সাজেকে দ্বিতীয় দফায় ঘোষিত ৪৮ ঘন্টার সময়সীমা শেষ, সন্তু গ্রুপের সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা বহাল তবিয়তে

সাজেক প্রতিনিধি, সিএইচটি নিউজ
বুধবার, ১৪ অক্টোবর ২০২৬
সাজেকের মাচলঙের বিভিন্ন এলাকায় অবস্থান নিয়ে সাধারণ জনগণের ওপর নিপীড়ন ও সন্ত্রাস সৃষ্টির কারণে জেএসএস সন্তু গ্রুপের সশস্ত্র সদস্যদের সরিয়ে নিতে সাজেক কার্বারী এসোসিয়েশন ও সাজেক গণ অধিকার রক্ষা কমিটির দ্বিতীয় দফায় ঘোষিত ৪৮ ঘন্টার সময়সীমাও গতকাল (১৩ অক্টোবর) শেষ হয়েছে। এই সময়ের মধ্যে প্রশাসন প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণের আশ্বাস দিয়ে সাজেকবাসীর তিন দফা দাবি মেনে দিলেও এখনো সন্তু গ্রুপের সশস্ত্র সদস্যরা বহাল তবিয়তে রয়েছেন বলে জানা গেছে। ফলে প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
উল্লেখ্য, গত ৩১ আগস্ট ভোররাত থেকে সেনাবাহিনীর সহায়তায় সন্তু গ্রুপের সশস্ত্র সদস্যরা মাচলঙ এলাকায় এসে অবস্থান নেয়। সেই পর থেকে তারা বিভিন্ন এলাকায় সশস্ত্র সন্ত্রাস চালাচ্ছে। গত ২৯ সেপ্টেম্বর তাদের এলোপাতাড়ি ছোঁড়া গুলিতে মাচলঙ নোয়াপাড়া এলাকায় কস্মিতা ত্রিপুরা নামে ৮ বছরের এক শিশু গুলিবিদ্ধ হয়ে আহত হয়। এরপর গত ১০ অক্টোবর একই এলাকার মন্দিরছড়ায় জুমচাষীদের দিকে লক্ষ্য করে এলোপাতাড়ি ব্রাশফায়ার করলে অল্পের জন্য প্রাণে রক্ষা পান চিক্কো চাকমা ও তার স্ত্রী। এছাড়া সম্প্রতি উজ্জেংছড়ি, লামাবাক ও ভুয়োছড়ি এলাকায় সাধারণ জনগণের মোবাইল ফোন কেড়ে নেওয়ারও অভিযোগ উঠেছে সন্তু গ্রুপের সশস্ত্র সদস্যদের বিরুদ্ধে। শুধু তাই নয়, তারা এলাকার মুরুব্বীসহ বিভিন্ন জনকে প্রাণনাশের হুমকি-ধমকিসহ নানা ভয়-ভীতি প্রদর্শন করছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।
সন্তু গ্রুপের এমন কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে গত ১ অক্টোবর সাজেক গণ অধিকার রক্ষা কমিটি ও সাজেক কার্বারী এসোসিয়েশন সাজেকের উজোবাজারে প্রতিবাদ সমাবেশ করে। এদিন সমাবেশ বক্তব্য দেওয়ার কারণে সন্তু সশস্ত্র সদস্যরা বিভিন্ন জনকে প্রাণনাশের হুমকি প্রদর্শন করলে এলাকার জনমনে তাদের প্রতি আরো বেশি ক্ষোভের সৃষ্টি হয়।
এরপর গত ৮ অক্টোবর উক্ত দুই সংগঠনের উদ্যোগে নিরাপত্তা বাহিনীর মদত ও পৃষ্ঠপোষকতায় জেএসএস সন্তু গ্রুপের সশস্ত্র সন্ত্রাসীদের সাজেকে অবস্থান ও সাধারণ জনগণকে হত্যার হুমকি প্রদানের প্রতিবাদে এবং ৪৮ ঘণ্টার মধ্যেও সশস্ত্র সন্ত্রাসীদেরকে সরিয়ে নেয়ার দাবিতে সাজেকের উজোবাজার এলাকায়বিশাল বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ করা হয়।
সমাবেশ থেকে ৪৮ঘন্টা মধ্যে জেএসএস সশস্ত্র সন্ত্রাসীদের সরিয়ে না নিলে অনির্দিষ্টকালের জন্য সাজেক ভ্যালি পর্যটন সড়ক অবরোধের ঘোষণা দেওয়া হয়।
কিন্তু প্রশাসন কোন উদ্যোগ গ্রহণ না করায় তারা ১১ অক্টোবর থেকে অনির্দিষ্টকালের জন্য সাজেক পর্যটন সড়কে অবরোধ পালন শুরু করেন। অবরুদ্ধ হয়ে পড়ে সাজেক পর্যটন।
পরে ওদিন বিকাল ৫টার সময় সামরিক-বেসামরিক প্রশাসনের কর্মকর্তারা সাজেকের উজোবাজারে গিয়ে অবরোধ পালনকারীদের সাথে কথা বলেন এবং সড়কটি খুলে দেওয়ার অনুরোধ জানান। এরই পরিপ্রেক্ষিতে সাজেকবাসীর পক্ষে সাজেক গণঅধিকার রক্ষা কমিটি ও সাজেক কার্বারী এসোসিয়েশনের নেতা কর্মীরা প্রশাসনকে ৩ দফা দাবি বা শর্ত জানিয়ে দেন। তাদের শর্তগুলো হলো: ১. ৪৮ ঘন্টা সময়ের মধ্যে জেএসএস সন্তু গ্রুপের সশস্ত্র সদস্যদের সরিয়ে নিতে হবে; ২. জেএসএসের সদস্যরা কাউকে মৃত্যুর হুমকি দেবে না ও ৩. সেনা প্রশাসন কর্তৃক সাধারণ নিরীহ জনগণের ঘর-বাড়ি তল্লাশি ও হয়রানি করা যাবে না।
প্রশাসনের পক্ষ থেকে উক্ত সময়ের মধ্যে তিন দফা দাবি বা শর্ত বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলে অবরোধকারীরা ৪৮ ঘন্টার জন্য অবরোধ কর্মসূচি স্থগিত করে পর্যটন সড়কটি খুলে দেন।
কিন্তু ৪৮ ঘন্টার সময়সীমা পার হলেও প্রশাসনকে এখনো কার্যকর কোন পদক্ষেপ নিতে দেখা যায়নি। ফলে সন্ত্রাসীরা এখনো বহাল তবিয়তে থেকে নানা সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছেন।
এ বিষয়ে সাজেক গণ অধিকার রক্ষা কমিটি ও সাজেক কার্বারী এসোসিয়েশনের নেতৃবৃন্দ বলেন, ‘প্রশাসন ৪৮ ঘন্টার মধ্যে আমাদের তিন দফা দাবি বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি দিলেও কোন অগ্রগতি দেখা যাচ্ছে না। বরং সেনাবাহিনী অভিযানের নামে মাচলঙ চিল্ল্যাতুলিতে মিয়্যে রঞ্জন চাকমা নামে এক সাধারণ গ্রামবাসীর ঘর আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দিয়েছে বলে আমরা জানতে পেরেছি। সন্তু গ্রুপের সশস্ত্র সদস্যদের বিরুদ্ধে কোন পদক্ষেপ না নিয়ে কেন সাধারণ গ্রামবাসীর ঘর পোড়ানো হলো তা প্রশাসনকে জবাব দিতে হবে।’
তারা জেএসএসের সশস্ত্র সদস্যরা এখনো থালকুম্ভো, চিল্ল্যাতুলি, লাম্বাবাক ও ভুয়োছড়ি এলাকায় প্রকাশ্যে সশস্ত্র তৎপরতা চালিয়ে জনগণের মোবাইল ফোন কেড়ে নেওয়াসহ নানা হয়রানিমূলক কর্মকাণ্ড চালাচ্ছে বলে অভিযোগ করেন।
প্রশাসন তাদের দাবি বাস্তবায়নে ব্যর্থ হলে আবারো অবরোধের মতো কর্মসূচি দেওয়ার কথা জানান নেতৃবৃন্দ।
সিএইচটি নিউজে প্রকাশিত প্রচারিত কোন সংবাদ, তথ্য, ছবি ,ভিডিও, কনটেন্ট ব্যবহার করতে হলে কপিরাইট আইন অনুসরণ করে ব্যবহার করুন।
