মতামত
সংঘাত বন্ধ করতে সন্তু গ্রুপকে চাপ দিন

নূতন কুমার চাকমা, সহসভাপতি, ইউপিডিএফ
সংঘাতে রক্তাক্ত পাহাড় শিরোনামে (৯ জুলাই ২০২৬) নেত্র নিউজের ভিডিও প্রতিবেদনে স্পষ্ট জেএসএস সন্তু গ্রুপ ইপিডিএফের সাথে চলমান ভ্রাতৃঘাতী সংঘাত বন্ধ করতে চায় না। সন্তু গ্রুপের মুখপাত্র স্পষ্টভাবে বলেছেন, তারা সমঝোতার প্রস্তাবকে সন্দেহের চোখে দেখেন।
অপরদিকে ইউপিডিএফের নেতা মাইকেল চাকমা সমঝোতার ব্যাপারে ইউপিডিএফের ইতিবাচক মনোভাবের কথা তুলে ধরেছেন।
বস্তুতঃ শুরুতেই জেএসএস সন্তু গ্রুপ ইউপিডিএফ নির্মূলের কর্মসূচি গ্রহণ করে আজ পর্যন্ত তা বাস্তবায়নের চেষ্টা করে আসছে। তারা এক বনে এক বাঘ থাকার ফ্যাসিস্ট নীতিতে বিশ্বাসী। সেজন্য তারা এই সংঘাত শুরু করে এবং এখনও জিইয়ে রেখেছে। যারা জেএসএসকে আলোচনা-সমঝোতার প্রস্তাব দেয় তাদের ওপরও সন্তু লারমা বিরক্ত ও ক্ষুব্ধ হন। তার ব্রিটেন প্রবাসী প্রয়াত মামা রামেন্দু শেখর দেওয়ান ইউপিডিএফের সাথে আলোচনা করে সংঘাত বন্ধের পরামর্শ দিলে তিনি তার সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করেন বলে জানা যায়। কেবল লণ্ডনে নিঃসঙ্গ নিঃসহায় অবস্থায় মারা যাওয়ার পর জেএসএস সন্তু গ্রুপ রামেন্দু বাবুকে নিজের লোক বলে প্রচার করে রাজনৈতিক ফায়দা তোলার চেষ্টা করেছিলেন। তার আগে সন্তু লারমা তার কোন খোঁজ খবর নেননি, যদিও তিনি জেএসএসের মুখপাত্র হিসেবে কাজ করে আসছিলেন।
সন্তু লারমার অপর এক মামা সম্পর্কীয় আত্মীয় সাবেক ভারতীয় রাষ্ট্রদূত মুকুর কান্তি খীসাও (বর্তমানে প্রয়াত) তাকে ইউপিডিএফের সাথে হানাহানি বন্ধ করে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার পরামর্শ দিয়ে চিঠি লিখেছিলেন। এই সুপরামর্শের কারণে সন্তু বাবু তার ওপরও চটে যান এবং ভদ্রলোক বহু বছর পর নিজ মাতৃভূমি পার্বত্য চট্টগ্রামে বেড়াতে এসে সন্তু বাবুর সাথে দেখা করতে চাইলে তিনি তাকে সাক্ষাত দেননি। ইউপিডিএফের সাথে সমঝোতার ব্যাপারে তার এমনই ”ফারবান্যা” না।
অন্যদিকে ইউপিডিএফ শুরু থেকেই সংঘাত বন্ধের জন্য সমঝোতার আহ্বান জানিয়ে আসছে। কিন্তু জেএসএস নেতারা সেই আহ্বান কানে তোলেননি। তারা মনে করেছিলেন শক্তি প্রয়োগ করে তারা ইউপিডিএফকে ধ্বংস করতে পারবেন। তাদের এই একগুঁয়েমী ও একরোখা মনোভাবের কারণে ১৯৮০ দশকে জেএসএসে রক্তাক্ত গৃহযুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল এবং ফলশ্রুতিতে এন. এন. লারমা প্রাণ হারিয়েছিলেন। এই একই কারণে বর্তমান ভ্রাতৃঘাতী সংঘাত শুরু হয়েছে এবং এখনও চলমান রয়েছে।
সন্তু লারমা ইউপিডিএফের সাথে তখনই আলোচনায় বসতে ও সমঝোতা করতে বাধ্য হয়েছেন, যখন ব্যাপক গণপ্রতিরোধের ফলে তার দল কোণঠাসা ও দুর্বল হয়ে পড়েছে। ২০০৬, ২০০৭ ও ২০১৮ সালে দুই দলের মধ্যে আলোচনা ও সমঝোতা তার প্রমাণ। এ সময়গুলোতে জেএসএস ঠেকায় পড়ে নিজেই ইউপিডিএফের কাছে আলোচনার প্রস্তাব নিয়ে হাজির হতে বাধ্য হয়েছিল।
তবে বলে রাখা ভাল ২০০০ সালেও একবার উভয় দলের মধ্যে আলোচনা ও সমঝাতা হয়েছিল। সে সময় সন্তু লারমা ভারতে অবস্থান করছিলেন। খাগড়াছড়িতে থাকা তার দলের অন্যান্য নেতারা তার অনুমতি না নিয়ে সেই সমঝোতা করেছিলেন। তবে সন্তু লারমা এ খবর জানতে পেরে সেই সমঝোতা প্রত্যাখ্যান করেন এবং ইউপিডিএফের ওপর হামলা অব্যাহত রাখেন।
নেত্র নিউজের উক্ত প্রতিবেদনে জুমলিয়ান আমলাইয়ের সাক্ষাতকারও অন্তর্ভুক্ত আছে। তিনি নির্দিষ্ট এজেন্ডা নিয়ে দুই পার্টির মধ্যে বোঝাপড়া হলে ভালো হতো বলে মন্তব্য করেছেন। তার এই বক্তব্যের সাথে ইউপিডিএফ সম্পূর্ণ একমত। বস্তুতঃ ইউপিডিএফ ২০০০ সাল থেকে এজেন্ডার ভিত্তিতে ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের কথা বলে আসছে। এমনকি চুক্তি বাস্তবায়নের আন্দোলনে সহযোগিতার প্রতিশ্রুতিও দিয়েছে। কিন্তু জেএসএস কোনমতেই রাজী হয়নি। সংঘাত ও বৈষম্য বিরোধী পাহাড়ি ছাত্র আন্দোলনের নেতারাও ২০২৪ সালে হাসিনার পতনের পর চুক্তি বাস্তবায়নের দাবিতে আন্দোলন গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন, কিন্তু জেএসএসের সন্তু লারমার অংশ তাতে প্রবলভাবে বাধা দেয় এবং সেনা গোয়েন্দাদের সাথে মিলে আন্দোলনের নেতাদের গলায় মিথ্যা মামলা ঝুলে দেন।
এখন যেহেতু নেত্র নিউজকে জেএসএস সন্তু গ্রুপ স্পষ্ট করে বলেছে তারা সংঘাত বন্ধের প্রস্তাবে রাজী নয়, তাই যারা হানাহানি বন্ধ ও সমঝোতার পক্ষে তাদের করণীয় ঠিক করার দরকার আছে। তবে এতদিন তারা যেভাবে উভয় দলের কাছে সংঘাত বন্ধের মামুলী আহ্বান জানিয়ে আসছেন সেই আহ্বান অচল হয়ে গেছে। এখন যে দল বা যে পক্ষ সংঘাত বন্ধ করতে চায় না, সেই দল বা সেই পক্ষের ওপরই সংঘাত বন্ধ ও সমঝোতার জন্য চাপ দিতে হবে।
যতদূর মনে আছে কয়েক বছর আগে মিজোরামের জনগণ সমাবেশে ঘোষণা দিয়েছিলেন, যে দল সমঝোতা করতে চাইবে না, তাদেরকে মিজোরাম থেকে বের করে দেয়া হবে। (যদি ভুল হয় তাহলে দয়া করে সংশোধন করে দেবেন।) জেএসএসের ওপর চাপ দেয়ার জন্য তাদের অনেক লেভারেজ আছে। তারা এখন সেগুলো প্রয়োগ করতে পারেন।
মনে রাখা দরকার, শান্তি, সমঝোতা, ঐক্য আপনি এসে ধরা দেয় না। কেবল মনে মনে বা মুখে মুখে আকাঙ্ক্ষা করলেও তা পাওয়া যায় না। তার জন্য সংগ্রাম করতে হয়, অনেক চেষ্টা করতে হয়। আমরা জানি অনেকে বিশেষত জেএসএস নিয়ন্ত্রিত এলাকায় যারা থাকেন তারা জেএসএসের ভয়ে ঐক্য ও সমঝোতার প্রসঙ্গ তুলতে পারে না। সেক্ষেত্রে ভারতের মিজোরাম, ত্রিপুরা, অরুণাচল এবং মায়ানমারে বসবাসরত চাকমা, মারমা ও ত্রিপুরারা এগিয়ে আসতে পারেন।
এখানে একটি কথা বলা দরকার। ইউপিডিএফ নেতারা খেয়াল করেছেন, যখনই তারা জেএসএসের কাছে ঐক্য ও সমঝোতার প্রস্তাব দেন, তখন জেএসএস (সন্তু) নেতারা সেটাকে ইউপিডিএফের দুর্বলতা বলে মনে করেন এবং তাদের কর্মীদেরকে বলেন “এই দেখো, ইউপিডিএফ দুর্বল হয়েছে, আলোচনার প্রস্তাব দিয়েছে। কয়েকটা আঘাতেই তারা শেষ হয়ে যাবে।” এ কারণে ইউপিডিএফ যখন তখন আর জেএসএসের কাছে আলোচনার প্রস্তাব দেয় না। ২০১৮ সালের সমঝোতা লঙ্ঘন করার পর দায়বদ্ধতার খাতিরে ইউপিডিএফ জেএসএসের কাছে দু’একবার বৈঠকের প্রস্তাব দিয়েছিল। কিন্তু জেএসএস তাতে সাড়া না দেয়ায় এরপর ইউপিডিএফ আজ পর্যন্ত আর কোন আলোচনার প্রস্তাব পাঠায়নি।
তবে তৃতীয় পক্ষের মধ্যস্ততায় জেএসএসর সাথে আলোচনায় বসতে ইউপিডিএফ সব সময় প্রস্তুত রয়েছে।
(১০ জুলাই ২০২৬)
সিএইচটি নিউজে প্রকাশিত প্রচারিত কোন সংবাদ, তথ্য, ছবি ,ভিডিও, কনটেন্ট ব্যবহার করতে হলে কপিরাইট আইন অনুসরণ করে ব্যবহার করুন।
