নির্বাচনী কৌশলের নামে জেএসএসের ভন্ডামি!

0


সোহেল চাকমা



আর মাত্র ১০ দিন পর আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। পরিবর্তিত রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে এই নির্বাচন পাহাড়িদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্ব বহন করছে। এই নির্বাচনের মধ্যে দিয়ে দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও পার্বত্য চট্টগ্রামে আগামী দিনের রাজনৈতিক গতিপথ কেমন হতে যাচ্ছে তার একটা সুস্পষ্ট দৃশ্যপট তৈরী হয়েছে। আরেকদিক থেকেও এই নির্বাচন পাহাড়িদের জন্য তাৎপর্যপূর্ণ। তা হলো, এই নির্বাচন পাহাড়ের রাজনৈতিক দলগুলোর প্রকৃত মুখোশ জনগণের সামনে উন্মোচন করে দিয়েছে। এতে এতদিন ধরে বিভ্রান্তি ও ধোঁয়াশার মধ্যে নিমজ্জিত থাকা তরুণ প্রজন্মের রাজনৈতিক চৈতন্যবোধে নতুন দিশা জাগবে এবং জাতীয় অস্তিত্ব রক্ষার সংগ্রামে তরুণদের সম্মিলিত শক্তিই হবে আগামী দিনের প্রতিরোধের অন্যতম হাতিয়ার।

আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে রাঙামাটি ২৯৯ নং আসনে জেএসএস নিজেদের প্রার্থী নিয়ে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করার কথা থাকলেও পরবর্তীতে তারা নির্বাচনে প্রার্থী না দিয়ে বিএনপিকে সমর্থন দিয়েছে। রাজনৈতিক টানাপোড়নের মধ্যে পার্বত্য চট্টগ্রামে এটি একটি আলোচিত বিষয়ও বটে। যাই হোক, বিএনপিকে সমর্থন দিয়ে জেএসএস নিঃসন্দেহে পাহাড়িদের সামগ্রিক স্বার্থ ক্ষুণ্ন করেছে। কেননা জুম্মদের প্রতিনিধিত্ব করার জন্য এই আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থীও রয়েছে। তারা চাইলেই নাগরিক সমাজের মনোনীত কোন প্রার্থীকে সমর্থন যোগাতে পারত। এতে পাহাড়িদের ঐক্যবদ্ধতা আরো সুদৃঢ় হতো। আশ্চর্যের বিষয় হলো, অন্তবর্তীকালীন সরকারের এই ম্যানেজমেন্ট ইলেকশনে জেএসএস বিএনপিকে সমর্থন দিয়ে পাহাড়িদের সামনে সেটিকে নির্বাচনী কৌশল হিসেবে প্রচার করছে। যা খুবই হাস্যকর। জেএসএসের এই সিদ্ধান্ত জুম্মদের জাতীয় স্বার্থ পরিপন্থী। নির্বাচনী কৌশলের নামে জুম্মদের জাতীয় স্বার্থকে বিসর্জন দিয়ে জেএসএসের এই পদক্ষেপ মূলত সুবিধাবাদী, দালালিপনা ও রাজনৈতিক দেউলিয়াত্বেরই বহি:প্রকাশ। একই সাথে পাহাড়িদের সাথে চরম ভন্ডামি।

পার্বত্য চট্টগ্রামে পাহাড়িদের ঘুম পাড়ানিয়া গান শুনিয়ে বুঝ দেয়ার কোন সুযোগ নেই। তরুণ প্রজন্ম এখন রাজনৈতিকভাবে অনেক সচেতন এবং চিন্তা-চেতনায়ও যথেষ্ট অগ্রসর। তীব্র সমালোচনা হচ্ছে না বলে একাত্তরের স্বাধীনতাবিরোধী রাজাকার, আল বদর, আল শামসের ভূমিকা নিয়ে জুম্মদের ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন ও গণআকাঙ্ক্ষার বিরোধীতা করা কিংবা শাসকগোষ্ঠীর চামচাগিরি করে কেউ পার পেয়ে যাবে তা ভাবা নিতান্তই বালখিল্যসুলভ। জেএসএস নেতৃত্বের স্মরণে রাখা উচিত ইতিহাস মীর জাফরদের কখনো ক্ষমা করে না।

পাহাড়িদের অধিকারের প্রশ্নে জেএসএসের কোন রাজনৈতিক চরিত্র নেই। সেজন্য তারা জাতীয় অস্তিত্ব রক্ষার সংগ্রামে জুম্মদের ঐক্যবদ্ধ করে আন্দোলন করার দুঃসাহস দেখাতে পারে না। এতদিন যাবৎ জেএসএস শুধুমাত্র দলীয় স্বার্থে চুক্তি বাস্তবায়ন আন্দোলন কিংবা সশস্ত্র সংগ্রামের বুলি আওড়িয়ে পাহাড়িদের মেকি স্বপ্নে মগ্ন রাখার চেষ্টা করছে। তা আজ তরুণ প্রজন্ম তথা পাহাড়ি জনগণের কাছে দিনের আলোর মতো স্বচ্ছ।

জেএসএসের রাজনৈতিক দেউলিয়াত্বে প্রকাশ পায় পাইলট ফিস বিহেভিয়ার, যা তাদেরকে শাসকগোষ্ঠীর সহচরে রুপান্তরিত করেছে। আর্ন্তজাতিক রাজনৈতিক প্রাঙ্গনে স্ক্যান্ডিনেভিয়ান এক স্কলার Earling Bijol  প্রদত্ত ‘পাইলট ফিস বিহেভিয়ার’ নামে একটি তত্ত্ব রয়েছে। পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে ছোটরাষ্ট্রগুলো সচরাচর এই নীতি প্রয়োগ করে থাকে। এই তত্ত্বের মূল কথা হল- Keeping close to the shark to avioid being eaten.  অর্থাৎ, হাঙ্গরের পাশাপাশি থেকো, যাতে হাঙ্গর তোমাকে খেয়ে ফেলতে না পারে। জেএসএস কি তবে পাইলট ফিস বিহেভিয়ারের মতো নিজেদের গদি রক্ষা, সুযোগ-সুবিধা ও ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক নিরাপত্তার কথা চিন্তা করে অনুষ্ঠিতব্য নির্বাচনে রাষ্ট্র ক্ষমতায় যাওয়ার সম্ভাব্য দল হিসেবে বিএনপিকে নির্লজ্জভাবে সমর্থন দিচ্ছে? যে বিএনপি রাষ্ট্র ক্ষমতায় থাকাকালে ১৯৯২ সালের ১০ এপ্রিল রোমহর্ষক লোগাং গণহত্যা, নানিয়াচর ও মাল্যা গণহত্যাসহ অসংখ্য জাতিগত হামলা সংঘটিত করেছে। যে বিএনপি ২০০১ সালে সরকার গঠনের পরও মহালছড়ি, মাইসছড়িতে ভয়াবহ সাম্প্রদায়িক হামলা চালিয়েছে এবং সেনাদের ‘অপারেশ উত্তরণ’ জোরদার করে পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর ওপর নিষ্ঠুর দমন-পীড়ন জারী রেখেছিল সেই বিএনপিকে সমর্থন দিয়ে জেএসএস আসলে কি অর্জন করতে চায়?

অবশ্যই এতে অবাক হওয়ারও কিছু নেই। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের বিরোধীতা করা জেএসএস দীর্ঘ ১৬ বছর পতিত আওয়ামীলীগের পদলেহন করার পর এখন বিএনপির দাসত্ববরণ করার জন্য রাজনৈতিক পতিতাবৃত্তির পথ বেছে নিয়েছে।

প্রশ্ন হচ্ছে, বিএনপি যদি রাষ্ট্র ক্ষমতায় যেতে না পারে বা সরকার গঠন করতে না পারে তাহলে জেএসএসের অবস্থান কি হবে? তারা কাকে নিয়ে রাজনীতি করবে? সেই কথা কি জেএসএস কখনো ভেবে দেখেছে? পার্বত্য চুক্তি বিরোধীতা করে চুক্তি বাতিল চাওয়া দল বিএনপিকে সমর্থন দিয়ে জেএসএস তো নিজের পায়ে কুড়াল মেরে বসল। জুম্মদের অধিকার বিকিয়ে দিয়ে জেএসএস আপামর পাহাড়ি জনগণের সমর্থন হারানোর পাশাপাশি পাহাড়িদের সঙ্গে নিয়ে রাজনীতি করার অধিকারও হারিয়েছে। একটা নীতিহীন, পথভ্রষ্ট, শাসকগোষ্ঠীর পদলেহনকারী ও জুম্ম স্বার্থ বিরোধীতাকারী দলকে পাহাড়িরা জেনেশুনে আর সমর্থন করবে না। জাতীয় স্বার্থ পরিপন্থি দল হিসেবে জেএসএস ইতিহাসের আস্তাকুড়ে নিক্ষিপ্ত হবে।

প্রসঙ্গক্রমে, যেখানে পাহাড়িরা ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন সংগঠিত করার চেষ্টা করছে, সংসদে প্রকৃত জনপ্রতিনিধিত্বশীল প্রার্থী নির্বাচন করার চেষ্টা করছে সেখানেই জেএসএস শাসকগোষ্ঠীর পক্ষ নিয়ে পাহাড়িদের আন্দোলনে প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়িয়েছে। এতে জুম্মরা বিভাজিত হয়েছে, লাভবান হয়েছে শাসকগোষ্ঠী। সেটলমেন্ট প্রজেক্টের প্রণেতা জিয়াউর রহমানের দল (বিএনপি) পাহাড়িদের অধিকারের পক্ষে সহায়ক কোন দল নয়, তা সত্ত্বেও জেএসএস কেন নির্বাচনে বিএনপিকে সমর্থন করল? মূলত, ক্ষমতার লোভে আঞ্চলিক পরিষদের গদি রক্ষার জন্য, নিরাপদ জীবনযাপন ও সরকারের সুযোগ-সুবিধা ভোগ করার অভিপ্রায়ে জেএসএস নিজেদের ঝধভব ঊীরঃ খোঁজার চেষ্টা করছে। এতে পাহাড়িদের কোন স্বার্থ নেই।

বস্তুত, জেএসএস ১৯৯৭ সালে পাহাড়িদের গণমুক্তির আকাঙ্ক্ষা জলাঞ্জলি দিয়ে আত্মসমর্পন করে জাতীয় মুক্তির আন্দোলন থেকে সরে দাঁড়িয়েছে। এতদিন শুধুমাত্র চুক্তি বাস্তবায়নের আন্দোলনের গাঁজাখুরি গল্প শুনিয়ে তরুণ প্রজন্মকে আন্দোলন থেকে সরিয়ে রেখেছে এবং শাসকগোষ্ঠীর এজেন্ডা বাস্তবায়ন করেছে। জেএসএস কখনো জাতীয় অস্তিত্ব রক্ষার সংগ্রামে পাহাড়িদের কৃচ্ছ্রসাধন করতে পারবে না। তাদের সেই রাজনৈতিক দৃঢ়তা নেই। তাই জেএসএসের নেতৃবৃন্দ দীর্ঘদিন আওয়ামীলীগের ঘাড়ে বসে আখের গোছানোর পর এখন বিএনপি ঘাড়ে ওঠার চেষ্টা করছে। নিখাদ নির্লজ্জ, নীতি-নৈতিকতাহীন, ভন্ড, চরম প্রতিক্রিয়াশীল ও নিকৃষ্ট দালালী সংগঠন না হলে এমন কাজ করা কারো পক্ষে সম্ভব না।

সুতরাং আর কালক্ষেপন নয়, জুম্ম স্বার্থ বিরোধী, সংঘাতপন্থী প্রতিক্রিয়াশীলদের হটিয়ে ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়ার এখনই প্রকৃত সময়। সংগ্রামী ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনার মহৎ দায়িত্ব তরুণ প্রজন্মের কাঁধের ওপর, শত শহীদের রক্তে ভেজা মাতৃভূমির মা-বোনের সম্ভ্রম, সম্পদ ও আত্মনিয়ন্ত্রাধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে আমরা হারব না।#

সোহেল চাকমা, সহ-সাধারণ সম্পাদক, পাহাড়ি ছাত্র পরিষদ, কেন্দ্রীয় কমিটি।



This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. AcceptRead More