জাতীয় কন্যা শিশু দিবসে কুদুকছড়িতে বর্ণাঢ্য র‌্যালি ও পথ নাটক

পাহাড়ে কন্যা শিশুদের নিরাপত্তা ও নির্বিঘ্নে বেঁচে থাকার অধিকার নিশ্চিত করতে হবে: নীতি চাকমা

0

রাঙামাটি প্রতিনিধি, সিএইচটি নিউজ
শনিবার, ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৩

পার্বত্য চট্টগ্রামসহ সারাদেশের কন্যা শিশু ও নারীদের সুরক্ষা, নিরাপত্তা ও নির্বিঘ্নে বেঁচে থাকার অধিকার নিশ্চিত করতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন পার্বত্য চট্টগ্রামে নারী সমাজের প্রতিনিধিত্বকারী সংগঠন হিল উইমেন্স ফেডারেশনের কেন্দ্রীয় সভাপতি নীতি চাকমা।

আজ শনিবার (৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৩) জাতীয় কন্যা শিশু দিবসে রাঙামাটি সদর উপজেলার কুদুকছড়িতে হিল উইমেন্স ফেডারেশন ও পার্বত্য চট্টগ্রাম নারী সংঘের যৌথ উদ্যোগে বর্ণাঢ্য র‌্যালীর পরবর্তী আয়োজিত এক সমাবেশে তিনি এ আহ্বান জানান।

কর্মসূচি বানচাল করে দেয়ার লক্ষ্যে আজ সকাল থেকে কুদুকছড়ির বিভিন্ন এলাকায় সেনাবাহিনীর নানা তৎপরতা, শিশু-কিশোরদের জিজ্ঞাসাবাদের পরও উত্তর কুদুকছড়ি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে র‌্যালি সহকারে শতাধিক ছোট ছোট কন্যা শিশুরা নিজেদের তৈরি কাগজের বিভিন্ন রঙের ফুল হাতে নিয়ে শাসকের অন্যায় অত্যাচারে বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানিয়ে নিজের মাতৃভাষায় মুখরিত স্লোগানে পায়ে হেঁটে র‌্যালিতে অংশগ্রহণ করেন। কন্যা শিশুরা কর্মসূচির মূল ভেন্যু কুদুকছড়ি বড় মহাপুরুম উচ্চ বিদ্যালয়ে ফটকে পৌঁছলে শিশুদের অপেক্ষারত মায়ের তুল্যা ৪ শতাধিক নারী তাদের স্বাগত জানান।

“আসুন, কন্যা শিশু তথা নারীর নিরাপত্তা ও অধিকার নিশ্চিত করতে ঐক্যবদ্ধ হই” এই স্লোগানে সকাল ১১টায় রাঙামাটি সদর উপজেলার কুদুকছড়ি বড় মহাপুরুম উচ্চ বিদ্যালয়ে ফটকে জাতীয় কন্যা শিশু দিবস উপলক্ষে বর্ণাঢ্য র‌্যালী ও রাণী কালিন্দীর সাহসিকতা ও সুশাসন নিয়ে পথ নাটকের আয়োজন করা হয়। এতে ৫ শতাধিক কন্যা শিশু ও নারী অংশগ্রহণ করেন।

স্কুল-কলেজের অগ্রসর ছাত্র-ছাত্রীদের মঞ্চায়নে পথ নাটকটিতে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসক ক্যাপ্টেন লুইনের খবরদারির বিরুদ্ধে রাণী কালিন্দীর সাহসীকতার চিত্র তুলে ধরা হয়।

এপর অনুষ্ঠিত সমাবেশে বক্তব্য রাখেন পার্বত্য চট্টগ্রাম নারী সংঘের কেন্দ্রীয় সহ-সভাপতি রিনিসা চাকমা, হিল উইমেন্স ফেডারেশনের কেন্দ্রীয় সভাপতি নীতি চাকমা ও সাধারণ সম্পাদক রিতা চাকমা।

সমাবেশের নারী নেত্রী নীতি চাকমা বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামের কন্যা শিশু-নারীদের কোন নিরাপত্তা নেই। শাসকের নিপীড়নের ফলে তারা নির্বিঘ্নে চলাফেরা করতে পারে না। সেনা-সেটলার কর্তৃক নিজ গৃহে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, এলাকায়, বাজারে, পথে ঘাটে ধর্ষণ, লাঞ্ছনা-বঞ্চনার শিকার হয়। রাষ্ট্রীয় বাহিনী পাহাড়ি নারীদের ধর্ষণ, নির্যাতনকে জাতিগত নিপীড়ন হিসেবে বেছে নিয়েছে। গত ৩ সেপ্টেম্বর কাপ্তাইয়ে সেনা সদস্য কর্তৃক এক স্কুল ছাত্রীকে ধর্ষণ করা হয়েছে। সেনাবাহিনী কতিপয় দালাল দুর্বৃত্তকে দিয়ে এ ধর্ষণের ঘটনা ধামাচাপা দেয়ার অপচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। ২৩ সেপ্টেম্বর নারী নেত্রী এন্টি চাকমাসহ তিন জনকে সেনাসৃষ্ট নব্য মুখোশ বাহিনীর সন্ত্রাসীদের দিয়ে দীঘিনালায় অপহরণ হয়। এছাড়াও পাহাড়ি জনগণের ওপর প্রতিনিয়ত নিপীড়ন নির্যাতন চালিয়ে তাদের বেঁচে থাকার ন্যূনতম অধিকারটুকু কেড়ে নেওয়া হয়েছে। শাসকগোষ্ঠীর এ দুঃশাসনের বিরুদ্ধে নারী সমাজকে রুখে দাঁড়াতে হবে।

কালিন্দী রানী বীরত্বের কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, তেজস্বীনি নারী রাণী কালিন্দী ব্রিটিশ ঔপনেবিশক শাসকদের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে রাজ্য শাসন করেছিলেন। ব্রিটিশ শাসক ক্যাপ্টন লুইন ক্ষমতার দাপট দেখাতে গিয়ে রাণীর হাতে অপদস্ত হয়েছিলেন। নারী হয়েও তিনি প্রায় দেড় যুগ রাজ্যে শাসন করেছিলেন। তিনি পার্বত্য চট্টগ্রামের নারী সমাজের মধ্যে অনুপ্রেরণাকারী একজন। আমরা তাকে শ্রদ্ধা ও স্মরণ করছি।

তিনি পাহাড়ে নারী নির্যাতন, জনগণের ওপর দমন-পীড়ন বন্ধ না হলে নারী সমাজকে সংগঠিত করে প্রতিরোধ গড়ে তোলা হবে বলে শাসকগোষ্ঠীর প্রতি হুশিয়ারী উচ্চারণ করেন।

রিনিসা চাকমা বলেন, সরকার পার্বত্য চট্টগ্রামের বহিরাগত সেটলার বাঙালিদের পুনর্বাসন করে পাহাড়িদের জায়গাগুলো কেড়ে নিচ্ছে। পাহাড়িরা আজ নিজ জায়গায় পরবাসী হয়ে ভূমিহীন অবস্থায় জীবন যাপন করতে বাধ্য হচ্ছে।

তিনি আরো বলেন, ’৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধে পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়িরা অংশগ্রহণ করেছিলেন। পাহাড়িরাও পাক্ বাহিনীর বিরুদ্ধে অস্ত্র ধরে যুদ্ধ করেছিলেন। কিন্তু স্বাধীনতার ৫২ বছর পরও পাহাড়িদের পরাধীন হয়ে বেঁচে থাকতে হচ্ছে, তাদের কাঙ্ক্ষিত মুক্তি মিলেনি।

তিনি, তিনি জাতির অস্তিত্ব রক্ষার্থে এবং নারী সমাজের অধিকার প্রতিষ্ঠার লক্ষে ঐক্যবদ্ধ হয়ে আন্দোলনে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান।

সমাবেশে অংশগ্রহণকারী নারীরা “আমরা চাই নিরাপত্তা, চাই অধিকার; হাসিনা আমাদের নিরাপত্তা দাও; নিরাপত্তা হরনকারীরা আমাদের শত্রু, তাদের প্রতিহত করবো; টহল-তল্ল্যাসি-নিরাপত্তা নামে সম্ভ্রমহানি বরদাস্ত করবো না; নরপশুদের চিহ্নিত কর, কন্যা শিশুদের রক্ষা করো; জাগ্রত হও নারী সমাজ” ইত্যাদি শ্লোগান সম্বলিত প্ল্যাকার্ড প্রদর্শন করেন।

সমাবেশ শেষে দালাল, প্রতিক্রিয়াশীলদের প্রতীকী শায়েস্তা ও কুশপুত্তলিকা দাহ করার মধ্য দিয়ে কর্মসূচি সমাপ্ত হয়।


সিএইচটি নিউজে প্রকাশিত প্রচারিত কোন সংবাদ, তথ্য, ছবি ,ভিডিও, কনটেন্ট ব্যবহার করতে হলে কপিরাইট আইন অনুসরণ করে ব্যবহার করুন।


সিএইচটি নিউজের ইউটিউব চ্যানেলটি সাবস্ক্রাইব করুন

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. AcceptRead More