বরুণ বিকাশ চাকমা খুনীদের বাঁচাতে জেএসএসের মরিয়া চেষ্টা

বিশেষ প্রতিনিধি, পানছড়ি
বৃহস্পতিবার, ২৭ জুন ২০২৪
পানছড়ির লোগাং ইউনিয়নের ধুদুকছড়ায় গুলিতে নিহত বরুণ বিকাশ চাকমার খুনীদের বাঁচাতে জেএসএস সন্তু গ্রুপ মরিয়া হয়ে চেষ্টা চালাচ্ছে বলে জানা গেছে। এমনকি তাদের এই প্রচেষ্টার কারণে ত্রিপুরা রাজ্যে চাকমাদের মধ্যে এখন বিভেদ ও মতবিরোধ দেখা দিয়েছে।
বিশ্বস্ত সূত্র মতে, খুনীদের বেশ কয়েকজন এখন ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের বিভিন্ন জায়গায় অবস্থান করছে। এ বিষয়ে জানতে পেরে চাকমা মুরুব্বীরা গত ১৭ জুন করল্যাছড়ি নামক গ্রামে ফরাকাজি চাকমার বাড়িতে একটি সভা আহ্বান করেন।
উক্ত সভায় ২৫ জনের মতো মুরুব্বী উপস্থিত ছিলেন। সেখানে খুনীদের মধ্যে দিলীপ, তুঙলো, বিপ্লব ও সমাজপ্রিয়কে ডাকা হয় এবং তাদের দলীয় পরিচয় সম্পর্কে জানতে চাওয়া হয়।
এরপর গত ২১ জুন মুরুব্বীরা খুনীদের অবস্থান করা বিষয়ে আবারও সভা আহ্বান করেন। এতে রেজ্যো কার্বারীর প্রতিনিধি সুবাস চাকমা, ষোলকানী কার্বারী জয়মনি চাকমা ও চাগালা কার্বারী জ্যোতির্ময় চাকমাসহ অনেকে উপস্থিত ছিলেন।
(দুই বা তিনটি পঞ্চায়েতের প্রতিনিধি হলেন চাগালা কার্বারী, পুরো সাবডিভিশনের প্রতিনিধি হলেন ষোলকানী কার্বারী আর সবার উপরে হলেন রেজ্য কার্বারী।)
উক্ত সভায় সমাজ প্রিয় চাকমা, বিপ্লব চাকমা ও সুপন চাকমা ওরফে তুঙলো আর কোন দলের পক্ষে কাজ করবে না বলে লিখিত অঙ্গীকার দিলে তাদেরকে এলাকায় থাকতে দেয়ার সিদ্ধান্ত হয়। তবে উক্ত অঙ্গীকার লঙ্ঘন করলে তাদেরকেও এলাকায় থাকতে দেয়া হবে না বলে মুরুব্বীরা স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেন।
অন্যদিকে জেএসএস সদস্য দীলিপ চাকমা লিখিত অঙ্গীকার দিতে অস্বীকার করলে তাকে ২২ জুনের মধ্যে এলাকা ছাড়ার নির্দেশ দেয়া হয়। এছাড়া তাকে এলাকায় জেএসএসের নির্মাণ করা কোয়ার্টার ভেঙে নিয়ে যাওয়ার ও কমলহা ক্যাম্প গুটিয়ে নেয়ারও নির্দেশ দেয়া হয়।
মুরুব্বীদের এই সিদ্ধান্তের পর জেএসএস সন্তু গ্রুপের কপালে বাজ পড়ে যায়। তারা তাদের দলের খুনী সদস্যদের রক্ষা করতে মরিয়া হয়ে ওঠে এবং বেশ কিছু চতুর সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে।
সিদ্ধান্তের মধ্যে রয়েছে বুদ্ধি করে এলাকায় গ্রামের লোকজনদের মধ্যে বিভাজন সৃষ্টি করে দেয়া যাতে জেএসএসের বিষয়ে তারা মনোযোগ দিতে না পারেন, সম্ভব হলে খুনীদেরকে জেএসএসের সদস্য বলে অস্বীকার করা এবং খুনীদের কয়েকজনকে আপাতত আগরতলায় বা অন্যত্র সরিয়ে রাখা।
এই সিদ্ধান্তের অংশ হিসেবে গত ২৪ ও ২৫ জুন খীসা বাবু, উদয়ন ত্রিপুরা, তুজিম চাকমা, সমেশ বাবু ও মিশুক ত্রিপুরা গণ্ডাছড়ার মগপাড়া নামক গ্রামে বিভিন্ন স্তরের কার্বারীদের সাথে দফায় দফায় মিটিং করেন এবং খুনীদেরকে এলাকায় থাকার অনুমিত দিতে অনুরোধ জানান।
এ মিটিঙে কার্বারীদের মধ্যে বক্তব্য রাখেন গণ্ডাছড়ার কার্বারী সুবাস চাকমাসহ আরও কয়েকজন। সন্তু লারমার পক্ষ হয়ে কথা বলেন খীসা বাবু, উদয়ন ত্রিপুরা এবং তুজিম চাকমা। মিটিঙে প্রচুর খানাপিনারও আয়োজন করা হয়।
উক্ত মিটিঙের পর গত ২৬ জুন তৈচাকমা টাউন হলে স্থানীয় কার্বারীরা গ্রামবাসীদের সাথে এক সভায় মিলিত হন। সভায় খুনীদেরকে গ্রামে থাকার অনুমতি দেয়া নিয়ে তাদের মধ্যে মতভিন্নতা ও বিরোধ দেখা দেয়।
জানা গেছে এই মতবিরোধের কথা শুনে খীসা বাবুসহ জেএসএস নেতারা উল্লাস প্রকাশ করেন এবং “কাজ হয়েছে” বলে ফোনে সন্তু লারমার কাছে রিপোর্ট দেন।
এদিকে জেএসএস সন্তু গ্রুপের গোয়েন্দা বিভাগে দায়িত্বরত তুজিম চাকমাকে বাঁচানোর জন্য জেএসএসের প্রবীণ সদস্য মানস বাবু স্থানীয় কার্বারী ও লোকজনকে জানান যে, তুজিম চাকমা তাদের দলের সদস্য নন।
অথচ তথ্যমতে তুজিম চাকমা হলেন সন্তু লারমার নিকট আত্বীয় এবং সাবেক সামরিক সদস্য। কিছুদিন আগে সন্তু লারমা তাকে মিজোরাম জোনের দায়িত্ব দিয়েছেন বলে জানা গেছে।
খুনীদের রক্ষার জন্য জেএসএসের আরও একটি সিদ্ধান্ত হলো সমাজপ্রিয়, তুঙলো, বিপ্লব ও দিলীপকে কিছু সময়ের জন্য আগরতলায় নিরাপদ স্থানে সরিয়ে রাখার ব্যবস্থা করা। উল্লেখ্য, আগরতলার নন্দন নগরে জেএসএস সন্তু গ্রুপের সাধারণ সম্পাদক প্রণতি বিকাশ চাকমা ওরফে ভিকটর বাবুসহ আরও বেশ কয়েকজন নেতার জমি ও বাড়ি রয়েছে।
এদিকে তৈচাকমা গ্রামের প্রতিবাদী যুবকদের ”শিক্ষা দিতে” খীসা বাবু, উদয়ন ত্রিপুরা, বুলবুল (ভিকটর বাবুর ছেলে) ও সমাজপ্রিয় ২৫ জুন ভারতীয় প্রশাসনের বিভিন্ন এজেন্সির সাথে আগরতলায় গোপন বৈঠক করেছেন বলে বিশ্বস্ত সূত্রে জানা গেছে।
উল্লেখ্য, তৈচাকমা গ্রামের যুবকরা জেএসএসের স্বজাতি বিরোধী ভূমিকা সম্পর্কে অত্যন্ত সচেতন এবং সেজন্য তারা জেএসএসকে মোটেই পছন্দ করেন না।
তারা মনে করেন জেএসএস তার পূর্বের আদর্শ ও লক্ষ্য থেকে পুরোপুরি বিচ্যুত হয়েছে এবং বর্তমানে নিজের জ্ঞাতী ভাইয়ের বুকে গুলি চালিয়ে জাতি ও জনগণের বিরাট ক্ষতি করছে।
অন্যদিকে অনেক মুরুব্বীর মতে খুনীদের এলাকায় আশ্রয় দেয়া হলে তা জনগণের জন্য অমঙ্গল বয়ে আনবে এবং পার্বত্য চট্টগ্রামের ভ্রাতৃঘাতী সংঘাতের আগুন একদিন তাদের এলাকায়ও পৌঁছে যাবে। সে কারণে তারা কোনমতে তাদেরকে এলাকায় থাকতে দিতে রাজী নয়।
তাছাড়া তারা মনে করেন জেএসএস সদস্যরা ভারতে থাকার সুযোগ না পেলে চাপে পড়ে ইউপিডিএফের সাথে ভ্রাতৃঘাতী সংঘাত বন্ধ করতে বাধ্য হবে। তখন পার্বত্য চট্টগ্রামে আর ভাইয়ে ভাইয়ে মারামারি করে প্রাণহানির ঘটনা ঘটবে না এবং শান্তি ফিরে আসবে।
এখন প্রশ্ন জেএসএস কূটকৌশল করে ত্রিপুরা রাজ্যের চাকমাদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করে দিয়ে কতদিন টিকে থাকতে পারবে? তবে জেএসএস যাই করুক, সেখানকার চাকমারা জেএসএস সন্তু গ্রুপের এই বিভেদ নীতি কোনদিন মেনে নেবেন না বলে অভিজ্ঞ মহলের অভিমত।
সিএইচটি নিউজে প্রকাশিত প্রচারিত কোন সংবাদ, তথ্য, ছবি ,ভিডিও, কনটেন্ট ব্যবহার করতে হলে কপিরাইট আইন অনুসরণ করে ব্যবহার করুন।