আগ্রাসনের শিকার শিশুদের আন্তর্জাতিক দিবস উপলক্ষে
বান্দরবানে ৫ম শ্রেণীর শিশু ভানথাংপুই বমকে হত্যার প্রতিবাদে মানিকছড়িতে বিক্ষোভ

মানিকছড়ি প্রতিনিধি, সিএইচটি নিউজ
মঙ্গলবার, ৪ জুন ২০২৪
আগ্ৰাসনের শিকার শিশুদের আন্তর্জাতিক দিবস ২০২৪ উপলক্ষে বান্দরবানে ৫ম শ্রেণীর শিশু ভানথাংপুই বম (১৩)-কে হত্যার প্রতিবাদে খাগড়াছড়ির মানিকছড়িতে কালো ব্যাজ ধারণ, বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ স্কুল-কলেজ শিক্ষার্থী ও অভিভাবকবৃন্দ।
আজ ৪ জুন ২০২৪, মঙ্গলবার সকাল ১১টার সময় কয়েক শ স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থী মানিকছড়ি গিরিমৈত্রী ডিগ্রি কলেজ থেকে একটি বিক্ষোভ মিছিল বের করেন। মিছিল নিয়ে তারা মানিকছড়ি সদরের আমতলা উপজেলা পরিষদ এলাকা ঘুরে এসে আবার কলেজের সামনে এসে সমাবেশে মিলিত হয়।
মিছিলে তারা ‘পাহাড় থেকে সেনাশাসন তুলে নাও-নিতে হবে, বাংলাদেশ মিলিটারি গো ব্যাক-গো ব্যাক” সহ বিভিন্ন শ্লোগান দেন। ব্যানারে ছিল বান্দরবানের সেনাবাহিনীর গুলিতে নিহত ৫ম শ্রেণীর শিশু ‘ভানথাংপুই বম-এর ছবি।

সমাবেশে মানিকছড়ি গিরি মৈত্রী ডিগ্ৰি কলেজের একাদশ শ্রেণীর শিক্ষার্থী আনু মারমার সঞ্চালনায় বক্তব্য রাখেন হাটহাজারী সরকারি কলেজের বিবিএস ১ম বর্ষের শিক্ষার্থী অংহ্লাচিং মারমা, খাগড়াছড়ি সরকারি কলেজের এইচএসসি ২য় বর্ষের শিক্ষার্থী অংসালা মারম।
সমাবেশে শিল্পী সায়ানের লেখা ‘তোমাকে বলছি পাহাড়ের বীর সেনা’ কবিতাটি আবৃত্তি করে শোনান মানিকছড়ি ইংলিশ স্কুলের দশম শ্রেণীর শিক্ষার্থী অংমাপ্রু মারমা।
সমাবেশে অংহ্লাচিং মারমা বলেন, ভানথাংপুই বম একজন সাধারণ শিশু শিক্ষার্থী। তাকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে। তিনি বলেন, ভানথামংপুই একজন নাবালক। তিনি কখনো কেএনএফের সাথে যুক্ত হতে পারেন না । যদি কেএনএফ করেও থাকে তাহলেও একজন সচেতন ছাত্র হিসেবে তাদের জাতির উপর যে নির্যাতন চালানো হচ্ছে তার প্রতিবাদ করা কী অপরাধ ছিলো?
তিনি আরো বলেন, সংবিধানে ৩৮ নাম্বার ধারায় বলা হয়েছে দেশের সকল নাগরিকের সংগঠন, রাজনীতি করার অধিকার রয়েছে। তাহলে ১৩ বছর বয়সী ভানথাংপুই বমকে কেন হত্যার শিকার হতে হলো। তাকে হত্যা করে আবারও প্রমাণ হয়েছে দেশের কোন আইন নেই। এই রাষ্ট্র বান্দরবানে যৌথ বাহিনীর অভিযানের নামে বম জাতির ওপর অবর্ণনীয় নিপীড়ন চালাচ্ছে। সাধারণ মানুষকে হত্যা, গুম, গ্রেফতার করছে। শিশু, ছাত্র এমনকি গর্ভবতী মহিলা পর্যন্ত রক্ষা পাচ্ছে না।

সমাবেশ থেকে তিনি দাবি জানান, অবিলম্বে পাহাড় থেকে সেনা শাসন প্রত্যাহার করতে হবে। ছাত্রদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে এবং বান্দরবানে বম জাতিস্বত্তাদের উপর নির্যাতন নিপীড়ন বন্ধ বন্ধসহ যারা ভানথাংপুই বমকে গুলি করে হত্যা করেছে তাদেরকে অবিলম্বে আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে।
অংসালা মারমা বলেন, বান্দরবানে কেএনএফ দমনের নামে বম জাতিতত্তার জনগণের উপর অমানবিক নির্যাতন করা হচ্ছে। ভানথাংপুই বমের মতো ছোট্ট একজন শিশুকেও গুলি করে হত্যা করা হয়েছে। তার কী অপরাধ ছিল? একটি রাষ্ট্র তার দেশের সংখ্যালঘু বম জাতিসত্তার উপর যে দমন-পীড়ন চালাচ্ছে তা দেখে আমাদেরকে অবাক হতে হয়।
তিনি বলেন, আমরা এমন একটি রাষ্ট্রে বসবাস করছি যে রাষ্ট্র আমাদেরকে অধিকারহীন করে রেখে নিপীড়ন চালিয়ে যাচ্ছে। বান্দরবানে বম জাতিসত্তার গর্ভবর্তী নারীসহ শিশু-কিশোরদের গ্রেফতার-হত্যা করা হচ্ছে। বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অধ্যয়নরত বম শিক্ষার্থীরা তাদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যেতে পারছে না। বম জাতির হয়ে জন্মগ্রহণ করা কী তাদের অপরাধ?
তিনি বলেন, আমাদের পাহাড়িদের উপর দমন-পীড়ন চালানোর জন্যই মূলত বান্দরবানে ব্যাংক ডাকাতির মতো নানা কাহিনী তৈরি করা হয়ে থাকে।

অংসালা মারমা আরো বলেন, ভানথাংপুই বমকে হত্যা শুধু বম জাতির ওপর আঘাত নয়, এটা সমগ্র পারত্য চট্টগ্রামের পাহাড়িদের উপর আঘাত। আজকে বম জাতির ওপরে যে নিপীড়ন, যেভাবে তারা ঘরবাড়ি ছেড়ে জঙ্গলে পালিয়ে থেকে মানবেতর জীবন-যাপন করতে বাধ্য হচ্ছে তার দায় ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সরকারকে নিতে হবে।
তিনি পার্বত্য চট্টগ্রামে ফিলিস্তিনের মতো পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে বলে মন্তব্য করে সকল শিক্ষার্থীদের প্রতি অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে সামিল হওয়ার আহ্বান জানান এবং অধিকার প্রতিষ্ঠার এই আন্দোলন চলবে বলে দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।
তিনি পার্বত্য চট্টগ্রামসহ দেশের সকল শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং ভানথাংপু্ই বমের হত্যাকারীদের বিচারের আওতায় আনার দাবিসহ যৌথ বাহিনীর অভিযানে গ্রেফতারকৃত বম জাতিসত্তার নারী-শিশুসহ নিরীহ লোকজনকে অবিলম্বে মুক্তি দেয়ার দাবি জানান।
উল্লেখ্য, বিশ্বজুড়ে যুদ্ধ-বিগ্রহসহ বিভিন্ন ধরনের আগ্রাসন এবং তা থেকে শিশুদের উপর সংঘটিত জঘন্যমত অপরাধ ও মৃত্যুর ঘটনাকে স্মরণ ও প্রতিরোধ করতেই জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ ১৯৮২ সালে আগ্রাসনের শিকার শিশুদের আন্তর্জাতিক দিবস পালনের ঘোষণা দেয়। ১৯৮৩ সাল থেকে এই দিবসটি বিশ্বজুড়ে পালিত হয়ে আসছে।
সিএইচটি নিউজে প্রকাশিত প্রচারিত কোন সংবাদ, তথ্য, ছবি ,ভিডিও, কনটেন্ট ব্যবহার করতে হলে কপিরাইট আইন অনুসরণ করে ব্যবহার করুন।