ঢাকায় লেখক, শিল্পী ও সংস্কৃতিকর্মীদের জাতীয় কনভেশন, পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে প্রতিরোধ সাংস্কৃতিক স্কোয়াডের অংশগ্রহণ

0
লেখক, শিল্পী ও সংস্কৃতিকর্মীদের জাতীয় কনভেনশনে অংশ নেওয়া প্রতিনিধিবৃন্দ।  

ঢাকা, সিএইচটি নিউজ
শুক্রবার, ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬

ঢাকায় ‘গণতান্ত্রিক সাংস্কৃতিক ঐক্য’-এর আয়োজনে লেখক, শিল্পী ও সংস্কৃতিকর্মীদের জাতীয় কনভেনশন অনুষ্ঠিত হয়েছে। এতে পার্বত্য চট্টগ্রামের সাংস্কৃতিক সংগঠন ‘প্রতিরোধ সাংস্কৃতিক স্কোয়াড’ও অংশ নিয়েছে।

আজ শুক্রবার (১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬) সকাল ১১টায় বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমীর জাতীয় নাট্যশালা মিলনায়তনে কনভেনশন উদ্বোধন করেন সিনিয়র সাংবাদিক ও লেখক নূরুল কবীর। এতে সভাপতিত্ব করেন গণতান্ত্রিক সাংস্কৃতিক ঐক্যের আহ্বায়ক জামশেদ আনোয়ার তপন।

লেখক, শিল্পী ও সংস্কৃতিকর্মীদের জাতীয় কনভেনশন উদ্বোধন করছেন সাংবাদিক ও লেখক নূরুল কবীর। 

উদ্বোধন শেষে একটি একটি র‌্যালি শিল্পকলা একাডেমি সড়ক প্রদক্ষিণ করে।  

র‌্যালি শেষে কনভেনশনের মূল আলোচনাপর্ব শুরুর আগে ‘প্রতিরোধ সাংস্কৃতিক স্কোয়াড’-এর শিল্পীরা রণজিত দেওয়ানের গাওয়া “ধান খেলে মুড়োত যা, পানি খেলে ছড়াত যা…” গানের মাধ্যমে একটি দলীয় নৃত্য পরিবেশ করেন।

লেখক, শিল্পী ও সংস্কৃতিকর্মীদের জাতীয় কনভেনশনে প্রতিরোধ সাংস্কৃতিক স্কোয়াড-এর শিল্পীদের নৃত্য পরিবেশনা।
লেখক, শিল্পী ও সংস্কৃতিকর্মীদের জাতীয় কনভেনশনে প্রতিরোধ সাংস্কৃতিক স্কোয়াড-এর শিল্পীদের নৃত্য পরিবেশনা। 

আলোচনা সভায় কনভেনশনের উদ্বোধক নূরুল কবীর বলেন, ‘জুলাই অভ্যুত্থানে আপনারা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে এবং নানা অঙ্গীকার করে রাষ্ট্রে জনমুখী ও গণতান্ত্রিক পরিবর্তন চেয়েছিলেন। কিন্তু রাজনৈতিকভাবে সেই পরিবর্তন ধরে রাখা সম্ভব হয়নি, তা আমাদের হাতছাড়া হয়ে গেছে। এটিই বাস্তব চিত্র। তবে বাংলাদেশের জন্য এটি কোনো নতুন ঘটনা নয়। এর আগে ১৯৬৯ এবং ১৯৯০ সালের গণঅভ্যুত্থানের পরেও একই ঘটনা ঘটেছিল। ঠিক একইভাবে ২০২৪ সালের অভ্যুত্থানের পরেও কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন হাতছাড়া হয়ে গেল।’

তিনি আরও বলেন, ইতিহাসের নিয়ন্ত্রণ নিতে হলে সাংস্কৃতিক জাগরণকে সারা দেশে ছড়িয়ে দিয়ে রাজনৈতিক শক্তির উদ্বোধন ঘটাতে হবে।

ফরাসি, রুশ বিপ্লব ও বাঙালির মুক্তিসংগ্রামের ইতিহাস টেনে নূরুল কবীর বলেন, যতদিন পরিবর্তনের স্বপ্ন দেখা শিল্পী, সাহিত্যিক ও কবি তৈরি না হয়, ততদিন রাজনৈতিক বৈপ্লবিক পরিবর্তন সাধিত হয় না।

অধ্যাপক আনু মোহাম্মদ বলেন, ‘আমাদের এই জমিনের ইতিহাস যেমন প্রতিরোধের, তেমনি বারবার প্রতারণা, বেইমানি ও প্রত্যাশাভঙ্গেরও।’

তিনি জানান, প্রতিকূলতা সত্ত্বেও সমাজে নতুন আশার সঞ্চার হয়েছে এবং নতুন লড়াইয়ের তাগিদ তৈরি হয়েছে।

লেখক, শিল্পী ও সংস্কৃতিকর্মীদের জাতীয় কনভেনশনে কথা বলেন অধ্যাপক আনু মোহাম্মদ। সংগৃহীত ছবি

সংস্কৃতির লড়াইকে সব লড়াইয়ের ভিত্তি উল্লেখ করে আনু মোহাম্মদ বলেন, ‘উচ্চশিক্ষিতদের কেউ কেউ দাসত্বের সংস্কৃতি লালন করে মার্কিন বাণিজ্য চুক্তি, ফুলবাড়ীতে উন্মুক্ত কয়লাখনি বা বিদেশিদের চট্টগ্রাম বন্দর দেওয়াকে সমর্থন করে। এটি মূলত ঔপনিবেশিক ও সাম্রাজ্যবাদের দাসত্বের মধ্য দিয়ে পাওয়া তৃপ্তি ও গৌরবের সংস্কৃতি। তার বিপরীতে দাঁড়িয়ে জনগণের পক্ষে, সাম্রাজ্যবাদ বা আধিপত্যের বিরুদ্ধে লড়াই করাটাও একটা সংস্কৃতি।’

৫ আগস্টের পর ভাস্কর্য, শিল্পকলা, বাউল, মাজার এবং মুক্তিযুদ্ধের চিহ্নের ওপর আক্রমণ ও গান-চলচ্চিত্রের অনুষ্ঠান বন্ধ করে দেওয়ার সমালোচনা করে তিনি বলেন, ফতোয়াবাজদের এই উত্থান আকাশ থেকে পড়ে যায়নি। দীর্ঘদিন ধরেই তা সমাজের মধ্যে তৈরি হয়েছে।

ফরাসি, রুশ বিপ্লব ও বাঙালির মুক্তিসংগ্রামের ইতিহাস টেনে নূরুল কবীর বলেন, যতদিন পরিবর্তনের স্বপ্ন দেখা শিল্পী, সাহিত্যিক ও কবি তৈরি না হয়, ততদিন রাজনৈতিক বৈপ্লবিক পরিবর্তন সাধিত হয় না।

অনুষ্ঠানে বাউলশিল্পী আবুল সরকার বলেন, ‘আমি গান করতে পারি, এটাই আমার অস্ত্র। আমাকে যদি আমার মনের কথাটা সুরের মাধ্যমে প্রকাশ করতে দেওয়া হয়, এটা আমার স্বাধীনতা, আমার বেঁচে থাকার অবলম্বন। আমি মনে করি, আলাদা আলাদা সংস্কৃতির সঙ্গে জড়িত আমরা সবাই এক পরিবারের।’

লেখক, শিল্পী ও সংস্কৃতিকর্মীদের জাতীয় কনভেনশনে কথা বলেন বাউলশিল্পী আবুল সরকার। সংগৃহীত ছবি

নিজের বন্দীজীবনের কষ্টের কথা তুলে ধরে আবুল সরকার বলেন, যেদিন বুক ফুলিয়ে স্বাধীনভাবে নাচতে, গাইতে ও লিখতে পারবেন, সেদিনই তিনি প্রকৃত মুক্তি পাবেন।

সভাপতির বক্তব্যে গণতান্ত্রিক সাংস্কৃতিক ঐক্যের আহ্বায়ক জামশেদ আনোয়ার তপন বলেন, ফ্যাসিবাদের পতনের পরও সংস্কৃতিকর্মীদের কোণঠাসা ও নিপীড়নের শিকার হতে হচ্ছে।

বাউলশিল্পী আবুল সরকারকে কারাবাস ও নিপীড়নের মুখোমুখি করার নিন্দা জানিয়ে তিনি বলেন, ‘স্বৈরাচার পতনের পরও এই দমবন্ধ পরিস্থিতির পুনরাবৃত্তি ঘটছে। সংস্কৃতিকর্মীদের গান, নাটক ও শিল্পের ভাষার মধ্য দিয়েই এই দানবদের প্রতিহত করতে হবে।’

তিনি ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে মেহনতী মানুষের বৃহত্তর সংহতি গড়ে তোলার আহ্বান জানান ।

অনুষ্ঠানে আরো উপস্থিত ছিলেন গণতান্ত্রিক সাংস্কৃতিক ঐক্যের সদস্য সচিব মফিজুর রহমান লালটু, ৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানের সংগঠক ও কমিউনিস্ট নেত্রী দীপা দত্ত, লেখক রণজিৎ চট্টোপাধ্যায়, কবি মোহন রায়হানসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা বিশিষ্ট লেখক, শিল্পী, গবেষক ও সংস্কৃতিকর্মীরা।



This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. AcceptRead More