পাহাড়ে নারী ধর্ষণের ঘটনায় জড়িতদের গ্রেফতার-শাস্তির দাবিতে চট্টগ্রামে তিন সংগঠনের বিক্ষোভ

চট্টগ্রাম প্রতিনিধি, সিএইচটি নিউজ
রবিবার, ২৫ আগস্ট ২০২৪
খাগড়াছড়ির রামগড়ে গৃহবধুকে গণধর্ষণে জড়িত চিহ্নিত সেটলার মো. ইউসুফ-রানা-ফয়সালসহ রাঙামাটি ও বান্দরবানে শিশু-নারী ধর্ষণ চেষ্টাকারী রাইছ মিয়া-ফারুককে অবিলম্বে গ্রেফতার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে চট্টগ্রাম নগরীতে বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ করেছে হিল উইমেন্স ফেডারেশন, গণতান্ত্রিক যুব ফোরাম, বৃহত্তর পার্বত্য চট্টগ্রাম পাহাড়ি ছাত্র পরিষদ (চবি ও মহানগর শাখা)।
আজ রবিবার ( ২৫ আগস্ট ২০২৪) বেলা ৩ টার সময় চট্টগ্রাম চেরাগী পাহাড় মোড়ে এই সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়।
সমাবেশের আগে চেরাগি মোড় থেকে একটি মিছিল বের হয়ে প্রেসক্লাব প্রদক্ষিণ করে আবার চেরাগী পাহাড় মোড়ে এসে সমাবেশে মিলিত হয়।

সমাবেশে সভাপতিত্ব করেন গণতান্ত্রিক যুব ফোরামের চট্টগ্রাম মহানগরের সহসভাপতি শুভ চাক।
হিল উইমেন্স ফেডারেশনে মহানগরের প্রতিনিধি জেসি চাকমার সঞ্চালনায় সমাবেশে আরো বক্তব্য রাখেন হিল উইমেন্স ফেডারেশনের কেন্দ্রীয় সভাপতি নীতি চাকমা, পাহাড়ি ছাত্র পরিষদের চবি শাখার সাংগঠনিক সম্পাদক সুদর্শন চাকমা, বাংলাদেশ নারী মুক্তি আন্দোলনের কেন্দ্রীয় সদস্য ইন্দ্রানী সোমা, পাহাড়ি ছাত্র পরিষদের চট্টগ্রাম মহানগর শাখার সভাপতি সোহেল চাকমা, বাংলাদেশ ছাত্র ফেডারেশনের চট্টগ্রাম মহানগর সভাপতি সাইফুর রুদ্র, বাংলাদেশ ছাত্র কাউন্সিলের সদস্য সৈয়দ ইনজামুল-উল-হুদা প্রমুখ।
সমাবেশে নীতি চাকমা বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামে যে সরকারই ক্ষমতায় আসুক না কেন রাষ্ট্রীয়ভাবে পাহাড়ি জনগণের ওপর জাতিগত নিপীড়ন চালায়। সেখানে সেনাশাসন ‘অপারেশন উত্তরণ’ ও দমনমূলক অগণতান্ত্রিক ‘১১ নির্দেশনা’ রেখে অন্যায় দমন-পীড়ন চালানো হয়। পাহাড়ে প্রতিনিয়ত নারী নির্যাতনসহ নানা জুলুম-নিপীড়ন চালানো হচ্ছে। যার কারণে পার্বত্য অঞ্চলে নারী ও শিশু সহ সাধারণ মানুষ আজ চরম নিরাপত্তাহীতার মধ্যে রয়েছে।

তিনি পাহাড়ি নারী ধর্ষণের ঘটনার সুষ্ঠু বিচার ও অপরাধীদের সাজা দেয়া হয় না অভিযোগ করে বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামে ধর্ষণের মেডিক্যাল রিপোর্ট দেয়ার ক্ষেত্রে সেনাবাহিনীর গোপন নিষেধাজ্ঞা জারি থাকায় এ যাবত যত পাহাড়ি নারী ধর্ষণ-খুনের শিকার হয়েছেন কোন ঘটনারই বিচার হয়নি। কারণ, ধর্ষণের ঘটনা ঘটলেও গোপন নিষেধাজ্ঞার কারণে বরাবরই মেডক্যাল রিপোর্টে নেগেটিভ ফলাফল দেয়া হয়ে থাকে। যার ফলে অপরাধীরা পার পেয়ে যায় এবং পরবর্তীতে তারা সেনা, প্রশাসন ও সরকার দলীয় দুর্বৃত্তদের সহায়তায় পুনরায় একই অপরাধ কর্ম চালিয়ে যায়।
রামগড়ে ধর্ষণ মামলায় রিসিভ কপি দিতে গড়িমসির কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, এদেশের প্রশাসনই ধর্ষক-নিপীড়কদের রক্ষা করে থাকে। যার কারণে ধর্ষক, খুনি, নিপীড়নকারীরা যদি ক্ষমতাবান হয় কিংবা ক্ষমতাবানদের ছত্রছায়ায় থাকে তাহলে তারা রেহাই পেয়ে যায়। রাষ্ট্রের এই বিমাতাসুলভ বিচারব্যবস্থা ও বিচারহীনতার কারণে নারীদের নিরাপত্তা নেই।
সমাবেশ থেকে তিনি রাষ্ট্রীয় এই নিপীড়নমূলক ব্যবস্থা ভেঙে দিয়ে অন্তর্বতীকালীন সরকারের সুষ্ঠু নিরপেক্ষ বিচারব্যবস্থার মাধ্যমে পাহাড়ের সকল ধর্ষণের বিচার দাবি জানান এবং পাহাড়-সমতলে নারীদেরকে আরো বেশি সচেতন হওয়ার ও ঐক্যবদ্ধভাবে রুখে দাঁড়ানোর আহ্বান জানান।

সুদর্শন চাকমা বলেন, গত ৫ আগষ্ট আওয়ামী ফ্যাসিষ্ট সরকারের পতনের পর বাংলাদেশ নতুন করে ‘স্বাধীন’ হলেও পাহাড়ে এখনও ‘স্বাধীন’ হয়নি। যে সময় দেশের কুমিল্লা-ফেনী এবং খাগড়াছড়িতে বন্যায় প্লাবিত, ঠিক সেসময়ে পাহাড়ে ধর্ষণের ঘটনা ঘটায় সেটলাররা। এই যে ধর্ষণের ঘটনাগুলোর ক্ষেত্রে সমতলে তৎক্ষনাৎ আইনের আওতায় আনা হলেও পার্বত্য চট্টগ্রামের ক্ষেত্রে বিচারের ক্ষেত্রে নানা টালবাহানা দেখা যায়।
তিনি পাহাড়ের সমস্যাকে রাজনৈতিক সমস্যা উল্লেখ করে রাজনৈতিকভাবে এ সমস্যা সমাধানের মাধ্যমে সেটলারদের সমতলে সম্মানজনকভাবে পুনর্বাসনের মাধ্যমে নারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবি জানান।
সাইফুর রুদ্র বলেন, পুরো দেশ যখন দুর্যোগের কারণে আশ্রয়ের জন্য হাহাকার, সেখানে পাহাড়ে সেটলার কর্তৃক ৩টি ধর্ষণ-ধর্ষণ চেষ্টার ঘটনা ঘটে, যা আমাদের জন্য খুবই লজ্জাজনক।
ছাত্র জনতার আন্দোলনের মাধ্যমে সকল জাতিগত বৈষম্য কাটিয়ে উঠার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, পাহাড় এবং সমতলে যে কৃত্রিম দেয়াল তৈরি হয়েছে তা উৎখাত করতে হবে।
সৈয়দ ইনজাম-উল-হুদা বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামে সেনা শাসনের আড়ালে এসব ধর্ষণের ঘটনাগুলো হচ্ছে। পাহাড়ে সেনাবাহিনী রক্ষকের নামে ভক্ষকের ভূমিকা পালন করছে। একইভাবে সমতলে সোহাগী জাহান তনুকেও সেনাবাহিনী ধর্ষণের পর হত্যা করে। তিনি পাহাড়-সমতলে ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন করার আহ্বান জানান।
ইন্দ্রানী সোমা বলেন, পাহাড় সমতলে ধর্ষণের ঘটনা নতুন নয়। স্বৈরাচার পতন হলেও স্বৈরাচার ব্যবস্থা রয়ে গেছে। যার ক্ষমতা বেশি তার হাতে ধর্ষণের শিকার হতে হচ্ছে। এইক্ষেত্রে সামাজিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক সকল ক্ষেত্রে ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন চালিয়ে যেতে হবে।
তিনি প্রশাসনের নিরব ভূমিকার কথা তুলে ধরে আরো বলেন, সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে বিচারের ক্ষেত্রে কারা বাধা প্রদান করছে তা খটিয়ে দেখতে হবে।

সমাবেশে সোহেল চাকমা বলেন, দেশের উদ্ভুত পরিস্থিতিতে যখন বন্যা কবলিত মানুষের উদ্ধারের জন্যে ছাত্র জনতা একযোগে কাজ করছে তখন পার্বত্য চট্টগ্রামে একের পর এক ধর্ষণের ঘটনা সংঘটিত হচ্ছে। শাসকগোষ্ঠীর মদত না থাকলে তিন পার্বত্য জেলায় পর পর ধর্ষণ ও ধর্ষণ চেষ্টার ঘটনা হয়তো ঘটতো না।
তিনি সাংবাদিক, মিডিয়া কর্মীদের আহ্বান জানিয়ে বলেন, পার্বত্য জনপদ যখন বন্যায় কবলিত, খাগড়াছড়িতে হাজার হাজার পরিবার উদ্বাস্তু হয়ে দুর্বিষহ অবস্থায় ছিল তখন মিডিয়ায় সেটি তুলে না ধরে সাজেকে আটকা পড়া পর্যটকদের নিয়ে সংবাদ প্রকাশ করা হয়। এক্ষেত্রে মিডিয়া ও সংবাদপত্রেও পাহাড়িরা বৈষম্যের শিকার হচ্ছে। পাহাড়ে দেশের মেইনস্ট্রিম মিডিয়ায় অনেকে ঘুরতে যান, সংবাদ প্রকাশ করেন কিন্তু পাহাড়িদের প্রকৃত দুঃখ-দুর্দশার কথা তারা জনসম্মুখে প্রকাশ করতে পারেন না। সত্যিকার অর্থে পাহাড়ি জনগণের নিপীড়ন-নির্যাতনের কথা তুলে ধরতে না পারলে মিডিয়া কিংবা সংবাদপত্রে পাহাড়ের সংবাদ প্রকাশ করতে বিরত থাকুন। অন্যথায় সততার সাথে প্রকৃত ঘটনাগুলো দেশের জনগণের সম্মুখে তুলে ধরুন।
তিনি আরো বলেন, পাহাড়ে দীর্ঘদিন যাবত বিচারহীনতার যে সংস্কৃতি চলমান রয়েছে তা নিরসনের জন্যে আগামী ২৪ ঘন্টার মধ্যে সংঘটিত ধর্ষণ ও ধর্ষণ চেষ্টার ঘটনায় যারা জড়িত তাদেরকে অবিলম্বে গ্রেফতার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। না হলে পাহাড়ি জনগণ অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের ওপর আস্থা হারাবে। এছাড়া দেশে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার যে আকাঙ্ক্ষা সেটি বাস্তবায়ন করতে হলে সর্বপ্রথমে পাহাড় থেকে সেনাশাসন তুলে নিতে হবে এবং স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে পাহাড়িদের পূর্ণস্বায়ত্তশাসন প্রদান করতে হবে।
সভাপতির বক্তব্যে যুবনেতা শুভ চাক দ্রুত সময়ের মধ্যে রামগড়ে গণধর্ষণকারী ইউসুফ, রানা, ফয়সালসহ জড়িতদের গ্রেফতার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি এবং রাঙামাটি ও বান্দরবানে ধর্ষণ চেষ্টার ঘটনায় জড়িত মো. হাবিবুর (রাইছ মিয়া) ও ফারুককে বিচারের মাধ্যমে যথাযথ শাস্তি নিশ্চিত করার দাবি জানান।
সিএইচটি নিউজে প্রকাশিত প্রচারিত কোন সংবাদ, তথ্য, ছবি ,ভিডিও, কনটেন্ট ব্যবহার করতে হলে কপিরাইট আইন অনুসরণ করে ব্যবহার করুন।