না হতো, তাহলে ঘোড়া প্রতীকের জয় লাভের সম্ভাবনা উজ্জ্বল হতো।

ছয়) প্রার্থীর ক্ষেত্রে ইউপিডিএফের পক্ষে ছাড় দেয়ার কোন জায়গা ছিল না। জেএসএস যদি সমীরণ দেওয়ানকে প্রার্থী হিসেবে দাঁড় না করিয়ে দালালীর রেকর্ড মুক্ত অন্য কাউকে দাঁড় করিয়ে দিতো, তাহলে ইউপিডিএফের জন্য তাকে সমর্থন দেয়ার বিষয়টি বিবেচনা করা সম্ভব হতো। সমীরণ দেওয়ানের মতো একজন নিকৃষ্ট দালাল ও বিশ্বাসঘাতককে সমর্থন দেয়া মানে ইউপিডিএফের জন্য রাজনৈতিক আত্মহত্যার সামিল। তাছাড়া ইউপিডিএফ নাগরিক কমিটির মনোনীত প্রার্থীকে সমর্থন দিতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ ছিল। অথচ জেএসএসের অবস্থা ছিল ভিন্ন। তারা অনায়াসে ধর্ম জ্যোতি চাকমাকে সমর্থন দিতে পারত।

উপরোক্ত বিশ্লেষণ থেকে এটা স্পষ্ট যে, চূড়ান্ত বিচারে জেএসএস সন্তু গ্রুপের আত্মঘাতী, সুবিধাবাদী রাজনীতির কারণেই খাগড়াছড়ির আসন (এবং রাঙ্গামাটি ও বান্দরবান আসনও) এবারও জনগণের হাতছাড়া হয়ে গেল। তবে পরাজয়ের মধ্যেও একটি বিজয় আছে, যা ফলাফলে স্পষ্ট ফুটে উঠেছে। খাগড়াছড়ি আসনটি খাগড়াছড়িবাসীর হাতছাড়া হলেও, তারা সমীরণ দেওয়ানের দালালি ও বিশ্বাসঘাতকতার বিরুদ্ধে সুস্পষ্ট রায় দিয়েছেন। এ রায় একদিকে সন্তু লারমার আত্মঘাতী, লেজুড়বাদী রাজনীতির বিরুদ্ধে এবং অন্যদিকে ইউপিডিএফ ও উদীয়ামন তরুণদের বিপ্লবী ধারার পক্ষে রায়। নির্বাচনী ফলাফলের এই দিকটি বেশ আশাব্যঞ্জক। এ জন্য খাগড়াছড়িবাসীকে অনেক ধন্যবাদ।

ইউপিডিএফ নির্বাচনে বিজয়কে কখনই চূড়ান্ত লক্ষ্য মনে করে না। জনগণের জন্য জাতীয় নির্বাচন হলো সামগ্রিক আন্দোলনের অংশ। জনগণের অধিকার আদায়ের আন্দোলনে পার্টি নির্বাচনকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের চেষ্টা করে থাকে। জনগণের রাজনৈতিক চেতনার মান বাড়াতে এবং তাদের শত্রু-মিত্রকে পরিচয় করিয়ে দিতে নির্বাচন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

এই দিক থেকে দেখলে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে পার্টি অনেকটা সফল হয়েছে। জেএসএস সন্তু গ্রুপের কুৎসিত দালালি চেহারা সবার সামনে উন্মোচিত হয়েছে। অন্যদিকে তরুণ-যুব সমাজ স্বতঃস্ফূর্তভাবে নির্বাচনী প্রচারণায় জড়িয়ে পড়েছে। তাদের মধ্যে পরিবর্তনের তীব্র আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ পেয়েছে। এই নির্বাচনে তারা যে অভিজ্ঞতা লাভ করেছে, ভবিষ্যত আন্দোলনের জন্য তা অনেক কাজে লাগবে। তারা এখন বুঝতে সক্ষম হবে যে, প্রকৃত পরিবর্তন নির্বাচনের মাধ্যমে নয়, অন্যভাবে আন্দোলনের মাধ্যমে নিয়ে আসতে হবে। তারা বুঝেছে, সুবিধাবাদী দালালদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম ছাড়া জুম্মদের জাতীয় মুক্তির সংগ্রাম এক কদমও অগ্রসর হবে না। তাদের এই বোধ, এই চেতনা এই নির্বাচনের মাধ্যমেই সম্ভব হয়েছে।

(১৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬)



This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. AcceptRead More