শিক্ষা দিবসে রাঙামাটির সাজেকে পিসিপির বিশাল ছাত্র-যুব সমাবেশ

0

 রক্তে রঞ্জিত সাজেকের মাটিতে কেউ যদি শিক্ষার অধিকার কেড়ে নিতে চায় তাহলে পাল্টা প্রতিরোধ গড়ে তুলুন : সমর চাকমা

পিসিপির আয়োজিত ছাত্র-যুব সমাবেশে অংশগ্রহণকারীদের একাংশ।


সাজেক প্রতিনিধি, সিএইচটি নিউজ
বৃহস্পতিবার, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬

লক্ষী বিজয় ও বুদ্ধপুদির রক্তে রঞ্জিত সাজেকের মাটিতে কেউ যদি শিক্ষার অধিকার কেড়ে নিতে চায় তাহলে পাল্টা প্রতিরোধ গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়েছেন পাহাড়ি ছাত্র পরিষদ (পিসিপি)-এর কেন্দ্রীয় সভাপতি সমর চাকমা।

মহান শিক্ষা দিবসে আজ ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, বৃহস্পতিবার সকাল ১০টায় রাঙামাটির বাঘাইছড়ি উপজেলার সাজেকের উজোবাজারে আয়োজিত ছাত্র-যুব সমাবেশে জনগণের প্রতি তিনি এই আহ্বান জানান।

“গোয়েন্দা ল্যাবে উদ্ভাবিত ‘কর্মকৌশল’ খাটবে না, ‘পূর্ণস্বায়ত্তশাসন’ মেনে নাও; সাজেক কলেজে পাঠদানে বাধা কেন, প্রধানমন্ত্রীর জবাব চাই” এসব শ্লোগানে এবং পিসিপির শিক্ষা সংক্রান্ত ৫ দফা পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন ও পাহাড়ের দুর্গম অঞ্চলে মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করার দাবিতে এই সমাবেশের আয়োজন করা হয়।

সমাবেশ শুরুর পূর্বে সাজেক পর্যটন সড়কের লাদুমুনি বাজার থেকে দেড় সহস্রাধিক শিক্ষার্থী ও যুব-জনতার অংশগ্রহণে একটি মিছিল বের করা হয়। মিছিলটি বিভিন্ন শ্লোগানে মূল সড়ক হয়ে উজোবাজারে গিয়ে সমাবেশে মিলিত হয়।


সমাবেশে পিসিপির বাঘাইছড়ি উপজেলা শাখার সভাপতি সুজয় চাকমার সঞ্চালনায় বক্তব্য দেন পাহাড়ি ছাত্র পরিষদের কেন্দ্রীয় সভাপতি সমর চাকমা, সাজেক গণ অধিকার রক্ষা কমিটির সভাপতি বাবুধন চাকমা , হিল উইমেন্স ফেডারেশন কেন্দ্রীয় সভাপতি নীতি চাকমা, পাহাড়ি ছাত্র পরিষদের রাঙামাটি জেলা সভাপতি চয়ন চাকমা, গণতান্ত্রিক যুব ফোরাম বাঘাইছড়ি উপজেলা শাখার সভাপতি সমর চাকমাও সাধারণ শিক্ষার্থীদের পক্ষে জারুলছড়ি স্কুলের ছাত্রী রিয়া চাকমা। এতে সমাবেশে সংহতি জানিয়ে উপস্থিত ছিলেন সাজেক নারী সমাজের সভাপতি নিরুপা চাকমা ও পার্বত্য চট্টগ্রাম নারী সংঘের বাঘাইছড়ি উপজেলা শাখার সভাপতি অমিতা চাকমা।

ছাত্রনেতা সমর চাকমা বলেন, ১৯৬২ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর আজকের এই দিনে ছাত্র-জনতার আন্দোলনের মুখে তৎকালীন সামরিক শাসক আইয়ুব খান গণবিরোধী শরীফ শিক্ষা কমিশন বাতিল করতে বাধ্য হয়। ১৯৫২ ও ১৯৬২ সালে যে শিক্ষা আন্দোলন হয়েছিল তা শুধু বাঙালিদের ভাষা রক্ষার জন্য নয়, এটা ছিল বাংলাদেশে বসবাসরত সকল জাতিসত্তার ভাষা-সংস্কৃতি-ঐতিহ্য রক্ষার জন্য সংগ্রাম। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ স্বাধীনতা লাভ করলেও পার্বত্য চট্টগ্রামে জাতিসত্তাগুলোর মাতৃভাষা ও অস্তিত্ব কেড়ে নেওয়ার পাঁয়তারা চালায় স্বাধীন বাংলাদেশের সরকার। ৭২-এর সংবিধানে এবং ২০১১ সালে সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে বাঙালি ভিন্ন অন্য জাতিগুলোর ভাষা, সংস্কৃতি কেড়ে নিয়ে উগ্র বাঙালি জাতীয়তা ছাপিয়ে দেওয়া হয়েছে। একজন পাহাড়ি যেমন কখনো বাঙালি পারে না, তেমনি একজন বাঙালিও কখনো চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা হতে পারে না। পাহাড় ও সমতলের জাতিসত্তার ভাষা, সংস্কৃতি ও অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার জন্য পাহাড়ি ছাত্র পরিষদ ২০০০ সাল থেকে স্ব স্ব মাতৃভাষায় প্রাথমিক শিক্ষা লাভের  অধিকার নিশ্চিত করা-সহ শিক্ষাসংক্রান্ত ৫ দফা দাবি জানিয়ে আসছে।

 বক্তব্য রাখছেন পিসিপির সভাপতি সমর চাকমা।

তিনি আরো বলেন, সাজেকে লুসাইদের ভূমি থেকে উচ্ছেদ করে সেখানে বিলাসবহুল রিসোর্ট, পর্যটন, কোটি টাকার মসজিদ নির্মাণ করা হয়েছে। কিন্তু স্কুল, কলেজ নির্মাণে বাধা প্রদান করা হয়। সাজেক কলেজ নির্মাণ করা নিয়ে সেনাবাহিনী কলকাঠি নেড়ে প্রশাসন ও বনবিভাগকে দিয়ে নানাভাবে বাধা দেওয়া হয়েছে, কলেজ পর্ষদের দায়িত্বপ্রাপ্তদের বিরুদ্ধে মামলা দেওয়া হয়েছে। এ ষড়যন্ত্র এখনো চলমান রয়েছে। শুধু সাজেক কলেজ নয়, মাজলং এগোজ্জেছড়িতে সেনাবাহিনী কর্তৃক এলাকাবাসীর নির্মিত বেসরকারি প্রাইমারি স্কুল ভেঙ্গে দেওয়া হয়েছে। পরে এলাকাবাসীর ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধের মুখে তারা স্কুলের জিনিসপত্র পুনরায় ফেরত দিতে  বাধ্য হয়েছে। সেনাবাহিনী একদিকে দমন-পীড়ন চালাচ্ছে আর অন্যদিকে লোকদেখানো নানা কার্যক্রম পরিচালনা করছে বলে তিনি মন্তব্য করেন।

ছাত্র ও জনগণের প্রতি আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, সাজেকে শহীদ লক্ষী বিজয় ও বুদ্ধপুদির রক্তে রঞ্জিত মাটিতে কেউ যদি স্কুল ভেঙে দিয়ে, পাঠদানে বাধা প্রদান করে শিক্ষার অধিকার কেড়ে নিতে চায় তাহলে জনগণকে পাল্টা প্রতিরোধ তুলতে হবে।

তিনি সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক যে ৩টি হয়েছে তাতে সেনা-গোয়েন্দাদের প্রধান দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। সেনা-গোয়েন্দা নির্ভর কমিটি দিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রাম সমস্যার সমাধান হবে না। এ সমস্যার প্রকৃত সমাধান করতে চাইলে জনগণের প্রাণের দাবি পূর্ণস্বায়ত্তশাসন মেনে নিয়ে আলোচনায় বসতে হবে।

তিনি অবিলম্বে পিসিপির শিক্ষা সংক্রান্ত ৫ দফা দাবি পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন এবং পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রত্যন্ত অঞ্চলে মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করার জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানান।

হিল উইমেন্স ফেডারেশনের নেত্রী নীতি চাকমা বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামের শিক্ষা নীতি আর সমতলের শিক্ষা নীতি এক নয়। কেন না পার্বত্য চট্টগ্রামে ছাত্র-ছাত্রীদের সাথে মতবিনিময় সংবর্ধনা, নবীন বরণ করতে গেলে সেনা-গোয়েন্দা নজরদারি ও খবরদারি করা হয়। সাজেক কলেজ নির্মাণের শুরু থেকে বন বিভাগকে দিয়ে নানা বাধা ও হয়রানির অভিযোগ করেন তিনি।

বক্তব্য রাখছেন হিল উইমেন্স ফেডারেশনের সভাপতি নীতি চাকমা

তিনি আরো বলেন, সাজেকের মত জায়গায় যখন বড় বড় রিসোর্ট নির্মাণ করা হয় তখন সে জায়গা বনবিভাগের আওতায় কেন পড়ে না? কিন্তু যখন সাজেকে কলেজ, স্কুল নির্মাণ করা হয় তখন বনবিভাগের আইন দেখানো হয়। এছাড়া আমরা আরো দেখতে পাই যে, সমতলের দুর্নীতিগ্রস্ত ও নানা কেলেঙ্কারিতে জড়িত শিক্ষকদের পার্বত্য চট্টগ্রামে বদলী করা হয়ে থাকে। যার কারণে সেই শিক্ষকরা পার্বত্য চট্টগ্রামে এসে আগের মতো অনিয়মসহ শিক্ষার্থীদের যৌন নিপীড়ন করে থাকে। তিনি অনৈতিক কর্মকাাণ্ডে জড়িত শিক্ষকদের পার্বত্য চট্টগ্রামে বদলি না করা এবং বর্গা শিক্ষক দিয়ে বিদ্যালয়ে শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা না করার আহ্বান জানান।

সাজেক গণ অধিকার রক্ষা কমিটির সভাপতি বাবুধন চাকমা বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রাম বাংলাদেশের অংশ। পার্বত্য চট্টগ্রামে আমরা বিভিন্ন জাতি গোষ্ঠী বসবাস করি। স্বাধীনতার ৫৫ বছরেও বাংলাদেশে এখনো গণতান্ত্রিক পরিবেশ তৈরি করতে পারেনি সরকার।

শ্লোগান দিচ্ছেন অংশগ্রহণকারী শিক্ষার্থীরা।

তিনি আরো বলেন, ২০২২-২৩ সাল থেকে বান্দরবানে বম জনগোষ্ঠীর ওপর নিপীড়ন-নির্যাতন চালিয়ে একটি জাতিগোষ্ঠীকে কিভাবে ধ্বংস করা হচ্ছে তা আমরা দেখেছি। রাষ্ট্রীয় পরিকল্পনা অনুযায়ী সাজেকে পর্যটন, মসজিদ হতে পারে, কিন্তু শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হতে পারে না কেন? এখানে শত শত মাইল পাহাড় কেটে উন্নয়নের নামে রাস্তাঘাট বানানো হয়, কোটি টাকার পর্যটন নির্মাণ করা হয়। কিন্তু আমাদের মৌলিক অধিকার শিক্ষার জন্য কোনো প্রতিষ্ঠান নির্মাণ করা হলে ইউপিডিএফ তকমা লাগিয়ে বাধা দেওয়া হয়। তিনি সকল ষড়যন্ত্রমূলক মামলা বাতিল করে সাজেক এলাকায় মানসম্মত শিক্ষার পরিবেশ নিশ্চিত করার আহ্বান জানান।

সাধারণ শিক্ষার্থী রিয়া চাকমা বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামের মধ্যে সাজেক এলাকা অত্যন্ত প্রত্যন্ত অঞ্চল। সাজেকে আমরা মানসম্মত শিক্ষা পাই না। এখানকার প্রশাসনের বাধা-ষড়যন্ত্রের কারণে মানসম্মত শিক্ষার পরিবেশ তৈরি হচ্ছে না। শিক্ষা এমন একটা জিনিস যা সমাজ ও রাষ্ট্রের মানুষের জন্য একান্ত প্রয়োজন। শিক্ষা ছাড়া দেশ ও জাতি কখনো উন্নতি করতে পারে না।

তিনি প্রশ্ন করে বলেন, সাজেকে শিক্ষার্থীদের মানসম্মত শিক্ষা পরিবেশ নিশ্চিত করতে সেনাবাহিনী কেন বাধা দেয়?

তিনি স্কুল কলেজ নির্মাণে বাধা প্রদান বন্ধ করে সাজেকে মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করার জন্য সরকারের প্রতি দাবি জানান।



This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. AcceptRead More