গুম: মানবাধিকার ও গণতন্ত্রের অদৃশ্য শত্রু

0
বিগত সরকারের আমলে নিখোঁজ ব্যক্তিদের খোঁজ পাওয়ার দাবিতে রাজপথে নামেন অ্যাকটিভিস্টরা। ছবি: সমকাল

মাইকেল চাকমা


৩০ আগস্ট-আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস। গুম গুরুতর মানবাধিকারের লঙ্ঘন, এটি একজন নাগরিকের মৌলিক অধিকার, ব্যক্তিস্বাধীনতা এবং নিরাপত্তা কেড়ে নেয়। গুমের মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা অপব্যবহার করে ভিন্ন মতাবলম্বী মানুষের কণ্ঠস্বরকে রোধ ও গণতন্ত্রকে অবরুদ্ধ করা হয়।

আমার জীবনই তার সাক্ষ্য!২০১৯ সালের বসন্তের শেষ দিকে ৯ এপ্রিল, বিকেল আনুমানিক সাড়ে ৫টা। কল্যাণপুর বাসস্ট্যান্ডের কাছে সোনালী ব্যাংকের ফটকের সামনে একটি চায়ের দোকানের পাশে দাঁড়িয়ে ছিল কয়েকজন অপরিচিত মানুষ। আমি জানতাম না, তারা আমাকে তুলে নেওয়ার জন্য অপেক্ষায় রয়েছে। আমি সেখানে উপস্থিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই একজন আমার নাম ধরে ডাক দেয়। আমি সাড়া দিতেই মুহূর্তের মধ্যে ৬-৭ জন আমাকে ঘিরে ধরে এবং সঙ্গে সঙ্গে জোরপূর্বক একটি সাদা মাইক্রোবাসে তুলে নিয়ে যায়। হাতে হ্যান্ডকাফ লাগানো হয়, চোখে বাঁধা হয় কালো পট্টি। সেই মুহূর্ত থেকেই আমি পৃথিবী থেকে হারিয়ে যাই। কিন্তু বেঁচে থাকি এক জঘন্য ও অমানবিক গোপন বন্দিশালার ভেতর- যার নাম “আয়নাঘর”।

অজানা বন্দিশালা: এক খণ্ড নরক
গোপন বন্দিশালায় শুরু হয় জীবনের দীর্ঘতম এক ভয়ংকর দুঃস্বপ্নের অধ্যায়। আমি কোথায় আছি, কেন আছি, কে আমাকে রেখেছে, কত দিন থাকতে হবে, বেঁচে ফিরব নাকি মারা যাব-এর কোনোটির উত্তর আমার কাছে ছিল। না। দিনের আলো নেই, বাতাস নেই, নেই মানবিক সম্পর্কও; পৃথিবী থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন ও ভয়ানক মানবেতর পরিবেশে বছরের পর বছর কাটাতে হয়েছে কবরের মতো ছোট্ট একটি কক্ষে। এটি মানুষের প্রকৃত জীবন নয়; যেন পৃথিবীর বুকে এক খণ্ড নরক, যেখানে প্রতিনিয়ত মৃত্যুকে আলিঙ্গন করে আত্মাকে বাঁচিয়ে রাখার নিরন্তর এক সংগ্রাম। প্রতিটি দিন আসে অনিশ্চয়তা, ভয় আর মৃত্যুর আশঙ্কার বার্তা নিয়ে। পরিবার, আত্মীয়স্বজন বা প্রিয়জনের সঙ্গে যোগাযোগ কিংবা আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে মুক্তির আশা সেখানে এসব ছিল কল্পনার বিলাসিতা। একদিকে অসহনীয় শারীরিক কষ্ট, অন্যদিকে নিষ্ঠুর মানসিক নির্যাতন—সব মিলিয়ে সময়টা হয়ে উঠেছিল মৃত্যুর চেয়েও ভয়ংকর।

অন্ধকারে প্রতিরোধের আলো
আমি জানতাম না, পরিবার আমাকে খুঁজে পাচ্ছে কিনা, সমাজ আমাকে ভুলে গেছে কিনা, নাকি সবাই ধরে নিয়েছে যে, আমি আর বেঁচে নেই—এ রকম শত প্রশ্ন ঘুরপাক খেতো মনে। তবুও অন্ধকারের ভেতরে আমি আলোর বরুনা বুনেছি, মুক্তির স্বপ্ন এঁকেছি। নিষ্ঠুর অমানবিক নির্যাতনের মধ্যেও ছিলাম মানসিকভাবে দৃঢ় ও দ্ব্যর্থহীনভাবে সংকল্পবদ্ধ। নিজেকে বলতাম- ভেঙে পড়া যাবে না। বেঁচে থেকে প্রতিরোধের মশাল জ্বালাতে হবে।

মুক্তির দিন: নতুন সূর্যের দেখা
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট-ইতিহাসের বাঁকবদল ঘটে। প্রবল গণবিক্ষোভের জোয়ারে চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে যায় ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার ক্ষমতার মসনদ। শত শহীদের রক্তে রচিত হয় নতুন ইতিহাস, যবনিকাপাত ঘটে ফ্যাসিবাদী দুঃশাসনের। এর দুদিন পর ৭ আগস্ট, দীর্ঘ গাড়ি ভ্রমণের পর চট্টগ্রাম বন বিভাগের নির্জন এক বাগানে চোখ বাঁধা অবস্থায় আমাকে নামিয়ে দেওয়া হয়। এরপর আসে মুক্তি, নতুন করে পৃথিবী দেখার কল্পনাতীত সুযোগ। তারা চলে যাওয়ার পর একপর্যায়ে যখন আমি আমার চোখের বাঁধন খুলি, প্রায় সাড়ে পাঁচ বছর পর প্রথমবার দিনের আলো দেখে দেহ- এমন শিহরিত হয়ে উঠল এবং মনে হলো আমার পুনর্জন্ম হয়েছে। মৃদুমন্দ বাতাস, মেঘলা আকাশ, নির্জন বনে পাখির গান—সবকিছু ছিল অচেনা অথচ আপন। একদিকে মুক্তির আনন্দ, অন্যদিকে অজানা শঙ্কা; হঠাৎ অশ্রুতে ভিজে গেল দুই চোখ।

অসমাপ্ত ক্ষত, অমোচনীয় দাগ
জীবন থেকে হারিয়ে যাওয়া সাড়ে পাঁচ বছর, সমাজ ও পরিবার তথা পৃথিবী থেকে বিচ্ছিন্নতার কষ্ট, অমানবিক নির্যাতন, এমনকি সবচেয়ে মৌলিক মানবাধিকারগুলো থেকেও বঞ্চিত থাকার ক্ষত-আমাকে বহন করতে হবে আমৃত্যু। তবুও আমি জানি, এই গল্প শুধু আমার একার নয়; আমার মতো অসংখ্য মানুষ, অসংখ্য পরিবার একই যন্ত্রণা ভোগ করেছে। ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার ১৫ বছরের ফ্যাসিবাদী দুঃশাসনে শত শত রাজনৈতিক ভিন্ন মতাবলম্বী নাগরিককে বলপূর্বক তুলে নিয়ে গুম করা হয়েছে। অধিকাংশ গুম হওয়া ব্যক্তি এখনও ফিরে আসেননি।

গুম হওয়া ব্যক্তিদের ঘটনা অনুসন্ধান এবং গুমের শিকার হওয়া ব্যক্তিদের সন্ধান দেওয়ার জন্য সরকার গত বছর ২৭ আগস্ট একটি ‘গুম সংক্রান্ত তদন্ত কমিশন’ গঠন করে। গঠনের এক বছর পার হয়ে গেলেও গুম হওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে যারা এখনও নিখোঁজ রয়েছেন, তাদের সন্ধান বা তাদের ভাগ্যে কী ঘটেছে- তা জানাতে পারেনি কমিশন।

মানবাধিকার ও গণতন্ত্রের জন্য হুমকি
মানবাধিকার চুক্তি ও আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী প্রত্যেক নাগরিকের জীবন, নিরাপত্তা ও ন্যায়বিচারের অধিকারের নিশ্চয়তা প্রদানের দায়িত্ব রাষ্ট্রের। বিগত পনেরো বছরের ফ্যাসিবাদী শাসনামলে রাষ্ট্র সে দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয়েছে। পতিত ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনা আজীবন ক্ষমতায় থাকার মানসে গণতন্ত্র ও নাগরিকদের সাংবিধানিক মৌলিক মানবাধিকারগুলোকে পদদলিত করে খুন- গুমের মাধ্যমে একচেটিয়া মাফিয়াতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। যার প্রমাণ শত শত নাগরিকের গুম, ভোট ডাকাতি ও জালিয়াতির নির্বাচনের মাধ্যমে অবৈধভাবে ক্ষমতা দখল।

গুম কেবল একটি গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘন নয়; গণতন্ত্রের জন্যও বড় হুমকি। পতিত ফ্যাসিস্ট হাসিনা সেই কাজটি করেছিলেন। রাষ্ট্রযন্ত্রকে ব্যবহার করে তিনি নাগরিকদের মুক্তভাবে মতপ্রকাশ ও স্বাধীনভাবে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশ নেওয়ার অধিকারকে কেড়ে নিয়েছিলেন, মানুষের প্রতিবাদের কণ্ঠকে স্তব্ধ করে দিয়েছিলেন এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর অধিকারকে কেড়ে নিয়েছিলেন। ফলে রাজনৈতিক ভিন্নমত প্রকাশ, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা এবং গণতন্ত্রকেও তিনি কার্যত গুম করেছিলেন।

ন্যায়বিচার ও ক্ষতিপূরণগুমসংক্রান্ত মামলাগুলোর বিচার প্রক্রিয়া এখনও শুরু হয়নি। গুমের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের এখনও চিহ্নিত ও গ্রেপ্তার করতে পারেনি সরকার। জেআইসি ও টিএফআই-এর মতো বীভৎস গোপন কারাগারগুলো হেফাজতে নিতে পারেনি ‘গুমসংক্রান্ত তদন্ত কমিশন’। ফলে সেগুলো ভেঙে আকার আকৃতি পরিবর্তন করা হচ্ছে, গুরুত্বপূর্ণ, আলামত নষ্ট করে ফেলা হচ্ছে; সর্বোপরি সেগুলোর অস্তিত্ব মুছে ফেলা হচ্ছে। গুমের শিকার ব্যক্তিরাই যে কেবল ভুক্তভোগী তা নয়, তাদের গোটা পরিবারকেও বছরের পর বছর বহুমাত্রিক অনিশ্চয়তা, অবর্ণনীয় মানসিক পীড়ন, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা, ভয় ও আর্থিক ভোগান্তির মধ্য দিয়ে জীবন কাটাতে হয়। তাদের এই সংকট কাটিয়ে ওঠার জন্য দরকার ন্যায়বিচার। পাশাপাশি ভুক্তভোগী ব্যক্তি ও পরিবারকে উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থাও জরুরি।

রাষ্ট্রকে অবশ্যই ভুলেভোগীদের প্রতি দায় স্বীকার করতে হবে। গুম ব্যক্তিদের পরিচয়, তাদের অবস্থান ও শেষ পরিণতি এবং কেন গুম করা হয়েছে, তা জানতে হবে। দায়ীদের বিচারের মুখোমুখি করতে হবে, দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। ভুক্তভোগী ও তাঁর পরিবারের সম্মান ফিরিয়ে দিতে হবে।

লেখক: সংগঠক, ইউপিডিএফ

সূত্র: সমকাল (প্রিন্ট ভার্সন) 



This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. AcceptRead More