পার্বত্য চট্টগ্রামের ইতিহাসে এই দিন

১০ মার্চ পার্বত্য চট্টগ্রামে ‘পূর্ণস্বায়ত্তশাসন’ দাবি উত্থাপন দিবস

0
পূর্ণস্বায়ত্তশাসন মেনে নেয়ার দাবিতে মিছিল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডাস চত্ত্বর অতিক্রমের সময় তোলা ছবি। ইত্তেফাকের সৌজন্যে।


ইতিহাস ডেস্ক, সিএইচটি নিউজ
মঙ্গলবার, ১০ মার্চ ২০২৬

পার্বত্য চট্টগ্রামের লড়াই-সংগ্রামের ইতিহাসে ১০ মার্চ একটি গুরুত্বপূর্ণ দিন। ১৯৯৭ সালের এ দিন তিন গণতান্ত্রিক সংগঠন (পাহাড়ি গণ পরিষদ, পাহাড়ি ছাত্র পরিষদ, হিল উইমেন্স ফেডারেশন)-এর উদ্যোগে ঢাকায় জাতীয় প্রেসক্লাবের সম্মুখে আয়োজিত এক সমাবেশ থেকে ‘পূর্ণস্বায়ত্তশাসন’ দাবি উত্থাপন করা হয়।

তিন সংগঠনের পক্ষ থেকে এদিন পার্বত্য চট্টগ্রামে সাংবিধানিক গ্যারান্টিসহ পূর্ণস্বায়ত্তশাসন প্রদান, বহিরাগত বাঙালিদের সমতলে সম্মানজনক পুনর্বাসনসহ ৮ দফা দাবি সম্বলিত একটি লিফলেটও প্রচার করা হয়। পার্বত্য চট্টগ্রামের আন্দোলনের ইতিহাসে এদিন প্রথম বারের মত সুস্পষ্টভাবে এ অঞ্চলে বসবাসকারী ১৩টি জাতিসত্তা ছাড়াও প্রান্তিক জনগোষ্ঠী সাঁওতাল, গুর্খা (নেপালি), অহমি এবং পুরাতনবস্তী বাঙালিদেরও মর্যাদার সাথে স্বীকৃতি, অধিকার প্রদানের দাবিসহ দ্ব্যর্থহীন ভাষায় রাজনৈতিক বক্তব্য উত্থাপিত হয়েছিল, যা এ যাবৎকালে প্রচারিত “দশ ভাষা-ভাষী ১৩ জাতি” দাবির উন্নত ও উচ্চতর রূপ।

পাহাড়ি গণ পরিষদ, পাহাড়ি ছাত্র পরিষদ  ও হিল উইমেন্স ফেডারেশন কর্তৃক পূর্ণস্বায়ত্তশাসন দাবি উত্থাপন করে প্রচারিত লিফলেট, ১০ মার্চ ১৯৯৭, ঢাকা।

চুক্তি সম্পাদনের লক্ষ্যে এ সময় সরকারের সাথে জনসংহতি সমিতির বৈঠকের ভেন্যু খাগড়াছড়ি সার্কিট হাউজ থেকে ঢাকাতে রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন পদ্মায় স্থানান্তর করে তৃতীয় বৈঠক নির্ধারিত হয় ১২ মার্চ ১৯৯৭। পার্বত্য চট্টগ্রামের জনগণের মূল দাবিকে উপেক্ষা করে সরকারেরর সাথে চুক্তিতে উপনীত হতে জনসংহতি সমিতি যখন প্রস্তুতি সম্পন্ন করে সব কিছু পাকাপাকি করে ফেলতে উদ্যত, জাতীয় জীবনের এমনই এক সন্ধিক্ষণে রাজপথে নেতৃত্বদানকারী তিন গণতান্ত্রিক সংগঠন পূর্ণস্বায়ত্তশাসনের এই দাবি উত্থাপন করে। সত্তর-আশি দশকের দাবি-দাওয়া ও বক্তব্য নিয়ে এ সময় পার্বত্য চট্টগ্রামের লড়াই সংগ্রাম এগিয়ে নেয়া অসম্ভব হয়ে পড়ে। কাজেই পূর্ণস্বায়ত্তশাসন দাবিই যুগের দাবি হয়ে দাঁড়ায়। এর মাধমে পার্বত্য চট্টগ্রামের দ্বিধাগ্রস্ত জনতা ও আন্দোলনকামী কর্মীবাহিনী খুঁজে পায় ভবিষ্যৎ পথ চলার সঠিক দিশা।

স্মর্তব্য যে, তিন গণতান্ত্রিক সংগঠনের নেতৃবৃন্দ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইবিএ ইন্সটিটিউটের সম্মুখের লনে ৮ মার্চ এক জরুরি বৈঠকে গৃহীত সিদ্ধান্ত মোতাবেক এই পূর্ণস্বায়ত্তশাসন দাবি উত্থাপন করা হয়।

এই পূর্ণস্বায়ত্তশাসন দাবিকে মূল ভিত্তি করে পরবর্তীতে ১৯৯৮ সালের ২৬ ডিসেম্বর তিন সংগঠনের সমন্বয়ে গঠিত হয় রাজনৈতিক দল ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (ইউপিডিএফ)। এই দলটির নেতৃত্বে বর্তমানে পূর্ণস্বায়ত্তশাসন প্রতিষ্ঠার আন্দোলন চলমান রয়েছে।

২০১৬ সালের ২৬ ডিসেম্বর, দীঘিনালায় ইউপিডিএফ-এর প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে স্থানীয় যুবক যুবতীরা শারীরিক কসরতের মাধ্যমে  Full Autonomy প্রদর্শন করেন।

এদিকে, দিবসটি উপলক্ষে পাহাড়ি ছাত্র পরিষদ, গণতান্ত্রিক যুব ফোরাম ও হিল উইমেন্স ফেডারেশন একটি লিফলেট প্রকাশ করেছে। ইতোমধ্যে তারা বিভিন্ন স্থানে লিফলেটি বিলি ও পথসভা কর্মসূচি পালন করেছে বলে জানা গেছে।

লিফলেটে তারা সরকারের কাছে ৭ দফা দাবি তুলে ধরেছে। দাবিগুলো হলো:

১. পার্বত্য চট্টগ্রামে সাংবিধানিক গ্যারান্টিসহ ‘পূর্ণস্বায়ত্তশাসন’ প্রদান করুন।

২. পুনর্বাসিত বাঙালিদের পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে সরিয়ে সমতলে সম্মানজনক পুনর্বাসনের উদ্যোগ নিন ।

৩. সেনাশাসন বন্ধ করে পার্বত্য চট্টগ্রামে পাহাড়িদের ওপর নিষ্ঠুর দমন-পীড়ন বন্ধ করুন।

৪. পাহাড়িদের প্রথাগত ভূমি অধিকার নিশ্চিত করুন এবং স্ব স্ব জাতিসত্তার সাংবিধানিক স্বীকৃতি দিন ।

৫. জাতিসংঘকে অন্তর্ভুক্ত করে জুলাই গণহত্যাসহ পার্বত্য চট্টগ্রামে সংঘটিত সকল গণহত্যার তদন্ত ও বিচার নিশ্চিত করুন ।

৬. অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে জুনান, রুবেল, ধনঞ্জয় হত্যার নির্দেশদাতা তৎকালীন খাগড়াছড়ি ব্রিগেডিয়ার জেনারেল শরীফ মো: আমান হাসানসহ ঘটনায় জড়িত সেনা সদস্য ও অনিক চাকমাকে প্রকাশ্যে হত্যার সাথে জড়িত সেটলারদের গ্রেফতারপূর্বক দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করুন। একই সাথে গুইমারায় আখ্র, আথুইপ্রু ও থৈইচিং মারমা’কে গুলি করে হত্যার ঘটনায় জড়িত সেনা-সেটলারদের বিচার এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে যথাযথ ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসন করুন।

৭. ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার আমলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রণালয় থেকে পার্বত্য চট্টগ্রামে জারীকৃত দমন-পীড়নমূলক ‘১১ দফা নির্দেশনা’ বাতিল করে গণতান্ত্রিক পরিবেশ নিশ্চিত করুন।




This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. AcceptRead More