স্মরণীয়-বরণীয়
অনন্ত স্যার নিজেই একজন ‘Pioneer’ : যতীন্দ্র লাল ত্রিপুরা
[শিক্ষাবিদ এবি খীসা (অনন্ত বিহারী খীসা)-এর প্রয়াণ হয় ২০২১ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি তারিখে। এরপর তাঁর প্রথম প্রয়াণ বার্ষিকী (২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২২) উপলক্ষে ‘পাইওনিয়ার’ নামে একটি স্মরণিকা প্রকাশ করা হয়। উক্ত স্মরণিকায় তাঁর গুণমুগ্ধ ছাত্র ও অনুরাগী-অনুসারীগণ তাঁকে নিয়ে স্মৃতিচারণ করেছেন।
আগামী ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ এবি খীসার ৫ম প্রয়াণ বার্ষিকী। এ উপলক্ষে “পাইওনিয়ার” স্মরণিকায় তাঁকে নিয়ে স্মৃতিচারণকৃত কয়েকজন লেখকের লেখা ধারাবাহিকভাবে এখানে প্রকাশ করা হচ্ছে- সম্পাদকমন্ডলী]
** নীচে খাগড়াছড়ির সাবেক এমপি যতীন্দ্র লাল ত্রিপুরা’র এবি খীসাকে নিয়ে স্মৃতিচারণমূলক লেখাটি তুলে ধরা হলো:
———————————-
অনন্ত স্যারের ১ম মৃত্যুবার্ষিকীতে শ্রদ্ধাঞ্জলি
যতীন্দ্র লাল ত্রিপুরা*
লেখাপড়ার হাতে খড়ি থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যায়ের শেষ ধাপ পর্যন্ত ছাত্র জীবনে আমি বহু শিক্ষকের সান্নিধ্য ও সাহচর্য লাভ করেছি। অনেক শিক্ষকের মধ্যে যিনি আমাকে ভবিষ্যতে জীবন গড়ে তোলার ক্ষেত্রে সবার চেয়ে অধিক প্রভাবিত করেছেন। তিনি আমার প্রাত: স্মরনীয় পরম শ্রদ্ধেয় শিক্ষাগুরু অনন্ত স্যার। তিনি পার্বত্য অঞ্চলের শিক্ষিত মহলে এ.বি. খীসা নামে সমধিক পরিচিত। নামের abbreviation দিয়ে পরিচিত লোক পৃথিবীতে কমই আছে। বিশ শতকের ষাট দশকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে একজন শিক্ষক সংক্ষেপিত নামে পরিচিত ছিলেন শুধুমাত্র ছাত্রদের মধ্যে। তাঁর নাম অধ্যাপক ডঃ মোজাফফর আহমদ চৌধুরী। তিনি ওই সময় রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের বিভাগীয় প্রধান ছিলেন। ছাত্র মহলে তিনি MAC (ম্যাক) নামে পরিচিত ছিলেন। আওয়ামী লীগের ৬ দফা দাবীর খসড়া প্রণয়নে বঙ্গবন্ধুকে যাঁরা সহযোগিতা করেছেন তিনি তাঁদের একজন। ইংরেজী সাহিত্যের বিখ্যাত লেখক ও নাট্যকার George Bernard Show বহুল পরিচিত ছিলেন G.B.S নামে।

অনন্ত স্যার ১৯৬১ সালে খাগড়াছড়ি হাই স্কুলে সহকারী প্রধান শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন। আমি তখন সবেমাত্র নবম শ্রেণীতে উত্তীর্ণ ছাত্র। তিনি আমাদের ক্লাশের ইংরেজী শিক্ষক। খাগড়াছড়ি বাজারের পার্শ্ববর্তী পৌরসভা, এন, এস, আই ও বি,এন, পি কার্যালয় যেখানে এক সময় ওই জায়গায় অবস্থিত ছিল খাগড়াছড়ি হাই স্কুল। বর্তমান ঈদগাহ ময়দানটা ছিল তখন স্কুলের খেলার মাঠ। স্কুলে যোগদানের পর অনন্ত স্যারকে বাসা হিসেবে ব্যবহারের জন্য দেয়া হল স্কুলের সন্নিকটে ঢিবির উপর কাঠ বাঁশ দিয়ে নির্মিত চৌচালা একটি বাড়ী। নবীনবাবু (নবীন কুমার ত্রিপুরা) তখন স্কুলের হেড মাষ্টার। তিনি পরিবার নিয়ে থাকেন অপর্না চরণ চৌধুরী পাড়ায় স্ব-খরচে নির্মিত একটি বাড়ীতে। অনন্ত স্যার তখন অবিবাহিত। তিনি সাহায্যকারী একজন লোক নিয়ে থাকতেন। বাড়ীতে তিনি ওঠার পর বাড়ীর চারি পার্শ্বে ঝোপঝাড় পরিস্কার করে ফল ও ফুলের গাছ লাগিয়ে ছিলেন। পোষাক পরিচ্ছেদেও স্যার খুবই পরিপাটি ছিলেন। তিনি সবসময় ফুলশার্ট ইন করে প্যান্ট পরতেন। হাফ শার্ট গায়ে অথব্য ফুল শার্টের হাত গোটানো অবস্থায় উনাকে আমি কোন সময় দেখিনি।
অনন্ত স্যার ক্লাশে পড়াতেন ধীর লয়ে। ফলে ওনার পাঠদান ছাত্রদের পক্ষে অনুধাবন করা সহজ ছিল। কঠিন কোন বিষয় তিনি বার বার বুঝিয়ে বলতেন। ওনার মুখে কোন সময় বিরক্তি ভাব অভিব্যক্ত হতোনা। ইংরেজী যে কোন শব্দের প্রতি শব্দ বা সমার্থক শব্দ, বিপরীত শব্দ ও শব্দের যথাযথ ব্যবহার তিনি পুঙ্খানুপুঙ্খরূপে বুঝিয়ে দিতেন। আমরা বলাবলি করতাম স্যার নিজেই একটা অভিধান। শুধুমাত্র পরীক্ষা পাশের জন্য স্যার পড়াতেন না। প্রকৃত জ্ঞান দানই ছিল স্যারের উদ্দেশ্য ও ব্রত। অজানা কোন বিষয় জানতে চাইলে স্যার বিস্তারিত তথ্য সহকারে বলে দিতেন। স্যারের সাধারন জ্ঞানের পরিধি ছিল অনেকদূর বিস্তত। জ্ঞানের পরিধির দিক থেকে অনন্ত স্যারের সমকক্ষ তাঁর সমসাময়িক শিক্ষিতদের মধ্যে আমি কাউকে দেখিনি। আমরা ভাগ্যবান ছাত্রজীবনে স্যারের মাতো শিক্ষক পেয়েছি। তবে আমাদের ব্যর্থতা হল স্যারের মতো এমন এক জ্ঞানবৃক্ষ থেকে আমরা যথার্থরূপে ফল আহরণ করতে পারিনি।
বৃটিশ আমলের কথা বাদ দিলাম, পাকিস্তান আমলেও পার্বত্য চট্টগ্রাম ছিল শিক্ষাক্ষেত্রে অনেক পশ্চাৎপদ এলাকা। বিশ শতকের ষাট দশক সময় পর্যন্ত সমগ্র পার্বত্য চট্টগ্রামে সরকারী হাই স্কুল ছিল মাত্র একটি। রাঙ্গামাটি গভ: হাই স্কুল। এটি উনবিংশ শতকের শেষ দশকে বৃটিশ সরকারের আমলে প্রতিষ্ঠিত। পঞ্চাশ দশকের মাঝামাঝি সময়ে পার্বত্য চট্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকায় স্থানীয় বিদ্যোৎসাহী কিছু লোকের উদ্যোগে বেসরকারী হাইস্কুল প্রতিষ্ঠিত হয়। তাও হাতে গোনা কয়েকটি। আমার জানামতে ওই সময়ের বেসরকারী হাই স্কুলগুলো হল রামগড় হাইস্কুল, খাগড়াছড়ি হাই স্কুল, রাঙ্গামাটি শাহ হাই স্কুল, চন্দ্রঘোনায় কর্ণফুলী নদীর দক্ষিণপাড়ে নারানগিরি পাইলট হাই স্কুল ও বান্দরবান হাই স্কুল। ঘাট দশকের প্রথম ও মাধামাঝি সময়ে দিঘীনালা হাইস্কুল, মাটিরাঙ্গার তবলছড়িতে টি, কে, হাইস্কুল ও রাঙ্গামাটির কাউখালীতে কাউখালী হাইস্কুল ও গুইমারায় জুনিয়র হাইস্কুল প্রতিষ্ঠিত হয়। ওই সময় হাই স্কুল প্রতিষ্ঠার জন্য সরকারের শর্ত ছিল অন্যূন তিনজন গ্র্যাজুয়েট শিক্ষক নিয়োগদান। গ্র্যাজুয়েট শিক্ষক পাওয়া বেসরকারী স্কুল গুলোর জন্য ছিল বড় একটা সমস্যা। পার্বত্য চট্টগ্রামে তখন গ্র্যাজুয়েটের সংখ্যা ছিল মুষ্ঠিমেয়। বেসরকারী স্কুলের তহবিলে অপর্যাপ্ত অর্থের কারণে জেলার বাইরের এলাকা থেকে গ্র্যাজুয়েট শিক্ষক নিয়োগ দেয়া বা রাখা ছিল দুরূহ ব্যাপার। গ্র্যাজুয়েট হবার পর লাভজনক অন্যকোন চাকুরী অনুসন্ধান না করে যাঁরা বেসরকারী হাই স্কুল প্রতিষ্ঠার সাথে সম্পৃক্ত থেকে আর্থিক দৈন্যতার মধ্য দিয়ে একাগ্রচিত্তে শিক্ষকতার পেশায় নিজেকে যুক্ত রেখেছেন তাদেরকে অবশ্যই শিক্ষানুরাগীও বিদ্যোৎসাহী বলতে হবে। অনন্ত স্যার এই শ্রেণীর একজন শিক্ষক। অর্থ বিত্তের প্রতি লোভ মোহ উনার কোনদিনই ছিলনা। স্যারের চরিত্রের এই বৈশিষ্ট্যটি তাঁর সমগ্র জীবনে বিভিন্ন কর্মকান্ডে প্রতিফলিত হয়েছে।
অনন্ত স্যার সহজ সরল ও অনাড়ম্বর জীবন যাপন করে গেছেন। Plain living high thinking হল উনার ব্যক্তিজীবনের মতো। তবে অগোছালো, অপরিষ্কার অপরিচ্ছন্ন জিনিস উনার পছন্দ নয়। ফলে উনার ব্যক্তিগত ও পারিবারিক জীবন সাজানো গোছানো সৌন্দর্যময়।
আমার দৃষ্টিতে ও জানামতে অনন্ত স্যার ছিলেন একজন আদর্শবান ও নীতিবান ব্যক্তিত্ব। উনার সান্নিধ্যে এসে আমি যা দেখেছি ও জেনেছি উনার আদর্শ হল অন্যায়ের কাছে মাথা নত না করা। তাঁর অবস্থান ছিল অন্যায় অত্যাচার শাসন শোষনের বিপক্ষে এবং শাসিত শোষিত, অত্যাচারিত উৎপীড়িত, লাঞ্ছিত বঞ্চিত মানুষের পক্ষে। পার্বত্য চট্টগ্রামের সামাজিক ও রাজনৈতিক দুর্যোগের সময় প্রশাসন (সামরিক-বেসামরিক) কর্তৃক আহুত যে কোন সভায় বা বৈঠকে তিনি সত্য কথাটাকে দৃঢ়তার সাথে, দ্বিধাহীন চিত্তে ও নির্ভয়ে বলতেন। কারোর রক্তচক্ষুকে তিনি পরোয়া করতেন না। সত্যিকার অর্থে তিনি ছিলেন সৎ সাহসী। বর্তমান দিনে স্যারের মত একজন মানুষ পাওয়া খুবই দুস্কর। তিনি যদিও সক্রিয়ভাবে কোন রাজনৈতিক সংগঠনের সাথে সম্পৃক্ত হয়ে রাজনৈতিক কর্মকান্ডে জড়িত ছিলেন না, তিনি বিশেষ একটা রাজনৈতিক মতাদর্শে বিশ্বাস করতেন। তিনি সর্বান্তকরনে মার্কসবাদ লেনিনবাদে বিশ্বাসী ছিলেন। একদিন শ্রেণিকক্ষে পাঠদানের সময় বিশেষ বিভিন্ন মনিষীদের কথা বলতে গিয়ে কার্ল মার্কস সম্পর্কে আমাদের শুনালেন। তখন আমরা দশম শ্রেণীর ছাত্র। এর আগে কার্ল মার্কসের নাম আমরা কখনো শুনিনি। স্যারের কাছ থেকে শুনলাম পৃথিবীতে সবচেয়ে বড় জ্ঞানী ছিলেন কার্ল মার্কস। তাঁর পঠিত পুস্তক লম্বালম্বিভাবে সাজানো হলে নাকি ছয় মাইল দীর্ঘ হয়। পরবর্তীতে দেখা গেল আমাদের ক্লাশের অনেকের মধ্যে সৃষ্টি হয়েছে মার্কসকে জানার প্রবল আগ্রহ।
স্যারের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে আমার জীবনের সাথে সংশ্লিষ্ট কিছু কথা মনে পড়লো। এস এস সি পরীক্ষার পর আমি ফেনী ও চেঙ্গী উপত্যকায় ত্রিপুরা অধ্যুষিত বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখার জন্য বেরিয়ে পড়ি। ওই সময়ে ঘুরাঘুরি করতে গেলে পায়ে হাঁটা ছাড়া অন্য কোন উপায় নেই। অনেক দিন ঘুরাঘুরির পর পানছড়ি এলাকার এক ত্রিপুরা পাড়ায় এসে খবর পেলাম পরীক্ষার ফল বেরিয়েছে। আমি বাড়ীর দিকে না গিয়ে সোজা চলে আসলাম খাগড়াছড়িতে। হেডমাষ্টার নবীন বাবুর বাসায় গিয়ে জানতে পারলাম তিনি বি,এড কোর্সে ভর্তির জন্য ঢাকায় গেছেন। স্কুলের দায়িত্বে আছেন অনন্ত স্যার ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক হিসেবে। আমি স্কুলে গিয়ে উনার সাথে দেখা করলাম। তিনি আমাকে দেখে বললেন, তোমার রেজাল্ট আমাদের (শিক্ষকদের) প্রত্যাশা পূরণ করেনি। আমরা আশা করেছিলাম তুমি ষ্ট্যান্ড না করলেও ভালো রেজাল্ট করবে। মাত্র কয়েকটি নম্বরের জন্য তুমি ফাষ্ট ডিভিশনও পেলেনা। “আমি বললাম স্যার দোষটা সম্পূর্ণ আমার। আমি পাঠ্য বইয়ে মনযোগ না দিয়ে আউট বই নিয়ে সময় নষ্ট করেছি। যার ফলে আপনাদের প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ হলাম। আশীর্বাদ করেন ভবিষ্যতে যেকোন পরীক্ষায় ভাল করতে পারি”। তিনি তাড়াতাড়ি কলেজে গিয়ে ভর্তি হতে বললেন। টেস্টিমনিয়েল সার্টিফিকেট ইংরেজীতে নিজ হাতে লিখে দিলেন এবং আমার আর্থিক অসচ্ছলতার কথা জেনে নিজের পকেট থেকে ৩০/- টাকা বের করে দিলেন। কলেজে ভর্তির জন্য ৩০ টাকাই যথেষ্ট। স্যারের ব্যবহারে আমি বুঝতে পারলাম স্যার আন্তরিকভাবে আমাকে স্নেহ করেন ও ভালবাসেন। কলেজে অধ্যয়নকালীন একদিন স্যারের সাথে দেখা করলাম। তিনি পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়ীদের ভবিষ্যত নিয়ে অনেক কথা বললেন। স্যারের কথা শুনে বুঝতে পারলাম তিনি শুধু ছাত্রদের শিক্ষক নন, তিনি অন্য আরও কিছু।
১৯৬৪ সাল। এপ্রিল কি মে মাস তারিখ এখন সঠিক মনে নেই। ছুটিতে বাড়ি যাচ্ছিলাম। যাওয়ার পথে খাগড়াছড়িতে নবীনদার বাড়িতে দু’একদিন থাকার জন্য উঠলাম। অনন্ত স্যার থাকেন স্কুলে দক্ষিণপার্শ্বে একটি বাড়িতে। বাড়িটি নিজের টাকা দিয়ে নির্মিত। একদিন সকাল বেলার দিকে উনার বাড়িতে যাওয়ার জন্য একজন লোক এসে খবর নিয়ে গেল। গিয়ে দেখি বাড়িতে অনেক লোক সমাগত। মধ্যাহ্ন ভোজেরও আয়োজন আছে। খাবারের আগে পাতি বিছানো বৈঠক খানায় সকলে বসলাম। উপস্থিতিনের মধ্যে কিছু চেনা কিছু অচেনা। এম এন লারমাকে সেদিন প্রথম দেখলাম। তাঁর নাম শুনেছি ও কাপ্তাই বাঁধ নির্মাণের প্রতিবাদে বীরোচিত তাঁর ভূমিকা সম্পর্কে জানি, কিন্তু তাঁকে আগে কখনো দেখিনি। লারমার সাথে সেদিনই আমার প্রথম পরিচয়। পরবর্তী সময়ে আমাদের মধ্যে নিবিড় ভালোবাসার সম্পর্ক গড়ে ওঠে। অনন্ত স্যারের সভাপতিত্বে পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়ীদের বিষয় নিয়ে একটি আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। লারমা দীর্ঘ বক্তব্য রাখেন। আলোচনান্তে পাহাড়ীদের মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টির লক্ষ্যে একটি সামাজিক সংগঠন প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। সংগঠনটির নাম রাখা হয় ‘Chittagang Hill Tracts Tribal Welfare Association’ ওই সময় পার্বত্য চট্টগ্রামে প্রকাশ্যে রাজনৈতিক সংগঠন প্রতিষ্ঠা করার জন্য পরিবেশ ও পরিস্থিতি অনুকূলে ছিলনা। সামাজিক সংগঠনের জন্য প্রয়োজন হতো পূর্ব পাকিস্তান সরকারের Directorate of Social welfare Agency কর্তৃক নিবন্ধন। নিবন্ধের জন্য অপরিহার্য ছিল DSB ‘র অনাপত্তি প্রতিবেদন। ওই দিন সংগঠনের কাজ সম্পাদনের জন্য সর্বসম্মতিক্রমে অনন্ত স্যারকে প্রেসিডেন্ট ও এম,এন, লারমাকে সাধারণ সম্পাদক করে ১৫ (পনের) জনের একটি নির্বাহী কমিটি গঠন করা হয়। আমাকে রাখা হয় সহ-সম্পাদক পদে। স্যারকে দায়িত্ব দেয়া হয় সংগঠনের ঘোষণাপত্র ও গঠনতন্ত্র প্রণয়ন করে নিবন্ধনের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের। তিনি সবকিছু যথারীতি নিবন্ধনের জন্য আবেদন করেন DSB ‘র খারাপ প্রতিবেদনের কারনে নিবন্ধন আর হয়নি। সংগঠনটি নিবন্ধনকৃত না হওয়ায় কমিটির সদস্যদের অনেকে আর যোগাযোগ রাখেন নি। ফলে সংগঠনটি অঙ্কুরেই বিনষ্ট হয়ে যায়।
আমার দুই শিক্ষাগুরু নবীন স্যার ও অনন্ত স্যার দু’জনে মিলে একদিন পরিকল্পনা নিলেন খাগড়াছড়ি বাজারে একটা ষ্টেশনারী ও বইয়ের দোকান খুলবেন। তাঁদের পুঁজি বেতনের টাকা দিয়ে নয়। কাপ্তাই বাঁধের কারনে অনন্তস্যার পেয়েছেন ক্ষতিপূরণের টাকা আর নবীনস্যার পেয়েছেন উদ্বাস্তুদের নিকট জমি বিক্রয় করে কিছু টাকা। বর্তমানে খাগড়াছড়ি বাজারে আলম ব্রাদার্সের রড সিমেন্টের দোকান যেখানে সে জায়গায় দোকানের জন্য নির্মান করা হল একটি ষ্টল। দোকানের নাম দেয়া হল- Pioneer Store. স্যার দু’জনের উদ্দেশ্য হল নিজেদের আর্থিক স্বচ্ছলতা সৃষ্টির পাশাপাশি অর্থবিত্ত সম্পন্ন পাহাড়ীদেরকে ব্যবসার প্রতি আগ্রহী করে তোলা। দোকানের জন্য অনন্ত স্যার নিয়ে আসলেন একজন ম্যানেজার। নাম রেবতী চাকমা। নবীন স্যার নিয়ে আসলেন একজন সেলসম্যান। নাম মদন মোহন ভট্টাচার্য। রেবর্তী বাবু তোঁতলা। মদন মোহনের এক পা খোঁড়া। বসা থেকে উঠতে লাগে অনেকক্ষণ। দোকানে এসে কেউ কিছু চাইলে রেবর্তী বাবুর মুখ থেকে কথা বের করতে লাগে অনেকক্ষণ। তাদের কাজ কারবার দেখে অনেকে হাসাহাসি করতো। হাটের দিনে দু’জনকে দিয়ে দোকানের মালপত্র বিক্রয় সামাল দেয়া সম্ভব হতোনা। হাটের দিন দোকানে আমাকে থাকতে হতো। দোকানটি বছর দুয়েকের বেশী টিকেনি। অনন্ত স্যারের একটি খুব পছন্দের ইংরেজী শব্দ আছে। শব্দটি হল ‘Pioneer’। আসলে অনন্ত স্যার নিজেই একজন ‘Pioneer’ (অভিযাত্রী)। পাহাড়ী ছাত্র সমিতি, পার্বত্য চট্টগ্রাম জন সংহতি সমিতি ওনার প্রেরণা ও প্রদর্শিত পথ ধরেই অগ্রসর হয়েছে।
পার্বত্য চট্টগ্রাম আন্দোলনে যখন ছিলাম আমি বেশ কয়েকবার গোপনে এসে স্যারের সাথে দেখা করে পরামর্শ ও উপদেশ নিয়েছি। এম, এন, লারমা যতদিন জীবিত ছিলেন স্যারকে তাঁর রাজনীতির দীক্ষাগুরুর মতোই ভাবতেন। তাদের দু’জনের মধ্যে নিবিড় একটা সম্পর্ক আমি লক্ষ্য করেছি।
স্যার সরকারী হাই স্কুলের প্রধান শিক্ষকের পদ থেকে অবসরে যাওয়ার পর নিষ্ক্রিয় বসে থাকেননি। বিভিন্ন সামাজিক জনসেবামূলক বিভিন্ন কাজে নিজেকে সক্রিয়ভাবে জড়িত রেখেছেন। তিনি খাগড়াছড়িতে অবসরপ্রাপ্ত সরকারী কর্মচারীদের কল্যানের জন্য অবসর প্রাপ্ত সরকারী কর্মচারী কল্যান সমিতি গঠন করে মেধা ও শ্রম দিয়ে সংগঠনটিকে সুপ্রতিষ্ঠিত করে গেছেন। স্যারের আরো একটি উল্লেখযোগ্য অবদান খাগড়াছড়ি ‘প্রবীন হিতৈষী সংঘ ও জরা বিজ্ঞান প্রতিষ্ঠান’। সব জেলায় এই প্রতিষ্ঠানটি নেই। স্যারের প্রচেষ্টায় এ সংগঠনটি বর্তমানে খাগড়াছড়িতে সুপ্রতিষ্ঠিত। তিনি খাগড়াছড়ি জেলা পরিষদ ভবনের সামনে ‘টিউফা’ নামে একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রিন্সিপালের দায়িত্ব পালন করে প্রতিষ্ঠানটিকে শক্তভিতের উপর দাঁড় করিয়ে গেছেন। অনন্ত স্যার আমাদের মাঝে দৃশ্যত; যদিও নেই তিনি অগনিত মানুষের হৃদয়ে থাকবেন চিরকাল। খাগড়াছড়ি হাই স্কুলসহ যেসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে তিনি ছিলেন এবং যেসব জন-কল্যানমূলক প্রতিষ্ঠান তিনি প্রতিষ্ঠা করে গেছেন সেসব প্রতিষ্ঠানের মধ্য দিয়ে তিনি চিরস্মরণীয় ও সকলের একজন নমস্য ব্যক্তি হয়ে থাকবেন। পরিশেষে স্যারের বিদেহী আত্মার প্রতি জানাই সশ্রদ্ধ প্রণাম।
*সাবেক এমপি, খাগড়াছড়ি নির্বাচনী এলাকা, খাগড়াছড়ি।
# লেখা সৌজন্যে: ‘পাইওনিয়ার’ (অনন্ত বিহারী খীসার ১ম মৃত্যুবার্ষিকীর স্মরণিকা)
আরও পড়ুন:
>> আমার দেখা অনন্ত বিহারী খীসা : জ্ঞানেন্দু বিকাশ চাকমা
>> শিক্ষক ও অন্তরালের কারিগর এবি খীসা (১৯৩৭-২০২১)
সিএইচটি নিউজে প্রকাশিত প্রচারিত কোন সংবাদ, তথ্য, ছবি ,ভিডিও, কনটেন্ট ব্যবহার করতে হলে কপিরাইট আইন অনুসরণ করে ব্যবহার করুন।
