কাউখালিতে পাহাড়িদের জুমঘর নিয়ে সেনাবাহিনীর অপপ্রচার, স্থানীয়দের ক্ষোভ ও শঙ্কা

0
 পাহাড়িদের এই জুমঘরগুলোকে সেনাবাহিনী মিথ্যাভাবে ‘ইউপিডিএফের আস্তানা’ দাবি করে সোস্যাল মিডিয়া ও তাদের নিয়ন্ত্রিত নিউজ পোর্টালে প্রচার করে। ছবিগুলোতে স্পষ্টভাবে জুম ক্ষেতের চিহ্ন দেখা যায়। পাহাড়ের প্রত্যেক জুমচাষী কাজের সুবিধার্থে জুমে এ ধরনের জুমঘর তৈরি করে থাকেন। 

কাউখালী প্রতিনিধি, সিএইচটি নিউজ
বুধবার, ২৮ জানুয়ারি ২০২৬

রাঙামাটির কাউখালী উপজেলার কলমপতি ইউনিয়নের নাইল্যাছড়ি এলাকায় পাহাড়িদের জুমঘরকে “ইউপিডিএফের গোপন আস্তানা” উল্লেখ করে সেনাবাহিনীর অপপ্রচারে স্থানীয়রা ক্ষোভ ও আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, গত ২৭ জানুয়ারি ২০২৬ ভোররাত আনুমানিক ৩-৪টার সময় ৭টি জীপ গাড়িতে করে সেনাবাহিনীর একটি দল কলমপতি ইউনিয়নের ৫ ও ৬ নং ওয়ার্ডের অন্তর্গত নাইল্যাছড়ি হয়ে কোলাপাড়া এলাকায় যায়। তারা কোলাপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় মাঠে গাড়ি রেখে আশেপাশে পাহাড়ে গিয়ে ঘোরাঘুরি করে।

পরে সেনারা সেখান থেকে গাড়িতে করে বের হয়ে যায়। তারা নাইল্যাছড়ি হয়ে একই ইউনিয়নের ৩ নং ওয়ার্ডের বড়ডলু পাড়ার দিকে যায়। সেখানে গিয়ে সেনা সদস্যরা গাড়ি থেকে নেমে বন্দুক তাক করে বড়ডলু পাড়া হয়ে নৌকাছড়া পার হয়ে চলাচল রাস্তার দিকে যায় এবং টিলার (পাহাড়ে) উপরে উঠে পাহাড়িদের জুমক্ষেতে গিয়ে সেখানে জুমে কাজ করার জন্য তৈরি করা টংঘরগুলো (জুমঘর) ছবি তোলে ও ভেঙে দেয়।

সেই জুমক্ষেত ও জুমঘরের মালিকরা হলেন- ১. উসাবাই মারমা (৫০), পিতা- মৃত. ফঅং মারমা, ২. মাসাচিং মারমা (৫৫) স্বামী- মৃত. য়ংপ্রু মারমা, ৩. চিংথোয়াইউ মারমা (৩৫), পিতা- উসাবাই মারমা ও ৪. থুইমাচিং মারমা (২৫) স্বামী : মৃত: উসাচিং মারমা। তারা সবাই বড়ডলু পাড়ার বাসিন্দা। প্রত্যেক বছর তারা ওই এলাকায় জুম চাষ করেন বলে জানান।

কিন্তু পরবর্তীতে সেনাবাহিনী সেসব ছবি “ইউপিডিএফ(মূল) এর গোপন আস্তানা” উল্লেখ করে সোস্যাল মিডিয়ায় প্রচার করে। যা সম্পুর্ণ মিথ্যা ও বানোয়াট বলে জানান স্থানীয়রা।

জুমের মালিক মাসাচিং মারমা বলেন, ‍“আমি জুমচাষ করে কোন রকমে জীবিকা নির্বাহ করি। জুমে মরিচ, হলুদ রোপন করেছি। জুম চাষের সময় ধান রাখার জন্য সেখানে ছোট একটি জুমঘর তৈরি করেছি। গতকাল আর্মি এসে আমার ওই ঘরটিকে ‘ইউপিডিএফের ঘর’ বলে ঘরের চাল থেকে তেলপাড় (পলিথিন) খুলে ফেলে দিয়েছে। কিন্তু এটা কোন ইউপিডিএফের ঘর নয়, আমার নিজের জুমঘর। যদি বিশ্বাস না হয় তাহলে এসে দেখে যেতে পারেন। আমি সকলের কাছে এই বিষয়টি জানাচ্ছি।”

তিনি আরো বলেন, “জুমের হলুদ ক্ষেত থেকে তিন ভাগের এক ভাগ হলুদ তুলেছি। আরো হলুদ তোলা বাকি রয়েছে। কাজে গিয়ে আমি ওই জুমঘরে বসে ভাত খাই, বিশ্রাম করি। এখন ঘরের চালের তেলপাড়(পলিথিন) সব খুলে ফেলে দিয়েছে। ফলে এখন জুমে গিয়ে কাজ শেষে ভাত খাওয়ারও জায়গা নাই।”

এদিকে, সেনাবাহিনী এহেন কর্মকাণ্ডে স্থানীয় জনগণের মধ্যে ক্ষোভ ও নানা আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। সেনাবাহিনীর এমন অপপ্রচার উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ও জনগণকে ক্ষতি করার অন্য কোন পরিকল্পনা থাকতে পারে বলে স্থানীয়রা ধারণা করছেন।

উক্ত ঘটনার পর গতকাল (২৭ জানুয়ারি) সন্ধ্যা থেকে আরও প্রায় একশ’ জনের কাছাকাছি সেনা সদস্য নাইল্যাছড়ি উচ্চ বিদ্যালয়ের অবস্থান করছে বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এলাকার একজন শিক্ষক বলেন, ‘সেনাবাহিনীর সদস্যরা নাকি বলছে তারা নির্বাচন পর্যন্ত থাকবে। প্রতিদিন ১:০০টা পর্যন্ত বাইরে অবস্থান করবে। এরপর আবার স্কুল এসে অবস্থান করবে। এভাবে তারা স্কুলে অবস্থান করলে কিছুটা হলেও শিক্ষা কার্যক্রমে ব্যাঘাত ঘটবে বলে তিনি মন্তব্য করেন।

স্থানীয় জনগণ ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেছেন, গ্রামের নিরীহ মানুষের কষ্ট করে তোলা জুমঘর ভেঙে দিয়ে ও ছবি তোলে সেগুলো একটি দলের ‘গোপন আস্তানা’ হিসেবে প্রচার করা কোনভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। সেনাবাহিনীর মতো একটি রাষ্ট্রীয় বাহিনী এভাবে মিথ্যা প্রচার করতে পারে তা আমরা আশা করিনি। তারা সেনাবাহিনীর এমন কান্ডে নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছেন।

অপরদিকে, ইউপিডিএফও তাদের অফিসিয়াল ফেসবুক পেজে দেয়া এক পোস্টে পাহাড়িদের জুমঘর নিয়ে সেনাবাহিনীর মিথ্যাচারের প্রতিবাদ জানিয়েছে। এতে তারা বলেছেন, ‘সেনাবাহিনী অসৎ উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য পাহাড়িদের জুমঘরগুলোকে ইউপিডিএফের আস্তানা হিসেবে মিথ্যাভাবে প্রচার করছে। ইউপিডিএফের ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন করতে ও পার্বত্য চট্টগ্রামে সেনা উপস্থিতি জায়েজ করতে সেনাবাহিনী এভাবে পরিকল্পিতভাবে মিথ্যা প্রচারে নেমেছে’ বলে তারা উল্লেখ করেছে।

এদিকে, এই রিপোর্ট লেখার সময় পর্যন্ত সেনাবাহিনীর সদস্যরা কোলাপাড়া, মাঝের পাড়া এলাকায় টহল দেয়ার খবর জানিয়েছিল স্থানীয়রা।



This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. AcceptRead More