১০ বছর পূর্বে খাগড়াছড়িতে ‘ফিলিস্তিন সংহতি দিবসের’ সমাবেশে সেনাবাহিনী ও পুলিশ যেভাবে হামলা করেছিল

বিশেষ প্রতিবেদন, সিএইচটি নিউজ
শনিবার, ২৯ নভেম্বর ২০২৫
২৯ নভেম্বর দিনটি বিশ্বের বিভিন্ন দেশে জাতিসংঘের ঘোষণা মোতাবেক ‘আন্তর্জাতিক ফিলিস্তিন সংহতি দিবস’ হিসেবে পালন করা হয়। ১৯৭৭ সালে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ ফিলিস্তিনি জনগণের সাথে সংহতি প্রদর্শনস্বরূপ ২৯ নভেম্বরকে “আন্তর্জাতিক ফিলিস্তিন সংহতি দিবস” হিসেবে গ্রহণ করে। এর দশ বছর পরে ১৯৮৭ সালের ২৯ নভেম্বর ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে ‘ইউনাইটেড নেশনস পার্টিশন প্ল্যান ফর প্যালেস্টাইন’ প্রস্তাব অনুমোদিত হয়। এরপর থেকে এ দিনটি “আন্তর্জাতিক ফিলিস্তিন সংহতি দিবস” হিসেবে পালিত হয়ে আসছে।
বাংলাদেশ এ দিনটি পালন করলেও পার্বত্য চট্টগ্রামের বেলায় তার অবস্থান ভিন্ন। সেখানে নিপীড়িত ফিলিস্তিনি জনগণের পক্ষে আন্তর্জাতিক সংহতি দিবস পালন করতে গেলেও সেনাবাহিনীর বাধা ও হামলার শিকার হতে হয়। তেমনই একটি ঘটনা ঘটেছিল ২০১৫ সালের ২৯ নভেম্বর খাগড়াছড়িতে।
জাতিসংঘ ঘোষিত ফিলিস্তিন সংহতি দিবসের সাথে সংহতি প্রকাশের লক্ষ্যে সেদিন (২৯ নভেম্বর ২০১৫) পার্বত্য চট্টগ্রামের নিপীড়িত জনগণের পক্ষে অধিকারকামী ৮ গণসংগঠন (গণতান্ত্রিক যুব ফোরাম, পাহাড়ি ছাত্র পরিষদ, হিল উইমেন্স ফেডারেশন, পার্বত্য চট্টগ্রাম নারী সংঘ, সাজেক নারী সমাজ, সাজেক ভূমি রক্ষা কমিটি, ঘিলাছড়ি নারী নির্যাতন প্রতিরোধ কমিটি ও প্রতিরোধ সাংস্কৃতিক স্কোয়াড)-এর কনভেনিং কমিটি খাগড়াছড়ি সদরের তিনটি স্থানে ছাত্র-যুব-নারী সংহতি সমাবেশের আয়োজন করলে তাতে সেনাবাহিনী ও পুলিশ বাধা প্রদান করে এবং হামলা চালিয়ে সমাবেশ ভণ্ডুল করে দেয়।
সেদিন সকাল ১০.৩০টায় খাগড়াছড়ি সদরের মধুপুরে আয়োজিত শান্তিপূর্ণ সমাবেশে সেনা-পুলিশ অতর্কিতে হামলা চালায়। এতে ৩ নারীসহ কমপক্ষে ৮ জন গুরুতর আহত হন। সেনা-পুলিশের বেধড়ক লাঠিপেটা ও বেয়নেটের আঘাতে দীপু ত্রিপুরা ও বিপ্লব চাকমা মাথা ফেটে গুরুতর আহত হন। হামলায় সমাবেশে অংশগ্রহণকারীগণ ছত্রভঙ্গ হয়ে যায় এবং সমাবেশও ভণ্ডুল হয়।

মধুপুর ঘটনার ঘণ্টাখানেক পর সকাল ১১.৩০টায় চেঙ্গীস্কোয়ারে আহুত সমাবেশের উদ্দেশ্যে ৮ গণসংগঠনের নেতা-কর্মী ও সমর্থকরা স্বনির্ভর থেকে মিছিল সহকারে রওনা দিলে উপজেলা পরিষদ এলাকায় আবারো সেনা-পুলিশ হামলা চালায়। এতে সেনা-পুলিশ সদস্যরা রাস্তা থেকে হিল উইমেন্স ফেডারেশনের কেন্দ্রীয় সভাপতি নিরূপা চাকমা ও কেন্দ্রীয় সদস্য দ্বিতীয়া চাকমাকে আটক করে। এছাড়া স্বনির্ভর এলাকা থেকে জেএসসি পরীক্ষার্থী দীবিক্ষ দেওয়ান ও উপজেলা পরিষদ এলাকা থেকে খাগড়াছড়ি সরকারি কলেজের ছাত্র জয়শীষ চাকমা নামে আরো দুই ছাত্রকেও আটক করা হয়। সেনা-পুলিশ সদস্যরা লাঠিপেটা করে সমাবেশে যোগদানকারীদের তাড়িয়ে দেয়। হামলায় ৪ নারীসহ ৬ জন আহত হন।
পরে দুই ছাত্রকে ছেড়ে দেওয়া হলেও হিল উইমেন্স ফেডারেশনের নেত্রী নিরূপা ও দ্বিতীয়া চাকমাকে মিথ্যা মামলা দিয়ে জেল হাজতে প্রেরণ করা হয়।
সে সময় প্রথম আলো, সমকাল সহ বিভিন্ন জাতীয় পত্রিকায় এবং টেলিভিশনে এ ঘটনা নিয়ে খবর প্রকাশিত হয়েছিল।

হামলার প্রতিবাদে খাগড়াছড়ি, রাঙামাটি, ঢাকাসহ বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভ প্রদর্শিত হয় এবং খাগড়াছড়ি জেলায় আধাবেলা সড়ক অবরোধ পালিত হয়েছিল।
কিন্তু হামলার সাথে জড়িত সেনা-পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে আইনগত কোন পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।
ফ্যাসিস্ট শেখ হাাসিনার আমলে সংঘটিত এ হামলার ঘটনায় বাংলাদেশে শাসকগোষ্ঠির দ্বি-চারিতা দিবালোকের মতো স্পষ্ট হয়ে যায়। বাংলাদেশ সরকার তথা শাসকগোষ্ঠি লোকদেখানোর জন্য ফিলিস্তিনের পক্ষে অবস্থান নিলেও চরিত্রগতভাবে তার বিপরীতেই যে তাদের অবস্থান তা ফিলিস্তিন সংহতি দিবসের সমাবেশের মতো কর্মসূচিতে হামলার মধ্যে দিয়ে প্রমাণিত হয়। সে কারণে তারা পার্বত্য চট্টগ্রামে অধিকারকামী পাহাড়ি জনগণকে দমিয়ে রাখতে নিপীড়ন-নির্যাতনের পন্থা বেছে নিয়ে থাকে।
চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানে ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর পার্বত্য চট্টগ্রামের পরিস্থিতি পরিবর্তনের আশা করা হলেও তা হয়নি। নোবেলজয়ী ড. ইউনূসের নেতৃত্বে গঠিত অন্তর্বর্তী সরকারও পূর্বের ফ্যাসিস্টদের পথ অনুসরণ করে সেনাশাসন অব্যাহত রেখে পার্বত্য চট্টগ্রামে সাম্প্রদায়িক হামলা, দমন-পীড়ন চালিয়ে যাচ্ছে। সেনা অভিযানের নামে অন্যায় ধরপাকড়, ঘরবাড়ি তল্লাশি, নিপীড়ন, হয়রানি ইত্যাদি জারি রাখা হয়েছে। ফলে পাহাড়ি জনগণ নিজ বাড়িতেও আর নিরাপদে থাকতে পারছে না।
বলা চলে পার্বত্য চট্টগ্রাম যেন আরো এক ফিলিস্তিন। ইসরায়েল যেভাবে ফিলিস্তিনের ভূখণ্ড দখল ও ফিলিস্তিনি জনগণের ওপর অবিরাম দমন-পীড়ন চালাচ্ছে, একইভাবে বাংলাদেশের শাসকগোষ্ঠিও পার্বত্য চট্টগ্রামে অন্যায় দমন-পীড়ন জারি রেখেছে।
মোট কথা, ফিলিস্তিনি জনগণকে যেভাবে নিজেদের ভুখণ্ড রক্ষার্থে লড়াই সংগ্রাম জারি রাখতে হচ্ছে, একইভাবে পার্বত্য চট্টগ্রামের নিপীড়িত-নির্যাতিত পাহাড়ি জনগণকেও নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষার্থে লড়াই সংগ্রামের কোন বিকল্প নেই।
সিএইচটি নিউজে প্রকাশিত প্রচারিত কোন সংবাদ, তথ্য, ছবি ,ভিডিও, কনটেন্ট ব্যবহার করতে হলে কপিরাইট আইন অনুসরণ করে ব্যবহার করুন।
