খাগড়াছড়িতে জুনান-রুবেল হত্যার বিচারের দাবিতে পার্বত্য প্রতিমন্ত্রীর নিকট স্মারকলিপি প্রদান

0
২০২৪ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর খাগড়াছড়িতে সেনাবাহিনী কর্তৃক জুনান-রুবেল হত্যর বিচারের দাবিতে প্রতিমন্ত্রী মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দীনের কাছে স্মারকলিপি দেন নিহতদের পরিবার, আহত ব্যক্তি ও এলাকাবাসী। 

খাগড়াছড়ি প্রতিনিধি, সিএইচটি নিউজ
বুধবার, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬

২০২৪ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর খাগড়াছড়ি সদরের নারানখিয়া ও স্বনির্ভর এলাকায় সেনাবাহিনীর গুলিতে নিহত জুনান চাকমা ও রুবেল ত্রিপুরার হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু বিচার, আহতদের ক্ষতিপূরণ এবং হামলা, অগ্নিসংযোগ ও লুটপাটে ক্ষতিগ্রস্তদের যথোপযুক্ত ক্ষতিপূরণের দাবিতে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দীনের কাছে স্মারকলিপি প্রদান করা হয়েছে।

স্মারকলিপিতে স্বাক্ষর করেন নিহত জুনান চাকমার মা রূপসা চাকমা, নিহত রুবেল ত্রিপুরার মা নিরন্তা ত্রিপুরা এবং আহতদের পক্ষে নলেজ চাকমা ও পহেল দেওয়ান।

আজ বুধবার (২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬) দুপুরে প্রতিমন্ত্রী মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দীন গাড়ি বহর নিয়ে খাগড়াছড়ির গিরিফুলের উদ্দেশ্যে যাওয়ার পথে জামতলী এলাকায় তাঁর গাড়ি বহর থামিয়ে নিহতদের পরিবার, আহত ব্যক্তি এবং স্থানীয় এলাকাবাসীর পক্ষ থেকে এ স্মারকলিপি প্রদান করা হয়। এতে শহীদ জুনান চাকমার মা রূপসা চাকমা, শহীদ রুবেল ত্রিপুরার মা নিরন্তা ত্রিপুরা, আহত পহেল চাকমা ও নলেজ চাকমাসহ স্থানীয় এলাকাবাসী উপস্থিত ছিলেন।

এ সময় উপস্থিত এলাকাবাসী প্রতিমন্ত্রীর গাড়ি বহরের সামনে জুনান-রুবেল খুনিদের শাস্তি চাই; ১৯ সেপ্টেম্বরের ঘটনা তদন্ত হবে কি কখনো?; ১০০% মানবাধিকার চাই; প্রলোভন দেখিয়ে আশ্বাস, উঠে গেছে বিশ্বাস; আহতদের ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত কর; স্বনির্ভর গণহত্যার বিচার চাই”… ইত্যাদি লেখা প্ল্যাকার্ড প্রদর্শন করেন।

স্মারকলিপি দেওয়ার সময় প্রতিমন্ত্রী গাড়ির ভিতর অবস্থান করছিলেন। এ অবস্থায় তাঁকে স্মারকলিপিটি প্রদান করা হয়। এ সময় নিহত জুনান চাকমার মা রূপসা চাকমা তাঁর পরিচয় দিয়ে আবেগঘন কণ্ঠে বলেন, “আমার ছেলেকে সেনাবাহিনী হত্যা করেছে। ২ বছরেও আমি কোনো বিচার পাইনি। আমি সন্তানহারা একজন মা। সন্তান হারানোর কত বেদনা তা আমি জানি।  আমার ছেলেকে যে সেনাবাহিনী হত্যা করেছে আমি আপনার কাছে তার সুবিচার চাচ্ছি।”

স্মরকলিপি দেওয়ার পর প্রতিমন্ত্রী গাড়ির ভিতরে থাকা অবস্থায় তাঁর সাথে কথা বলছেন জুনান চাকমার মা রূপসা চাকমা।

তিনি কত সময়ের মধ্যে বা কত মাসে তাঁর আবেদনের সুরাহা হবে এবং সুবিচার পাবে তা প্রতিমন্ত্রীর কাছ থেকে জানতে চান এবং তাঁকে গাড়ি থেকে নেমে তাদের সাথে কথা বলার অনুরোধ করেন। এর কিছুক্ষণ পর প্রতিমন্ত্রী গাড়ি থেকে নেমে তাদের সাথে কথা বলেন।

প্রতিমন্ত্রী মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দীন বলেন, “আমি আপনাদেরকে খুশি করার জন্য যদি বলি এক সপ্তাহ বা দুই সপ্তাহে করবো তাহলে এটা সঠিক হবে না। আমি ঢাকায় ফিরে যাই। রবিবার দিন অফিস খুলবে। আমি আগে আবেদনটা দিই। সে বিষয়ে তদন্ত হোক। তদন্ত হলে প্রয়োজনী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”

গাড়ি থেকে নেমে ভুক্তভোগী পরিবারের সাথে কথা বলছেন প্রতিমন্ত্রী মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দীন।

এ সময় নিহত রুবেল ত্রিপুরার মা নিরন্তা ত্রিপুরা ও আহতদের প্রতিনিধি প্রতিমন্ত্রীর সামনে উপস্থিত ছিলেন।

প্রতিমন্ত্রীকে দেওয়া স্মারকলিপিতে বলা হয়, “বিগত ফ্যাসিস্ট সরকারের পতনের পর পার্বত্য চট্টগ্রামে খাগড়াছড়ি জেলাধীন দীঘিনালায় সুপরিকল্পিতভাবে সাম্প্রদায়িক হামলা, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। এতে সেনাবাহিনীর প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় সেটলার বাঙালিরা ধন রঞ্জন চাকমাকে নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করে। উক্ত ঘটনার ধারাবাহিকতায় খাগড়াছড়ি শহরেও উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। পানখিয়াপাড়া, মধুপুরে সেটলার বাঙালিরা পাহাড়িদের দোকানপাট বাড়িঘরে লুটপাট, অগ্নিসংযোগ ও হামলা চালিয়ে অগ্রসর হতে থাকে। এক পর্যায়ে মহাজনপাড়াতেও সেটলার বাঙালিরা হামলা ও অগ্নিসংযোগ করে। এতে শঙ্কিত হয়ে উপালীপাড়া, নারানখিয়া, খবংপড়িয়া ও স্বনির্ভর এলাকাবাসী নিজেদের বসতবাড়ি-দোকানপাট রক্ষার্থে রাস্তায় নেমে আসে। এলাকার ছাত্র-যুবকরা নিরাপত্তা পাহারায় নিয়োজিত হয়। এ সময় আনুমানিক রাত ১০/১১টায় নারানখিয়া ও স্বনির্ভর এলাকায় সেনাবাহিনী আক্রমণাত্মকভাবে উপস্থিত হয়ে নির্বিচারে গুলি বর্ষণ করে। এতে সেনাবাহিনীর গুলিতে জুনান চাকমা ও রুবেল ত্রিপুরা ঘটনাস্থলে নিহত হয় এবং আরো ১৫/২০ জন গুরুতর আহত হয়।” 

বিভিন্ন প্ল্যাকার্ড হাতে প্রতিমন্ত্রীর গাড়ি বহরের সামনে সড়কের পাশে দাঁড়িয়েছেন স্থানীয়রা।  
প্ল্যাকার্ড প্রদর্শন করছেন এক নারী।

এতে আরো বলা হয়, “অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় এই যে, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার উক্ত হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার কার্য সম্পন্ন করতে ব্যর্থ হয়েছে। বর্তমানে দেশে নির্বাচনের মাধ্যমে বিএনপি সরকার ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়েছে। বিএনপি সরকার ফ্যাসিস্ট হাসিনা ও অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে সংঘটিত বহু অন্যায়-অবিচারের বিচার কার্য শুরু করেছে এবং সাজাও হচ্ছে। ২০২৪ সালের ১৯-২০ সেপ্টেম্বর দীঘিনালা, খাগড়াছড়ি ও রাঙ্গামাটিতে সংঘটিত হত্যাকাণ্ডের দুই বছর হয়ে গেলো। এ ঘটনার সুষ্ঠু বিচার সম্পন্ন করা বর্তমান বিএনপি সরকারের আশু জরুরি কর্তব্য বলে আমরা মনে করি। অতএব, সরকারের একজন গুরুত্বপূর্ণ পদে অধিষ্ঠিত প্রতিমন্ত্রী হিসেবে আপনি ১৯-২০ সেপ্টেম্বর সংঘটিত নারকীয় হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু তদন্ত ও দোষীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যাপারে পদক্ষেপ গ্রহণ করুন।”

“১০০% মানবাধিকার চাই’ লেখা প্ল্যাকার্ড প্রদর্শন করছেন এক নারী।
প্ল্যাকার্ড হাতে দাঁড়িয়েছে এক শিশু।

স্মারলিপিতে অবিলম্বে ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৪ সেনা গুলিতে নিহত জুনান চাকমা ও রুবেল ত্রিপুরার হত্যাকারী জওয়ান ও কর্মকর্তার বিরুদ্ধে আইনী পদক্ষেপ গ্রহণের নিশ্চয়তা দেওয়া; হামলায় আহত ও মিথ্যা মামলায় হয়রানির শিকার নিরপরাধ ব্যক্তিদের মামলা তুলে নেয়ার সুনির্দিষ্ট সময় জানানো; সেটলারদের হামলা, অগ্নিসংযোগ ও লুটপাটের শিকার ব্যক্তিদের যথোপযুক্ত ক্ষতিপূরণ এবং অপরাধীদের সাজা নিশ্চিত করতে সুনির্দিষ্ট সময় সীমা জানানো এবং নিরাপত্তা বাহিনী, আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, গোয়েন্দা সংস্থার লোকজন ও তাদের মদদপুষ্ট সশস্ত্র ঠ্যাঙাড়ে সন্ত্রাসীরা সাধারণ জনগণকে ভয়-ভীতি প্রদর্শন ও হয়রানি করবে না সে ব্যাপারে আশ্বস্ত করার দাবি জানানো হয়েছে।



This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. AcceptRead More