খাগড়াছড়ি আসনে ঘোড়া এগিয়ে চলছে

বিশেষ প্রতিবেদক, সিএইচটি নিউজ
সোমবার, ২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। আওয়ামী লীগ-বিহীন এই নির্বাচনে বিএনপি মাঠ দখলে রাখতে চাইছে। কিন্তু প্রায় সব আসনে দলটি শক্তিশালী প্রতিপক্ষের মুখোমুখি হচ্ছে। নির্বাচনে বিএনপি সরকার গঠন করার মতো আসন পাবে কীনা তা এখনও নিশ্চিত নয়। নির্বাচনের আগ মুহূর্তেও ভোটের হিসাবে ওলট-পালট হতে পারে।
পার্বত্য চট্টগ্রামের আসনগুলোতেও বিএনপি শক্তিশালী প্রতিদ্বন্দ্বীর মুখোমুখি। খাগড়াছড়ি আসনে বিএনপির একজন বিদ্রোহী প্রার্থী থাকায় স্বতন্ত্র প্রার্থী ধর্ম জ্যোতি চাকমার জয়ের সম্ভাবনা দিন দিন উজ্জ্বল হয়ে উঠছে। এই আসনে পাহাড়িদের কাছে বিএনপির প্রার্থী ওয়াদুদ ভূঁইয়ার নেতিবাচক ভাবমূর্তি রয়েছে। ২০০৩ সালে মহালছড়িতে ভয়াবহ সাম্প্রদায়িক হামলার জন্য তাকে দায়ি করা হয়। এছাড়া তার বিরুদ্ধে পাহাড়িদের জমি বেদখলে সেটলারদের উস্কে দেয়ারও অভিযোগ রয়েছে। ২০০৭ সালে দেশে জরুরী অবস্থার সময় তিনি গ্রেফতার হয়েছিলেন এবং আদালত কর্তৃক দুর্নীতির অভিযোগে দণ্ডিত হয়েছিলেন।
সেটলারদের একটি অংশ তার বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসসহ বিভিন্ন অভিযোগ করে থাকে। ফলে বাঙালিদের একটি বিরাট অংশের ভোট থেকে তিনি নিশ্চিতভাবে বঞ্চিত হবেন।
বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী সমীরণ দেওয়ানকে সেনা গোয়েন্দারা ও জেএসএস সন্তু গ্রুপ মিলে প্রার্থী হিসেবে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে বলে মনে করা হয়। উদ্দেশ্য পাহাড়িদের ভোটগুলো বিভক্ত করে দেয়া, যাতে ওয়াদুদ ভূঁইয়ার বিজয় নিশ্চিত করা যায়। তবে তাদের লক্ষ্য পূরণ হওয়ার সম্ভাবনা খুব কম। কারণ সমীরণ দেওয়ান পাহাড়িদের কাছে দালাল হিসেবে ঘৃণিত। খোদ জেএসএস সন্তু গ্রুপ তাকে এক সময় “জাতীয় বিশ্বাসঘাতক, দালাল ও দুর্নীতিগ্রস্ত” বলে ঘোষণা করেছিল। ফলে পাহাড়িদের সমাজে তার গ্রহণযোগ্যতা নেই বললেই চলে। শহর এলাকায় মধ্যবিত্তের একটি অতি নগণ্য অংশের মধ্যে তার যোগাযোগ থাকলেও তৃণমূলের সাধারণ লোকজনের সাথে তার কোন সংযোগ নেই। ফলে তিনি নির্বাচনের ভোটের ফলাফলে খুব বেশি প্রভাব ফেলতে পারবেন বলে মনে হয় না। তাছাড়া জেএসএস সন্তু গ্রুপ তাকে সমর্থন দিলেও, খাগড়াছড়িতে তাদের কোন সাংগঠনিক কার্যক্রম নেই।
অপরদিকে স্বতন্ত্র প্রার্থী সাবেক দীঘিনালা উপজেলা চেয়ারম্যান ধর্ম জ্যোতি চাকমা বয়সে অনেকটা তরুণ এবং তার পেছনে ছাত্র-যুব সমাজের ব্যাপক সমর্থন রয়েছে। তিনি খাগড়াছড়ির সুশীল সমাজের মনোনীত প্রার্থী। খাগড়াছড়ির ৯টি উপজেলার ৭ জন সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যানসহ ইউপি চেয়ারম্যান, মেম্বার ও হেডম্যান কার্বারিরা তার প্রার্থীতা বাছাইয়ের সাথে জড়িত ছিলেন। জেএসএস সন্তু গ্রুপ ও সেনা মদতপুষ্ট সংগঠনের প্রবল চাপ সত্ত্বেও তিনি মনোনয়ন পত্র প্রত্যাহার করেননি। এতে তার প্রতিবাদী ভাবমূর্তি আরও বৃদ্ধি পেয়েছে, এবং তার প্রতি একের পর এক অন্যায় হওয়ার কারণে তিনি সাধারণ জনগণের সহানুভূতিও লাভ করেছেন।

কিছুটা দেরীতে প্রচারণা শুরু করলেও ধর্ম জ্যোতি চাকমার পক্ষে ব্যাপক জনসমর্থন লক্ষ্য করা যাচ্ছে। এতদিন যারা ঠিক করতে পারেননি কাকে ভোট দেবেন, তারা এখন তার ঘোড়ার পিঠে সওয়ার হচ্ছেন। সবচেয়ে বড় কথা হলো, ইউপিডিএফ সুশীল সমাজের মনোনীত প্রার্থীকে সমর্থন দিতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। আর এই দলটির খাগড়াছড়িতে সুদৃঢ়-সুসংগঠিত সাংগঠনিক ভিত্তি ও ব্যাপক জনসমর্থন রয়েছে, যা নির্বাচনে সঠিকভাবে ব্যবহার করা গেলে ঘোড়ার জয় শতভাগ নিশ্চিত। এছাড়া বাড়তি পাওনা হিসেবে তিনি আওয়ামী লীগের একটি বড় অংশের ভোটও পেতে পারেন বলে ধারণা করা যায়। কারণ তারা তাদের ভোটগুলো অস্থানে দিয়ে তাদের জাত শত্রু ওয়াদুদ ভূঁইয়ার বিজয় নিশ্চিত করে দেবেন না।
ধর্ম জ্যোতি চাকমাই খাগড়াছড়িতে stabilizing factor হিসেবে সবার জন্য পছন্দের হতে পারেন। ওয়াদুদ ভূঁইয়া নির্বাচিত হলে খাগড়াছড়িতে তার দলের বিরুদ্ধ পক্ষ, আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী ও সমর্থকদের আর কোন অস্তিত্ব থাকবে না। এটা তারা ভালো করেই জানেন। নির্বাচিত না হতেই তিনি তার দলের বিরোধী পক্ষ ও আওয়ামী লীগারদের যেভাবে কোণঠাসা করে রেখেছেন, নির্বাচিত হলে কী করবেন তা সহজেই অনুমেয়। এক কথায় ওয়াদুদ ভূঁইয়ার শত্রু হলো ঘরে-বাইরে সবখানে। এরা যদি সবাই এক জোট হতে পারে তাহলে তার পরাজয় আরও সহজ হয়ে যাবে। ফলে সব দিক বিবেচনায় ঘোড়ার জয় ঠেকিয়ে রাখা প্রায় অসম্ভব হতে চলেছে বলে সচেতন মহল মনে করছেন।
সিএইচটি নিউজে প্রকাশিত প্রচারিত কোন সংবাদ, তথ্য, ছবি ,ভিডিও, কনটেন্ট ব্যবহার করতে হলে কপিরাইট আইন অনুসরণ করে ব্যবহার করুন।
