আয়নাঘরের উন্মোচন

মাহফুজুর রহমান মানিক
বিএনপির সাবেক নেতা ইলিয়াস আলী ২০১২ সালে গুম হন। পরিবার এখনও জানে না- তিনি জীবিত আছেন, নাকি মারা গেছেন। তবে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকারের পদত্যাগের পর তাঁর পরিবার এখনও আশা করে আছে- তিনি ফিরবেন। এমনকি বুধবার গুজব ছড়ায়- ইলিয়াস আলী ফিরছেন। শুধু আয়নাঘরের ক্যারিশমায়ই তিনি ফিরতে পারেন। আয়নাঘর হলো একটি গোপন বন্দিশালা, যেখানে আওয়ামী লীগ আমলে মানুষকে আটকে রাখা হতো। এখানে বন্দিরা, তাদের পরিবার দূরে থাক, নিজেরাও জানত না, তারা কোথায় আছে।
এই বন্দিশালার অস্তিত্ব সরকার সর্বদা অস্বীকার করেছে। তবে সোমবার গণঅভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর এর অস্তিত্ব মানুষ দেখতে পেল।
বুধবার আয়নাঘর থেকে মুক্তি পেয়েছেন পার্বত্য চট্টগ্রামের আঞ্চলিক সংগঠন ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্টের (ইউপিডিএফ) নেতা মাইকেল চাকমা। ২০১৯ সালের এপ্রিলে নারায়ণগঞ্জ থেকে তিনি নিখোঁজ হন। তাঁকে পাওয়ার জন্য তাঁর সংগঠন থেকে নানা চেষ্টা-তদবির করা হয়। পুলিশ তাঁর সন্ধানে এতটাই অসহযোগিতা করে যে, থানায় জিডিও নেওয়া হয়নি। উল্টো সোনারগাঁ থানার ওসি প্রথম আলোকে বলেছিলেন, আমরা তদন্ত করে দেখেছি, মাইকেল চাকমার বিরুদ্ধে ১১টি মামলা আছে। এর মধ্যে চারটি হত্যা মামলা। হয়তো তিনি আত্মগোপনে আছেন বা অন্য সমস্যা হতে পারে। বিষয়টি নিয়ে ইউপিডিএফ আদালতেও গিয়েছিল। ২০২০ সালে ইউপিডিএফ থেকে অভিযোগ করা হয়, প্রতিবাদী কণ্ঠ তথা পার্বত্য চট্টগ্রামসহ দেশে ক্রমবর্ধমান আন্দোলন স্তব্ধ করতেই রাষ্ট্রীয় কোনো সংস্থা মাইকেল চাকমাকে তুলে নিয়েছে। পাঁচ বছর পর আয়নাঘর থেকে তাঁর মুক্তি বাস্তবে সেটাই প্রমাণ করেছে।

এর আগের দিন মঙ্গলবার আয়নাঘর থেকে মুক্তি পেয়েছেন জামায়াতে ইসলামীর সাবেক আমির গোলাম আগমের মেজো ছেলে সেনাবাহিনীর সাবেক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আবদুল্লাহিল আমান আযমী ও দলটির নেতা মীর কাসেম আলীর ছোট ছেলে মীর আহমাদ বিন কাসেম (আরমান)। তারাও ২০১৬ সালে হঠাৎ গুম হয়ে যান।
বিনাবিচারে আটক গুম-খুনের শিকার পরিবারগুলো বারবার আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে ধরনা দিয়েও প্রিয়জনকে পায়নি। কেউ মারা গেলে অন্তত তার লাশও তো পরিবার প্রত্যাশা করে। গুমের শিকার ব্যক্তিদের সন্তানদের যে কান্না আমরা বিভিন্ন কর্মসূচিতে দেখে আসছিলাম, হয়তো তাতেই লেখা ছিল জনরোষে সরকারের এমন অপমানজনক পতন।
বস্তুত আয়নাঘর নিয়ে ২০২২ সাল থেকেই মানুষের কৌতূহল; – নেত্রনিউজের অনুসন্ধানে ওই সময় কুখ্যাত এই বন্দিশালার বিস্তারিত উঠে আসে। ওই প্রতিবেদনেও ইঙ্গিত দেওয়া হয়, আমান আযমী ও আরমান। আয়নাঘরে বন্দি আছেন। এর পরও তাদের মুক্ত করা যায়নি। কারণ জাতীয় ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলো বাংলাদেশে সরকারি বাহিনী কর্তৃক গুম নিয়ে এক দশকের বেশি সময় ধরে অভিযোগ করলেও আসছিল। ২০২১ সালে আন্তর্জাতিক সরকার বরাবরই তা অস্বীকার করে মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস ওয়াচ ৮৬ জনের একটি তালিকা প্রকাশ করে, যাদেরকে অন্তত ১০ বছর ধরে বন্দি রাখা হয় কিংবা খোঁজ পাওয়া যায়নি।
আইন অনুসারে যে কোনো নাগরিককে আটক করার ২৪ ঘণ্টার মধ্যে আদালতে হাজির করতে হয়। অথচ মাইকেল চাকমা, আমান আযমী কিংবা আরমানকে রাষ্ট্রীয় বাহিনী আটক করলেও আদালতে হাজির না করেই বছরের পর বছর আয়নাঘরে আটকে রাখে। আয়নাঘরের কিছু চিত্রও নেত্রনিউজে প্রকাশ হয়। যেগুলো আসলে ঘর নয়, বীভৎস নির্যাতন কেন্দ্র। একজন বন্দির বর্ণনা অনুসারে, সেখানে দিনরাত উচ্চশব্দে এগজস্ট ফ্যান চলত। নির্যাতন করলেও শব্দ যাতে বাইরে না যায়।
বলা বাহুল্য, আয়নাঘর কর্তৃত্ববাদী শাসনের ভয়ানক নজির। শেখ হাসিনা সরকার বিরোধীদের ওপর দমন- নিপীড়ন চালিয়েছিল এবং বেআইনিভাবে নাগরিকদের ধরে আয়নাঘরে রেখেছিল। যারা সেখানে এখনও আটক আছে, তাদের ছেড়ে দেওয়া জরুরি। বিনাবিচারে আটক গুম-খুনের শিকার পরিবারগুলো বারবার আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে ধরনা দিয়েও প্রিয়জনকে পায়নি। কেউ মারা গেলে অন্তত তার লাশও তো পরিবার প্রত্যাশা করে। গুমের শিকার ব্যক্তিদের সন্তানদের যে কান্না আমরা বিভিন্ন কর্মসূচিতে দেখে আসছিলাম, হয়তো তাতেই লেখা ছিল জনরোষে সরকারের এমন অপমানজনক পতন।
■ মাহফুজুর রহমান মানিক: জ্যেষ্ঠ সহ-সম্পাদক
mahfuz.manik@gmail.com
* সৌজন্যে: সমকাল, ৮ আগস্ট ২০২৪
সিএইচটি নিউজে প্রকাশিত প্রচারিত কোন সংবাদ, তথ্য, ছবি ,ভিডিও, কনটেন্ট ব্যবহার করতে হলে কপিরাইট আইন অনুসরণ করে ব্যবহার করুন।