প্রয়াত পিতার মুখ দর্শন না করেই শেখ হাসিনার ইউনেস্কো শান্তি পুরস্কার গ্রহণ অনুষ্ঠানে গিয়েছিলেন সন্তু লারমা

0

বিশেষ প্রতিবেদক, সিএইচটি নিউজ
বৃহস্পতিবার, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬

জনগণের মতামত উপেক্ষা করে ১৯৯৭ সালে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের সাথে চুক্তিতে উপনীত হয় পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি। ওই বছর ২ ডিসেম্বর স্বাক্ষরিত পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির (সরকারের ভাষায় “শান্তিচুক্তি”) বদৌলতে ’৯৮ সালে ইউনস্কো কর্তৃক তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ফেলিক্স হুফে-বোয়ানি শান্তি পুরস্কার প্রদান করা হয়। ১৯৯৯ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর শেখ হাসিনা প্যারিসে গিয়ে পুরস্কারটি গ্রহণ করেন। ইউনেস্কো সদর দপ্তরে এক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে তৎকালীন ইউনেস্কো মহাপরিচালক ফেদেরিকো মেয়র তাঁর হাতে পুরস্কারটি তুলে দেন। সন্তু লারমা সে অনুষ্ঠানে গেলেও তাঁর ভাগ্যে কোনো পুরস্কার জোটেনি।

প্যারিসে শেখ হাসিনার শান্তি পুরস্কার গ্রহণ, জেএসএসের নাটকীয়তা

পুরস্কার গ্রহণের জন্য শেখ হাসিনাকে প্যারিসে ইউনেস্কো সদর দপ্তরে যেতে হবে। হাসিনা ভাবলেন ঐ পুরস্কার প্রদান অনুষ্ঠানে সন্তু লারমা না থাকলে বেখাপ্পা দেখাবে। নিজের পরিধানের অলংকারের মতো সন্তু লারমাকে তার পাশে শো-পিস্ হিসেবে দেখাতে হবে। না হলে আন্তর্জাতিক মহল বুঝে ফেলবে যে, যে-চুক্তির জন্য তাকে শান্তি পুরস্কার দেওয়া হচ্ছে সেই চুক্তি পার্বত্য চট্টগ্রামে শান্তি প্রতিষ্ঠার বদলে অশান্তি ও অরাজকতা সৃষ্টি করেছে। এজন্য শেখ হাসিনার সফর টিমের সাথে সন্তু লারমাকেও আমন্ত্রণ জানানো হয় সরকারের পক্ষ থেকে। কিন্তু সন্তু লারমা এত দালালী করেও শেখ হাসিনার প্রেম না পাওয়ার কারণে মুখ গোমড়া করে বসে আছেন। তাই তার নেতৃত্বে জেএসএস সিদ্ধান্ত নিল সন্তু লারমা প্যারিসে যাবেন না। তার বদলে যাবেন রূপায়ন দেওয়ান। সরকারকে জেএসএস-এর এই সিদ্ধান্ত জানিয়ে দেয়া হল।

সন্তু লারমা চিকিৎসার নাম দিয়ে কলকাতায় চলে গেলেন। তবে যাওয়ার আগে ঢাকায় সরকারি দলের নেতাদের সাথে দেখা করলেন। তাদের মধ্যে কী কথা হয়েছিল তা জানা না গেলেও পরে সন্তু লারমা কলকাতা থেকে তড়িঘড়ি করে ঢাকায় ফিরে সোজা প্যারিস চলে গেলে বিষয়টি পরিষ্কার হয়ে যায়।

প্রয়াত পিতার মুখ দর্শন না করেই সন্তু লারমার প্যারিস গমন

১৯ সেপ্টেম্বর ’৯৯ সন্তু লারমার প্রব্রজ্যারত পিতা দেহ ত্যাগ করেন। সামাজিক ও ধর্মীয় বিধান মতে প্রয়াত পিতার মুখ দর্শন পর্যন্ত না করে সন্তু লারমা প্যারিস গমনকে প্রাধান্য দেন। ঐদিকে রাঙামাটি থেকে উষাতন বাবু প্রেস বিজ্ঞপ্তি দিয়ে জানিয়ে দিলেন বাবার মৃত্যুর কারণে সন্তু লারমার প্যারিস গমনের সিদ্ধান্ত বাতিল হবে না। অথচ তারা সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন যে, সন্তু লারমার বদলে রূপায়ন দেওয়ান প্যারিস যাবেন। বাবার মৃত্যু সত্ত্বেও এবং তার মুখ দর্শন না করেই সন্তু লারমা প্যারিস গিয়ে শেখ হাসিনাকে আন্তর্জাতিকভাবে বেকায়দা অবস্থা থেকে উদ্ধার করলেন!

সন্তু লারমা বা জেএসএস-এর কোনো প্রতিনিধি প্যরিস না গেলে তা সরকারের ওপর বিরাট চাপ সৃষ্টি করতো। আন্তর্জাতিক মহল বুঝতে পারতো যে, চুক্তির ফলে পার্বত্য চট্টগ্রামের জনগণ সন্তুষ্ট নয়। সেখানে শান্তি ফিরে আসেনি। প্যারিস না গিয়ে জেএসএস বিবৃতি দিতে পারতো, চুক্তির পরও যে জনগণের ওপর দমন পীড়ন চলছে তা বলতে পারতো। তখন পার্বত্য চট্টগ্রামে আসলে কী ঘটছে তা আন্তর্জাতিক মহল জানতে পারতো এবং তারাও সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পারতো। কিন্তু জেএসএস নেতৃবৃন্দ সেই সুযোগ হাতছাড়া করলেন। তারা নিজেদের রাজনৈতিক অবস্থানে অটল থাকতে পারলেন না। সরকারি কর্তা ব্যক্তিদের কথা মতো তাদের সিদ্ধান্ত পাল্টালেন। প্যারিস না গেলে সরকার রুষ্ট হতো তাদের ওপর, সে ভয়ে তারা প্যারিস গেলেন। চাপ সৃষ্টির বদলে শেখ হাসিনার মনোরঞ্জনের পথটাকে বেছে নিলেন। (তথ্য সূত্র: স্বাধিকার বুলেটিন নং ১২)

এর ফলাফল কী হয়েছে? শান্তি পুরস্কার পেয়ে শেখ হাসিনার আর চুক্তি বাস্তবায়নের পথে হাঁটেননি। আর জেএসএসও সরকারকে চাপ সৃষ্টির মতো কোনো কর্মসূচি দিতে পারেনি। ফলে দীর্ঘ ২৯ বছরেও চুক্তির পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন হয়নি। পার্বত্য চট্টগ্রামের জনগণ নিপীড়ন-নির্যাতন থেকে মুক্তি পায়নি। শেখ হাসিনা যে চুক্তির মুলাটি ঝুলিয়ে রেখেছিলেন তা আজো ঝুলছে। আরো যে কত বছর ঝুলবে নাকি ঝুলন্ত অবস্থা থেকে ঝরে পড়বে তারও কোনো নিশ্চয়তা আর নেই। জেএসএসের এই ভুলের মাশুলই কড়ায় গন্ডায় দিতে হচ্ছে পাহাড়ি জনগণকে।

কাজেই, পাহাড়ি জনগণকে অতীতের ভুল থেকে শিক্ষা নিতে হবে। পুরনো ভুল পথ পরিহার করে নতুন পথে হেঁটে সঠিক গন্তব্যে পৌঁছতে হবে।



This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. AcceptRead More