পার্বত্য চট্টগ্রামে সেনাশাসন প্রত্যাহারের রোডম্যাপ ঘোষণা করাসহ অন্তর্বর্তী সরকারকে ১৩ প্রস্তাবনা গণতান্ত্রিক অধিকার কমিটির

অনলাইন ডেস্ক, সিএইচটি নিউজ
শনিবার, ৫ অক্টোবর ২০২৪
পার্বত্য চট্টগ্রামে গণতান্ত্রিক পরিবেশ সৃষ্টি করতে সেনাশাসন প্রত্যাহারের রোডম্যাপ ঘোষণা করাসহ অন্তর্বতীকালীন সরকারকে ১৩টি প্রস্তাবনা দিয়েছে গণতান্ত্রিক অধিকার কমিটি।
আজ শনিবার (৫ অক্টোবর ২০২৪) বিকেলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) নাটমণ্ডল মিলনায়তনে গণতান্ত্রিক অধিকার কমিটির আয়োজনে ‘অন্তর্বর্তী সরকারের দুই মাস: পর্যালোচনা, প্রস্তাব ও মতবিনিময়’ শীর্ষক সভায় এ ১৩ প্রস্তাবনা দেওয়া হয়।
সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্টের সভাপতি ও গণতান্ত্রিক অধিকার কমিটির সদস্য সালমান সিদ্দিকীর সঞ্চালনায় সভাপ্রধান হিসেবে উপস্থিত ছিলেন অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ।
এ ছাড়াও বক্তব্য রাখেন গবেষক মাহা মির্জা, ঢাবির সমাজবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক সামিনা লুৎফা, সুফি দার্শনিক কাজী জাবের আহমেদ, চলচ্চিত্রকর্মী আকরাম খান প্রমুখ।
গবেষক মাহা মির্জা এই ১৩ প্রস্তাবনা পেশ করেন। প্রস্তাবগুলোর মধ্যে রয়েছে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে শহীদ, আহত ও নিখোঁজদের তালিকা প্রকাশ করে তাদের পরিবারের দায়িত্ব গ্রহণসহ গণহত্যায় জড়িত শেখ হাসিনা ও সংশ্লিষ্ট সবাইকে বিচারের আওতায় আনা এবং তাদের সম্পত্তি জাতীয়করণ করা। সংবিধান কমিশনের মাধ্যমে একটি গণতান্ত্রিক সংবিধানের রূপরেখা প্রকাশ করা এবং জনমতের ভিত্তিতে তা চূড়ান্ত করাসহ বিচার বিভাগের প্রকৃত স্বাধীনতা নিশ্চিত করা। গণতান্ত্রিক অধিকার নিশ্চিত করা এবং জানমালের নিরাপত্তা ও আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন করা।
খাদ্যদ্রব্য, গ্যাস, বিদ্যুৎ, জ্বালানি তেলসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্য ও খাদ্যপণ্যের দাম কমাতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা ও সারা দেশে রেশন চালুর প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণসহ অবিলম্বে ব্যাংক লুট, অর্থপাচার ও শেয়ার কারসাজির বিষয়ে তদন্ত রিপোর্ট প্রকাশ ও দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা। শ্রমিকদের জন্য ন্যূনতম জাতীয় মজুরি ঘোষণা করাসহ শ্রমিক হত্যার বিচার করা এবং শ্রমিকদের বকেয়া মজুরিসহ সব ন্যায্য দাবি পূরণে মালিকদের বাধ্য করা। প্রকৃতি ও কৃষকবান্ধব কৃষিব্যবস্থা নিশ্চিত করতে কমিশন গঠন করা ও কৃষি উপকরণ থেকে সব ধরনের শুল্ক প্রত্যাহারসহ কৃষিতে ব্যবহৃত জ্বালানি ও বিদ্যুতের দাম কমানো।
প্রস্তাবের মধ্যে আরো রয়েছে বিদ্যুৎ খাতে রেন্টাল ও কুইক রেন্টাল চুক্তি নবায়ন না করার প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন এবং রামপাল, রূপপুরসহ দেশবিরোধী প্রাণবিনাশী প্রকল্প এবং এলএনজি ও আদানিসহ বিদ্যুৎ আমদানি চুক্তি বাতিলের প্রক্রিয়া চালু করা।
শিক্ষার বাণিজ্যিকীকরণ ও অব্যবস্থাপনা বন্ধ করে সর্বজনীন, বৈষম্যহীন, বিজ্ঞানভিত্তিক, একমুখী শিক্ষাব্যবস্থার প্রতিষ্ঠায় একটি কমিশন গঠন করাসহ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সন্ত্রাসী দখলদারি তৎপরতা বন্ধ করে ছাত্রসংসদ নির্বাচন সম্পন্ন করা এবং পাঠ্যপুস্তক কমিটি পুনর্বহাল করা, শিক্ষকদের বিরুদ্ধে বিদ্বেষী প্রচারণার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ। স্বাস্থ্যরক্ষা ও চিকিৎসাকে সাংবিধানিক অধিকার হিসেবে প্রতিষ্ঠা এবং সর্বজন (পাবলিক) হাসপাতালে সম্পূর্ণ বিনা মূল্যে চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় সংস্কারের কাজ শুরু করাসহ ওষুধসহ সব চিকিৎসাসংক্রান্ত পণ্যের দাম কমানো। পার্বত্য চট্টগ্রামে গণতান্ত্রিক পরিবেশ সৃষ্টি করতে সেনাশাসন প্রত্যাহারের রোডম্যাপ ঘোষণাসহ সাম্প্রতিক হামলাসহ সব খুন অপহরণ হয়রানির বিচার করা। উত্তরাধিকার সূত্রে জমি-সম্পত্তিতে নারীদের সমানাধিকার নিশ্চিত করা এবং সব কাজে সমশ্রমে সমমজুরি নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় বিধিব্যবস্থা প্রণয়ন ও যৌন নিপীড়ন প্রতিরোধে ২০০৯ সালের হাইকোর্ট নির্দেশনা অবলম্বন করে কারখানা-সচিবালয়সহ সব প্রতিষ্ঠানে যৌন নিপীড়নবিরোধী নীতিমালা কার্যকর করা। মানবপাচার ও প্রবাসে বাংলাদেশি নারী-পুরুষের নিপীড়ন প্রতিরোধে বিশেষায়িত সেল গঠন করা।
যুক্তরাষ্ট্র, চীন, রাশিয়া, ইইউ, ভারতের সঙ্গে স্বাক্ষরিত সব চুক্তি প্রকাশ এবং জনস্বার্থবিরোধী চুক্তিগুলো বাতিলের কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করাসহ সীমান্ত হত্যা বন্ধ ও আন্তর্জাতিক পানিবণ্টনে বাংলাদেশের প্রাপ্য নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ।
সভায় আনু মুহাম্মদ বলেন, ‘আমাদের ১৩টি দাবি অনেক দাবি মনে হতে পারে কিন্তু এগুলো আসলে অনেক বেশি কিছু নয়। সরকার যদি জনগণের দিকে ঘাড় ফেরান তাহলেই এই দাবি গুলোর বাস্তবায়ন সহজ। এসব বিষয়ের জন্য সরকারের অনেকগুলো মন্ত্রণালয় রয়েছে।
নিহত আহতের তালিকা তৈরীতে কালক্ষেপণের বিষয়ে তিনি বলেন, সরকারের এত সোর্স থাকার পরও আহত ও নিহতদের তালিকা বের করতে এত সময় কেন লাগছে! এটা এত কঠিন কিছু নয়। নিহতদের পরিবারকে কেবল এক লাখ টাকা ধরিয়ে না দিয়ে তাদের দায়িত্ব সরকারকে নিতে হবে।
দেশে বিভিন্ন জায়গায় সংখ্যালঘু ও ভিন্ন মতাদর্শের ওপর হামলা লুটপাটের বিষয়ে তিনি বলেন, সরকার পতনের পর থেকে দেশের বিভিন্ন স্থানে সংখ্যালঘু ও ভিন্ন মতাদর্শের ওপর যে হামলা হচ্ছে সেটা দমন করার বিষয়ে সরকারের কণ্ঠে জোর নেই। এই যে সময়গুলো চলে যাচ্ছে এটা দেশের জন্য বিপজ্জনক। এর ফলে সুবিধা হচ্ছে স্বৈরশাসকদের, ভারতের হিন্দুত্ববাদীদের। অনতিবিলম্বে এসব বন্ধে সরকারকে জোরালো পদক্ষেপ নিতে হবে।
ছাত্ররাজনীতির বিষয়ে তিনি বলেন, বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ছাত্ররাজনীতির নামে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড বন্ধ করতে হবে। তবে ছাত্রসংসদ থাকতে হবে। শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন সংগঠন থাকবে সেটা রাজনৈতিক হতে হবে তেমন কথা নয়, সাংস্কৃতিক সংগঠন হিসেবেও থাকতে পারে তবে সংগঠন থাকতে হবে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের ছয় মাস পূর্ণ হলে আবারও পর্যালোচনা, প্রস্তাব ও মতবিনিময়সভার আয়োজন করা হবে বলে জানান তিনি।
তথ্যসূত্র: কালের কণ্ঠ
সিএইচটি নিউজে প্রকাশিত প্রচারিত কোন সংবাদ, তথ্য, ছবি ,ভিডিও, কনটেন্ট ব্যবহার করতে হলে কপিরাইট আইন অনুসরণ করে ব্যবহার করুন।