লক্ষ্মীছড়ি-মানিকছড়ি এলাকায় ঠ্যাঙাড়ে ও সেটলারদের দিয়ে সেনাবাহিনীর নানা ষড়যন্ত্র

মানিকছড়ি-লক্ষ্মীছড়ি প্রতিনিধি, সিএইচটি নিউজ
সোমবার, ১৫ জানুয়ারি ২০২৪
খাগড়াছড়ির লক্ষ্মীছড়ি ও মানিকছড়ি উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় ঠ্যাঙাড়ে নব্যমুখোশ সন্ত্রাসী ও সেটলার বাঙালিদের দিয়ে সেনাবাহিনী পাহাড়িদের বিরুদ্ধে নানা ষড়যন্ত্র চালিয়ে যাচ্ছে।
এরই অংশ হিসেবে ফটিকছড়ি উপজেলার কিছু দাগি সন্ত্রাসীকেও ঠ্যাঙাড়েদের সাথে ভিড়িয়ে দেয়া হয়েছে।
লক্ষ্মীছড়িতে সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা:
গতকাল রবিবার (১৪ জানুয়ারি ২০২৪) লক্ষ্মীছড়ি উপজেলার বান্যাছোলা এলাকা থেকে বাঘা রফিক নামে এক সেটলার নিখোঁজ হওয়ার গুজব ছড়িয়ে সেটলার বাঙলিরা সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা সৃষ্টির চেষ্টা চালায়।
লক্ষ্মীছড়ি উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক পিসি বেলাল দলবদ্ধভাবে সেটলারদের নিয়ে বাইন্যাছোলা গ্রামে গিয়ে বাঘা রফিককে বের করে না দিলে ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দেওয়ার হুমকি প্রদান করে।
তার সাম্প্রদায়িক উস্কানিমূলক কথাবার্তায় সেখানে পাহাড়িদের মধ্যে আতঙ্ক দেখা দেয়।
তবে আজ সোমবার (১৫ জানুয়ারি) সকালে তাকে মানিকছড়ি উপজেলাধীন ভোলাছোলা এলাকায় সুস্থ অবস্থায় পাওয়া যায় বলে জানা গেছে।
তাকে বর্তমানে লক্ষ্মীছড়ি থানায় পুলিশী হেফাজতে রেখে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে।
প্রাপ্ত তথ্য অনুসারে তাকে ঠ্যাঙাড়ে নব্যমুখোশ সন্ত্রাসীরা ফটিকছড়ির কাঞ্চনগর ইউনিয়নস্থ চাইল্যাচর এলাকায় ডেকে নিয়ে যায়। এ নিয়ে সেনাবাহিনী সেটলার বাঙালিদের দিয়ে একটা নাটক সাজানোর চেষ্টা করে।
তবে পুলিশ তাকে যে ঠ্যাঙাড়ে সন্ত্রাসীরা নিয়ে গেছে সেটা স্পষ্ট করে বলছে না।
তার বিরুদ্ধে অবৈধ গাছ কাটার মামলা হতে পারে বলে থানা সূত্রে খবর পাওয়া গেছে।
সর্বশেষ প্রাপ্ত খবর অনুযায়ী বান্যাছোলা এলাকায় এখনো সেনাবাহিনীর তৎপরতা রয়েছে।
এখানে উল্লেখ্য যে, বাইন্যাছোলা গ্রামের পাশে‘বাইন্যাছোলা আর্মি ক্যাম্প’ রয়েছে। ওই ক্যাম্পে মাঝে মাঝে ঠ্যাঙাড়ে সন্ত্রাসীরা গিয়ে অবস্থান করে বলেও অভিযোগ রয়েছে।
ঠ্যাঙাড়ে সন্ত্রাসীদের সশস্ত্র তৎপরতা:
অপরদিকে লক্ষ্মীছড়ি সদর, মানিকছড়ি সদর এবং ফটিকছড়ি উপজেলা সীমান্তবর্তী এলাকাগুলোতে সেনাবাহিনীর প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় ঠ্যাঙাড়ে নব্যমুখোশ সন্ত্রাসীদের সশস্ত্র তৎপরতা অব্যাহত রয়েছে।
মূল সন্ত্রাসীদের কয়েকজনের নাম হলো জ্যোতিষ দেওয়ান (সাং-দুল্যাতলী, বর্তমানে মানিকছড়ি), সুইথোয়াইঅং মারমা (সাং-ঐ), শ্যামল কান্তি চাকমা (লক্ষ্মীছড়ি সদর) ও রবিন চাকমা।
এছাড়া মো. রমজান আলী (সাং-বটতলী পাড়া, কাঞ্চননগর ইউপি, ফটিকছড়ি), মো. ইয়াসিন (সাং-ঐ), মো. আলী (সাং-ভোলাছোলা, তিনটহরি ইউপি, মানিকছড়ি) ও মো. হারিছ (সাং-ঐ) এই চার জন বাঙালিও মুখোশদের দলে যুক্ত রয়েছে বলে জানা গেছে।
জানা যায়, এসব সন্ত্রাসীদেরকে লক্ষ্মীছড়ি সেনা জোন, লক্ষ্মীছড়ি জোনের অধীন বাইন্যাছোলা আর্মি ক্যাম্প, সিন্দুকছড়ি জোনের অধীন নোয়া বাজার আর্মি ক্যাম্প কমান্ডাররা নিয়ন্ত্রণ ও তত্ত্বাবধান করে থাকে।
২০২২-২৩ সালে লক্ষ্মীছড়ি জোন কমাণ্ডার ছিলেন লে. কর্ণেল রাশেদুল ইসলাম রাশেদ। সে সময় তিনি সন্ত্রাসীদের পরিচালনা করতেন।
বর্তমানে লক্ষ্মীছড়ি জোন কমান্ডার লে. কর্ণেল জুবায়ের ও সিন্দুকছড়ি জোন কমান্ডার লে. কর্ণেল সৈয়দ পারভেজ হোসেন এ দায়িত্ব পালন করছেন।
সন্ত্রাসীদের একটি দল লক্ষ্মীছড়ি উপজেলা সদরের লক্ষ্মীছড়ি সেনা জোনের পাশে এক বিল্ডিংয়ে নিয়মিত আগ্নেয়াস্ত্রসহ অবস্থান করে থাকে।
বিল্ডিংটা স্থানীয়দের কাছে লাল বিল্ডিং নামে পরিচিত।
সন্ত্রাসীরা লক্ষ্মীছড়ি ও মানিকছড়ি বাজারের সাপ্তাহিক হাটের দিন প্রকাশ্যে প্রশাসন ও সেনা-গোয়েন্দাদের নাকের ডগায় পাহাড়ি-বাঙালি ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে চাঁদা আদায় করে থাকে।
বাজারের কোন ব্যবসায়ী তাদেরকে চাঁদা না দিয়ে ব্যবসা করতে পারে না।
লক্ষ্মীছড়ি বাজারে চাঁদা উত্তোলনের দায়িত্বে রয়েছে শ্যামল কান্তি চাকমা, আর মানিকছড়ি বাজারে দায়িত্বে রয়েছে জ্যোতিষ দেওয়ান।
তবে উত্তোলিত চাঁদার একটি অংশ সেনা গোয়েন্দাদের দিতে হয় বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে।
এই ঠ্যাঙাড়ে সন্ত্রাসীরা জনমনে আতঙ্ক ও ভীতি সৃষ্টি করতে মাঝে মধ্যে বিভিন্ন এলাকায় ঢুকে বন্দুক দিয়ে ফাঁকা ব্রাশফায়ার করে থাকে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
এছাড়া তারা প্রতিনিয়ত এলাকার মুরুব্বীদের উপরও নানা হুমকি-ধমকি ও ভয়-ভীতি প্রদর্শন করে যাচ্ছে।
উল্লেখ্য, ২০২১ সাল হতে লক্ষীছড়ি-মানিকছড়ি-ফটিকছড়ি সীমান্তবর্তী এলাকায় সন্ত্রাসীদের তৎপরতা বৃদ্ধি পায়।
পরবর্তীতে তারা সরকারি বনবিভাগের বাগানের গাছ লুটপাট, চাঁদাবাজিসহ নানা সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড চালাতে থাকে।
সে সময় বনবিভাগের ধরুং বিট-এর বাগান কাটার উপর সিএইচটি নিউজে খবর প্রকাশিত হয়।
সন্ত্রাসীদের দফায় দফায় বাগানের গাছ কেটে নেয়ার বিরুদ্ধে প্রতিকার চেয়ে সেসময় ধরুং বন বিটের অফিসার টিটু চাকমা (টিটু বাবু) সেনা প্রশাসনের সহযোগিতা চান, কিন্তু কোন সুফল পাননি।
উপরন্তু সন্ত্রাসীরা তাকে চাইল্যাচর পাড়ায় ডেকে হুমকি প্রদান ও ভয়-ভীতি প্রদর্শন করে। এমনকি তাঁর কাঁধে ভারী অস্ত্র তুলে ব্রাশফায়ার করে।
এতে তিনি ভীষণ ভয় পান এবং অসুস্থ হয়ে পড়েন। ২০২৩ সালের শেষে দিকে মারা যান।
বর্তমানে উক্ত ধুরুংবিটের বাগানটি ধ্বংস হয়ে মরুভূমিতে পরিণত হয়েছে।

উল্লেখিত সন্ত্রাসীরা ২০২৩ সালে মানিকছড়ির কুমারী পাড়া থেকে রাতের অন্ধকারে আরেশি মার্মাকে তার নিজ বাড়ি থেকে অপহরণ করে বন্দুক গুজে দিয়ে সেনাদের হাতে তুলে দিয়েছিল।
পরে তাকে শারিরীক নির্যাতনের পর মানিকছড়ি থানা পুলিশের নিকট সোপর্দ করে জেল হাজতে পাঠানো হয়। অবশ্য কিছুদিন পর তিনি আদালত থেকে জামিনে মুক্তি পান।
২০২৩ সালের শেষের দিকে সন্ত্রাসীরা মানিকছড়ির তিনটহরী ইউনিয়নের কুমারী পাড়ার মো. গোলাম মোল্লা (চৌধুরী) এর মেয়ের বিয়ের অনুষ্ঠানে এসে হামলা চালায়।
এছাড়া সে সময় সন্ত্রাসীরা কুমারী পাড়া মাদ্রাসার পাশে এসে ব্রাশ ফায়ার করলে এতে মাদ্রাসার ছাত্র ও জনমনে ভীতির সঞ্চার হয়।
এভাবে ঠ্যাঙাড়ে নব্যমুখোশ সন্ত্রাসীরা সেনাবাহিনীর ছত্রছায়ায় এলাকায় এক ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছে।
প্রশাসনকে তাদের বিরুদ্ধে কোন পদক্ষেপ নিতে দেখা যায় না। ফলে তারা দিন দিন আরো বেশি বেপরোয়া হয়ে উঠছে।
সিএইচটি নিউজে প্রকাশিত প্রচারিত কোন সংবাদ, তথ্য, ছবি ,ভিডিও, কনটেন্ট ব্যবহার করতে হলে কপিরাইট আইন অনুসরণ করে ব্যবহার করুন।