জাতির অস্তিত্ব রক্ষায় যুব সমাজকে অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে হবে- প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর সভায় জিকো ত্রিপুরা

0

বক্তব্য রাখছেন গণতান্ত্রিক যুব ফোরামের সভাপতি জিকো ত্রিপুরা।

নিজস্ব প্রতিনিধি, সিএইচটি নিউজ
শনিবার, ৫ এপ্রিল ২০২৫

জাতির অস্তিত্ব রক্ষায় যুব সমাজকে অগ্রণী ভূমিকা পালনের আহ্বান জানিয়েছেন গণতান্ত্রিক যুব ফোরামের সভাপতি জিকো ত্রিপুরা।

আজ শনিবার (৫ এপ্রিল ২০২৫) সকাল ১০টায় খাগড়াছড়ির মাটিরাঙ্গায় গণতান্ত্রিক যুব ফোরামের ২৩তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে কেন্দ্রীয় কমিটির আয়োজিত আলোচনা সভায় তিনি এ আহ্বান জানান।

অস্তিত্ব ধ্বংসের কবল থেকে জাতিকে রক্ষার্থে যুবশক্তি পূর্ণস্বায়ত্তশাসনের পতাকাতলে সমবেত হও, প্রতিরোধ গড়ে তোল” এই শ্লোগানে এ আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়।

আলোচনা সভায় জিকো ত্রিপুরার সভাপতিত্বে ও ক্যামেরণ দেওয়ানের সঞ্চালনায় বক্তব্য রাখেন ইউপিডিএফ’র মাটিরাঙ্গা-গুইমারা ইউনিটের সমন্বয়ক ঝিমিত চাকমা, হিল উইমেন্স ফেডারেশনের সভাপতি নীতি চাকমা ও পাহাড়ি ছাত্র পরিষদের কেন্দ্রীয় সদস্য অনিমেষ চাকমা।

সভায় সভাপতির বক্তব্যে জিকো ত্রিপুরা বলেন, জাতির অস্তিত্ব আজ হুমকির সম্মুখীন। পার্বত্য চট্টগ্রামে অব্যাহত ভূমি বেদখল, নারী ধর্ষণ, অন্যায় দমন-পীড়ন জারি রয়েছে। তাই জাতির অস্তিত্ব রক্ষায় যুব সমাজকে অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে হবে।

তিনি আরো বলেন, মাটিরাঙ্গাসহ পার্বত্য চট্টগ্রামে পাহাড়িদের জায়গা দখল করে তাদেরকে উচ্ছেদ করা হচ্ছে। যুব সমাজকে এসব অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে হবে।

জিকো ত্রিপুরা আরো বলেন, এলাকার জনগণ ও ছাত্র-যুব সমাজকে রাজনৈতিকভাবে আরো বেশি সচেতন হতে হবে। বর্তমানে সমাজে সামাজিক অবক্ষয় বৃদ্ধি পেয়েছে। নানা অনিয়মের ঘটনা ঘটছে। এসব সামাজিক অবক্ষয় ও অসঙ্গতি বিষয়েও সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে। আমাদের আর বসে থাকার সময় নেই। 

তিনি পূর্ণস্বায়ত্তশাসন লড়াইয়ে সামিল হয়ে সকল অন্যায়-অবিচার রুখে দেয়ার জন্য যুব সমাজের প্রতি আহ্বান জানান।

ইউপিডিএফ সংগঠক ঝিমিত চাকমা বলেন, যুব সমাজ হচ্ছে আন্দোলনের প্রধান শক্তি। আমাদের অধিকার আদায় ও অস্তিত্ব রক্ষার্থে যুব সমাজকে এগিয়ে আসতে হবে।

তিনি আরো বলেন, চব্বিশের ছাত্র-গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর এখন শাসকগোষ্ঠিভুক্ত বিভিন্ন দল এলাকার চাকমা, মারমা, ত্রিপুরাদের তাদের দলে ভিড়াতে নানা প্রলোভন দেখাচ্ছে। অতীতে আমরা বিএনপি-আওয়ামী লীগের রাজনীতি ও তাদের আমলে পাহাড়িদের ওপর নিপীড়ন-নির্যাতনের চিত্র দেখেছি। কাজেই, বর্তমান সময়েও এসব দলগুলোর বিষয়ে পাহাড়িদেরকে সজাগ ও সতর্ক থাকতে হবে।

বক্তব্য রাখছেন হিল উইমেন্স ফেডারেশনের সভাপতি নীতি চাকমা।

হিল উইমেন্স ফেডারেশনের সভাপতি নীতি চাকমা বলেন, আলুটিলা পর্যটন কেন্দ্র সম্প্রসারণের লক্ষ্যে ভূমি বেদখলের যে পাঁয়তারা চালানো হয়েছিল তা জণগণ প্রবল আন্দোলনে ভেস্তে দিয়েছে। এতেই প্রমাণ হয়েছে যে, আমাদের ভূমি রক্ষার জন্য গণপ্রতিরোধ ছাড়া কোন বিকল্প নেই।

তিনি তার বক্তব্যে পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়ি জাতিগোষ্ঠীগুলোর মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করে দেয়ার চক্রান্ত চলছে বলে অভিযোগ করেন।  

পার্বত্য চট্টগ্রামসহ সারাদেশে নারীরা নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে রয়েছেন উল্লেখ করে নীতি চাকমা বলেন, বর্তমানে পাহাড় ও সমতলে নারীদের ওপর সহিংতা চলমান রয়েছে। মৌলবাদী গোষ্ঠীগুলো চায় না নারীরা ঘরের বাইরে স্বাধীনভাবে চলাফেরা করুক।

তিনি বলেন, নারীদের সুরক্ষা ও সামাজিক অবক্ষয় রোধে এলাকার যুব সমাজসহ সমাজের সর্বস্তরের জনগণকে সচেতন হতে হবে।

নীতি চাকমা আরো বলেন, আমাদের জাতীয় অস্তিত্ব রক্ষা করতে হলে নারীদেরকে আন্দোলনে সামিল হয়ে বিশেষ ভূমিকা রাখতে হবে। তিনি ছাত্র-যুব-নারী সমাজকে পূর্ণস্বায়ত্তশাসনের লড়াইয়ে যুক্ত হয়ে জাতিকে রক্ষার আহ্বান জানান।

বক্তব্য রাখছেন ছাত্রনেতা অনিমেষ চাকমা

ছাত্র নেতা অনিমেষ চাকমা বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামে দীর্ঘ সময় ধরে অধিকার আদায়ের সংগ্রাম চলছে। নব্বইয়ের দশকে ছাত্র-গণআন্দোলনের কথা আমরা সকলেই জানি। কিন্তু বর্তমান সময়ে এসে ছাত্র-যুব সমাজের আন্দোলনে অনিহা সৃষ্টি হয়েছে। এর থেকে উত্তরণ ঘটাতে হবে। ছাত্র-যুব সমাজকে আন্দোলমুখি হয়ে জাতির হাল ধরতে হবে।

তিনি আরো বলেন, বাংলাদেশ একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হলেও পাহাড়িদের সাথে বরাবরই বৈষম্যমূলক আচরণ করা হয়েছে। মুক্তি সংগ্রামে পাহাড়িরা অংশগ্রহণ করলেও বিজয় অর্জনের পর পাহাড়িদেরকে জাতি হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়নি, বাঙালি জাতীয়তা চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে। চব্বিশের ছাত্র-জনতার অভুত্থানে হাসিনা সরকারের পতনের পরও পাহাড়ে আমরা একই চিত্র আমরা দেখতে পাচ্ছি। এখানে এখনো সেনাশাসন জারি রেখে অন্যায় দমন-পীড়ন চালানো হচ্ছে।

তিনি পার্বত্য চট্টগ্রামে অধিকার আদায়ের আন্দোলন জোরদার করতে ছাত্র-যুব সমাজকে পূর্ণস্বায়ত্তশাসনের লড়াইয়ে সামিল হওয়ার আহ্বান জানান।

আলোচনা সভা শুরুর পূর্বে শহীদ যুব নেতা পঞ্চসেন ত্রিপুরা, সুপ্রীম চাকমা, মিঠুন চাকমা, বিপুল চাকমা, পলাশ চাকমা, লিটন চাকমাসহ শহীদদের স্মরণে নির্মিত অস্থায়ী স্মৃতিস্তম্ভে পুষ্পস্তবক অর্পণ করে শ্রদ্ধা ও সম্মান জানানো হয়।


এতে গণতান্ত্রিক যুব ফোরামের পক্ষ থেকে সভাপতি জিকু ত্রিপুরা ও কেন্দ্রীয় সদস্য সুইচিং মারমা, ইউপিডিএফের পক্ষ থেকে ঝিমিত চাকমা, বিকাশ ত্রিপুরা ও উক্যচিং মারমা, পাহাড়ি ছাত্র পরিষদ ও হিল উইমেন্স ফেডারেশনের পক্ষ থেকে যথাক্রমে অনিমেষ চাকমা ও নীতি চাকমা প্রমুখ অস্থায়ী স্মৃতিস্তম্ভে পুষ্পস্তবক অর্পণ করে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন।

এরপর দলীয় সংগীতের মাধ্যমে দলীয় পতাকা উত্তোলন এবং পার্বত্য চট্টগ্রামে অধিকার আদায়ের আন্দোলন করতে গিয়ে যারা শহীদ হয়েছেন তাদের স্মরণে দাঁড়িয়ে ১ মিনিট নিরবতা পালন করা হয় ।

এছাড়া সভায় সদ্য কারাগার থেকে মুক্ত হওয়া যুবনেতা ধারাজ চাকমাকে ফুল দিয়ে সংবর্ধনা দেওয়া হয়।



This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. AcceptRead More