মতামত

দালাল বিশ্বাসঘাতকদের চিনে রাখুন

0
32

বিপ্লব চাকমা


গতকাল রাঙামাটি জেলার সচেতন নাগরিক সমাজ নামে কিছু প্রতিবাদী লোকজন রাঙামাটি শহরে ডিসি অফিসের সামনে অবস্থান ধর্মঘট করতে চেয়েছিলেন। লংগদুর ভাইবোনছড়া নামক গ্রামে বিবেক সাধনা বনবিহারের জমি বেদখলের প্রতিবাদে ছিল তাদের ওই কর্মসূচি। কিন্তু ডিসি অফিসে পৌঁছানোর আগেই সন্তু লারমার লেলিয়ে দেয়া গুণ্ডারা আয়োজকদের একটি অংশকে শহরের শিল্পকলা একাডেমী এলাকা ও সমতাঘাটে আটকায়। অন্যদিকে কুদুকছড়ি, ঘিলাছড়ি ও সাপছড়িসহ অন্যান্য এলাকা থেকে যারা কর্মসূচিতে যোগ দিতে গিয়েছিলেন তারা ডিসি অফিসে ঠিকই পৌঁছান। তবে সেখানে থাকা সন্তু লারমার মাস্তানরা তাদেরকে অবস্থান ধর্মঘট পালনে বাধা দেয়। বলতে গেলে তাদের ভূমিকা ছিল গণবিরোধী সরকারের নিয়োজিত কুখ্যাত পুলিশের মতো। নাগরিক সমাজের নেতারা তাদেরকে প্রশ্নবাণে জর্জরিত করেন। তারা প্রশ্ন করেন, কেন তারা গণতান্ত্রিক কর্মসূচি পালনে অন্যায়ভাবে বাধা দিচ্ছে? জমি বেদখলের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করা হলে তাতে তাদের (সন্তু লারমাদের) কী ক্ষতি? সন্তু লারমার লোকরা তাদের এসব প্রশ্নের কোন জবাব দিতে পারেনি। পরে নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা সেখানে কিছুক্ষণ অবস্থান করার পর সাপছড়িতে গিয়ে তাদের কর্মসূচি পালন করেন।

তকাল (১২ অক্টোবর) রাঙামাটিতে সচেতন নাগরিক সমাজের অবস্থান ধর্মঘটে বাধাদানকারী জেএসএস’র লেলিয়ে দেয়া গুণ্ডার। # সংগৃহিত ছবি

পার্বত্য চট্টগ্রামে অহরহ ভূমি বেদখলের ঘটনা ঘটছে। লংগদুর ভাইবোনছড়ার বৌদ্ধ বিহারের জমি বেদখলও এসব ঘটনার একটি। মূলতঃ বিহারটি উচ্ছেদের ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবে সেটেলাররা উক্ত জমি বেদখলের জন্য বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। এই বেদখলে ভূমিদস্যু সেটেলারদের প্রতি স্থানীয় সামরিক ও বেসামরিক প্রশাসনের পক্ষপাতিত্ব (হয়ত উস্কানিও) অত্যন্ত পরিস্কার। গতকাল (১২ অক্টোবর) ঘটনাস্থলে গিয়ে পুলিশ ও স্থানীয় সেনা কমান্ডারগণ বলে আসেন যে, সেটেলাররা বেদখলকৃত বিহারের জমিতে তোলা বাড়িঘরে থাকবে।

যে জমিতে সেটেলাররা জোর করে বাড়ি নির্মাণ করেছে তার আসল মালিক হলেন সমীর চাকমা। মোট জমির পরিমাণ ৫ একর। সেখান থেকে তিনি ৩ একর বিহারের জন্য দান করেন, বাকি দুই একর তার দখলে রয়েছে। জমিটি তার নামে বন্দোবস্তীকৃত।

সেটেলাররা প্রশাসনের সমর্থনে গায়ের জোরে যেভাবে অন্যের জমি কেড়ে নিয়েছে বা নিচ্ছে তা দিনে দুপুরে জনসমক্ষে ডাকাতি ছাড়া আর কিছুই নয়। এর থেকে বড় অন্যায় অবিচার আর কী হতে পারে! সরকারের লোকজন দিনরাত আইনশৃঙ্খলা রক্ষার কথা বলে গলা ফাটিয়ে ফেলেন। কিছু সেটেলার যখন দেশের আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে ভূমিদস্যুবৃত্তি করছে তখন তারা যায় কোথায়? সেটেলাররা পাহাড়িদের বিরুদ্ধে অপরাধ করলে কী তা অপরাধ নয়? তারা অন্যের জমি কেড়ে নিলে কী অপরাধ হয় না? পার্বত্য চট্টগ্রামের এই অবস্থা আমাদেরকে প্যালেস্টাইনে জায়নিস্ট ইসরায়েলের বর্বর নিপীড়ন ও ভূমি বেদখলের কথাই স্মরণ করিয়ে দেয়। পার্বত্য চট্টগ্রাম আসলে যেন আর এক প্যালেস্টাইন।

সেটেলারদের এই ভূমি বেদখলের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক দলগুলোর কার কী ভূমিকা তা দেখা জরুরী। সন্তু লারমার জেএসএস গতকাল নাগরিক সমাজের কর্মসূচিতে বাধা দিয়ে সরাসরি ভূমিদস্যু সেটেলার বাঙালিদের পক্ষে এবং জনগণের বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছে। এটা সবার কাছে পরিস্কার। সত্যি বলতে কী, ভূমি বেদখল, পাহাড়ি নারী ধর্ষণ ও জনগণের ওপর দমনপীড়নের বিরুদ্ধে তাদেরকে কোন সময় আন্দোলন করতে দেখা যায় না। তারা কেবল নিজ ভাইয়ের বুকে গুলি চালাতে ওস্তাদ, নিজের মা-বোনকে পুত্রহারা, স্বামীহারা করতে সিদ্ধহস্ত। আর সন্তু লারমা আঞ্চলিক পরিষদে নিজের গদি রক্ষার জন্য এমন কোন কাজ নেই করতে পারেন না। আমরা জানি, প্রকৃত দেশপ্রেমিক বিপ্লবীরা নিজে মরে জাতি ও জনগণকে রক্ষা করেন। আমাদের সন্তু বাবু নিজে বাঁচার জন্য, নিজের ক্ষমতা রক্ষার জন্য জাতি ও জনগণকে মেরে ফেলেন। তিনি জুম্ম জাতির যে ক্ষতি করেছেন, অন্য কোন দালাল আজ পর্যন্ত সে রকম ক্ষতি করতে পারেনি।

লংগদুর ভূমি বেদখলকৃত স্থানে সেটলার সমেত সেনাবাহিনী ও পুলিশের উপস্থিতি। ছবি: সংগৃহিত

অন্যদিকে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির জুম্ম নেতাদের ভূমিকা কী? দীপংকর, বীর বাহাদুর, কুজেন্দ্র লাল ও বাসন্তীরা কী করছেন? পাহাড়ি জনগণের ওপর যে অন্যায় অবিচার চলছে তার বিরুদ্ধে তাদের মুখ থেকেও আজ পর্যন্ত একটি শব্দও বের হয়নি। তারা এসব অন্যায় দেখেও দেখে না, শুনেও শোনে না। তারা কালা, বোবা ও বধির। কিন্তু তারা জনগণের মাথায় কাঁঠাল ভেঙে খেতে ওস্তাদ। নির্বাচনের সময় এসে পড়েছে, তারা আবার আগের মতো জনগণকে বিভ্রান্ত করতে মনভোলানো কথা বলতে শুরু করে দেবে, ভোট প্রার্থনায় কাচুমাচু করবে। সংসদে কিংবা সংসদের বাইরে এরা জনগণের পক্ষে কথা না বললেও, নিজের আখের গোছাতে তারা খুবই ব্যস্ত থাকে। মাঝেমধ্যে আমরা পত্রিকায় দেখি ও শুনি কে কত সম্পদের পাহাড় গড়ে তুলেছে। জনগণকে এদের চিনে রাখতে হবে এবং সময়মত শায়েস্তা করতে হবে।

তাহলে জনগণের এই চরম দুর্দিনে কোন দল তাদের পাশে রয়েছে? একমাত্র ইউপিডিএফ-ই গত ২৫ বছর ধরে অন্যায় ভূমি বেদখল, পাহাড়ি নারীদের ওপর যৌন সহিংসতা ও জনগণের ওপর দমন-পীড়ন-জুলুমের বিরুদ্ধে নিরলসভাবে এবং দৃঢ়তা ও আন্তরিকতার সাথে লড়াই করে যাচ্ছে। এই পার্টির নেতাকর্মীরা নিজেদের জীবন বাজি রেখে জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য সংগ্রাম করছে এবং সেটা করতে গিয়ে প্রাণ বিসর্জন দিচ্ছে, জেল-জুলুম অত্যাচার সহ্য করছে।

বিবেক সাধনা বনবিহার রক্ষার জন্য সবচেয়ে কাদের বেশি সরব হওয়া দরকার? দীপংকর, বীর বাহাদুর, কুজেন্দ্র, বাসন্তীরা যদি জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধি হন, সন্তু লারমা যদি পার্বত্য চট্টগ্রামের “একমাত্র রাজনৈতিক দলের” প্রধান হন, তাহলে সবার আগে তাদেরই কি ভূমি ও বিহার রক্ষায় এগিয়ে আসা উচিত নয়? যখন এই বোবা-কালার দল, এই সুবিধাবাদী-দালাল-বেঈমানের দল পাথরের মতো নিশ্চুপ বা চাকমা ভাষায় “থালত পানি দিয়ে পারা জুরো”, তখন সচেতন নাগরিক সমাজের প্রতিবাদ সত্যিই প্রশংসনীয়।

পঞ্চদশ শতকে ফ্রান্স বৃটিশদের দ্বারা পদানত ছিল। তখন রাজা, অমাত্য ও কুলীন সমাজ সকলে ভীরু কাপুরুষ হয়ে থাকত। নিজের দেশকে বিদেশী দখলদার থেকে মুক্ত করার জন্য যুদ্ধ করতে সাহস করত না। সেই ভীরুতা কাপুরুষতার হিমশীলত হাওয়ায় জোন অব আর্ক নামে ১৭-১৮ বছরের অশিক্ষিত গেঁয়ো তবে ধার্মিক এক কিশোরী বৃটিশদের বিরুদ্ধে প্রবল তেজে যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়েছিলেন। গতকাল রাঙামাটির সাপমারায় নাগরিক সমাজের যে নারীদের বক্তব্য দিতে দেখা গেছে তাদের ভূমিকাও যেন সেই জোন অব আর্কের মতো।

মধ্যযুগে ফ্রান্সের ওই নারী যেভাবে ভীরু ঘুমন্ত জাতির মধ্যে সাহস ও দেশপ্রেম জাগিয়ে তুলেছিলেন, আজ আমাদেরও সেভাবে জাতি ও জনগণকে জাগিয়ে তুলতে হবে। তাদের মধ্যে সাহস ও তেজ সঞ্চার করতে হবে। তাদেরকে বলতে হবে জুম্ম জাতি যোদ্ধার জাতি। তারা মোগলদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে নিজেদের স্বাধীনতা রক্ষা করেছে। তারা মহাপরাক্রমশালী বৃটিশদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে তাদেরকে সন্ধি করতে বাধ্য করেছে। কাজেই এই সংগ্রামী জুম্ম জাতিকে কখনো দাবিয়ে রাখা যাবে না।

মনে রাখতে হবে অন্যায় চিরস্থায়ী নয়। দালাল-সুবিধাবাদী-বেঈমানদের দিনও এক সময় শেষ হয়। ১৯৯০ দশকে ছাত্র-গণআন্দোলনের জোয়ারে যেভাবে দালালরা নির্মূল হয়ে গিয়েছিল, আজকের দালালদেরও একদিন তাই হতে বাধ্য। আজ যদি সন্তু লারমা তথা দালাল-বেঈমানদের দিন হয় এবং জনগণের জন্য রাত হয় — তাহলে তাই হোক। কিন্তু মনে রাখতে হবে, দিনের পরে রাত, আর রাতের পরে দিন আসে। এটাই হলো দুনিয়ার নিয়ম, অমোঘ সত্য। কাজেই একদিন জনগণেরও দিন আসবে, আর তখন দালাল বদমাশদের জন্য জন্য হবে নিঃসীম কালো রাত। আমরা সংগ্রাম করে সেই দিনকে অবশ্যই নিয়ে আসবো। কাজইে যতসব সুবিধাবাদী, দালাল, বেঈমান, স্পাইরা সাবধান! জনগণ সুনামির মতো ধেয়ে আসছে!!


সিএইচটি নিউজে প্রকাশিত প্রচারিত কোন সংবাদ, তথ্য, ছবি ,ভিডিও, কনটেন্ট ব্যবহার করতে হলে কপিরাইট আইন অনুসরণ করে ব্যবহার করুন।


সিএইচটি নিউজের ইউটিউব চ্যানেলটি সাবস্ক্রাইব করুন

Print Friendly, PDF & Email

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.