পানছড়িতে বরুণ বিকাশ চাকমাকে হত্যার পরিকল্পনা করা হয় ভারতের আগরতলায়
বিশেষ রিপোর্ট, পানছড়ি
সিএইচটি নিউজ, বুধবার, ১২ জুন ২০২৪,
গত ৮ জুন খাগড়াছড়ির পানছড়ি উপজেলার লোগাঙে খুন হন বরুন বিকাশ চাকমা। কিন্তু তাকে খুনের পরিকল্পনা করা হয় ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের আগরতলায়। কয়েকটি বিশ্বস্ত সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।
সূত্রগুলো জানায়, বরুনকে খুনের পরিকল্পনা করা হয় আগরতলার নন্দন নগরস্থ সন্তু গ্রুপের বর্তমান সাধারণ সম্পাদক প্রণতি চাকমা ওরফে ভিক্টর বাবুর নিজ বাড়িতে।
এতে অংশগ্রহণ করেন ভিক্টর বাবু নিজে, তার ছেলে জ্যোতিষ্মান চাকমা (বুলবুল), জেএসএসের সামরিক শাখার প্রধান বাচ্চু চাকমা, মৃন্ময় চাকমা ওরফে মায়া বাবু, দীলিপ চাকমা, খীসা বাবু, তুজিম চাকমা, উদয়ন ত্রিপুরা, চিনু মারমা এবং ইউপিডিএফ থেকে বিচ্যুত এক কর্মী, যিনি বর্তমানে ত্রিপুরায় বসবাস করছেন। তবে তার আসল বাড়ি পানছড়ির লোগাঙ এলাকায়। এছাড়া দিল্লি থেকে তাদের সাথে মোবাইলে যোগ দেন করুণালংকার ভান্তে।
উক্ত পরিকল্পনা সভায় বরুন চাকমাকে খুন করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় এবং ডেভিড চাকমাকে কিলিং মিশনের প্রধান দায়িত্বসহ কিছু বিশেষ ক্ষমতা দেয়া হয়। বরুন চাকমার গতিবিধি সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করার দায়িত্ব দেওয়া হয় ঝরে পড়া উক্ত ইউপিডিএফ কর্মীকে।
ঘটনার আগের দিন চিনু মারমার নেতৃত্বাধীন কোম্পানীর সশস্ত্র সদস্যদের ১৭ জনের একটি গ্রুপ ডেবিড চাকমার নেতৃত্বে ত্রিপুরা রাজ্যের সোনামুড়া থেকে বাংলাদেশ-ভারত সীমানার নো-ম্যানসল্যান্ড ও মিইনী থুম হয়ে পানছড়ির দিকে রওনা দেয়।
ঘটনার দিন পানছড়ির লোগাং ইউনিয়নে হে্ডমরা এলাকার গর্জনতুলি নামক স্থানে এসে গ্রুপের একটি অংশকে জঙ্গলের ভিতরে রেখে ডেভিড চাকমা ও তংগুলো চাকমা বাকিদের নিয়ে কিলিং মিশনটি বাস্তবায়ন করে।

খুনের ঘটনাটি ঘটে গত ৮ জুন ২০২৪ রোজ শনিবার রাত সাড়ে ৮টার দিকে। খুনীরা প্রথমে বরুন বিকাশ চাকমার বাড়িতে যায়। এ সময় তিনি তার হে্ডমরা গ্রামের নিজ বাড়ি থেকে কিছু দূরে একটি দোকানে অবস্থান করছিলেন।
খুনীরা নিজেদেরকে ইউপিডিএফ সদস্য বলে পরিচয় দেয় এবং বাড়িতে বরুন বিকাশ চাকমাকে খুঁজে না পেলে তার স্ত্রীকে দিয়ে মোবাইলের মাধ্যমে কল করে সুকৌশলে বাড়িতে ডেকে নিয়ে আসে।
বরুন বিকাশ চাকমা বাড়িতে আসার পর খুনীরা তাকে ধরে ফেলে এবং বাড়ির উঠানে বের করে ঠাণ্ডা মাথায় গুলি করে খুন করে চলে যায়।
বরুণ বিকাশ চাকমা দর্জির কাজ করতেন এবং সেলাই মেশিন মেরামত করতে জানতেন। তিনি এলাকায় বিভিন্ন জনকে বিনা পয়সায় নষ্ট হওয়া সেলাই মেশিন ঠিক করে দিতেন।
তার খুনের ঘটনার সন্তু গ্রুপের কমান্ডার ডেভিড চাকমা ও সুপন চাকমা ওরফে তংগুলো ছাড়াও ননুমনি চাকমা (বিপ্লব), বিজলী কুমার চাকম (সাবেক মেম্বার), জয়দেব চাকমা ও পূণ্যমনি চাকমা সরাসরি জড়িত ছিলেন বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে।
অনেকের প্রশ্ন, বরুন বিকাশ চাকমার মতো একজন সাধারণ গ্রামবাসীকে জেএসএস সন্তু গ্রুপ কেন খুন করলো। সূত্র মতে, সন্তু গ্রুপ দীর্ঘ কয়েক বছর ধরে পানছড়িতে পা দেয়ার জন্য চেষ্টা চালিয়ে আসছে। কিন্তু ইউপিডিএফের প্রতি সাধারণ জনগণের ব্যাপক সমর্থনের ভয়ে তারা তা করতে সাহস পায় না।
এজন্য সবকিছু হিসেব করে কয়েক মাস আগে সন্তু লারমা তার সশস্ত্র গ্রুপের বিন্যাসের মধ্যে কিছু গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন নিয়ে আসেন, যেমন তিনি সশস্ত্র গ্রুপের প্রধান হিসেবে দেবাশীষ চাকমার পরিবর্তে তরুণ প্রজন্মের বাচ্চু চাকমাকে দায়িত্ব দেন।
এছাড়া বিশ্বস্ত সূত্রে জানা যায়, সন্তু লারমা পানছড়ি দখলের উদ্দেশ্যে ডেভিড চাকমাকে বিশেষ দায়িত্ব দেন এবং যে করেই হোক ইউপিডিএফ নেতাকর্মীদের না পেলে তাদের সমর্থকদের হলেও হত্যা করে ‘ঘটনা’ ঘটানোর নির্দেশ দেন।
এই হত্যার উদ্দেশ্য হলো একদিকে তার কর্মী বাহিনীর মনোবল বৃদ্ধি করা এবং অন্যদিকে পানছড়ির সাধারণ জনগণের মধ্যে ভীতি ও আতঙ্ক সৃষ্টি করা। আর এভাবে এক সময় পানছড়ি দখলের পথ পরিস্কার করা।
কিন্তু বরুন বিকাশ চাকমার হত্যা জেএসএস সন্তু গ্রুপের মধ্যেও ভীষণ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে বলে জানা গেছে। অনেক জেএসএস নেতা বরুনকে টার্গেট করাকে মেনে নিতে পারছেন না, যার মধ্যে রয়েছেন বরুন বিকাশের ঘনিষ্ট আত্মীয় এবং জেএসএসে একজন প্রভাবশালী নেতা নৈতিক বাবু। তিনি ‘পার্টিতে কী হচ্ছে’ বলে প্রশ্ন করেন এবং বরুনকে কেন হত্যা করা হলো তার ব্যাখ্যা দাবি করেন।
এদিকে অনেক সাধারণ মানুষের প্রশ্ন, বরুনকে খুন করে জেএসএস কী অর্জন করলো এবং তাদের চুক্তি বাস্তবায়নের আন্দোলন কতদূর অগ্রসর হলো?
তারা সন্তু গ্রুপের নেতাদের বৃথা খুনের রাজনীতি বন্ধ করে সরকারের বিরুদ্ধে জনগণের অধিকার ও দাবি নিয়ে আন্দোলন করার পরামর্শ দেন।
তাদের প্রশ্ন, আন্দোলন না করে এভাবে বরুন চাকমাদের মতো নিরীহ লোকজনকে খুন করে জেএসএস কেন সরকার ও সেনাবাহিনীকে লাভ করে দিচ্ছে? তাদের মতে সন্তু গ্রুপ যদি আন্দোলন করতে না চায়, না করুক, তবে অন্তত তারা যেন ইউপিডিএফকে আন্দোলনে বাধা না দেয়।
কিন্তু পার্বত্য চট্টগ্রামের জুম্মদের ট্র্যাজেডি হলো, সন্তু লারমারা নিজেরাও আন্দোলন করেন না, অন্যদেরও আন্দোলন করতে দেন না। তারা সম্পূর্ণ সরকার ও সেনাবাহিনীর এজেন্ডা বাস্তবায়ন করছেন। এটা এখন দিবালোকের মতো সবার কাছে স্পষ্ট।
তবে সব কিছুর শেষ আছে। তাদের এই খুনের রাজনীতিও একদিন শেষ হবে এবং তাদেরকে ধ্বংস করে দেবে।
সিএইচটি নিউজে প্রকাশিত প্রচারিত কোন সংবাদ, তথ্য, ছবি ,ভিডিও, কনটেন্ট ব্যবহার করতে হলে কপিরাইট আইন অনুসরণ করে ব্যবহার করুন।