মতামত
আমরা কিসের জন্য লড়ছি?

লেখা: সোহেল চাকমা
একবিংশ শতাব্দীতে এসে আমরা কিসের জন্য লড়ছি এই প্রশ্ন করা অনেকের কাছে অবান্তর ও অপ্রাসঙ্গিক মনে হতে পারে। কিন্তু এটি বর্তমান সময়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ ও মৌলিক প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনেকেই মনে করেন শুধুমাত্র যারাই রাজনৈতিক সংগ্রামের সাথে সম্পৃক্ত প্রশ্নটা তাদেরই। এটা সম্পূর্ণ ভূল ধারণা। কারণ যুগের পালাবদলে তথ্যপ্রযুক্তি, ইন্টারনেট ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অভূতপূর্ব বিকাশের সাথে সাথে আমরাও নতুন কোন যুদ্ধে প্রবেশ করেছি। আমরা আজ প্রতিনিয়ত একটা সার্ভাইভাল ওয়ারের মধ্য দিয়ে দিনাতিপাত করছি। যদিও এটি নতুন কোন কথা নয়। বেঁচে থাকার যুদ্ধ প্রাগৈতিহাসিক কাল থেকে শুরু হলেও সেটি বিভিন্ন সময় বিভিন্ন আঙ্গিকে মানুষকে পরিচালনা করতে হয়েছে। বর্তমানে এই যুদ্ধ এক রাষ্ট্রের প্রতি আরেক রাষ্ট্রের, এক জাতির প্রতি আরেক জাতির, মানুষের প্রতি মানুষের আধিপত্য, ভোগদখল, জবরদস্তি ও উৎপীড়ন-নিপীড়নের মধ্য দিয়ে প্রবাহমান। সেজন্য কেন লড়ছি এই প্রশ্নটি একদিকে যেমন সামগ্রিক অন্যদিকে এটি ব্যক্তিগত বা আত্মবোধেরও প্রশ্ন।
প্রসঙ্গত, আমরা কিসের জন্য লড়ছি – এই প্রশ্নটির সঙ্গে জড়িয়ে আছে একটি জাতির ইতিহাস, ঐতিহ্য, সংগ্রাম, রাজনীতি, অর্থনীতি, সংস্কৃতি ও জীবনাচার। একই সঙ্গে আমাদের নিজেদের ব্যক্তিগত জীবনের মূল্যবোধ, আশা-আকাঙ্ক্ষা এবং স্বপ্নও। একজন ব্যক্তির পরিচয় নির্ধারণের ক্ষেত্রে অবশ্যই তার জাতিগত সত্ত্বাকে ধারণ করতে হয়। আর জাতিগত পরিচয়কে ধারণ করা মানে ব্যক্তি তার জাতিগত ইতিহাস, ঐতিহ্য, সংগ্রাম, রাজনীতি, অর্থনীতি, সমাজনীতি, সংস্কৃতি ইত্যাদি কোনকিছু থেকে সে বিচ্ছিন্ন নয়। সুতরাং সেদিক থেকে চিন্তা করলে ব্যক্তি আর কোন একক সত্ত্বা নয়, বরং বহুধা কর্তব্য ও দায় নিয়ে জাতিগত সত্ত্বার কাছে একজন ব্যক্তি আজন্ম দায়বদ্ধ।
সময়ের পরিক্রমায় পুঁজিবাদের বিকাশ ঘটার সঙ্গে মানুষের নৈতির মূল্যবোধেও এসেছে বিরাট পরিবর্তন। এই পরিবর্তন এতটাই ধ্বংসাত্মক যেখানে মানুষই পুঁজির ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে। মানুষ বন্দী হয়ে পড়েছে আত্মকেন্দ্রিকতা, স্বার্থপরতা ও অর্থ বৃত্তের মধ্যে। ফলে স্বাধীন চিন্তা, বিকাশ ও ক্রিয়াশীল চেতনা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। বিত্তশালী হওয়ার নেশায় বুঁদ হয়ে মানুষ ভূলতে বসেছে তার শিকড়, স্বাধীন জন্মলাভ। অধীনতা, দাসত্বের শৃঙ্খলে আবদ্ধ হয়ে ব্যক্তি নিজের ভবিষ্যৎ সমর্পণ করছে অন্য কারোর হাতে। এরচেয়ে পরাধীনতা, দীনতা ও অনিশ্চিত জীবনাচার আর কি থাকতে পারে!
মহামতি কার্ল মার্ক্স কৃষক-শ্রমিক-সর্বহারা সকলের স্বার্থে বলেছেন, They have a world to win, They have nothing to lose but their chain. এ কথা পৃথিবীর সমগ্র নিপীড়িত জাতি যারা জাতিগত আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার প্রতিষ্ঠা করতে চায় তাদের জন্যও সমভাবে প্রযোজ্য। লেনিনের ভাষায়, জাতিগত আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার মানে হল- রাজনৈতিক আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার। অর্থাৎ বিচ্ছিন্ন হয়ে পৃথক রাষ্ট্র গঠনের অধিকার। আধিপত্যকারী জাতি কর্তৃক নিষ্ঠুর দমন-পীড়নের বিরুদ্ধে নির্দয় সংগ্রাম পরিচালনার মাধ্যমে রাজনৈতিকভাবে বিচ্ছিন্ন হওয়ার অধিকার কায়েম করা।
জাতিগতভাবে নিপীড়নের শিকার কোন ব্যক্তি যে পেশায় নিযুক্ত থাকুক সে কখনো রাজনৈতিক অধিকার ব্যতীত একটা রাষ্ট্রে বা প্রতিষ্ঠানে শাসকগোষ্ঠীর সমমর্যাদা লাভ করতে পারে না। রাজনীতি একপাশে রেখে আমরা যতই ভালো থাকার চেষ্টা করি তা কখনো সম্ভবপর হয়ে ওঠে না। কারণ ব্যক্তির স্বচ্ছন্দ জীবনধারণ স্বজাতীয় অধিকার থেকে বিচ্ছিন্ন নয়। জাতিগত অধিকার প্রতিষ্ঠিত না হলে কারোর অধীনে ভালো থাকার চর্চা কখনো প্রতিষ্ঠা লাভ করতে পারে না। সেজন্য অধিকার বঞ্চিত কোন ব্যক্তির সর্বপ্রথম ও প্রধান কর্তব্য হয়ে দাঁড়ায় জাতিগত অধিকার প্রতিষ্ঠায় কঠোর সংগ্রাম করে যাওয়া। পুঁজিবাদের কোলে বেড়ে ওঠা বুর্জোয়া শাসকগোষ্ঠীর অর্থ-সাম্রাজ্য-প্রতিষ্ঠান ও ক্ষমতা হারানোর ভয় থাকে, কিন্তু একজন আন্দোলনকারী যে ন্যায্য অধিকার আদায়ে সংগ্রাম করে, যে নিজের জীবনের মূল্য নিজেই নির্ধারণ করতে চায় তার শৃঙ্খল ছাড়া হারাবার আর কিছুই থাকে না।
পার্বত্য চট্টগ্রামে নিপীড়িত জাতি ও জনগোষ্ঠীগুলোর অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামেও হারানোর কিছু নেই। উগ্র বাঙালি জাতীয়তাবাদী শাসকগোষ্ঠীর দমন-পীড়ন, বৈষম্য, আধিপত্য ও দাসত্ববরণে বাধ্য হওয়া ছাড়া স্বাধীনতার দীর্ঘ ৫৪ বছরে তাদের ভাগ্যে কিছুই জোটেনি। নামমাত্রিক সুবিধা ও চাকুরির প্রলোভনে আবিষ্ট করে অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলন থেকে তরুণ প্রজন্মকে স্বেচ্ছায় সরিয়ে দেয়া শাসকগোষ্ঠীর অন্যতম লক্ষ্য। এ ফর্মুলা বা ষড়যন্ত্র বাস্তবায়নে জিইয়ে রাখা হয়েছে জাতিগত আভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব- সংঘাত। যাহাতে পার্বত্য চট্টগ্রামে বৃহৎ জাতীয় মুক্তির আন্দোলন সংগঠিত হতে না পারে। শাসকগোষ্ঠীর এই ন্যাক্কারজনক পরিকল্পনা জোটবদ্ধভাবে ভেস্তে দিতে হবে। সেজন্য নিষ্ঠুর দমন-পীড়নের বিরুদ্ধে নির্দয় সংগ্রাম পরিচালনার মাধ্যমে জাতিগত বন্দীত্ব বা শৃঙ্খল ভাঙাই এখন অধিকারকামী সমস্ত তরুণ-ছাত্র-জনতার প্রধান লক্ষ্য হওয়া উচিত।
আমরা কিসের জন্য লড়ছি- এই প্রশ্নটিকে পার্বত্য চট্টগ্রামের নিপীড়িত জনগোষ্ঠীর সীমাবদ্ধতার জায়গায় নিয়ে আসলে বলতে হয়, আমরা শুধুমাত্র মিলিটারি রেজিম, ভূমির অধিকার প্রতিষ্ঠা কিংবা অস্তিত্ব রক্ষার জন্য লড়ছি তা নয়। আমরা একই সাথে রাজনৈতিক স্বাধীনতা কায়েমের জন্যও লড়ছি। আমাদের লড়াই হারানো স্বকীয়তা পুনঃপ্রতিষ্ঠা, সমৃদ্ধ পরিবার ও সুন্দর সমাজ গঠনের। স্বনির্ভর অর্থনীতি, প্রথাগত জীবন পদ্ধতি, আইন প্রণয়ন, ন্যায়-বিচার ও নিজস্ব কায়দায় শাসনব্যবস্থা পরিচালনার জন্য এই লড়াই অপরিহার্য। এই লড়াই-সংগ্রামে পরিবার, পিছুটান, ক্যারিয়ার আমাদের দুর্বলতা বলে ভাবা হয়। অথচ এ সমস্তকিছু অর্জনের জন্যেই আমাদের মুক্তির সংগ্রাম। আপসরফা নয়, ব্যক্তি জীবনের এই সংগ্রামের প্রয়োজনীয়তা, দায়বদ্ধতা ও উপলদ্ধি যার মধ্যে রয়েছে সেই তরুণ-ছাত্র-যুবা কখনোই আন্দোলনবিমুখ হয়ে থাকতে পারে না, সে আন্দোলনে যুক্ত হবে, সে বিপ্লবী হতে বাধ্য।
সুতরাং লড়ো! নিজেদের স্বার্থ সুরক্ষার সংগ্রাম জাতিগত অধিকার প্রতিষ্ঠার দিকে ধাবিত করো।
* সোহেল চাকমা, সাধারণ সম্পাদক, পিসিপি, কেন্দ্রীয় কমিটি
সিএইচটি নিউজে প্রকাশিত প্রচারিত কোন সংবাদ, তথ্য, ছবি ,ভিডিও, কনটেন্ট ব্যবহার করতে হলে কপিরাইট আইন অনুসরণ করে ব্যবহার করুন।
