রাঙামাটির কুদুকছড়িতে পিসিপি-এইচডব্লিউএফের আলোচনা সভা

রাঙামাটি প্রতিনিধি, সিএইচটি নিউজ
সোমবার, ১৫ জুন ২০২৬
“জঙ্গী আন্দোলন করে স্বায়ত্তশাসন আদায় হয় না’- প্রতিক্রিয়াশীল উক্তির মাধ্যমে দালালির পথ প্রশস্তকরণ, শাসকগোষ্ঠীর পক্ষাবলম্বন এবং অধিকার আদায়ের লড়াইয়ে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি সম্পর্কে রাঙামাটির কুদুকছড়িতে আলোচনা সভা করেছে বৃহত্তর পার্বত্য চট্টগ্রাম পাহাড়ি ছাত্র পরিষদ(পিসিপি) ও হিল উইমেন্স ফেডারেশন (এইচডব্লিউএফ) রাঙামাটি জেলা শাখা।
১৯৯৫ সালের ১৫ জুন জনসংহতি সমিতি বা শান্তিবাহিনীর প্রধান সন্তু লারমা উক্ত উক্তির মাধ্যমে আন্দোলনের বুকে ছুরিকাঘাতের মাধ্যমে দালালির পথ প্রশস্ত করে অধিকার আদায়ের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছেন বলে পিসিপি-এইচডব্লিউএফ মনে করে।
আজ সোমবার (১৫ জুন ২০২৬) বিকাল ৩ টার সময় আয়োজিত উক্ত আলোচনা সভায় পিসিপির রাঙামাটি জেলা শাখার সহ-সাধারণ ঝিমিত চাকমার সঞ্চালনায় আলোচনা করেন একই শাখার পিসিপি’র সাধারণ সম্পাদক দিপায়ন চাকমা ও হিল উইমেন্স ফেডারেশনের রাঙামাটি জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক রিতা চাকমা। সংহতি জানিয়ে উপস্থিত আলোচনা করেন ইউপিডিএফ সংগঠক তমেশ চাকমা।
সভায় স্থানীয় কার্বারী, যুব প্রতিনিধ ও শিক্ষার্থীরা অংশগ্রহণ করেন।
সভা শুরুতে পার্বত্য চট্টগ্রামে অধিকার প্রতিষ্ঠা লড়াইয়ে সকল বীর শহীদের স্মরণ করে দাঁড়িয়ে ১ মিনিট নীরবতা পালন করা হয়।

সভায় বক্তারা বলেন, ১৯৯৫ সালের এ দিনে পানছড়ির সীমান্তবর্তী গ্রাম ধুধুকছড়ায় অপেক্ষমান ছাত্র-যুবক ও ছাত্র-জনতার উদ্দেশ্যে সরকার-জেএসএসের মধ্যে চলমান বৈঠক ও পার্বত্য চট্টগ্রামের ভবিষ্যত নিয়ে ধারণা দিতে বক্তব্য দেয়ার সময় সন্তু লারমা তৎকালীন তিন গণতান্ত্রিক সংগঠন পিজিপি-পিসিপি-এইচডব্লিউএফ-এর উদ্দেশ্যে বলেন, “জঙ্গী আন্দোলন করে স্বায়ত্তশাসন আদায় হয় না, গুলতি মেরে স্বায়ত্তশাসন আদায় হয় না।” তার এই বক্তব্যে সেদিন সেখানে উপস্থিত তিন সংগঠনের নেতা-কর্মীদের মধ্যে প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করে। এতে পাহাড়ি গণ পরিষদ (পিজিপি) নেতা প্রদীপ লাল চাকমা তাৎক্ষণিকভাবে প্রশ্ন রেখে বলেন, ‘পার্বত্য চট্টগ্রামে স্বায়ত্তশাসন তাহলে কোন পথে অর্জিত হতে পারে? কীভাবে আন্দোলন করা দরকার, আপনি আমাদের বলে দিন।’ সমবেত জনতা আশা করেছিল সন্তু লারমা প্রদীপ লাল চাকমার প্রশ্নের উত্তর দেবেন। ভবিষ্যত আন্দোলনের ব্যাপারে দিক-নির্দেশনামূলক বক্তব্য বলবেন। কিন্তু পরবর্তীতে আলোচনার আশ্বাস দিয়ে তারা দ্রুত সমাবেশ স্থল ত্যাগ করেন। এ নিয়ে পরে প্রদীপ লাল চাকমা জনগণের সামনে অসন্তোষ প্রকাশ করেন ও কড়া সমালোচনা করেন। ধারণা করা হয়, জেএসএস’র অস্ত্র সমর্পণেরর পর ’৯৮ সালের ৪ এপ্রিল প্রদীপ লাল চাকমা ও কুসুমুপ্রিয় চাকমাকে হত্যার ঘটনা ছিল সন্তু লারমার সেই ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ।
বক্তারা আরো বলেন, অনেকে মনে করেন সন্তু লারমার উক্ত বক্তব্য ছিল সরকারের জন্য গ্রীণ সিগন্যাল। কারণ তার এ বক্তেব্যর কয়েক মাস পরেই সেনাবাহিনীর মদদে খাগড়াছড়িতে মুখোশ বাহিনী গঠন করে তিন সংগঠনের গণতান্ত্রিক আন্দোলনে বাধা সৃষ্টি করা হয়েছিল।

তারা বলেন, আমরা জানি, ১৯৭৫ সালে সন্তু লারমা আটকের পর ১৯৮০ সালে ৪৩ পৃষ্ঠার লিখিত শর্তনামার বিনিময়ে তৎকালীন জিয়াউর রহমান সরকার তথা সেনাবাহিনী তাকে মুক্তি দেয়। এরপর তিনি আবার শান্তিবাহিনীতে অন্তর্ভুক্ত হয়ে দলের ভাঙ্গন সৃষ্টি করেন এবং সরকারের এজেন্ডা সফল বাস্তবায়ন করেন। যার পরিণতি হয় শান্তিবাহিনীর মধ্যে সশস্ত্র গৃহযুদ্ধ এবং ’৮৩ সালের ১০ নভেম্বর মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমার মৃত্যু। পরবর্তীতে সন্তু লারমা জেএসএস বা শান্তিবাহিনীর হাল ধরলেও সরকারের সাথে আপোষরফার জন্য প্রচেষ্টা চালিয়ে যান। এরশাদ সরকার ও বিএনপি সরকারের সাথে আপোষরফায় যেতে না পারলেও আওয়ামী লীগ সরকারের সাথে আপোষ করে জুম্ম জনগণের স্বার্থকে জলাঞ্জলি দিয়ে ’৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন। এর মাধ্যমে তিনি অতীতের ধারাবাহিকতায় দালালি-সুবিধাবাদী ও প্রতিক্রিয়াশীলতার নজির স্থাপন করেন এবং পার্বত্য চট্টগ্রামে অধিকার আদায়ের আন্দোলনে এখনো প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে চলেছেন। তিনি শাসকগোষ্ঠির স্বার্থ রক্ষায় আঞ্চলিক পরিষদের গদিতে বসে এখনো ভ্রাতৃঘাতি সংঘাত জিইয়ে রেখেছেন।
তারা সন্তু লারমার অতীত ও বর্তমান রাজনীতির ইতিহাস জেনে নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে বলেন, সন্তু লারমা জাতিকে বিভক্তি ছাড়া কোন সুফল দিতে পারেননি। তিনি অতীতে যেমন শাসকগোষ্ঠির জুম্ম ধ্বংসের এজেন্ডা বাস্তবায়ন করেছেন, বতর্মানেও একই কাজ করে যাচ্ছেন। কাজেই, এ বিষয়ে নতুন প্রজন্মকে সচেতন হতে হবে এবং পার্বত্য চট্টগ্রামে জনগণের অধিকার আদায়ের প্রকৃত আন্দোলনের শক্তিকে চিনতে হবে।
বক্তারা, সন্তু লারমার মুখোশ উন্মোচন করে দিয়ে ভ্রাতৃঘাতি সংঘাতের বিরুদ্ধে এবং পূর্ণস্বায়ত্তশাসন প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার জন্য নতুন প্রজন্মের প্রতি আহ্বান জানান।
সিএইচটি নিউজে প্রকাশিত প্রচারিত কোন সংবাদ, তথ্য, ছবি ,ভিডিও, কনটেন্ট ব্যবহার করতে হলে কপিরাইট আইন অনুসরণ করে ব্যবহার করুন।
