শহীদ রূপনের আত্মাহুতি ও সমর-সুকেশ-মনতোষ গুম হওয়ার ৩০তম বার্ষিকীতে বাঘাইছড়িতে সমাবেশ

0

বাঘাইছড়ি প্রতিনিধি, সিএইচটি নিউজ

শনিবার, ২৭ জুন ২০২৬

কল্পনা চাকমাকে উদ্ধারের দাবিতে আন্দোলনে অংশ নিতে গিয়ে স্কুল ছাত্র রূপনের আত্মাহুতি ও সমর-সুকেশ-মনতোষ গুম হওয়ার ৩০তম বার্ষিকীতে বাঘাইছড়িতে ছাত্র-জনতার সমাবেশ, কালোব্যাজ ধারণ ও স্মৃতিস্তম্ভে পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ করেছে হিল উইমেন্স ফেডারেশন (এইচব্লিউএফ) ও বৃহত্তর পার্বত্য চট্টগ্রাম পাহাড়ি ছাত্র পরিষদ(পিসিপি)।

আজ শনিবার (২৭ জুন ২০২৬) সকাল ১০টায় বাঘাইছড়ি উপজেলার উজোবাজার এলাকার গঙ্গারাম মুখ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মাঠে এ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। এতে বাঘাইছড়ির বিভিন্ন এলাকা ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে প্রায় ৬ শতাধিক ছাত্র-যুব-নারী ও জনতা স্বতস্ফুর্তভাবে অংশগ্রহণ করেন।

সমাবেশের শুরুতে বিপ্লবী সংগীত বাজালে সমাবেশস্থলে সংগ্রামী আবহের সৃষ্টি হয়।

পাহাড়ে নিরাপত্তাহীন মা বোন রক্ষার্থে এগিয়ে এসো ছাত্র যুব সমাজ, বীর শহীদ রূপন, গুমের শিকার সমর-সুকেশ ও মনতোষের চেতনায় এলাকায় এলাকায় সংগঠিত হও, গড়ে তোল প্রতিরোধ” এই আহ্বানে আয়োজিত সমাবেশে পাহাড়ি ছাত্র পরিষদের রাঙামাটি জেলা শাখার সাংগঠনিক সম্পাদক পলেন চাকমর সঞ্চালনায় বক্তব্য দেন, পাহাড়ি ছাত্র পরিষদের কেন্দ্রীয় সহ-সাধারণ সম্পাদক শান্ত চাকমা ও হিল উইমেন্স ফেডারেশনের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক রিতা চাকমা। এছাড়াও সমাবেশ মঞ্চে উপস্থিত ছিলেন পার্বত্য চট্টগ্রাম নারী সংঘের বাঘাইছড়ি উপজেলা শাখার সভাপতি অমিতা চাকমা, সাজেক কার্বারী এসোসিয়েশনের সভাপতি নতুন জয় চাকমা ও সাজেক গণ অধিকার রক্ষা কমিটির সদস্য সচিব বাবুধন চাকমা প্রমুখ।

সমাবেশের শুরুতে লে. ফেরদৌস গং কর্তৃক অপহৃত কল্পনা চাকমাকে উদ্ধার করতে গিয়ে রাষ্ট্রীয় বাহিনী ও সেটলার কর্তৃক শহীদ ও গুম হওয়া রূপন-সমর-সুকেশ-মনতোষ’র স্মরণে নির্মিত অস্থায়ী স্মৃতিস্তম্ভে বীরদের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করে চৌকস দলের মাধ্যমে শ্রদ্ধাঞ্জলি অর্পণ করেন হিল উইমেন্স ফেডারেশন, পার্বত্য চট্টগ্রাম নারী সংঘ ও বৃহত্তর পার্বত্য চট্টগ্রাম পাহাড়ি ছাত্র পরিষদের নেতৃবৃন্দ। এলাকার শিশু-কিশোররাও স্মৃতিস্তম্ভে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন।

এরপর উপস্থিত ছাত্র-জনতা কল্পনা চাকমার মুক্তি ও রূপন-সমর-সুকেশ-মনতোষ’র গুম-হত্যাকারীদের বিচার দাবিতে সম্মিলিতভাবে স্লোগান দেন। এতে সমাবেশ প্রাঙ্গণ মুখরিত হয়ে উঠে।

সমাবেশে ছাত্রনেতা শান্ত চাকমা বলেন, ১৯৯৬ সালে কল্পনা চাকমাকে অপহরণের পরে ছাত্র-যুব ও জনতার মনে ব্যাপক প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়। ২৭ জুন তৎকালীন পিসিপি, পিজিপি ও এইচডব্লিউএফের ডাকা সড়ক ও নৌ পথ অবরোধ কর্মসূচিতে ছাত্র-জনতা স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ করে। উক্ত অবরোধ বানচালে স্থানীয় প্রশাসন, পুলিশ, সেনা-সেটলাররা মরিয়া হয়ে উঠে। আহুত শান্তিপূর্ণ কর্মসূচিতে সেটলার বাঙালিরা পুলিশের কাছ থেকে রাইফেল কেড়ে নিয়ে গুলি করলে সেখানেই রূপন শহীদ হন| একই দিন সেটলার কর্তৃক গুমের শিকার হন সমর, সুকেশ ও মনতোষ চাকমা। সেনা-পুলিশের প্রত্যক্ষ মদদে সংঘটিত এ ঘটনার ৩০ বছর অতিক্রান্ত হওয়ার পরও ঘটনায় জড়িতদের গ্রেফতার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা হয়নি। বরং কল্পনা চাকমা অপহরণকারী লে. ফেরদৌস গংদের আরো দুষ্কৃতিমূলক কর্মকাণ্ডে মদদ দিয়ে তাদের পদমর্যাদা বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে।

হিল উইমেন্স ফেডারেশনের নেত্রী রিতা চাকমা বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামের জনগণ নিপীড়ন-নির্যাতনের যাঁতাকলে পিষ্ট। বাংলাদেশ স্বাধীনতার পরও পার্বত্য অঞ্চলের জুম্ম জনগণের ভাগ্য অপরিবর্তিত রয়ে গেছে। ’২৪-এ গণঅভ্যুত্থানের পরে নতুন গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র গঠনের কথা থাকলেও পাহাড়ে জনগণের ভাগ্যের পরিবর্তন হয়নি। সেনাবাহিনী কর্তৃক রুবেল-জুনান’কে হত্যা, ধর্ষণের ঘটনার প্রতিবাদ জানাতে গিয়ে গুইমারায় নির্বিচারে হত্যা ও অগ্নিসংযোগের ঘটনাও সমর-সুকেশ-মনতোষের গুম হওয়া এবং রূপনের আত্মাহুতির সাথে মিল রয়েছে। কল্পনা চাকমাকে উদ্ধার করতে যেভাবে রূপন’রা বীরত্বপুর্ণ ভূমিকা রেখেছে, খাগড়াছড়ি সিঙ্গিনালা ধর্ষণের ঘটনার প্রতিবাদ জানাতে গিয়ে আখ্র, আথুইপ্রু, থোয়াইচিং মারমারাও বীরত্বপুর্ণ ভুমিকা রেখেছেন। জাতীয় অস্তিত্ব ও জাতবোন রক্ষার্থে যুগে যুগে রূপন-আখ্র-আথুইপ্রু- থোয়াইচিং মারমাদের মতো বীর পার্বত্য চট্টগ্রামে জন্মায় বলেই এখনো চিম্বুক থেকে ফুরোমোন, সাজেক থেকে গুইমারায় প্রতিবাদ-প্রতিরোধ গড়ে ওঠে।

বক্তারা আরো বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামে অন্যায় অত্যাচারীর মূল হোতা সেনাবাহিনী। নিজেরাই কৃত্রিম সমস্যা ˆতরী করে পাহাড়ে শাসন-শোষণ চালিয়ে যাচ্ছে। ২০২২ সালে রাঙামাটিতে এপিবিএন ক্যাম্প ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনকালে তৎকালীন পুলিশের আইজিপি বেনজির আহমেদ, তৎকালীন চট্টগ্রাম ক্যান্টনমেন্টের জিওসি সাইফুল আবেদিন দাম্ভিকতাপূর্ণ বক্তব্য দিলেও তারা নিজেরাই ইতিহাসের আস্তাকুঁড়ে নিক্ষিপ্ত হয়েছে। সুতরাং কল্পনা চাকমাকে অপহরণ, রূপনকে গুলি করে হত্যা এবং সমর-সুকেশ মনোতোষের গুমের ঘটনায় জড়িতদের শাস্তি না দিয়ে মাথায় তুলে রাখলেও ইতিহাস তাদের হত্যাকারী হিসেবে চিহ্নিত করবে।

তারা বীর শহীদ রূপন এবং গুমের শিকার সমর-সুকেশ ও মনতোষের চেতনায় এলাকায় এলাকায় সংগঠিত হয়ে অন্যায়-অবিচারের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলার জন্য ছাত্র-যুব-নারী ও জনগণের প্রতি আহ্বান জানান।

সমাবেশে শেষে বীর শহীদ রূপন ও সমর-সুকেশ-মনতোষ গুমের ৩০তম বার্ষিকীতে তাঁদের প্রতি সম্মান জানিয়ে উপস্থিত জনতা মুষ্টিবদ্ধ হাত উঁচিয়ে নতুন দিনের লড়াই সংগ্রামে অবিচল থাকার দৃপ্ত শপথ গ্রহণ করেন। শপথ বাক্য পাঠ করেন হিল উইমেন্স ফেডারেশনের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক রিতা চাকমা।

সমাবেশে উপস্থিত জনতা মুষ্ঠিবদ্ধ হাতে লড়াই সংগ্রামের শপথ নিচ্ছেন।

উল্লেখ্য, ১৯৯৬ সালের ১২ জুন হিল উইমেন্স ফেডারেশনের তৎকালীন কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক কল্পনা চাকমাকে তৎকালীন কজইছড়ি ক্যাম্পের কমান্ডার লে. ফেরদৌস-এর নেতৃত্বে ভিডিপি প্লাটুন কমান্ডার সালেহ আহম্মদ ও ভিডিপি সদস্য নুরুল হক গং কর্তৃক অপহরণের পরে ২৭ জুন কল্পনা চাকমার মুক্তির দাবিতে পিসিপি, পিজিপি ও এইচডব্লিউএফ সড়ক ও নৌ পথ অবরোধ কর্মসূচির ডাক দেয়। উক্ত কর্মসূচি সফল করতে গিয়ে আনসার-ভিডিপি সদস্যদের গুলিতে ১০ম শ্রেণির ছাত্র রূপন চাকমা শহীদ হন এবং সেটলার বাঙালিরা সমর-সুকেশ-মনতোষ চাকমাকে গুম করে।



This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. AcceptRead More