এপ্রিল মাসে পার্বত্য চট্টগ্রামে মানবাধিকার লঙ্ঘনের চিত্র

ডেস্ক রিপোর্ট, সিএইচটি নিউজ
সোমবার, ৪ মে ২০২৬
ইউপিডিএফের মানবাধিকার পরিবীক্ষণ সেলের মাসিক মানবাধিকার রিপোর্ট “পরিবীক্ষণ”-এ গত এপ্রিল মাসে পার্বত্য চট্টগ্রামে মানবাধিকার লঙ্ঘনের তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। এতে রাষ্ট্রীয় বাহিনী, জেএসএস(সন্তু), ঠ্যাঙাড়ে সন্ত্রাসী, সেটলার বাঙালি, প্রশাসন ও বনবিভাগ কর্তৃক সংঘটিত মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনাবলীসহ নারীর ওপর সহিংসতার চিত্র উঠে এসেছে।
গত ২ মে ২০২৬ প্রকাশিত উক্ত রিপোর্টে রাষ্ট্রীয় বাহিনীর দ্বারা সংঘটিত ঘটনা তুলে ধরে বলা হয়েছে, “পার্বত্য চট্টগ্রামে রাষ্ট্রের নিয়োজিত সেনাবাহিনীর মানবাধিকার লঙ্ঘন অব্যাহত রয়েছে। বাংলাদেশে ভোটের মাধ্যমে নির্বাচিত গণতান্ত্রিক সরকার ক্ষমতায় আসার পরও এ অঞ্চলে মানবাধিকার পরিস্থিতির কোন উন্নতি হয়নি।
গত এপ্রিল মাসে সেনা অপারেশনের নামে নিরীহ গ্রামবাসীদের ঘরবাড়ি তল্লাশি-লুটপাট ও হয়রানির বেশ কিছু ঘটনার খবর পাওয়া গেছে। তথ্য মতে, অন্তত ৮ ব্যক্তির বাড়িতে হয়রানিমূলক তল্লাশির ঘটনা ঘটে। তল্লাশি অভিযানকালে রাঙামাটির বাঘাইছড়ি উপজেলার বঙ্গলতলী এলাকার একটি পুরাতন স্কুল রুম থেকে এলাকাবাসীর সামাজিক কাজে ব্যবহৃত সরঞ্জাম (বাসন, বাতি) লুটে নেয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে।
এছাড়া মাটিরাঙ্গার তাইন্দং ইউনিয়নের ভগবানটিলা এলাকায় সেনাবাহিনীর ২৪ পদাতিক ডিভশনের জিওসি মেজর জেনারেল ফেরদৌস হাসান সেলিম-এর সফরসহ অন্তত ১০টি স্থানে সেনাবাহিনী জনমনে ভীতি সঞ্চারমূলক অপারেশন পরিচালনা করেছে। পাহাড়িদের উৎসবের সময়ও তারা অপারেশন ও তৎপরতা চালায়। মূলত ইউপিডিএফের নিয়ন্ত্রিত এলাকাগুলোতে এই অপারেশন পরিচালনা করা হয়। এ সময় সাধারণ জনগণকে নানা জিজ্ঞাসাবাদের নামে হয়রানি করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। অপারেশনকালে সেনারা কিছু কিছু স্থানে বিদ্যালয়ে অবস্থান করে। এতে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় ব্যাঘাত সৃষ্টি হয় বলে জানা গেছে।”
প্রশাসন কর্তৃক সংঘটিত ঘটনার বিষয়ে এতে বলা হয়েছে, “গত এপ্রিল মাসে খাগড়াছড়িতে জেলা প্রশাসন কর্তৃক আলুটিলা পর্যটন কেন্দ্র এলাকায় স্থানীয় পাহাড়ি (ত্রিপুরা সম্প্রদায়) ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের অন্তত ১২টি দোকান বন্ধ করে দেয়ার ঘটনা ঘটে। গত ১ এপ্রিল উক্ত স্থানে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে একটি টিম উচ্ছেদ অভিযান পরিচিালনা করতে গিয়ে ˆবধ কাগজপত্র না থাকার অজুহাত দেখিয়ে দোকানগুলো বন্ধের নির্দেশ প্রদান করা হয়। পরে এ খবর জানাজানি হলে সেটা নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা ও এলাকার জনমনে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়। এর প্রেক্ষিতে প্রশাসন “বৈসু” বা ‘ˆবসাবি’ উৎসব পর্যন্ত দোকানগুলো খোলা রাখার অনুমতি প্রদান করে বলে জানা যায়।”
বনবিভাগের দ্বারা সংঘটিত ঘটনা তুলে ধরে রিপোর্টে বলা হয়েছে, “পার্বত্য চট্টগ্রামে সরকারের বনবিভাগও পাহাড়িদের ওপর নানা জুলুম করে থাকে। গত এপ্রিল মাসে এ ধরনের একটি ঘটনা ঘটেছে বান্দরবানে। গত ১১ এপ্রিল বান্দরবান জেলার আলীকদম উপজেলার মাতামুহুরি রিজার্ভ এলাকায় বনবিভাগ কর্তৃক খিনওয়াই ম্রো নামে এক জুমচাষীর নতুন জুমে রোপণ করা প্রায় ১,০০০টি কলাগাছ ক্ষতিগ্রস্ত করে দেয়ার অভিযোগ পাওয়া যায়। যার ক্ষতির পরিমাণ আনুমানিক ৪৯,৫০০ টাকা বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন।”
রিপোর্টে জেএসএস (সন্তু)-এর মানবাধিকার লঙ্ঘনের চিত্র তুলে ধরে বলা হয়েছে, “সন্তু লারমার নেতৃত্বাধীন পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি বা পিসিজেএসএস রাষ্ট্রীয় বাহিনীর প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ সহযোগিতায় খুন, অপহরণসহ বিভিন্ন মানবাধিকার লঙ্ঘনের সাথে জড়িত হয়ে পড়েছে।
গত এপ্রিল মাসে জেএসএস-এর সশস্ত্র সন্ত্রাসীদের দ্বারা ইউপিডিএফের সহযোগী সংগঠন গণতান্ত্রিক যুব ফোরামের কেন্দ্রীয় সহসভাপতি ধর্মশিং চাকমা হত্যার শিকার হন। গত ১৭ এপ্রিল রাঙামাটির কুদুকছড়ির আবাসিক নামক গ্রামে সংঘটিত এ ঘটনায় সন্ত্রাসীদের গুলিতে গুরুতর আহত হন ধর্মশিং চাকমার দুই বোন কৃপাসোনা চাকমা ও ভাগ্য শোভা চাকমা। তারা বর্তমানে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। এ ঘটনায় প্রতিবাদ বিক্ষোভ সংঘটিত হলেও প্রশাসন এখনো খুনিদের গ্রেফতারে কোন পদক্ষেপ নেয়নি।
ঠ্যাঙাড়ে সন্ত্রাসীদের দ্বারা সংঘটিত ঘটনা তুলে ধরে এতে বলা হয়েছে, “পার্বত্য চট্টগ্রামে ঠ্যাঙাড়ে সন্ত্রাসীদের তৎপরতাও অব্যাহত রয়েছে। রাষ্ট্রীয় বাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থার মদদে তারা খুনসহ বিভিন্ন মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা সংঘটিত করে যাচ্ছে।
“গত এপ্রিল মাসে ঠ্যাঙাড়ে সন্ত্রাসীদের হাতে ইউপিডিএফ সদস্য নিউটন চাকমা ওরফে নির্মল (৪৭) হত্যার শিকার হন। খাগড়াছড়ি সদর উপজেলার ১নং খাগড়াছড়ি ইউনিয়নের অন্তর্গত আকবাড়ি নামক স্থানে গত ৮ এপ্রিল এ হত্যার ঘটনাটি সংঘটিত হয়। এ ঘটনায় অজিত চাকমার নেতৃত্বে একদল সশস্ত্র ঠ্যাঙাড়ে সন্ত্রাসীর সাথে মাহফুজুর রহমান মাসুম ও মাসুদ রানা নামে রাষ্ট্রীয় গোয়েন্দা সংস্থার দু’জন কর্মকর্তাও সরাসরি হত্যার মিশনে অংশ নেন বলে অভিযোগ রয়েছে।”
রিপোর্টে নারীর ওপর সহিংসতার চিত্র তুলে ধরে বলা হয়েছে, “পার্বত্য চট্টগ্রামে পাহাড়ি নারীর ওপর যৌন সহিংসতার ঘটনা প্রায়ই ঘটে থাকে। গত এপ্রিল মাসে এ ধরনের অন্তত দুটি ঘটনার তথ্য পাওয়া গেছে। ২৩ এপ্রিল ১২ বছর বয়সী ম্রো শিশু/কিশোরীকে এক বাঙালি ফেরিওয়ালা ধর্ষণের চেষ্টা করে। স্থানীয়রা অভিযুক্ত মো. রাসেলকে আটক করলেও গোয়েন্দা সংস্থার দু’জন কর্মকর্তার হস্তক্ষেপে স্থানীয় মৌজার হেডম্যানের মাধ্যমে ১০ হাজার টাকা জরিমানায় তাকে ছেড়ে দেয়ার অভিযোগ রয়েছে।
অপর ঘটনায় আরেকজন পাহাড়ি কিশোরী এক বাঙালি শ্রমিক কর্তৃক উত্ত্যক্তকরণের শিকার হন। ২০ এপ্রিল সংঘটিত এ ঘটনায় ভুক্তভোগী কিশোরী তীব্র প্রতিবাদ করলে স্থানীয় লোকজন অভিযুক্ত ব্যক্তিকে কড়া সতর্ক করে ছেড়ে দেন। তাকে আইনের হাতে সোপর্দ করা হয়নি।”
সেটলার বাঙালি কর্তৃক সংঘটিত ঘটনা তুলে ধরে রিপোর্টে বলা হয়েছে, “পার্বত্য চট্টগ্রামে পুনর্বাসিত সেটলার বাঙালিরা ঠুনকো ইস্যুতে পাহাড়িদের ওপর সাম্প্রদায়িক হামলা সংঘটিত করে থাকে। গত এপ্রিল মাসে পাহাড়িদের প্রধান সামাজিক উৎসবের সময় রাঙামাটির কাউখালী উপজেলার ঘাগড়া বাজারে সিএনজি ভাড়া নিয়ে বিতর্কের জের ধরে এমন একটি হামলার ঘটনা ঘটেছে।
গত ১৩ এপ্রিল চাকমা জাতিসত্তার “মূল বিঝু” উৎসবের দিন কয়েকজন পাহাড়ি যুবক ঢাকা থেকে আসা বাঙালি শিক্ষার্থী বন্ধুদের নিয়ে পাড়ায় ঘুরতে যাবার সময় ঘাগড়া বাজারে সিএনজি (অটোরিক্সা) ভাড়া বেশি চাওয়াকে কেন্দ্র করে চালকের সাথে বিতর্কের জেরে সৃষ্ট ঘটনাটি পরে সাম্প্রদায়িক হামলার রূপ নেয়। এতে সেটলার সিএনজি চালক ও দোকানদারদের হামলায় অন্তত ২০ জন পাহাড়ি যুবকসহ ঢাকা থেকে আসা বাঙালি শিক্ষার্থী আহত হন। এ হামলার সময় ঘটনাস্থলে ৩টি গাড়িতে করে সেনাবাহিনীর সদস্যরা উপস্থিত থাকলেও তারা হামলাকারী সেটলারদের বিরুদ্ধে কোন পদক্ষেপ নেয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে।”
এছাড়া রিপোর্টে আরো বলা হয়েছে, “গত এপ্রিল মাসে প্রথম শ্রেণির পাহাড়ি শিশু শিক্ষার্থীকে বিদ্যালয়ের সিসিটিভি ক্যামেরা বন্ধ করে অমানুষিক শারীরিক নির্যাতনের অভিযোগ উঠে সহকারী শিক্ষক ফরিদুল আলমের বিরুদ্ধে। গত ১ এপ্রিল বান্দরবানের লামা উপজেলার গজালিয়া ইউনিয়নের বোচাপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে এই ঘটনাটি ঘটে।
অভিযোগ রয়েছে, ক্লাস চলাকালীন ৬ বছর বয়সী ১ম শ্রেণির ছাত্রী রেশমি ত্রিপুরা ব্ল্যাকবোর্ডে বর্ণমালা লিখতে না পারায় শিক্ষক ফরিদুল আলম তাকে জোরে চড়-থাপ্পড় মারেন। শিশুটির কান্নার শব্দ যাতে বের না হয় সে জন্য মুখ চেপে ধরেন এবং প্রমাণ মুছে দিতে সিসিটিভি ক্যামেরা বন্ধ করে দেন। এতে এক পর্যায়ে শিশুটি জ্ঞান হারিয়ে ফেলে। পরে অজ্ঞান অবস্থায় তাকে সহপাঠীরা বাসায় নিয়ে গিয়ে বিষয়টি শিশুটির মাকে জানায়। এরপর শিশুটির মা স্কুলে এসে আর্তনাদ ও অভিযোগের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ায় প্রতিবাদ ও ব্যাপক সমালোচনার সৃষ্টি হয়| সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ তার বিরুদ্ধে আইনী পদক্ষেপ গ্রহণের কথা বললেও এ বিষয়ে আদৌ কোন পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে কিনা তা জানা যায়নি।”
সিএইচটি নিউজে প্রকাশিত প্রচারিত কোন সংবাদ, তথ্য, ছবি ,ভিডিও, কনটেন্ট ব্যবহার করতে হলে কপিরাইট আইন অনুসরণ করে ব্যবহার করুন।
