পার্বত্য চট্টগ্রামে পাকিস্তানের বেলুচ রেজিমেন্টের আগ্রাসনের বিরুদ্ধে কুদুকছড়িতে ‘প্রতীকী প্রতিরোধ’ কর্মসূচি পালন করেছে এসিসি

0


রাঙামাটি প্রতিনিধি, সিএইচটি নিউজ
শুক্রবার, ২১ আগস্ট ২০২৬

১৯৪৭ সালের ২০ আগস্ট পার্বত্য চট্টগ্রামে পাকিস্তানের বেলুচ রেজিমেন্টের আগ্রাসনের বিরুদ্ধে রাঙামাটির কুদুকছড়িতে ‘প্রতীকী প্রতিরোধ’ কর্মসূচি পালন করেছে অগ্রণী শিশু-কিশোর কেন্দ্র (এসিসি)। একই সাথে তারা ব্রিটিশ আগ্রাসন প্রতিরোধের বীর নায়কদের প্রতি সম্মান প্রদর্শন ও ‘অস্তিত্ব রক্ষার মন্ত্র উচ্চারণ’ কর্মসূচিও পালন করেছে।

আজ শুক্রবার (২১ আগস্ট ২০২৬) দুপুর ১:০০টায় এ কর্মসূচি পালন করা হয়।    

কর্মসূচির শুরুতে ব্রিটিশ আগ্রাসন প্রতিরিাধের বীর নায়কদের সম্মান জানিয়ে তাদের স্মরণে নির্মিত অস্থায়ী স্মৃতিস্তম্ভে এবং স্নেহকুমার চাকমার প্রতিকৃতিতে বিভিন্ন এলাকা থেকে সমবেত হওয়া শিশু, কিশোর-কিশোরীরা ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন।

পরে আগ্রণী শিশু, কিশোর-কিশোরীরা চেঙে, মেয়েনি, কাজলঙ ও মাউরুম নাম দিয়ে চারটি স্কোয়াড এবং একটি প্লাটুনে ভাগ হয়ে প্রতীকী প্রতিরোধ হিসেবে বেলুচ রেজিমেন্ট সৈন্যদের কুশপুত্তলিকায়, বাউন্ডারি কমিশনের চেয়ারম্যান সিরিল র‍্যাডক্লিফ, লর্ড মাউন্ট ব্যাটেনের ছবিতে, পাকিস্তানের পতাকায়  ও বেলুচ রেজিমেন্টাল ইনসিগনিয়ায় এবং ফজলুল কাদের চৌধুরী ও সরকারি দালালদের বিরুদ্ধে সুশৃঙ্খলভাবে লাঠি, ঝাড়ু দিয়ে ‘প্রতীকী আক্রমণ’ ঘৃণা প্রকাশ করেন। এ সময় উপস্থিত জনতা ও শিশু-কিশোররা আগ্রাসন বিরোধী গগনবিদারী স্লোগান দিয়ে কর্মসূচিস্থল প্রকম্পিত করে।

এরপর দ্বিতীয় পর্বে এক আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়। এতে  অগ্রণী শিশু-কিশোর কেন্দ্রের রাঙামাটি সদর উপজেলা শাখার সভাপতি কিতু চাকমার সভাপতিত্বে ও প্রিয়সী চাকমার সঞ্চালনায় বক্তব্য দেন ইউপিডিএফ সংগঠক তনুময় চাকমা ও এলাকার বিশিষ্ট মুরুব্বি শান্তুনু চাকমা।

সভায় স্ফূরণ ম্যাগাজিনে প্রকাশিত আগ্রাসনের ওপর লেখাটি পাঠ করেন এসিসি’র উপজেলা সহ-সভাপতি শ্রদ্ধাপূর্ণা দেওয়ান। এছাড়া সভা মঞ্চে আরো উপস্থিত ছিলেন পিসিপি’র জেলা সভাপতি চয়ন চাকমা, হিল উইমেন্স ফেডারেশনের রাঙামাটি জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক রিতা চাকমা।

সভায় ইউপিডএফ সংগঠক তনুময় চাকমা বলেন, পৃথিবীতে যারা দেশ, জাতি রক্ষা করার জন্য জীবন উৎসর্গ করেছেন তারা যুগে যুগে স্মরণীয় বরণীয়। পৃথিবীতে যারা ব্যক্তি বা সরকারের স্বার্থের জন্য জাতি বা নিজেদের অস্তিত্বকে বিক্রি করেছেন তারা সকলের কাছে নিন্দিত।

তিনি আরো বলেন, ১৯৪৭ সালে ধর্মের ভিত্তিতে ভারত ও পাকিস্তান রাষ্ট্র  হলেও ৯৮% অমুসলিম অধ্যুষিত পার্বত্য চট্টগ্রামকে মুসলিম অধ্যুষিত পাকিস্তানের সাথে অন্তর্ভূক্ত করে দেওয়া হয়। এরপর ’৪৭-এর ২০ আগস্ট পাকিস্তানের বেলুচ রেজিমেন্ট পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে ভারতের পতাকা নামিয়ে পাকিস্তানের পতাকা উত্তোলনের মাধ্যমে পার্বত্য চট্টগ্রামকে তাদের শাসনাধীন করে নেয়। এরপর থেকে পাহাড়িদের ওপর নেমে এসেছে অন্যায় দমন-পীড়ন। ১৯৭১ সালে পাকিস্তানের কবল থেকে বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পরও পার্বত্য চট্টগ্রামের মানুষের ভাগ্যের কোনো পরিবর্তন হয়নি। স্বাধীন বাংলাদেশের শাসকগোষ্ঠি পাকিস্তানের কায়দায় পাহাড়িদের ওপর নিপীড়ন-নির্যাতন জারি রাখে। ভূমি বেদখল, অন্যায় দমন-পীড়ন, নারী নির্যাতন, বিচারবহির্ভুত হত্যা, গুম এখনো অব্যাহত রয়েছে।

তিনি অতীতের ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিয়ে সকল ষড়যন্ত্র ও দমন-পীড়নের বিরুদ্ধে ছাত্র, যুব সমাজ ও নতুন প্রজন্মকে রাজনৈতিক চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনের জন্য প্রস্তুত হওয়ার আহ্বান জানান।

এলাকার মুরুব্বী শান্তুনু চাকমা বলেন, সমাজ ও জাতিকে শোষণ থেকে মুক্ত করতে পারে একমাত্র ছাত্র ও যুব সমাজ। ছাত্র-যুব সমাজকে বাদ দিয়ে যেমন দেশ ও সমাজের ভবিষ্যতে চিন্তা করা যায় না, তেমনি পুরোনো  ইতিহাস থেকে শিক্ষা না নিয়েও আমরা ভবিষ্যতের চিন্তা করতে পারবো না। তাই পার্বত্য চট্টগ্রামে ব্রিটিশ আগ্রাসন ও পাকিস্তানের আগ্রাসন থেকে শিক্ষা নিয়ে ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুত হতে হবে।

সভাপতির বক্তব্যে কিতু চাকমা বলেন, ৭৯ বছর আগে ১৯৪৭ সালে ধর্মের ভিত্তিতে ভারত ও পকিস্তান রাষ্ট্রের জন্ম হয়। সে সময় পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়ি জনগণ চেয়েছিল ভারতে অন্তর্ভূক্তির। তৎসময়ে ১৫ আগস্ট স্নেহ কুমার চাকমার নেতৃত্বে পার্বত্য চট্টগ্রামে (রাঙামাটিতে) ভারতের পতাকা উত্তোলন করা হয়। বান্দরবানেও বোমাং রাজার নেতৃত্বে বার্মার পতাকা উত্তোলিত হয়। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাস যে, ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসকরা পরিকল্পিতভাবে ৯৮% অমুসলিম অধ্যুষিত পার্বত্য চট্টগ্রামকে মুসলিম অধ্যুষিত পাকিস্তান রাষ্ট্রের সাথে অন্তর্ভুক্ত করে দেয়। যার ফলে ১৯৪৭ সালের ২০ আগস্ট পাকিস্তানের বেলুচ রেজিমেন্ট পার্বত্য চট্টগ্রামে সশস্ত্র আগ্রাসন চালিয়ে ভারত ও বার্মার পতাকা নামিয়ে পাকিস্তানের পতাকা উত্তোলন করে পার্বত্য চট্টগ্রামকে দখল করে নেয়।

তিনি আরো বলেন, তখনকার সময়ে পাহাড়িদের মধ্যে সুসংগঠিত নেতৃত্বগ না থাকার কারণে বেলুচ রেজিমেন্টকে প্রতিরোধ করা সম্ভব হয়নি। তাই ভবিষ্যতে পার্বত্য চট্টগ্রামকে সুরক্ষায় যেকোনো আগ্রাসনের বিরুদ্ধে আমাদেরকে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। অতীতের ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুত হতে হবে। আমাদের বাপ-দাতদার ভিটেমাটি, জায়গা-জমি থেকে যাতে আমাদের উচ্ছেদ হতে না হয়, যযাতে আমাদের মা-বোনদের কেউ লাঞ্ছিত করতে না পারে তার জন্য আমাদের সর্বদা প্রস্তুত ও সতর্ক থাকতে হবে।

কর্মসূচিতে শিশু, কিশোর-কিশোরী ও উপস্থিত লোকজন ‘অস্তিত্ব রক্ষার মন্ত্র উচ্চারণ’-এর অংশ হিসেবে মুষ্ঠিবদ্ধ হাতে শপথ গ্রহণ করেন। 




This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. AcceptRead More