জেএসএস সন্তু গ্রুপের নির্বাচনী কৌশল সম্পর্কে

0


সচিব চাকমা, সদস্য, কেন্দ্রীয় কমিটি, ইউপিডিএফ



জাতীয় সংসদ নির্বাচন পার্বত্য চট্টগ্রামের জনগণের জন্য কতটা গুরুত্বপূর্ণ তা নতুন করে বলার প্রয়োজন নেই। সংসদে জনগণের সত্যিকার দায়িত্ববান প্রতিনিধি পাঠানো গেলে জাতীয় পরিসরে জনগণের আন্দোলন বিস্তৃত হয়। জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষা ও দাবি-দাওয়ার কথা তুলে ধরা যায়। স্বাধীনতার পর এ যাবত কেবল মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা ও উপেন্দ্র লাল চাকমা এই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পেরেছিলেন। ১৯৭৯ সালের পর পার্বত্য চট্টগ্রামের জনগণ আর কাউকে জাতীয় সংসদে তাদের প্রতিনিধি হিসেবে পাঠাতে পারেনি, বা সঠিকভাবে বলতে গেলে, পাঠাতে দেয়া হয়নি।

মূলতঃ জনসংহতি সমিতির সুবিধাবাদী ভুল নির্বাচনী কৌশলই এর জন্য দায়ি। সমিতি ১৯৯১ সালের নির্বাচন থেকে গত ৩৫ বছর ধরে সংসদ নির্বাচনে একটি কৌশলই গ্রহণ করেছে: সেটা হলো তথাকথিত জাতীয় রাজনৈতিক দলের সাথে আঁতাত করা। তাই তারা এই সাড়ে তিন দশকে জনগণকে কখনো আওয়ামী লীগকে, কখনো বিএনপিকে ভোট দিতে বাধ্য করেছে। কিন্তু কেন এই দুই দলকে ভোট দিতে হবে তার যুক্তিসঙ্গত বোধগম্য কোন ব্যাখ্যা তারা দেয়নি, বা দিতে পারেনি। তবে তাদের এই ভুল কৌশলের ফল কখনই জনগণের স্বার্থের পক্ষে যায়নি। বরং তার কুফল হয়েছে ভয়াবহ ও সুদূরপ্রসারী।

প্রথমত, নির্বাচিত হয়ে পাহাড়ি আওয়ামী লীগার ও পাহাড়ি বিএনপি-ওয়ালারা জাতীয় সংসদে জনগণের পক্ষে কোন কথা বলেনি বা দলীয় শৃঙ্খলার কারণে বলতে পারেনি। তারা এমপি হয়ে কেবল নিজেদের ব্যক্তিগত আখের গুছিয়েছে। এমনকি অনেক ক্ষেত্রে তাদের ভূমিকা ছিল গণবিরোধী। এমন কোন দৃষ্টান্ত পাওয়া যাবে না, যেখানে বিএনপি ও আওয়ামী লীগের টিকেটে নির্বাচিত হওয়া পাহাড়ি এমপিরা স্বজাতির জনগণের ওপর চলা নির্দয় দমনপীড়নের বিরুদ্ধে, সাম্প্রদায়িক হামলা, ভূমি বেদখেলের বিরুদ্ধে সংসদের ভেতরে ও বাইরে প্রতিবাদ করেছেন।

দ্বিতীয়ত, জেএসএসের অপরিণামদর্শী নির্বাচনী কৌশল পাহাড়ি জনগণকে আওয়ামী লীগ ও বিএনপিতে যোগ দিতে উৎসাহিত করে। আজ যে বাধভাঙা পানির মতো পাহাড়িরা ওয়াদুদ ভূঁইয়ার নির্বাচনী সমাবেশে ভিড় করছে তা জেএসএসের এই সুবিধাবাদী নির্বাচনী কৌশলেরই ফল। আওয়ামী লীগ ও বিএনপির প্রার্থীকে ভোট দিতে বলা মানেই হলো জনগণের মধ্যে সুবিধাবাদকে জনপ্রিয় করা, তাদেরকে এই দুই দলের দিকে ঠেলে দেয়া। যারা সত্যিকার দেশপ্রেমিক ও আন্দোলনকামী, তারা কখনই এটা করতে পারেন না।

তৃতীয়ত, জেএসএসের নির্বাচনী কৌশল আওয়ামী লীগ ও বিএনপিকেই লাভবান করেছে এবং পার্বত্য চট্টগ্রামে বাঙালি জাতীয়তাবাদ ও বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদকে পরিপুষ্ঠ করেছে। অথচ উচিত ছিল নির্বাচনকে ব্যবহার করে নিজেদের জাতীয়তাবাদকে, জুম্ম/জুম্মো জাতীয়তাবাদকে শক্তিশালী করা। কারণ আমাদের মতো জাতীয় মুক্তির সংগ্রামকে সফল করতে হলে জাতীয়তাবাদী চেতনার বিস্তার ঘটিয়ে বৃহত্তর জাতীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠা ছাড়া কোন বিকল্প নেই। অথচ জেএসএস নেতৃত্ব এমন কৌশল গ্রহণ করে যাতে নিজেদের জাতীয়তাবাদী শক্তি ও ঐক্য দুর্বল হয়ে যায়।

চতুর্থত, নির্বাচনে আওয়ামী লীগ বা বিএনপিকে ভোট দেয়ার কৌশল গ্রহণ করা হলে তাতে পাহাড়িদের নিজস্ব ইস্যুগুলো চাপা পড়ে যায়। বিএনপি ও আওয়ামী লীগের ইস্যু-কর্মসূচি এবং আমাদের ইস্যু ও কর্মসূচি এক নয়। নির্বাচনে যেখানে আমাদের নিজস্ব প্রধান জাতীয় ইস্যুগুলো – যেমন স্বায়ত্তশাসন, ভূমি অধিকার, সেনাশাসন ও নিপীড়ন, সাংবিধানিক স্বীকৃতি, পাহাড়ি নারীদের ওপর যৌন সহিংসতা – এসব ইস্যুগুলো সামনে আনা উচিত, সেখানে আওয়ামী লীগ ও বিএনপিকে সমর্থন করার কারণে তথাকথিত জাতীয় দলের ইস্যুগুলোই প্রাধান্য পায়।

পঞ্চমত, জেএসএসের ভুল নির্বাচনী কৌশল পার্বত্য চট্টগ্রামে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির রাজনীতিকে প্রতিষ্ঠা লাভ করতে সহায়তা করে। তাদের এই কৌশলের কল্যাণে আজ এই দুই দলের প্রভাব তৃণমূল পর্যন্ত বিস্তৃত হতে পেরেছে। এটা খাল কেটে কুমির আনার মতো অপরিণামদর্শী কাজ। পার্বত্য চট্টগ্রামে নিয়োজিত গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর সরকারের কাছে একটি সুপারিশ ছিল, তথাকথিত জাতীয় রাজনৈতিক দলগুলোর কেন্দ্রীয় নেতারা যাতে ঘন ঘন পার্বত্য চট্টগ্রাম সফর করেন। এই সুপারিশের উদ্দেশ্য হলো ”জাতীয় নেতাদের” সফরের মাধ্যমে পার্বত্য চট্টগ্রামে পাহাড়ি স্বার্থ বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর প্রভাব গভীরতর করা। জেএসএসের নির্বাচনী কৌশল গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর লক্ষ্যকেই সাহায্য করে।

জেএসএসের এই আত্মঘাতী নির্বাচনী কৌশলের উৎস হলো দলটির দক্ষিণপন্থী সুবিধাবাদ। তাদের এই কৌশল জনগণের আন্দোলনকে অগ্রসর না করে, বরং অনেক পেছনে নিয়ে যায়। আওয়ামী লীগ, বিএনপির “বাঙালি” ও “বাংলাদেশী” জাতীয়তাবাদের চাপে বর্তমানে জুম্ম/জুম্মো জাতীয়তাবাদ অপসৃয়মান। জেএসএস জনগণের কাছে এমন দলকে ভোট দিতে আহ্বান জানায়, যে দল তাদের ওপর নিষ্ঠুর দমনপীড়ন চালায় এবং তাদের জাতীয় অস্তিত্ব বিলুপ্ত করে দিতে চায়। কোন সুস্থ মস্তিষ্কসম্পন্ন নেতৃত্ব এ ধরনের আত্মঘাতী, অপরিণামদর্শী কৌশল গ্রহণ করতে পারে না।

এবারের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও জেএসএস সন্তু গ্রুপ বিএনপি প্রার্থীদের পক্ষে জোর প্রচারণা চালাচ্ছে। তারা নিজেদের জুম্ম/জুম্মো জাতীয়তাবাদ ভুলে গিয়ে “বাংলাদেশী” জাতীয়তাবাদের পিঠে সওয়ার হয়েছে। তাদের এই কৌশল তাদের আঞ্চলিক পরিষদের গদি রক্ষা করতে সহায়ক হতে পারে, কিন্তু তাতে জনগণের, আন্দোলনের কোন লাভ হবে না। অতীতেও জেএসএস নেতৃত্ব একই কৌশলে আঞ্চলিক পরিষদের গদি রক্ষা করেছে বটে, কিন্তু তাতে জনগণের কোন লাভ হয়নি – লাভ হয়েছে সেনা শাসকগোষ্ঠীর। তারা জেএসএসকে ঢাল-তলোয়ার-বিহীন আঞ্চলিক পরিষদের গদিতে রেখে জনগণের শক্তিকে বিভক্ত ও আন্দোলনকে ঠেকিয়ে রাখতে সক্ষম হয়েছে।

অতীতে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি থেকে নির্বাচিত পাহাড়ি এমপিরা জনগণের স্বার্থে কোন কাজ করতে পারেনি। সাচিংপ্রু জেরী, দীপেন দেওয়ান ও সমীরণ দেওয়ানও তার ব্যতিক্রম হবেন না। যারা রাঙ্গামাটি, খাগড়াছড়ি, গুইমারা ও দীঘিনালায় ভয়াবহ সাম্প্রদায়িক হামলার প্রতিবাদে একটি শব্দও উচ্চারণ করেনি, যারা বান্দরবানে বম জাতিগোষ্ঠীর ওপর নিষ্ঠুর নিপীড়ন ও গণহত্যার বিরুদ্ধে সামান্যতম প্রতিবাদ করেনি, যারা যুগের পর যুগ ধরে চলা জাতিগত নিপীড়নের বিরুদ্ধে একটি আঙুলও তোলেনি, তারা নির্বাচিত হলে জাতীয় সংসদে কীভাবে জনগণের পক্ষে কথা বলবে? ভাবতে অবাক লাগে, অতীতে তাদের দালালি ও নিপীড়ন-সহায়ক ভূমিকা সত্ত্বেও, তারা জনগণের ভোট চাইতে আসে কোন মুখে? এটা কি আসলে তাদের দুঃসাহস নয়? যেখানে ”হজ্” কুকুরকে (রোগগ্রস্ত-জরাজীর্ণ অচ্ছ্যুত কুকুর) যেভাবে তাড়িয়ে দেয়া হয়, সেভাবে ঘৃণাভরে তাদেরকে প্রত্যাখ্যান করা উচিত, সেখানে জেএসএস (সন্তু) তাদেরকে ও সেই সাথে তাদের সুবিধাবাদী, জুম্ম-জাতীয় স্বার্থ পরিপন্থী রাজনীতি ও আদর্শকে প্রতিষ্ঠা করতে উঠেপড়ে লেগেছে। জেএসএসের ভুল নেতৃত্বের কারণেই আজ তাদের এত দুঃসাহস ও দৌর্দণ্ড প্রতাপ।

জেএসএস (সন্তু) নেতৃত্বের উচিত অতীতের ভুল থেকে শিক্ষা নেয়া এবং জাতির বৃহত্তর স্বার্থে তাদের আত্মঘাতী নির্বাচনী কৌশল পরিত্যাগ করে সঠিক, বাস্তবসম্মত এবং আন্দোলন ও জাতীয় ঐক্যের পক্ষে সহায়ক নির্বাচনী কৌশল গ্রহণ করা।

(৩০ জানুয়ারি ২০২৬)



This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. AcceptRead More