পিসিপি’র রাবি শাখার ৮ম কাউন্সিল সম্পন্ন: সভাপতি উজানী চাকমা ও সাধারণ সম্পাদক শামীন ত্রিপুরা

0


রাবি প্রতিনিধি, সিএইচটি নিউজ

শুক্রবার, ১৬ জানুয়ারি ২০২৬

বৃহত্তর পার্বত্য চট্টগ্রাম পাহাড়ি ছাত্র পরিষদ (পিসিপি)-এর রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় শাখার ৮ম কাউন্সিল সম্পন্ন হয়েছে। এতে উজানী চাকমা সভাপতি, শামীন ত্রিপুরা সাধারণ সম্পাদক (পুনঃনির্বাচিত) ও মিশুক চাকমা সাংগঠনিক সম্পাদক নির্বাচিত হয়েছেন।

আজ শুক্রবার (১৬ জানুয়ারি ২০২৬) সকাল ৯টায় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় ক্যাফেটেরিয়া হল রুমে এই কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হয়।

‘পার্বত্য চট্টগ্রামের ন্যায্য দাাবি পূর্ণস্বায়ত্তশাসন মেনে নাও’ এই দাবিকে সামনে রেখে এবং ‘বুদ্ধিবৃত্তিক জ্ঞান অর্জন ও উৎকর্ষ চেতনায় উজ্জীবিত হয়ে শাসকশ্রেণির জাত ধ্বংসের সকল ষড়যন্ত্র নস্যাৎ করে ব্যক্তি স্বার্থের উর্ধ্বে গিয়ে আসুন, জাতীয় অস্তিত্ব রক্ষার্থে আপসহীন সংগ্রামে শামিল হই!’ এই আহ্বানে অনুষ্ঠিত কাউন্সিল অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন পিসিপির রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি সমু চাকমা ও সঞ্চালনা করেন সাধারণ সম্পাদক শামীন ত্রিপুরা।

এতে বক্তব্য রাখেন পিসিপি’র কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক শুভাশীষ চাকমা ও কেন্দ্রীয় সাংস্কৃতিক সম্পাদক রুপসী চাকমা। স্বাগত বক্তব্য রাখেন পিসিপির রাবি শাখার সাংগঠনিক সম্পাদক রিসার্চ চাকমা।

কাউন্সিল অধিবেশন শুরুতে অধিকার আদায়ের লক্ষ্যে পার্বত্য চট্টগ্রামসহ দেশে গণতান্ত্রিক আন্দোলনে শহীদদের স্মরণ ও সম্মান জানিয়ে দাঁড়িয়ে এক মিনিট নিরবতা পালন করা হয়। এরপর শুরু হয় কাউন্সিলের মূল পর্ব।

কাউন্সিল সভায় ছাত্র নেতা শুভাশীষ চাকমা বলেন, ‘শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য হলো বিকশিত হওয়া। ছাত্র সমাজও নানাভাবে বিকশিত হচ্ছে। কিন্তু আমি মনে করি একজন ছাত্রের বিকশিত হওয়ার মূল শর্ত হওয়া উচিৎ রাজনৈতিক সচেতনতার পরিপক্কতা। কারন, সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করছে রাজনীতি। অনেকেই রাজনীতি থেকে দূরে থাকে, রাজনীতিকে ঘৃণা করে। অথচ এইসব কিছুর প্রভাব যে রাজনীতি, সেটা আমরা রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি না থাকার কারনে বুঝতে পারিনা। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাস্পাসের মতন মনোরম পরিবেশে শিক্ষা অর্জনে যাঁরা সুযোগ পাচ্ছে, পিসিপি’র প্রত্যাশা থাকবে জুম্মদের অধিকার আদায়ের জন্য সকলেই রাজনৈতিক সচেতনতাবোধ জাগ্রত করে। যে প্রত্যাশা এবং আকাঙ্খা নিয়ে পিসিপি জন্মলাভ করেছিল সেটা অর্জন করার জন্য ছাত্রসমাজকে সকল ধরনের সীমাবদ্ধতা ও সংকীর্ণতার শৃঙ্খল ভেঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে হবে। পার্বত্য চট্টগ্রামে আমাদের আগামীর ভবিষ্যৎ কেমন হবে তা নির্ধারণ হবে বর্তমানে অধিকার আদায়ে আমরা কে কেমন ভূমিকা পালন করছি।


তিনি বলেন, সত্তর দশকে উদ্দাম, সাহসিকতা ও ত্যাগের মহিমায় যাঁরা স্বায়ত্তশাসনের দাবিকে সামনে রেখে সশস্ত্র সংগ্রাম শুরু করেছিল, শেষটা এমন আপসকামীতার মধ্য দিয়ে সমাপ্তি ঘটবে তা জুম্ম জনগণ কল্পনাও করতে পারেনি। আমাদের কাঙ্খিত অধিকার অর্জিত হলে আমাদের আর সংগ্রাম করা লাগত না। যার কারনে তাঁরা আজকে প্রতিটি পদে পদে জুম্ম জনগণ ও ছাত্র সমাজের নিকট জবাবদিহিতার সম্মুখীন হচ্ছে। সুতরাং, বর্তমান ছাত্র সমাজও যদি এই দায়িত্ব কাঁধে তুলে না নেয়, তাহলে পরবর্তী প্রজন্মের নিকট আমরাও দায়বদ্ধ থাকব। কাজেই আমাদের জাতীয় অস্তিত্ব রক্ষার্থে সঠিক লাইনের রাজনীতি ধারার সাথে সম্পৃক্ত হওয়া ছাড়া বিকল্প নেই। আমরা সংখ্যায় হয়ত কম হতে পারি, কিন্তু অধিকার অর্জনের জন্য এ সংখাটা কোনভাবেই নগণ্য নয়। পরিমাণগত মানের চাইতে গুণগত মান বৃদ্ধির জন্য বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চার প্রতি গুরুত্ব দিতে হবে। সমষ্টিগত স্বার্থকে প্রাধান্য দিতে হবে। তবেই মুক্তি আসবে।

শুভাশীষ চাকমা আরো বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামের জনগন অনেক দলকে রাষ্ট্রক্ষমতায় দেখেছে। কিন্তু যেই দলই ক্ষমতায় বসেছে, পার্বত্য চট্টগ্রামে জুম্মদের অধিকার প্রদানের প্রসঙ্গে একই পলিসি অনুসরণ ও বাস্তবায়ন করেছে। জুম্মদের ভাগ্য বিন্দুমাত্র পরিবর্তন হয়নি। গত চব্বিশের জুলাই আন্দোলনের পর কিছুটা প্রত্যাশার সঞ্চার হলেও দিনশেষে কেউই উগ্র বাঙ্গালি জাতীয়তাবাদের খোলস থেকে বের হতে পারেনি।

সাংস্কৃতিক সম্পাদক রুপসী চাকমা তাঁর বক্তব্যে বলেন, আমাদের সামাজিক প্রেক্ষাপট বিবেচনা করলে বুঝা যায় নারীদের নেতৃত্বে আসাটা কতোটা কঠিন। তারপরেও জাতির এই ক্রান্তিলগ্নে এইসব বাধা আমাদের আটকাতে পারেনি। আমরা কল্পনা চাকমার উত্তরসূরী হিসেবে তাঁর রেখে যাওয়া আদর্শকে ধারণ করে তাঁর যে স্বপ্ন ছিল পূর্ণস্বায়ত্তশাসন, সেটা অর্জনে আমাদের সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকার করতে হবে। বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনায় দেশের মানুষ ভোটের নির্বাচনে মাতোয়ারা। আমাদের জুম্মরাও এই স্রোতে গা ভাসাচ্ছে। এই সুযোগে শাসকশ্রেণি ঠিকই তার কাজটি করে যাচ্ছে। গত ১৪ জানুয়ারি ২০২৬ খাগড়াছড়ির ইটছড়িতে জমি বিরোধের জেরে ৩ জন পাহাড়িকে সেটলার বাঙ্গালি কর্তৃক কোপানোর ঘটনাও এর ব্যতিক্রম নয়। কাজেই, সদা সজাগ থেকে লড়াই সংগ্রামের মধ্য দিয়ে অধিকার আদায়ের জন্য ছাত্র-যুব-নারী সমাজকে এগিয়ে আসতে হবে।

রিসার্চ চাকমা বলেন, লংগদু গণহত্যার অগ্নিগর্ভ থেকে জন্ম নেয়া পিসিপি’র পথচলা কখনোই সুখকর ছিলোনা। বহু চড়াই উতরাই পেরিয়ে প্রতিষ্ঠার পর থেকে শিক্ষা অধিকার আদায়ের পাশাপাশি জাতীয় অস্তিত্ব রক্ষার্থে অগ্রণী ভূমিকা পালন করে আসছে। এই আপসহীন, অকুতোভয় দুর্বার পথ চলা বাধাগ্রস্ত করতে শাসকগোষ্ঠী বিভিন্ন প্রলোভন ও সুযোগ সুবিধা দিয়ে ছাত্র সমাজের অগ্রযাত্রাকে ব্যাঘাত করার অপচেষ্টা চালিয়েছে এবং এখনও অব্যাহত রেখেছে। সমস্ত প্রলোভন পিছনে রেখে ন্যায্য অধিকার আদায়ের আন্দোলনে ছাত্র সমাজকে যুক্ত হওয়ার আহ্বান জানাই।

সভাপতি সমু চাকমা তাঁর সমাপনী বক্তব্যে বলেন, গৌরবোজ্জ্বল সংগ্রাম ও ইতিহাসে ভরপুর পিসিপি’র মতন সংগঠনে যুক্ত হয়ে এই রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের মত বিদ্যাপীঠে সংগঠনের নেতৃত্ব দিতে পেরে আমি নিজেকে ধন্য মনে করছি। শুরুটা অবশ্যই মোটেই সুখকর ছিলোনা। নানা প্রতিক্রিয়াশীল গোষ্ঠী এখানে সক্রিয় ছিল। ক্যাম্পাসে এসে যা দেখলাম এবং যা বুঝলাম, এখানে এমন একটি সংগঠন দাঁড় করানো দরকার, যে সংগঠন পার্বত্য চট্টগ্রামের জুম্মদের ওপর চালানো নিপীড়ন-নির্যাতনের স্পষ্ট চিত্র তুলে ধরতে পারবে। সেই প্রত্যাশা ও আকাঙ্খা থেকে আমাদের নতুন করে পথ চলা শুরু হয়েছিল। নতুন কমিটিতে যাঁরা দায়িত্ব নিবে তাঁরা বিগত সময়ের ন্যায় আগামীতেও জাতীয় মুক্তির আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।

সভাপতি সমু চাকমা কাউন্সিলের ১ম অধিবেশন সমাপ্ত করেন এবং ২য় অধিবেশনের শুরুতে ৭ম কমিটি বিলুপ্ত করে নবগঠিত কমিটি প্রস্তাব করেন। প্রস্তাবিত কমিটি উপস্থিত প্রতিনিধিবৃন্দ সকলে জোর করতালির মাধ্যমে পাশ করেন। নতুন কমিটিতে সভাপতি উজানী চাকমা, সাধারণ সম্পাদক শামীন ত্রিপুরা (পুনরায়) ও মিশুক চাকমা সাংগঠনিক সম্পাদক নির্বাচিত হন।

নতুন কমিটির সদস্যদের শপথ বাক্য পাঠ করান পিসিপি’র কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক শুভাশীষ চাকমা।

শপথ গ্রহণ শেষে নতুন কমিটির নেতৃবৃন্দ বিদায়ী কমিটির সভাপতি সমু চাকমা’কে ফুল দিয়ে বিদায়ী শুভেচ্ছা জানান এবং নতুন কমিটি’র নেতৃবৃন্দকে ফুল দিয়ে অভিনন্দন জানান পাহাড়ি ছাত্র পরিষদের কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ।



This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. AcceptRead More