কাউখালীতে “স্বাধীন রাজ্য ‘জেলায়’ অবনমিত: রাষ্ট্রীয় দমন-পীড়ন ও জনগণের লড়াই-সংগ্রাম” শীর্ষক আলোচনা সভা

কাউখালি প্রতিনিধি, সিএইচটি নিউজ
শনিবার, ১ আগস্ট ২০২৬
রাঙামাটির কাউখালীতে “স্বাধীন রাজ্য ‘জেলায়’ অবনমিত (১৮৬০-১৯৪৭): পার্বত্য চট্টগ্রামে অব্যাহত রাষ্ট্রীয় দমন-পীড়ন, শাসন-শোষণ, জাতীয় পরিচিতি সংকট ও অস্তিত্বের হুমকির মুখে জনগণের লড়াই সংগ্রাম” শীর্ষক আলোচনা সভা করেছে পাহাড়ি ছাত্র পরিষদ, হিল উইমেন্স ফেডারেশন ও গণতান্ত্রিক যুব ফোরাম, কাউখালী উপজেলা শাখাসমূহ।
আজ শনিবার (১ আগস্ট ২০২৬) দুপুর ১.৩০টার সময় কাউখালী উপজেলার ডাবুয়া এলাকায় এই আলোচনা সভা আয়োজন করা হয়। এতে বিভিন্ন এলাকা হতে দেড় শতাধিক মুরুব্বি, শিক্ষার্থী ও যুবক-যুবতী অংশগ্রহণ করেন।
সভার শুরুতে ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের বীরযোদ্ধাদের স্মরণে দাঁড়িয়ে ১ মিনিট নীরবতা পালন করা হয়।

আলোচনা সভায় গণতান্ত্রিক যুব ফোরাম কাউখালি উপজেলার সভাপতি ক্যাথুই মার্মার সভাপতিত্বে আলোচনা করেন পাহাড়ি ছাত্র পরিষদের রাঙামাটি জেলা কমিটির অর্থ সম্পাদক জিপল চাকমা, হিল উইমেন্স ফেডারেশনের কাউখালী উপজেলা সভাপতি একা চাকমা এবং এলাকার মুরুব্বি ক্যাচিংমং মার্মা ও হরিপ্রু মার্মা। সভা সঞ্চালনা করেন দয়ারণ চাকমা।
সভায় আরও উপস্থিত ছিলেন- হিল উইমেন্স ফেডারেশনের রাঙামাটি জেলা কমিটির তথ্য প্রচার সম্পাদক নন্দা চাকমা, পিসিপি’র কাউখালি উপজেলা সাধারণ সম্পাদক অজয় মার্মা, এলাকার প্রতিনিধি বাচিমং মার্মা, থোইচিংমং মার্মা, অংসাজাই মার্মা ও উচিংথোয়াই মার্মা।

বক্তারা বলেন, ১৮৬০ সালের ১ আগস্ট ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসকরা স্বাধীন পার্বত্য রাজ্যকে তথাকথিত ‘জেলায়’ অবনমিত করার মাধ্যমে এ অঞ্চলের ওপর আগ্রাসন শুরু হয়। তারই ধারাবাহিকতায় পাকিস্তান আমল এবং বতর্মান বাংলাদেশ আমলে পার্বত্য চট্টগ্রামের ওপর কর্তৃত্ববাদী শাসন-শোষণ চলছে।
বক্তারা রাণী কালিন্দীসহ ব্রিটিশ বিরোধী প্রতিরোধ যোদ্ধাদের স্মরণ করে বলেন, এ অঞ্চলের স্বাধীনচেতা নৃপতিগণ মুঘল ও বৃটিশদের অন্যায় কর্তৃত্ব মেনে না নিয়ে তাদের বিরুদ্ধে বীরত্বপূর্ণ প্রতিরোধ সংগ্রাম করে গেছেন। রাণী কালিন্দীও তার পূর্বসূরীদের মতো ব্রিটিশদের অন্যায় হস্তক্ষেপ মেনে নেননি। যার কারণে তাঁর শাসনামল পর্যন্ত ব্রিটিশরা পুরো পার্বত্য অঞ্চল নিয়ন্ত্রণ কায়েম করতে পারেনি।

বক্তারা আরও বলেন, ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসকরা এ অঞ্চলে শাসন-শোষণ করে ক্ষান্ত হয়নি। তারা ১৯৪৭ সালে ভারত উপমহাদেশ বিভক্ত করে দেয়ার সময় ৯৮ ভাগ অমুসলিম অধ্যুষিত পার্বত্য চট্টগ্রামকে সম্পূর্ণ মুসলিম অধ্যুষিত উগ্র ধর্মান্ধ পাকিস্তান রাষ্ট্রের সাথে যুক্ত করে দিয়েছিল। যার ফলস্বরূপ এ অঞ্চলের মানুষের ওপর নেমে আসে দমন-পীড়ন। ১৯৬০ সালের কাপ্তাই বাঁধের মাধ্যমে ৫৪ হাজার একর ফসলি জমি পানির নীচে তলিয়ে দেওয়া হয়, যাতে লক্ষাধিক মানুষ নিজ ভূমি থেকে উচ্ছেদের শিকার হয়েছিলেন। ১৯৭১ সালে পাকিস্তানের কবল থেকে বাংলাদেশ স্বাধীন হলেও পাহাড়িদের ওপর দমন নীতির কোন পরিবর্তন হয়নি। স্বাধীনতার পর থেকে এদেশের বাঙালি শাসকগোষ্ঠি পাহাড়িদের ওপর অবর্ণনীয় নিপীড়ন-নির্যাতন চালিয়ে যাচ্ছে। সংঘটিত করা হয়েছে ডজনের অধিক গণহত্যা ও অসংখ্য সাম্প্রদায়িক হামলা। শুধু তাই নয়, এদেশের শাসকচক্র কখনো ‘বাঙালি’ কখনো ‘বাংলাদেশী’ জাতীয়তাবাদ চাপিয়ে দিয়ে পাহাড়িদের জাতিগত পরিচয়, অস্তিত্ব ধ্বংসের ষড়যন্ত্র অব্যাহত রেখেছে এদেশের শাসকগোষ্ঠী।

বক্তারা বলেন, ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর যেমন পাহাড়ি জনগণের ভাগ্যের কোন পরিবর্তন হয়নি, তেমনি ২০২৪ সালে গণঅভ্যুত্থানের পরও পাহাড়িরা নিপীড়ন-নির্যাতন থেকে মুক্তি পায়নি। তাই, অন্যায় দমন-পীড়ন ও জাতীয় অস্তিত্ব রক্ষার্থে পাহাড়ি জনগণকে লড়াই-সংগ্রাম করা ছাড়া আর কোন উপায় নেই। ছাত্র, যুবক, নারীসহ সর্বস্তরের জনগণকে এই লড়াইয়ে সামিল হতে হবে।
বক্তরা পাহাড়িদের ওপর দমন-পীড়ন বন্ধ করে জাতিসত্তার সাংবিধানিক স্বীকৃতি, জনগণের ন্যায়সঙ্গত দাবি পূর্ণস্বায়ত্তশাসন দাবি মেনে নেওয়া এবং সেনাশাসন ‘অপারেশন উত্তরণ’ তুলে নিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রামে প্রকৃত গণতান্ত্রিক শাসন প্রতিষ্ঠার দাবি জানান।
সিএইচটি নিউজে প্রকাশিত প্রচারিত কোন সংবাদ, তথ্য, ছবি ,ভিডিও, কনটেন্ট ব্যবহার করতে হলে কপিরাইট আইন অনুসরণ করে ব্যবহার করুন।
