খাগড়াছড়ির রামগড়ে সেনাবাহিনী ও বিজিবির ধারাবাহিক টহল, জনমনে উদ্বেগ

রামগড় প্রতিনিধি, সিএইচটি নিউজ
শনিবার, ১৫ আগস্ট ২০২৬
খাগড়াছড়ির রামগড় উপজেলার বাটনাতুলি ও এর আশপাশের পাহাড়ি গ্রামগুলোতে গত কয়েক দিন ধরে সেনাবাহিনী ও বিজিবির ধারাবাহিক টহল এবং আকস্মিক অবস্থানের কারণে স্থানীয় পাহাড়ি গ্রামবাসীদের মাঝে চরম আতঙ্ক বিরাজ করছে। রাতে গ্রামে গ্রামে সশস্ত্র টহল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অস্থায়ী ক্যাম্প স্থাপন এবং সাধারণ মানুষকে জিজ্ঞাসাবাদের ঘটনায় ওই এলাকার জনমনে গভীর উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে।
স্থানীয়য়রা জানান, চলতি আগস্ট মাসের শুরু থেকেই এই এলাকাগুলোতে সেনা ও বিজিবি সদস্যদের ঘন ঘন উপস্থিতি লক্ষ করা যাচ্ছে।
গত ৪ আগস্ট সন্ধ্যায় রামগড়ের বাটনাতুলি আর্মি ক্যাম্প থেকে সেনাবাহিনীর দুটি গাড়ি উপজেলার সদুখীল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে আসে এবং সেখানে রাত যাপন করে। স্কুল ভবনে এ ধরনের সশস্ত্র উপস্থিতির কারণে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে ভীতির সঞ্চার হয়।
এরপর ৬ আগস্ট রাত ৯টার দিকে নাঙেল পাড়া ও লালছড়ির মাঝামাঝি একটি জনবসতিহীন এলাকায় যৌথ বাহিনীর (সেনা-বিজিবি) একটি দলকে অবস্থান নিতে দেখা যায়। গভীর রাতে এমন উপস্থিতি আশপাশের গ্রামের মানুষকে ভয়ার্ত করে তোলে।
স্থানীয়দের মধ্যে সবচেয়ে বেশি আতঙ্ক ছড়ায় গত ৮ আগস্টের ঘটনায়। এদিন রাত সাড়ে ১০টার দিকে সোনাইখীল পাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ৫০ থেকে ৬০ জনের যৌথ বাহিনীর একটি দল হঠাৎ করে এসে অবস্থান নেয়। এ সময় ভীতিকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হলে স্থানীয় চায়ের দোকানগুলো বন্ধ করে দেওয়া হয়। বাহিনীর সদস্যরা স্থানীয়দের ডেকে রূপাইছড়ি ও গরু কাটা এলাকার দূরত্ব এবং যাতায়াতের পথ সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করেন। রাতে সেখানে অবস্থান করে পরদিন সকালে তাঁরা ফিরে যান।
রাতের বেলায় এমন জিজ্ঞাসাবাদে সাধারণ পাহাড়িদের মনে চরম ভীতির সঞ্চার হয়।
টহলের এই ধারাবাহিকতায় ১১ আগস্ট সন্ধ্যা সাড়ে ছয়টার দিকে বিজিবির খেদা ক্যাম্প (খাগড়া বিল) ও অন্যান্য ক্যাম্পের সদস্যরা এলাকায় তাঁবু টাঙিয়ে অস্থায়ীভাবে অবস্থান নেন। রাত ৯টার দিকে তাঁরা রূপাই ছড়ি ও বালু খালির আশপাশে টহলে বের হন। বৃষ্টির কারণে টহল অসমাপ্ত রেখে তারা পুনরায় ক্যাম্পে ফিরে গেলেও এলাকায় আতঙ্কজনক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়।
এছাড়া ১২ আগস্ট সকাল ৭টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত বাটনাতুলি আর্মি ক্যাম্প থেকে দুটি গাড়ি যোগে একদল সেনা সদস্য বেলছড়ি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গিয়ে অবস্থান করে।
গত ১৩ আগস্ট রাত ৮টার দিকে বাটনাতুলি ক্যাম্প থেকে ১০-১২ জনের একটি সেনাদল সালদা পাড়া ও নতুন পাড়ায় টহল দেয়। দুই ঘণ্টা পর দলটি পুনরায় ক্যাম্পে ফিরে যায়।
অপরদিকে, গরুকাটা এলাকায় অগ্নিকান্ডে মো. বারেক নামে এক সেটলার বাঙালিরা গোয়ালঘর পুড়ে যাওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে সেটলাররা সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা সৃষ্টির চেষ্টা করলে গতকাল (১৪ আগস্ট) ৮টি গাড়িতে করে একদল সেনা সদস্য সেখানে উপস্থিত হয়। পরে তারা সেখান থেকে সরে গিয়ে পার্শ্ববর্তী গ্লোব বাগান নামক স্থানে অবস্থান নেয়। ওই সেনা দলটি আজ (১৫ আগস্ট) সকাল ৮টার দিকে হাচুক পাড়া এলাকায় টহল অভিযান চালানোর পর পূনরায় গ্লোব বাগানে চলে যায় বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন।
এছাড়া আজ সকালে সেনাবাহিনীর একটি দল গুজাপাড়ার দিকে যাওয়ার খবর পাওয়া যায়। অন্যদিকে বৈদ্যপাড়া বিজিবি ক্যাম্প থেকে ১০ জনের একদল বিজিবি সদস্য সকাল ৮টার সময় দাঁতারাম পাড়ায় গিয়ে অবস্থান নেওয়ার খবর জানান স্থানীয়রা।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয় কয়েকজন পাহাড়ি গ্রামবাসী জানান, “সন্ধ্যা নামলেই গ্রামে গ্রামে সেনাবাহিনীর এমন আকস্মিক টহল, অবস্থান ও জিজ্ঞাসাবাদের কারণে তাঁরা নিজেদের এলাকাতেই নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন।
“বিশেষ করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে রাতে অস্থায়ী ক্যাম্প হিসেবে ব্যবহার করায় শিশুদের মনে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে এবং এলাকার স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হচ্ছে।
পাহাড়ে এমনিতেই এক ধরনের চাপা আতঙ্ক থাকে, তার ওপর এমন টানা সামরিক উপস্থিতিতে সাধারণ মানুষের প্রাত্যহিক চলাফেরা ও কাজকর্মে বিঘ্ন ঘটছে।”
সিএইচটি নিউজে প্রকাশিত প্রচারিত কোন সংবাদ, তথ্য, ছবি ,ভিডিও, কনটেন্ট ব্যবহার করতে হলে কপিরাইট আইন অনুসরণ করে ব্যবহার করুন।
