শান্তিবাহিনীর সশস্ত্র সংগ্রাম প্রসঙ্গ: রবি ত্রিপুরার সমালোচনার জবাবে

0

শান্তিবাহিনীর সদস্যবৃন্দ। সংগৃহিত ছবি


মিল্টন চাকমা, সংগঠক, দীঘিনালা ইউনিট, ইউপিডিএফ



কিছুটা বিলম্বে খেয়াল করলাম, আমার লেখা একটি প্রবন্ধের ওপর পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির নিউজ পোর্টালে (hillvoice.net) রবি ত্রিপুরা নামে এক ব্যক্তি একটি প্রতিক্রিয়া লিখেছেন। তিনি তার লেখার শিরোনাম দিয়েছেন “ইউপিডিএফ নেতা মিল্টন চাকমার ‘কেমন ছিল শান্তিবাহিনীর সশস্ত্র সংগ্রাম’ প্রসঙ্গে”।

বরাবরের মতোই জেএসএসের পরিচিত ভঙ্গিতে তিনি শুরুতেই আমার প্রবন্ধকে মনগড়া, মিথ্যা এবং রাজনৈতিক ফায়দা লাভের চেষ্টা বলে খারিজ করে দেয়ার প্রয়াস চালিয়েছেন। এরপর তিনি তার ভাষায় “মিল্টন বাবু তথা প্রসিত গংদের দায়িত্বশীল কীর্তির উপর সওয়াল” তুলেছেন।

যেহেতু ‘রবি ত্রিপুরা’ নামে জেএসএসের কোনো নেতৃত্বস্থানীয় ব্যক্তির অস্তিত্ব আমি খুঁজে পাইনি, তাই  এটা ধারণা করা যুক্তিসঙ্গত যে, তিনি ছদ্মনামে জেএসএসের কোনো একজন নেতা বা গুরুত্বপূর্ণ সদস্য হবেন।

বলে রাখা ভাল, ছদ্মনামে লেখা কোনো অপরাধ নয়। ইতিহাসে অনেক নামকরা কবি, সাহিত্যিক ও প্রাবন্ধিক ছদ্মনামে লিখেছেন। কিন্তু ছদ্মনামের আড়ালে নিজেকে লুকিয়ে মনগড়া, মিথ্যা, বানোয়াট ও কাল্পনিক তথ্য ছড়িয়ে জনগণকে বিভ্রান্ত করা হলে সেটা গর্হিত ও অনৈতিক কাজ হয়ে যায় এবং তা কোনভাবে মেনে নেয়া যায় না।

প্রকৃত পরিচয়ে লেখা হলে লেখার পেছনে একটি দায়িত্ববোধ থাকে। কিন্তু ছদ্মনামে হলে অনেক কিছুই লেখা যায়। প্রতিক্রিয়া ব্যক্তকারী লেখকও (রবি ত্রিপুরা) হয়তো সেই সুযোগটা নিতে চেয়েছেন। তবে সেটা করতে গিয়ে তিনি একটা পেয়ে আর একটা হারিয়েছেন। তিনি তার ইচ্ছামাফিক যা-তা ”ইতিহাস” লেখার সুযোগ পেয়েছেন বটে, কিন্তু হারিয়েছেন তার বিশ্বাসযোগ্যতা। ঘটে যাওয়া ইতিহাসের প্রকৃত ঘটনা নিয়ে ছদ্মনামে লেখা হলে তা মানুষকে শুধু বিভ্রান্তই করতে পারে, কোনো সঠিক পথ দেখাতে পারে না।

আমার লেখাটি ছিল মাত্র সাড়ে সাতশ শব্দের মধ্যে। আর তার জবাবে রবি ত্রিপুরা নামের ছদ্মবেশী লেখক একুশ শ’র বেশি শব্দের গাঁথুনি দিলেন। আমার লেখাটির প্রায় তিন গুণ বেশি বড় হলেও তিনি মূল প্রসঙ্গ থেকে চ্যুত হয়ে অনেক অপ্রসাঙ্গিক বিষয়ের অবতারণা করেছেন। যেমন কোথায় শান্তিবাহিনীর সফলতা-ব্যর্থতা নিয়ে আলোচনা, আর তিনি অপ্রাসঙ্গিকভাবে টেনে আনছেন পিসিপির খাগড়াছড়ি জেলা সম্মেলনকে। এছাড়া লেখার বাকি অংশও অনেক মিথ্যা ও মনগড়া তথ্যে ভরপুর। প্রকৃত সত্য তুলে ধরার স্বার্থে এর কিছু জবাব দেয়া একান্ত জরুরী।

১) একশ’ জনের কর্মী বাহিনীর তালিকা প্রেরণ: জঘন্য মিথ্যাচার:

রবি ত্রিপুরা বুঝি জেএসএস ও প্রসিত দার হাঁড়ির সব খবর জানেন। অথচ জেএসএসে এই নামে কোন নেতার সন্ধান আমরা জানি না; প্রসিত দা এবং আমরা কেউ তাকে চিনি না। যাই হোক, তিনি বলেছেন:

”তৎকালীন সময়ে পার্টির নেতৃত্ব শক্তিশালী ও সশস্ত্র আন্দোলন জোরদারকরণে জেএসএস’এর নেতৃত্ব ১৯৯৫ সালে পার্বত্য চট্টগ্রাম পাহাড়ী ছাত্র পরিষদ (পিসিপি) ও পাহাড়ী গণপরিষদ (পিজিপি) থেকে সদস্য রিক্রুট করার জন্য একটি আহবান জানান। পিসিপি ও পিজিপির নেতৃত্ব এবং পিসিপির সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যকে না জানিয়ে বা আলোচনা না করে প্রসিত বিকাশ খীসা ও সঞ্চয় চাকমা মিলে ১০০ জনের কর্মী বাহিনীর নামের তালিকা পার্টির নিকট প্রেরণ করে। নেতৃদ্বয়ের কাছ থেকে তালিকা পেয়ে পার্টির নেতৃত্ব পিসিপি ও পিজিপির কর্মীদের গুরুত্ব দিয়ে আলাদা ঘরবাড়ি প্রস্তুত করে রাখে। পিসিপি ও পিজিপির কর্মী বাহিনীর জন্য পার্টির নেতৃত্ব অপেক্ষা করতে থাকে। কিন্তু দীর্ঘ সময় পার করে জনপ্রিয় কণ্ঠশিল্পী কালায়ন চাকমা ও বর্তমানে র‌্যারে চাকরিরত প্রিয়দর্শী চাকমাসহ ১০-১৫ জনের একটি টিম নির্ধারিত গন্তব্যে পৌঁছায়।”

রবি বাবু এই তথ্যটি কোথায় পেয়েছেন তার কোন রেফারেন্স দিতে পারেননি। দিতে পারার কথাও নয়। কারণ কোন জেএসএস নেতা আজ পর্যন্ত এই কথা বলেননি। আমিও কোনদিন শুনিনি, আমার সহযোদ্ধারাও এই আজগুবি কথা শুনেছেন বলে আমাকে জানায়নি। সন্তু লারমা ও উষাতন তালুকদার হরহামেশা প্রসিতদাদের বিরুদ্ধে বিষোদ্গার করেন এবং অনেকে উল্টা-পাল্টা বক্তব্য দেন। কিন্তু কই তাদের মুখ থেকেও তো এমনতর অভিযোগ কোনদিন শোনা যায়নি! তাহলে জেএসএস-এর যে অভ্যন্তরীণ গোপনীয় বিষয় খোদ জেএসএস নেতারা জানেন না, সেই বিষয় রবিবাবু জানেন কী করে? এটেই কি প্রমাণ হয় না যে তার দেয়া উপরোক্ত তথ্য সম্পূর্ণ ভূয়া ও কল্পনিক?

আমি ক্রসচেক দেয়ার জন্য ও একইসাথে এ বিষয়ে আমার ব্যক্তিগত কৌতুহল মেটানোর জন্য প্রসিতদার শরণাপন্ন হলাম এবং এ বিষয়ে তার কাছ থেকে জানতে চাইলাম। তার ভাষ্য মতে, ১০০ জনের কর্মীবাহিনীর তালিকা পাঠানোর তথ্য একটি কিচ্ছা ছাড়া কিছুই নয়। যেখানে তারা নিজেরাই জেএসএস-শান্তিবাহিনীতে ভর্তি হতে সচিব চাকমা ও অভিলাষ চাকমাসহ অন্যান্যদের নিরুৎসাহিত করছিলেন, সেখানে ভর্তির জন্য ১০০ জনের লিস্ট পাঠাতে যাবেন কেন? তাছাড়া সে সময় সরকারের সাথে জনসংহতি সমিতির সংলাপ চলছিল এবং সবাই বৈঠকের ফলাফল কী হয় তার জন্য অপেক্ষা করছিল। পিসিপি-পিজিপি-এইচডব্লিউএফের নেতৃত্বে গণআন্দোলনও ছিল তুঙ্গে। প্রসিত দা তার সহযোদ্ধাদের অর্থাৎ আমাদের সাথে আলোচনা না করে কোনদিন কোন গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেননি। তিনি যদি ১০০ জনের লিস্ট পাঠাতেন, তাহলে তিনি আমাদের কারো না কারও সাথে অবশ্যই আলোচনা করতেন। কাজেই রবি ত্রিপুরার ১০০ জনের লিস্টের তথ্য বোমা ফিউজড!

প্রসিতদা বরং আমাদের অনেক আগে বলেছিলেন, ১৯৯৫ সালে যখন শেষ বার সন্তু বাবুর সাথে তার দেখা হয়েছিল, তখন সন্তু বাবু তাকে জেএসএসে যোগ দিতে অনুরোধ করেছিলেন। প্রসিতদা যোগ দেয়ার আগে জেএসএসের গঠনতন্ত্র পড়তে চেয়েছিলেন। সন্তু বাবু বলেছিলেন তিনি সেটা পড়তে দেবেন এবং এক কপি পাঠিয়ে দেবেন। কিন্তু তিনি কথা রাখেননি। ২০১৮ সালে উভয় পার্টির মধ্যে বৈঠকের সময়ই (যখন চতুর্থবারের মতো সমঝোতা হয়েছিল) কেবল জেএসএস তাদের গঠনতন্ত্র ইউপিডিএফের কাছে সরবরাহ করেছিল। অর্থাৎ কথা দেয়ার ২৩ বছর পর।

এখানে হয়ত অপ্রাসঙ্গিক হতে পারে, তারপরও তথ্যের জন্য বলে রাখা ভালো হবে যে, প্রসিতদারা জেএসএস নেতৃত্বকে আওয়ামী লীগ সম্পর্কে অগ্রিম সতর্ক করে দিয়েছিলেন। কিন্তু জেএসএস নেতৃত্ব আওয়ামী লীগকে “আদিবাসী পাহাড়িদের প্রতি সহানুভূতিশীল” ও “জাতীয় বুর্জোয়া দল” বলে মূল্যায়ন করত, যার সাথে প্রসিতদারা কখনো একমত ছিলেন না। ফলতঃ যাই হবার তাই হয়েছে। জেএসএস আওয়ামী লীগকে বিশ্বাস করেছে, আর প্রতারিত হয়েছে। অথচ জেএসএস নেতৃত্ব যদি তখন প্রসিতদাদের কথা শুনতো এবং সতর্কতার সাথে কাজ করতো, তাহলে আজকে তাদের ব্যর্থ চুক্তি নিয়ে যে করুণ পরিণতি হয়েছে, তা হতো না। গরীবের কথা বাসি হলেই ফলে আর কী!

২) সন্তু লারমার মুক্তি ও সেটলার পুনর্বাসন প্রসঙ্গ:

রবিবাবু মনে করেন: “রাজনীতিতে আটক ও মুক্তিলাভ একটি সাধারণ বিষয়। সন্তু লারমার মুক্তির পর সেটেলারদের উপর হামলা কমানোর বক্তব্য যুক্তিহীন ও মিথ্যা।” রাজনীতিতে আটক ও মুক্তি লাভ স্বাভাবিক ঘটনা। কিন্তু এই সাধারণ বিষয়ও অসাধারণ ও বিতর্কিত হয়ে ওঠে যখন অভিযোগ ওঠে যে, সেই মুক্তি লাভ হয়েছে ৪৩-পৃষ্ঠার মুচলেকা দেয়ার বিনিময়ে। হ্যাঁ, এই অভিযোগ প্রীতি গ্রুপের। কিন্তু অভিযোগকারীর উত্তরে অভিযুক্ত (সন্তু লারমার) বক্তব্য কী সেটা জনগণ জানতে চায়। বিচারক যেমন বাদি, বিবাদী, সাক্ষী ও প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য এবং পারিপার্শ্বিক অবস্থা, প্রেক্ষাপট ইত্যাদি সবকিছু বিবেচনা করে রায় দেন, তেমনি আমরা ও জনগণ এ বিষয়ে উভয় পক্ষের ও সকল মহলের বক্তব্য শুনতে চাই এবং একটা সিদ্ধান্তে উপনীত হতে চাই। কিন্তু আজ পর্যন্ত এই অভিযোগের বিষয়ে কোন উত্তর আমরা সন্তু বাবু কিংবা রবি ত্রিপুরাদের কাছ থেকে পাইনি।

প্রথম লেখাটিতে আমার প্রশ্ন ছিল, কেন সন্তু বাবু জেল থেকে ছাড়া পাওয়ার পরই সেটলার পুনর্বাসনের বিরুদ্ধে সশস্ত্র প্রতিরোধ বন্ধের নির্দেশ দিয়েছিলেন? কিন্তু রবি বাবু সেই প্রশ্নেরও উত্তর এড়িয়ে গেছেন। তিনি জেএসএসের এত হাঁড়ির খবর পান, অথচ এই প্রশ্নের উত্তর তার জানা নেই – এটা কি বিশ্বাস করা যায়?

আর সন্তু বাবুর মুক্তি লাভের বিষয়ে বাড়তি বলার প্রয়োজন নেই। গত পরশু ফেসবুকে সিএইচটি ভয়েস থেকেও এ বিষয়ে তথ্য ও যুক্তি-নির্ভর আলোচনা করা হয়েছে। আপনি সেটা পড়ে নিতে পারেন। তবে এখানে শুধু এটাই বলতে চাই, সন্তু বাবুর মুক্তির সাথে যে সরকারের সেটলার পুনর্বাসন উদ্যোগের সম্পর্ক রয়েছে তা রবি ত্রিপুরার লেখার মধ্যেই স্পষ্ট ফুটে উঠেছে। তার ভাষায় চারটি ধাপে সরকার সেটলারদের পুনর্বাসন করে, প্রথম ধাপে পুনর্বাসনের বিরুদ্ধে সশস্ত্র প্রতিরোধ সফল হলেও, পরবর্তী তিনটি ধাপের ক্ষেত্রে ব্যর্থ হয়েছে। কারণ? কারণ প্রীতি গ্রুপের উপদলীয় চক্রান্ত এবং পরে গৃহযুদ্ধ। গৃহযুদ্ধের কারণ কি? গৃহযুদ্ধের কারণ সন্তু লারমার বিতর্কিত মুক্তি ও পার্টি ফোরামে আলোচনা না করে সন্তু লারমা কর্তৃক স্বেচ্ছাচারভাবে সেটলার পুনর্বাসনের বিরুদ্ধে সশস্ত্র প্রতিরোধ বন্ধের নির্দেশ প্রদান এবং সেটলার পুনর্বাসন মোকাবিলার জন্য ইতিপূর্বে পার্টিতে গঠিত টাস্কফোর্স ভেঙে দেয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ। অথচ রবি ত্রিপুরা সেটলার পুনর্বাসনের বিরুদ্ধে সশস্ত্র প্রতিরোধ গড়ে তোলার ব্যর্থতার দায় থেকে সন্তু লারমাকে মুক্তি দিতে চাইছেন। তবে তার বক্তব্যে এটা প্রমাণিত হয় যে, লাম্বা-বাদি গৃহযুদ্ধে যে শক্তি ব্যয় হয়েছে, তা যদি সেটলারদের প্রতিরোধের জন্য ব্যয় করা হতো তাহলে বাকি তিনটি ধাপের পুনর্বাসনও হয়ত রোধ করা সম্ভব হতো। আজ বড় প্রশ্ন থেকে যায়, সন্তু লারমার মুক্তির আগ পর্যন্ত জেএসএসে গৃহবিবাদ হয়নি, অথচ তার মুক্তির পরই তা শুরু হলো কেন? তার মুক্তি না হলে কি সেটলার পুনর্বাসন প্রতিরোধ করা যেত?

রবি ত্রিপুরা স্বীকার করেছেন লাম্বা-বাদি গৃহযুদ্ধের সুযোগ নিয়ে সরকার সেটলারদের পুনর্বাসন করে। কিন্তু তারপরও তাদের শিক্ষা হয় না। তারপরও তারা ভ্রাতৃঘাতী সংঘাত চালিয়ে যায়। তারা কী জানে না এই ভ্রাতৃঘাতী সংঘাতের সুযোগ নিয়ে সেটলাররা প্রতিদিন আবর্জনার মতো পাহাড়ে ঢুকে পড়ছে? তারা কী দেখে না, যে বালাঘাটা এক সময় সম্পূর্ণ পাহাড়ি-অধ্যুষিত ছিল, এই সংঘাতের সুযোগে সেটা আজ সম্পূর্ণ বাঙালি-অধ্যুষিত অঞ্চলে পরিণত হয়েছে? তারা কী দেখে না, এই সংঘাতের সুযোগে সেটলাররা খাগড়াছড়ি, রাঙ্গামাটি ও বান্দরবান শহরে এতটাই সংখ্যাগরিষ্ঠ হয়ে গেছে, সেখানে পাহাড়িদের যেন চোখেই পড়ে না?

জাতির এই ধ্বংসের চিত্র দেখেও সন্তু বাবুরা আগে ইউপিডিএফ নির্মূল করতে চান, সংঘাত বন্ধ করতে চান না, সমঝোতা করলে তা ভঙ্গ করেন। সেটলাররা যে বাঁধ ভাঙা পানির মতো ঢুকে পড়ছে ও ভূমি বেদখল করছে সে বিষয়ে তারা কিছুই করেন না। অপরদিকে ইউপিডিএফের ইচ্ছা থাকলেও জেএসএসের হামলা মোকাবিলার জন্য তাদের পুরো শক্তি ব্যয় করতে হচ্ছে। এ এক চরম দুঃসহ অবস্থা, যার জন্য একমাত্র দায়ি জেএসএসের (সন্তু) একনায়কতান্ত্রিকতা।

পার্বত্য চট্টগ্রামে সেটলার পুনর্বাসনের ইতিহাস সম্পর্কে জ্ঞানদান করতে ছদ্মবেশধারী রবি ত্রিপুরা লেখন, “সশস্ত্র যুদ্ধ নয়, অমুসলিম অধ্যুষিত পার্বত্য অঞ্চলকে মুসলিম অধ্যুষিত অঞ্চলে রূপান্তরিত করার জন্য সমতল থেকে সেটেলার পুনর্বাসন যে আসল কারণ তা মিল্টন চাকমা বুঝতে অক্ষম।” পার্বত্য চট্টগ্রামে বিভিন্ন সময়ে বহিরাগতদের আগমণ ও পুনর্বাসন সম্পর্কে কমবেশি আমাদের জানা আছে। কিন্তু ১৯৭৯ সালে জিয়াউর রহমান যে প্রেক্ষাপটে ও যে উদ্দেশ্যে সেটলার পুনর্বাসনের উদ্যোগ নিয়েছিলেন, তা অন্য সময়ে হওয়া পুনর্বাসন থেকে মৌলিকভাবে ভিন্ন। এই ভিন্নতার কারণে পার্বত্য চট্টগ্রামের রাজনীতি সম্পর্কে আলোচনার সময় অন্যান্য সময়ের পুনর্বাসনের চাইতে জিয়া-এরশাদের সময় রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে নিয়ে আসা সেটলারদের পুনর্বাসনের বিষয়টি বিশেষভাবে ফোকাস করা হয়। এ বিষয়টি যারা বুঝতে চায় না, তারা দিনের আলোকে অস্বীকার করতে চায়।

বাংলাদেশের শাসকগোষ্ঠী পার্বত্য চট্টগ্রামকে মুসলিম বাঙালি-অধ্যুষিত অঞ্চলে পরিণত করতে চায় – এতে কোন সন্দেহ নেই। কিন্তু ১৯৭৯ সালে সেটলার পুনর্বাসনের সিদ্ধান্ত  সম্পূর্ণ রাজনৈতিক ও সামরিক বিবেচনা থেকেই নেয়া হয়েছে বলে প্রতীয়মান হয়। বলা যায়, এটা ছিল সরকারের কাউন্টার-ইন্সার্জেন্সির  সামগ্রিক কৌশলেরই অংশ। পাহাড়ে নিয়োজিত সেনাবাহিনীকে সহযোগিতার জন্যই ”বিদ্রোহীদের” বিরুদ্ধে তাদেরকে মানবঢাল হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছিল। সুতরাং আমরা এই সিদ্ধান্তে উপনীত হতে পারি যে, ইন্সার্জেন্সী অর্থাৎ সশস্ত্র সংগ্রাম দমন ছিল ১৯৭৯ সালে সেটলার পুনর্বাসনের প্রধান লক্ষ্য।

৩) বিভেদপন্থীদের (প্রীতিগ্রুপ) গুণগান?

রবি বাবু লিখেছেন: “দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্রে সামিল হয়ে ক্ষমতার লোভে দ্রুত নিষ্পত্তি করার সস্তা স্লোগান তুলে যারা মহান নেতাকে হত্যা করে আন্দোলনের অপূরণীয় ক্ষতি করেছে, জুম্ম জনগণ যাদের ঘৃণা করে, নিন্দা করে, কিন্তু মিল্টন বাবুর ইউপিডিএফ তাদের গুণগান করে।

তার জ্ঞাতার্থে বলতে চাই, ইউপিডিএফ অন্ধভাবে কারও গুণগান কিংবা নিন্দা করতে অভ্যস্ত নয়। কোন ঐতিহাসিক আলোচনায় পার্টি ব্যক্তিকে তার ভূমিকার উপর ভিত্তি করেই মূল্যায়ন করে থাকে। আমরা যেমন লারমা হত্যার নিন্দা করি, তেমনি বলি ওস্তাদ, চাবাই মগ ও সাহিত্যিক সুহৃদ চাকমার খুনেরও নিন্দা করি। লাম্বা-বাদি গৃহযুদ্ধ শুরুর জন্য সন্তু বাবুর ভূমিকাকেও সমালোচনা করি।

অপরদিকে আমরা দেখি, জেএসএস (সন্তু) নেতারা যাদেরকে এক সময় দালাল বলে ঘোষণা করেছিলেন এবং যাদেরকে হত্যার চেষ্টা করেছিলেন, যাদেরকে জুম্ম জনগণ ঘৃণা করতো এবং এখনও করে, আজ হীন ব্যক্তিস্বার্থের আশায় তাদের সাথেই মাখামাখি করছে, তাদেরকে প্রশংসা করছে।

৪) সশস্ত্র সংগ্রামের রাজনৈতিক ও অন্যান্য প্রস্তুতি:

রবি বাবু সশস্ত্র সংগ্রামের জন্য রাজনৈতিক প্রস্তুতি হিসেবে জেএসএস যা যা করেছে তার ফিরিস্তি দিয়েছেন। তার মধ্যে রয়েছে কাপ্তাই বাঁধ বিরোধী আন্দোলন (যা মূলত একটি লিফলেট প্রচারের মধ্যে সীমিত ছিল), পাহাড়ি ছাত্র সমিতির সাংগঠনিক সফর, সন্তু বাবুদের শিক্ষকতা পেশার আড়ালে রাজনৈতিক প্রচারণা, নির্বাচনে অংশগ্রহণ, গিরিসুর শিল্পী গোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড।

আমরা জানি, সশস্ত্র সংগ্রাম হলো আন্দোলনের সর্বোচ্চ রূপ। গণআন্দোলনের একটি নির্দিষ্ট পর্যায়ে সেটা সশস্ত্র আন্দোলনের রূপ নিয়ে থাকে। কিন্তু জেএসএসের সশস্ত্র সংগ্রামের বেলায় আমরা কী দেখি? এখানে গণআন্দোলনের সুযোগ থাকা সত্বেও সেটা ব্যবহার করা হয়নি। অনেক সফল বিপ্লবী গেরিলা নেতা বলেছেন, সামান্যতম আইনী ও গণতান্ত্রিক আন্দোলনের সুযোগ থাকলেও বিপ্লবীদের তার সদ্ব্যবহার করতে হবে। সশস্ত্র সংগ্রাম শুরুর আগে জেএসএস-এর আরও রাজনৈতিক ও সামরিক প্রস্তুতি নেয়ার দরকার ছিল এবং এতে ক্ষতির কোন সম্ভাবনা ছিল বলে মনে হয় না।

(২৩ জানুয়ারি ২০২৬)



This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. AcceptRead More