কাউখালীতে ‘প্রতীকী প্রতিরোধ’ কর্মসূচির মধ্য দিয়ে পাক আগ্রাসন দিবস পালিত

0


কাউখালী প্রতিনিধি, সিএইচটি নিউজ

বৃহস্পতিবার, ২০ আগস্ট ২০২৬ 

রাঙামাটির কাউখালীতে ‘প্রতীকী প্রতিরোধ’ এবং কর্মসূচির মধ্য দিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রামে ‘পাকিস্তানি আগ্রাসন’ দিবস পালিত হয়েছে।

আজ বৃহস্পতিবার (২০ আগস্ট ২০২৬) বিকাল ৩টায় কাউখালীর ডাবুয়া এলাকায় অগ্রণী শিশু-কিশোর কেন্দ্র (এসিসি) কাউখালী উপজেলা শাখার উদ্যোগে এ কর্মসূচির আয়োজন করা হয়। একই সাথে ‘ব্রিটিশ আগ্রাসন প্রতিরোধের বীর নায়কদের প্রতি সম্মান প্রদর্শন’ ও ‘অস্তিত্ব রক্ষার মন্ত্র উচ্চারণ’ করা হয়েছে।

কর্মসূচিতে কাউখালীর বিভিন্ন এলাকা হতে হাজারের অধিক ছাত্র, যুব-নারী ও বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশগ্রহণ করেন।

কর্মসূচি পালনকালে মাঠে কালো পতাকা উত্তোলন করা হয় এবং উপস্থিত সকলে কালো ব্যাজ ধারণ করেন।

শুরুতে সঞ্চালকের মাধ্যমে লিখিত বক্তব্য পাঠ করা হয়। এতে বলা হয়, “ভারত ও পাকিস্তান স্বাধীনতা লাভ করেছিলো এই আগস্ট মাসের ১৯৪৭ সালে। ১৪ আগস্ট পাকিস্তান আর তারপরের দিন ১৫ আগস্ট ভারত স্বাধীন হয়েছিলো। তাদের জন্য আগস্ট মাস বয়ে এনেছে সৌভাগ্য। তাই এ মাস তাদের কাছে আশীর্বাদের মতো। অন্যদিকে, এই আগস্ট মাসটা হচ্ছে পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলের মানুষের জন্য দুর্দশা বয়ে আনার এক দুঃস্বপ্নের কাল অধ্যায়। ১৯৪৭ সালের ২০ আগস্ট এক অভিশপ্ত দিনে পার্বত্য চট্টগ্রাম আগ্রাসনের শিকার হয়। পার্বত্য চট্টগ্রামের ইতিহাসে এটি একটি কালো দিবস। পাকিস্তান কর্তৃক জবর দখল হবার পর হতে পার্বত্য চট্টগ্রামের সহজ সরল দুর্ভাগা, জনতা আর সুখশান্তির মুখ দেখতে পায়নি। পরবর্তী পার্বত্য চট্টগ্রামের ইতিহাস হচ্ছে অবর্ণনীয় লাঞ্ছনা-বঞ্চনা, অত্যাচার, নিপীড়ন নির্যাতন আর হত্যাযজ্ঞের এক দীর্ঘ বিভীষিকাময় জীবন্ত গাঁথা।”

লিখিত বক্তব্যে আরো বলা হয়, “২০ আগস্ট পাকিস্তান ব্রিটিশদের কাছ থেকে স্বাধীনতা লাভের ৬ দিনের মাথায় সামরিক আগ্রাসন চালিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রাম দখল করে নিয়েছিলো। পাকিস্তানের হানাদার বাহিনী বেলুচ রেজিমেন্ট প্রথমে পার্বত্য চট্টগ্রামের রাজধানী রাঙামাটিতে হানা দেয়। পরে বান্দরবানও দখল করে নেয়। সে সময় অর্থাৎ এখন হতে ৭৯ বছর আগে পার্বত্য চট্টগ্রামের মানুষ পাকিস্তানের হানাদার বাহিনীর আগ্রাসনের মুখে ছিলো অসহায়। কর্ণফুলী নদীর পারে পার্বত্য চট্টগ্রামের ফ্রন্টিয়ার পুলিশদের  নিয়ে পাকিস্তানের হানাদার বাহিনীকে প্রতিরোধ করার পরিকল্পনাও নেয়া হয়েছিলো। সে যুগে চট্টগ্রাম হতে নদী পথেই রাঙামাটিতে যেতে হতো। এখনকার চট্টগ্রাম-রাঙামাটি পাকা সড়ক তখন ছিলো না। কিন্তু পরিকল্পনা নেয়া হলেও উপযুক্ত সংগঠন আর নেতৃত্ব না থাকায় সে সময় হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে পার্বত্য চট্টগ্রামের জনতা তেমন কোন প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারেনি। অথচ শত বছর আগে এই পার্বত্য চট্টগ্রামের জনতাই পরাক্রমশালী ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে বীর বিক্রমে যুদ্ধ করে স্বাধীনতা রক্ষা করেছিলো। ব্রিটিশরা যুদ্ধ করে পার্বত্য চট্টগ্রামের স্বাধীনতা প্রিয় জাতিসত্তাসমূহকে পরাস্ত করতে পারেনি। ইতিহাসের নিষ্ঠুর পরিহাস, পাকিস্তানের বেলুচ রেজিমেন্টকে ’৪৭ সালে পার্বত্য চট্টগ্রাম দখলের সময় তেমন কোন প্রতিরোধের সম্মুখীন হতে হয়নি। রাজনৈতিভাবে পিছিয়ে থাকার কারণে সে সময় জনগণ ছিলো নিরস্ত্র, অসংগঠিত, হতবিহ্বল আর দিকনির্দেশনাহীন। আগ্রাসী বেলুচ রেজিমেন্ট কোন বড় ধরনের প্রতিরোধ প্রতিবাদ ছাড়া অনেকটা বিনা বাধায় ঔদ্ধত্যের সাথে রাঙামাটিতে প্রবেশ করে। সে যুগে কালো পতাকা দেখিয়ে প্রতিবাদ করা কিংবা মিছিল করার রাজনৈতিক কর্মসূচির সাথে বোধহয় তখন পার্বত্য চট্টগ্রামের জনতা পরিচিত ছিলো না।

“পার্বত্য চট্টগ্রামের উপর এ আগ্রাসন হচ্ছে দ্বিতীয় বারের মতো আগ্রাসন। প্রথমবার আগ্রাসনের শিকার হয়েছিলো ব্রিটিশদের হাতে ১৮৬০ সালে। তার আগে পার্বত্য চট্টগ্রাম ছিলো স্বাধীন। প্রায় ১৪০ বছর যাবৎ পার্বত্য চট্টগ্রামকে ব্রিটিশ উপনিবেশের অধীন থাকতে হয়েছে। মুঘল আমলে মুঘলদের সাথে যুদ্ধ হয়েছিলো। তারা আগ্রাসন চালায়নি। পার্বত্য চট্টগ্রাম স্বাধীন রাজ্যের অস্তিত্ব টিকিয়ে রেখেছিলো। পাকিস্তানের আগ্রাসনের শিকার হবার ফলে পার্বত্য চট্টগ্রামকে পরাধীন হতে হয়েছে প্রায় সিকি শতাব্দীকাল। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ স্বাধীন হলে ‘পার্বত্য চট্টগ্রাম’ হাত বদল হয়ে আবার নতুন রাষ্ট্র বাংলাদেশের অধীনে চলে যায়। পার্বত্য চট্টগ্রামবাসীদের দুঃখের রজনী যেন আর শেষ হয় না! বলা হচ্ছে পার্বত্য চট্টগ্রাম বাংলাদেশের ‘অবিচ্ছেদ্য অংশ’। বর্তমানে বাংলাদেশের শাসনাধীনে রয়েছে পার্বত্য চট্টগ্রাম। প্রায় ৫৪  বছর হলো বাংলাদেশের অধীনে থাকার কাল। এই ৫৪ টি বছরে বাংলাদেশের শাসকগোষ্ঠী পার্বত্য চট্টগ্রামে ‘উপহার’ দিয়েছে ডজনের অধিক হত্যাযজ্ঞ। যার মধ্যে লেগাঙ-লংগুদু-কলমপতি হত্যাযজ্ঞ সারা বিশ্ব বিবেককে নাড়া দিয়েছে। পাহাড়িদেরকে নিজ বাস্তুভিটা হতে উচ্ছেদ করে পার্বত্য চট্টগ্রাম হতে বিতাড়িত করার ভয়াবহ নীল নক্সা শাসকগোষ্ঠী প্রণয়ন করছে। যার ফলশ্রুতিতে ‘৮৬ সালে অর্ধ লক্ষাধিক লোককে ভিটে-বাড়ী ছাড়া হয়ে ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যে শরণার্থী হিসেবে চরম দুঃখ-দুদর্শার মধ্যে দিনাতিপাত করতে হয়েছে।”

এরপরে পাহাড়ে জাতীয় মুক্তির লক্ষ্যে আত্মোৎসর্গকারী বীর শহীদদের স্মরণে ১ মিনিট নীরবতা পালন করা হয় ।

নিরবতা পালন শেষে ব্রিটিশ আগ্রাসন প্রতিরোধের বীর নায়কদের স্মরণে নির্মিত অস্থায়ী স্মৃতিস্তম্ভে পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন অগ্রণী শিশু-কিশোর কেন্দ্র-এর প্রতিরোধ স্কোয়াডের পাঁচটি টিমের দলনেতাদের মাধ্যমে পাঁচটি টিম এবং এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ।

পুষ্পস্তবক অর্পণ শেষে শিশু-কিশোরদের প্রতিরোধ স্কোয়াড পাঁচটি টিম গঠন করে প্রতিটি টিমে দলনেতার নেতৃত্বে হুইসেল বাজিয়ে তারা একপাশে বেলুচ রেজিমেন্ট সৈন্যদের ৫টি কুশপুত্তলিকা, পাকিস্তানের পতাকা, ফজলুল কাদের চৌধুরীর ছবি এবং সরকারপন্থী দালাল ও প্রতিক্রিয়াশীলদের কুশপুত্তলিকায় সুশৃঙ্খলভাবে লাঠি, ঝাড়ু, বল্লম, তীর-ধনুক ও বাঁশের খেলনা অস্ত্র (চাকমা ভাষায় থুম্বুক বলে) দিয়ে বিক্ষুব্ধ হয়ে আক্রমণ করে। এ-সময় উপস্থিতি ছাত্র-জনতা স্লোগান দিয়ে কর্মসূচির মাঠ প্রকম্পিত করে।

এছাড়া কর্মসূচিস্থলে তারা ক্রস চিহ্ন দিয়ে র‌্যাডক্লিফ সিরিলজন-এর ছবি এবং লর্ড মাউন্ট ব্যাটেন ও পুষ্পমাল্য সম্বলিত স্নেহকুমার চাকমার ছবি টাঙিয়ে রাখে।

শিশু-কিশোর প্রতিরোধ স্কোয়াডের প্রতীকী প্রতিরোধ শেষে তারা উপস্থাপকের মাধ্যমে   শপথ গ্রহন করেন।  

শপথে তারা প্রতিজ্ঞা করেন যে, তাদের পূর্বপুরুষদের সাহসিকতা ও বীরত্বপূর্ণ ঐতিহ্য থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে মুঘল ও ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ লড়াই থেকে অনুপ্রেরণা নিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রামের জাতীয় বীর রুণু খাঁ-খেজু রোয়াজাদের যোগ্য উত্তরসূরী হতে নিজেদের প্রস্তুত করবে। তাদের বাপ-দাদার বাস্তুভিটা থেকে কেউ যাতে আমাদের বিতাড়িত করতে না পারে, সে লক্ষ্যে আমরা সদা সতর্ক থাকবে এবং প্রয়োজনের মুহূর্তে বড়দের পাশে দাঁড়াবে।

তাদের মা-বোনদের যাতে কেউ লাঞ্ছিত করতে না পারে, সে লক্ষ্যে তারা  সদা সতর্ক ও প্রস্তুত থাকবেএবং বোনের ইজ্জত রক্ষার্থে গুইমারার তিন বীর শহীদ আখ্রই-আথুইদের মতো আত্মবলিদান দিতে দ্বিধা করবে না। ক্ষুদ্র ব্যক্তিস্বার্থে সরকারের দালালি-লেজুড়বৃত্তি করে যারা তাদের  শিশু-কিশোরদের ভবিষ্যত তথা জাতির ভাগ্য নিয়ে ছিনিমিনি খেলছে,  তাদের চিহ্নিত করবে এবং সমাজে তাদের বাড়াবাড়ি করতে দেবে না।তাদের মাঝে  মাঝে বিভেদ ও বিভ্রান্তি সৃষ্টি করে যারা শাসকচক্রকে লাভবান করছে, তাদেরও শায়েস্তা করবে।

কর্মসূচিতে উপস্থিত ছিলেন, ইউপিডিএফ-এর প্রতিনিধি অভি মার্মা, জনপ্রতিনিধি জগদীশ চাকমা, মুরুব্বি প্রতিনধি হরিপ্রু মার্মা, পলেন চাকমা (পিসিপি’র সাংগঠনিক সম্পাদক রাঙামাটি জেলা), ক্যাথুই মার্মা (ডিওয়াইএফে’র সভাপতি, কাউখালী উপজেলা), একা চাকমা (এইচডব্লিউএফ’র সভাপতি, কাউখালী উপজেলা), উবাইচিং মারমা (পার্বত্য চট্টগ্রাম নারী সংঘ, কাউখালী), ক্যাচিংঅং মার্মা, ছাত্র জনতার সংগ্রাম পরিষদ কেন্দ্রীয় অর্থ সম্পাদক)। 

পুরো কর্মসূচির অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন দীপা চাকমা আহ্বায়ক অগ্রণী শিশু-কিশোর কেন্দ্র কাউখালী শাখা।



This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. AcceptRead More