খাগড়াছড়িতে শহীদ জুনান চাকমা ও রুবেল ত্রিপুরার স্মরণে স্মৃতিফলক উন্মোচন ও স্মরণসভা

খাগড়াছড়ি প্রতিনিধি, সিএইচটি নিউজ
শনিবার, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬
খাগড়াছড়িতে ২০২৪ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর সেনাবাহিনীর গুলিতে শহীদ হওয়া জুনান চাকমা ও রুবেল ত্রিপুরার স্মরণে স্মৃতিফলক উন্মোচন ও স্মরণসভা করা হয়েছে।
আজ শনিবার (১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬) সকালে শহীদ জুনান চাকমার মা ও শহীদ রুবেল ত্রিপুরার মা খাগড়াছড়ি জেলা পরিষদ সংলগ্ন স্থানে ‘শহীদ জুনান-রুবেল স্মৃতিফলক’ উন্মোচন করেন। এ সময় তাদের সাথে ’৯৬-এ শহীদ অমর বিকাশ চাকমার পিতাও উপস্থিত ছিলেন।
জুনান চাকমা ও রুবেল ত্রিপুরা হত্যার দ্বিতীয় বার্ষিকীতে শহীদ স্মৃতি সংরক্ষণ সংসদ, বৃহত্তর পার্বত্য চট্টগ্রাম পাহাড়ি ছাত্র পরিষদ ও হিল উইমেন্স ফেডারেশন যৌথভাবে এই স্মৃতিফলক উন্মোচন ও স্মরণসভা অনুষ্ঠানটি আয়োজন করে।

“জনগণের জন্য যারা জীবন দেন, তারা অমর” এই স্লোগানে আয়োজিত অনুষ্ঠানে পাহাড়ি ছাত্র পরিষদ(পিসিপি)-এর খাগড়াছড়ি জেলা শাখার তথ্য ও প্রচার সম্পাদক তৈমাং ত্রিপুরার সঞ্চালনায় সভাপতিত্ব করেন শহীদ স্মৃতি সংরক্ষণ সংসদ -এর আহ্বায়ক শহীদ জুনান চাকমার মা রুপসা চাকমা।
এতে আরো বক্তব্য দেন শহীদ স্মৃতি সংরক্ষণ সংসদের সদস্য শহীদ রুবেল ত্রিপুরার মা, হিল উইমেন্স ফেডারেশন খাগড়াছড়ি জেলা কমিটি আহ্বায়ক এন্টি চাকমা ও পাহাড়ি ছাত্র পরিষদ (পিসিপি) খাগড়াছড়ি জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক প্রাঞ্জল চাকমা।
প্রাঞ্জল চাকমা’র বক্তব্যের মধ্য দিয়ে শহীদ জুনান চাকমা ও শহীদ রুবেল ত্রিপুরাসহ গণতান্ত্রিক আন্দোলনে সকল বীর শহীদদের স্মরণে দাঁড়িয়ে ২ মিনিট নীরবতা পালন করা হয়।
ছাত্রনেতা প্রাঞ্জল চাকমা বলেন, গত ২০২৪ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর দিবাগত রাতে দীঘিনালায় পাহাড়িদের ওপর সংঘটিত সাম্প্রদায়িক হামলার মতো ঘটনা যাতে খাগড়াছড়ি সদরেও না ঘটতে পারে সেজন্য এলাকার ছাত্র-জনতা উপালি পাড়া, নারাঙহিয়া, কলেজ পাড়া ও স্বনির্ভর এলাকায় অবস্থান করে। এ অবস্থায় বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ছাত্র-জনতার ওপর নির্বিচারে গুলি চালায়। এতে জুনান চাকমা ও রুবেল ত্রিপুরা নিহত হন।

তিনি বলেন, পাহাড়িরা যুগ যুগ ধরে লড়াই করে এসেছে। তারা জানে নিজের মা-বোনের ইজ্জ্বত, নিজের বাস্তুভিটা, নিজের অধিকার কিভাবে রক্ষা করতে হয়। পাহাড়ি জনগণ অন্যায়-অবিচারের বিরুদ্ধে কখনো মাথানত করেনি, ভবিষ্যতেও আমরা মাথানত করবো না। যতক্ষণ পর্যন্ত আমাদের রক্ত শিরায় শিরায় প্রবাহিত হবে ততক্ষণ পর্যন্ত আমরা অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করে যাবো।
তিনি আরো বলেন, ২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর আমরা পাহাড়িরা মনে করেছিলাম পার্বত্য চট্টগ্রামে কিছুটা হলেও শান্তি প্রতিষ্ঠা হবে। আমরা নিজেদের অধিকার নিয়ে বেঁচে থাকতে পারবো। কিন্তু আমরা পেয়েছি একের পর এক সাম্প্রদায়িক হামলা।
তিনি ছাত্র সমাজের উদ্দেশ্যে বলেন, সরকার যতই অত্যাচার, নিপীড়ন করুক না কেন আমাদের ক্ষান্ত হলে হবে না। পার্বত্য চট্টগ্রামে জনগণের ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠা না হওয়া পর্যন্ত আমাদের আন্দোলন চালিয়ে যেতে হবে। তিনি আন্দোলনে সামিল হওয়ার জন্য ছাত্র সমাজের প্রতি আহ্বান জানান।

এইচডব্লিএফ নেত্রী এন্টি চাকমা বলেন, আজকের এই দিন আমাদের জন্য শোকের এবং গৌরবেরও। ২০২৪ সালের আজকের এই দিনে এই এলাকায় শহীদ জুনান ও রুবেল জনগণের জনগণের জীবন রক্ষা করতে গিয়ে, জাতীয় অস্তিত্ব রক্ষা করতে গিয়ে জীবন দান করেছেন। তারা জনগণের মাঝে অমর হয়ে থাকবেন। শুধু জুনান, রুবেলকে নয়, আমরা দেখেছি দীঘিনালায় ধন রঞ্জন চাকমা এবং রাঙামাটিতে অনিক চাকমাকে কীভাবে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়েছে। তিনি ২০২৫ সালে গুইমারার রামেসু পাড়ায় সংঘটিত হামলা ও তিন জনকে হত্যার ঘটনাও তুরে ধরেন।
তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, জুনান ও রুবেলকে সেনাবাহিনীর সদস্যরা নৃশংসভাবে গুলি করে হত্যা করেছে। কিন্তু ২ বছরেও এ ঘটনার কোন বিচার হয়নি, সরকার ঘটনার তদন্ত রিপোর্ট এখনো প্রকাশ করেনি এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলো ন্যূনতম ক্ষতিপূরণও পায়নি।

তিনি অবিলম্বে সুষ্ঠু তদন্ত সাপেক্ষে ঘটনায় জড়িতদের গ্রেফতারপূর্বক বিচার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান।
শহীদ জুনান চাকমার মা রূপসা চাকমা আবেগতাড়িত কণ্ঠে বলেন, ছেলে হারানোর যন্ত্রণা একমাত্র মা বোঝে। ২ বছর হয়েছে আমার ছেলেকে সেনাবাহিনীরা গুলি করে হত্যা করেছে। কিন্তু তার সুষ্ঠু বিচার এখনো পাইনি।
তিনি বলেন, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের উপদেষ্টা এবং বর্তমান এনসিপির নেতা ও সংসদ সদস্য নাহিদ ইসলাম কথা দিয়েছিলেন আমার ছেলের হত্যার বিচার করা হবে। কিন্তু আজও কোন বিচার হয়নি।
তিনি দেশের বর্তমান বিএনপি সরকার ও রাষ্ট্রের কাছে ছেলে হত্যার বিচার দাবি করেন।

সেনাবাহিনীর বিষয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেন, আগে সেনাবাহিনীকে আমি দেশ ও জনগণের রক্ষা বাহিনী মনে করতাম। কিন্তু এই সেনাবাহিনীই আমার ছেলেকে গুলি করে হত্যা করেছে। তাই এখন সেনাবাহিনীর প্রতি আমার শ্রদ্ধা সম্পূর্ণ উঠে গেছে।
তিনি এ হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় অবিলম্বে তদন্ত কমিটি গঠন গঠন করে সুষ্ঠু তদন্ত সাপেক্ষে জড়িতদের বিরুদ্ধে বিচারের কার্যক্রম শুরু করার জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানান।
শেষে তিনি আজ সন্ধ্যা ৬টায় শহীদ জুনান-রুবেলদের স্মরণে “গণ প্রদীপ প্রজ্ব্লন’ কর্মসূচি পালনের আহ্বান জানান।
স্মৃতিফলক উন্মোচন ও স্মরণসভা শেষে অনুষ্ঠানস্থল একটি মিছিল বের করা হয়। মিছিলটি স্বনির্ভর বাজারে গিয়ে শেষ হয়।

সিএইচটি নিউজে প্রকাশিত প্রচারিত কোন সংবাদ, তথ্য, ছবি ,ভিডিও, কনটেন্ট ব্যবহার করতে হলে কপিরাইট আইন অনুসরণ করে ব্যবহার করুন।
