বাঘাইছড়িতে বিভিন্ন স্থানে ইউপিডিএফের ২৭তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী পালন

বাঘাইছড়ি প্রতিনিধি, সিএইচটি নিউজ
শুক্রবার, ২৬ ডিসেম্বর ২০২৫
রাঙামাটির বাঘাইছড়ি উপজেলার বিভিন্ন স্থানে ২৭তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী পালন করা হয়েছে।
আজ শুক্রবার (২৬ ডিসেম্বর ২০২৫) সকাল ৭টায় সাজেকের মাজলং এলাকায় ইউপিডিএফ সদস্য রিপন চাকমার সঞ্চালনায় ‘আমরা করবো জয়’ গানটি বাজিয়ে দলীয় পতাকা উত্তোলন করেন ইউপিডিএফ কেন্দ্রীয় সদস্য সচিব চাকমা। পরে দলীয় পতাকায় সম্মান জানিয়ে স্যালুট প্রদান করা হয়।
পতাকা উত্তোলন শেষে অস্থায়ী স্মৃতিস্তম্ভে শ্রদ্ধা নিবেদন করা হয়। এতে ইউপিডিএফের পক্ষ থেকে সচিব চাকমা ও উত্তম চাকমা, শহীদ পরিবারের পক্ষ থেকে মহেশ চন্দ্র চাকমা, তিন গণসংগঠন (পিসিপি, ডিওয়াইএফ, এইচডব্লিউএফ)-এর প্রতিনিধিবৃন্দ ও এলাকাবাসীর পক্ষ থেকে শহীদ স্মৃতিস্তম্ভেব পুষ্পস্তবক অর্পণ করে শ্রদ্ধা জানানো হয়। এছাড়াও উপস্থিত গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ, শিশু-কিশোররা সবাই শহীদদের সম্মান জানিয়ে স্মৃতিস্তম্ভে ফুল অর্পণ করেন। পরে শহীদদের স্মরণে দাঁড়িয়ে ১ মিনিট নিরবতা পালন করা হয়।
শ্রদ্ধা নিবেদনের পর ইউপিডিএফের কেন্দ্রীয় কমিটির প্রদত্ত বার্তা পড়ে শোনান সচিব চাকমা ও লড়াই সংগ্রামে অবিচল থাকার শপথ বাক্য পাঠ করান উত্তম চাকমা।




এরপর সকাল ১০টায় প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে খানাপিনার আয়োজন করা হয়।
অনুষ্ঠানের দ্বিতীয় পর্বে অনুষ্ঠিত হয় আলোচনা সভা। এতে সভাপতিত্ব করেন ইউপিডিএফ সংগঠক উত্তম চাকমা। ইউপিডিএফ সদস্য নিউটন চাকমার সঞ্চালন এতে স্বাগত বক্তব্য রাখেন রিপন চাকমা। এছাড়া অন্যান্যের মধ্যে আরো বক্তব্য রাখেন ইউপিডিএফের কেন্দ্রীয় সদস্য সচিব চাকমা, সাজেক ইউনিটের সংগঠক উত্তম চাকমা, গণতান্ত্রিক যুব ফোরামের সাজেক অঞ্চল কমিটির সভাপতি অজন চাকমা, হিল উইমেন্স ফেডারেশন বাঘাইছড়ি উপজেলা কমিটির সভাপতি সুখী চাকমা, পাহাড়ি ছাত্র পরিষদের রাঙামাটি জেলা কমিটির সাধারণ সম্পাদক দিপায়ন চাকমা, ছাত্র জনতার সংগ্রাম পরিষদ সহ-সভাপতি বাবুধন চাকমা, কার্বারী এসোসিয়েশন ও পরিবেশ রক্ষা কমিটির সভাপতি নতুন জয় চাকমা, সাজেক গনঅধিকার রক্ষা কমিটি সভাপতি মেহেন্দ্র ত্রিপুরা, সাজেক নারী সমাজের সাবেক সভাপতি নিরুপা চাকমা, সাজেক জুম চাষী কল্যাণ সমিতি সভাপতি জ্যোতি লাল চাকমা, ৩৬ নং বঙ্গলতুলি ইউপি চেয়ারম্যান জ্ঞান জ্যোতি চাকমা।

রিপন চাকমা বলেন, জনগনের মুক্তির দিশারী ইউপিডিএফ আজ থেকে ২৭ বছর আগে এই দিনে গঠন হয়েছে। গঠনলগ্ন থেকে অদ্যাবধি পার্টি জনগণের সহযোগিতায় অন্যায় দমনপীড়নসহ সেনা শাসকের দালাল প্রতিক্রিয়াশীলদের বিরুদ্ধে মতাদর্শিক লড়াইয়ে অবিচল রয়েছে। তিনি জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে যারা শহীদ হয়েছেন, কারাগারে অন্তরীণ রয়েছেন তাদের শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করেন।
অজন চাকমা বলেন, আজকের দিনটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি দিন। শহীদদের স্মরণ ও লড়াইয়ের প্রতিজ্ঞা করা হয় ১ম পর্ব অনুষ্ঠানে। তিনি বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামে শোষণ নির্যাতনের বাঁধে আমরা আবদ্ধ। শাসকগোষ্ঠী পাহাড়িদের নিজস্ব গতিতে চলতে দিচ্ছে না। তাই প্রতিবাদ প্রতিরোধের বিদ্যুৎ জ্বেলে মুক্তির আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়ন করতে হবে।
সুখী চাকমা বলেন, ইউপিডিএফ ২৭ বছর অতিক্রম করে ২৮ বছরের পদার্পণ করছে। জুম্ম জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠা লড়াইয়ে আজ পর্যন্ত ইউপিডিএফের প্রায় চার শত ভাই জীবন উৎস্বর্গ করে গেছেন।
দিপায়ন চাকমা বলেন, দেশের যতগুলো গণতান্ত্রিক ক্রিয়াশীল সংগঠন রয়েছে তার মধ্যে ইউপিডিএফকে শাসকগোষ্ঠী ভয় পায়। ৯৭ সালের ১০ মার্চ তিন সংগঠন (পিসিপি, পিজিপি, এইচডব্লিএফ) এর নেতা কর্মীরা পূর্ণস্বায়ত্তশাসনের ডাক দেন। পরে ২৫-২৭ মার্চ তিন দিন ব্যাপি বিশেষ সম্মেলনে ৭ দফা গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক কর্মসূচি গৃহীত হয়। জেএসএস’র আন্দোলন ও চুক্তি জুম্ম জনগণের জাতীয় মুক্তির আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন না ঘটায় জাতির প্রয়োজনে নতুন যুগের পার্টি ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (ইউপিডিএফ) গঠন হয়েছিল। ইউপিডিএফ শুধুমাত্র পার্বত্য চট্টগ্রামে পাহাড়িদের অধিকার নিয়ে কথা বলে না, সমগ্র বাংলাদেশের সংখ্যালঘু জাতি সমূহের অধিকার নিয়ে কথা বলে।
তিনি বলেন, আগামী ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন সমাগত। এই নির্বাচনের মাধ্যমে পার্বত্য চট্টগ্রামে জুম্মদের ঐক্য প্রক্রিয়া গঠন করার সময় এসেছে।
তিনি উপস্থিত জনগণের কাছে নিজেদের সন্তানদের ইউপিডিএফের নেতৃত্বে চলমান লড়াইয়ে অংশগ্রহণে উৎসাহিত করার আহ্বান জানান।
বাবুধন চাকমা বলেন, শূন্য থেকে গঠন হওয়া ইউপিডিএফের সাথে জনগণ রয়েছে, ভবিষ্যতেও থাকবে। দেশের সংবিধান নিয়ে দেশের ৬১টি জেলা পরিচালনা হলেও পার্বত্য চট্টগ্রাম পরিচালিত হয় আরেক শাসনে। পার্বত্য চট্টগ্রামে যদি সংবিধান সম্মত শাসন থাকতে তাহলে নিশ্চয় বাড়িঘর, স্কুল-কলেজ নির্মাণে বাধা দেওয়া হতো না। কাজেই আমাদের আন্দোলন সংগ্রাম ছাড়া বিকল্প নেই। গত ১৪ ডিসেম্বর এগজ্যাছড়িতে স্কুল ঘর ভেঙে দেয়ার প্রতিবাদে জনগণ আন্দোলন করার কারণে সেনাবাহিনী জব্দকৃত স্কুলের নির্মাণ সামগ্রী ফেরত দিতে বাধ্য হয়েছে।
নতুন জয় চাকমা বলেন, নতুন প্রজন্মকে আন্দোলন সংগ্রামে সামিল হওয়ার আহ্বানকে সমর্থন জানাই। তিন ইউপিডিএফের সাথে যুক্ত হয়ে অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলন বেগবান করার জন্য উপস্থিত সকলের প্রতি আহ্বান জানান।

মেহেন্দ্র ত্রিপুরা বলেন, ‘লো যোক,পরাণ যোক, ‘পূর্ণস্বায়ত্তশাসন’ ন অলে ন ‘ খিমিবং! ইউপিডিএফের নেতৃত্বে জনগণের আন্দোলন দীর্ঘজীবী হোক।
নিরুপা চাকমা বলেন, অতীত হতে আজ পর্যন্ত শাসকগোষ্ঠীর সকল ষড়যন্ত্র রুখে দিতে ইউপিডিএফ নেতৃত্বে সাজেক নারী সমাজ ঐক্যবদ্ধ হয়ে মোকাবেলা করেছে, ভবিষ্যতেও করবে। পার্টির নেতৃত্বে সাজেকের মাটিতে আন্দোলনের গণ জোয়ার সৃষ্টি হয়েছে। দীর্ঘ ২৭ বছরে ইউপিডিএফ’র অনেক নেতা কর্মী জীবন উৎস্বর্গ করেছে। তাদের রক্ত বৃথা যেতে পারে না। ইউপিডিএফ জনগণের পার্টি, জনগণের সুখে দুঃখে, শিক্ষা, ভূমি রক্ষার জন্য সবসময় সামনের সারিতে রয়েছে, ভবিষ্যতেও থাকবে।
জোতিলাল চাকমা বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামে জুম্ম জনগণের একমাত্র মুক্তির কান্ডারী ইউপিডিএফ। ‘৭৫/’৭৬ সাল থেকে জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য সক্রিয় সহযোগিতা করে আসছি। ‘৮৩ সালে লাম্বা-বাদি দ্বন্দ্ব সৃষ্টি হলে নিরপেক্ষ অবস্থানে চলে আসি। ১৯৯৮ সালে আজকের এই দিনে ইউপিডিএফ গঠন হয়, জাতিকে বিভক্ত করার জন্য এ পার্টি গঠন হয়নি। জাতির প্রকৃত মুক্তির আকাঙ্খা অসম্পূর্ণ রয়েছে বলে ঐতিহাসিক প্রয়োজনে ইউপিডিএফ গঠিত হয়েছে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
জ্ঞানজোতি চাকমা বলেন, প্রতিষ্ঠা বার্ষিকীর সমবেত বুদ্ধিজীবী মহলকে জাতির বৃহত্তর স্বার্থে ইউপিডিএফের জাতির অস্তিত্ব রক্ষার সংগ্রামে এগিয়ে আসার আহ্বান জানাচ্ছি। স্ব স্ব সংগঠন, সমাজ, পরিবার জাতির বৃহত্তর স্বার্থে ইউপিডিএফের নির্দেশিত পথে চলতে হবে। আগামী প্রজন্মকে জাতির নেতৃত্বে তুলে আনতে হলে সমাজের বুদ্ধিজীবী মহলকে ভূমিকা রাখতে হবে।
ইউপিডিএফ নেতা সচিব চাকমা পার্টির কেন্দ্রীয় বার্তা পাঠ করে বলেন, শাসকগোষ্ঠীর প্রতারণা, বেঈমানি ও জনসংহতি সমিতির রাজনৈতিক অপরিণামদর্শীতার কারণে ক্ষতি যা হবার হয়েছে। আগামীতে আর তা হতে দেয়া যাবে না। এখন উঠে দাড়াঁনোর পালা। মৃত চুক্তি নিয়ে না হুতাশ করে পড়ে থেকে আর কোন লাভ নেই।
সভাপতির বক্তব্যে উত্তম চাকমা বলেন, জনগণের আকাঙ্ক্ষাকে ধারণ-লালন করে আজ ইউপিডিএফের ২৭তম বার্ষিকী উদযাপন করছি। এতদূর অতিক্রম করতে দলের অনেক ত্যাগী নেতা কর্মী নিজের জীবনকে আত্মবলিদান করে শহীদ হয়েছেন। এ ত্যাগ, আত্মবলিদানের উপর দাঁড়িয়ে আমরা আজ বর্ষপূর্তি পালন করছি। পার্বত্য চট্টগ্রামের জুম্ম জনগণের অধিকার আকাঙ্ক্ষাকে প্রতিফলন ঘটাতে সর্বস্তরের জনতাকে ইউপিডিএফ পতাকাতলে সামিল হয়ে একই মতাদর্শে আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে।
অন্যদিকে, বঙ্গলতুলি, বাঘাইহাট, গঙ্গারাম এলাকায় ছাত্র/ছাত্রী, যুবক যুবতি ও শিশু কিশোরসহ বয়োবৃদ্ধদের নিয়ে মতবিনময় সভা আয়োজন করা হয়। এতে উপস্থিত লোকজনকে পিঠা, পাজন ও চা দিয়ে আপ্যায়ন করা হয়।
সিএইচটি নিউজে প্রকাশিত প্রচারিত কোন সংবাদ, তথ্য, ছবি ,ভিডিও, কনটেন্ট ব্যবহার করতে হলে কপিরাইট আইন অনুসরণ করে ব্যবহার করুন।
