পাহাড়ে পানির জন্য নিত্যদিনের সংগ্রাম

0

শুকিয়ে যাচ্ছে ঝরনা-কূপ, সংকটে রাঙামাটির দুর্গম জনপদ

ছবি সৌজন্যে: ডেইলি স্টার


অন্য মিডিয়া ডেস্ক, সিএইচটি নিউজ

মঙ্গলবার, ২১ এপ্রিল ২০২৬

পার্বত্য অঞ্চলের দুর্গম এলাকার মানুষের কাছে বসন্তের শেষ এবং গ্রীষ্মের শুরু মানেই ঝরনা ও কূপ শুকিয়ে যাওয়া, যা সুপেয় পানির তীব্র সংকট তৈরি করে।

সারা বছর ঝরনার পানির ওপর নির্ভরশীল হওয়ায়, অনেক বাসিন্দা পানির উৎসের কাছে গর্ত খুঁড়তে এবং পাইপলাইন বসাতে বাধ্য হন যাতে অবশিষ্ট সামান্য পানিটুকু সংগ্রহ করা যায়।

রাঙামাটি সদর উপজেলার সপছড়ি যৌথ খামার এলাকার ৫০টিরও বেশি পরিবার গ্রীষ্মকালে, বিশেষ করে মার্চ মাস থেকে খাবার পানির সংকটে ভোগে। পরিস্থিতি সামাল দিতে বাসিন্দারা রান্নাবান্না, গোসল ও খাওয়ার পানি সংগ্রহের জন্য ফুরোমন পাহাড়ের পাদদেশের একটি ঝিরি (ছোট পাহাড়ি ছড়া) থেকে পাইপলাইন বসিয়েছেন।

কিন্তু সম্প্রতি সেই ঝিরিটিও শুকিয়ে যাওয়ায় তারা চরম দুর্ভোগে পড়েছেন। পাইপ দিয়ে যখন সামান্য পরিমাণ পানি আসে, তখনও তাদের ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হয়।

রাঙামাটির সড়ক ও জনপথ বিভাগ সম্প্রতি তাদের কষ্ট লাঘবে ৫,০০০ লিটার পানীয় জল সরবরাহ করেছে, তবে বাসিন্দাদের মতে এটি প্রয়োজনের তুলনায় অত্যন্ত নগণ্য।

স্থানীয় বাসিন্দা কালিন্দী চাকমা বলেন, “আমরা ঝিরির পাশে একটি পানির ট্যাংক বসিয়ে পাইপের মাধ্যমে পানি সংগ্রহের চেষ্টা করি। তবুও গ্রীষ্মকালে আমাদের অনেক কষ্ট হয় এবং ভোর থেকে দুপুর পর্যন্ত পানির জন্য অপেক্ষা করতে হয়। কয়েকদিনের মধ্যে পরিস্থিতির আরও অবনতি হবে।”

ছবি সৌজন্যে: ডেইলি স্টার

আরেক বাসিন্দা জিকেন চাকমাও একই উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, “ভূগর্ভস্থ পাথরের কারণে আমরা গভীর নলকূপ স্থাপন করতে পারিনি, আর সাধারণ কূপ খুঁড়েও পানি পাওয়ার সম্ভাবনা নেই। পানির জন্য আমাদের এই সংগ্রাম চলতেই থাকবে।”

এই সংকট কেবল একটি এলাকায় সীমাবদ্ধ নয়। বাঘাইছড়ি, বরকল, জুরাছড়ি, বিলাইছড়ি এবং কাপ্তাইয়ের মতো দুর্গম উপজেলাগুলোও পানির সংকটের মুখে পড়েছে।

কাপ্তাইয়ের ওয়াগ্গা ইউনিয়নের দেবতাছড়ি গ্রামে প্রায় ৭০টি পরিবারের বাস। এখানকার একটি ছড়া, যাতে একসময় সারা বছর পানি থাকত, সেটি এখন প্রায় শুকিয়ে গেছে।

বাসিন্দা লিটন তঞ্চঙ্গ্যা বলেন, “আমরা এই ছড়াতেই গোসল করতাম এবং গৃহস্থালির কাজ সারতাম। কিন্তু এখন বর্ষাকাল ছাড়া বছরের বেশিরভাগ সময় এটি শুকনো থাকে।” তিনি আরও বলেন, “যাদের সামর্থ্য আছে তারা নলকূপ বসিয়ে পাম্প ব্যবহার করেন, আর বাকিরা দূরবর্তী কূপ থেকে পানি সংগ্রহ করেন। কিছু এলাকায় তো কূপের পানিও পাওয়া যাচ্ছে না।”

কাউখালীর চেলাছড়া গ্রামের রেখিন চাকমা বলেন, “ফাল্গুন-চৈত্র মাসে ভাগ্য ভালো থাকলে ৮-১০ ফুট খুঁড়লে মাঝে মাঝে পানি পাওয়া যায়।”

একই গ্রামের সাধনা দেবী চাকমা বলেন, “মাঝে মাঝে পানির জন্য আমাদের লড়াই করতে হয়। ঘণ্টার পর ঘণ্টা দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে থাকার পর আমরা অনেক সময় বড়জোর এক কলস পানি জোগাড় করতে পারি।”

সিএইচটি বায়োডাইভারসিটি কনজারভেশন সোসাইটির প্রতিষ্ঠাতা সবুজ চাকমা বলেন, এই সংকটের প্রধান কারণ প্রাকৃতিক বন উজাড় হওয়া। তিনি বলেন, “বন উজাড় এবং সেগুনসহ একজাতীয় গাছের বাগান (মনোকালচার) পাহাড়ের ঝিরি ও ঝরনাগুলো শুকিয়ে দিচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তন খরা এবং অনিয়মিত বৃষ্টির মাধ্যমে পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ করে তুলছে। পানির উৎসের আশেপাশে দেশীয় প্রজাতির গাছ রোপণ করলে এই অবস্থা থেকে মুক্তি পাওয়া যেতে পারে।”

রাঙামাটির জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী পরাগ বড়ুয়া বলেন, “শুষ্ক মৌসুমে পানির চাহিদা বেড়ে যায়। আমরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলো চিহ্নিত করছি এবং আমাদের কাজে সেগুলোকে অগ্রাধিকার দিচ্ছি।”

(প্রতিবেদনটি ডেইলি স্টারে প্রকাশিত ইংরেজি খবর থেকে অনুবাদ করা হয়েছে)।



This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. AcceptRead More