বান্দরবানে ৫ বছরের শিশুকে ধর্ষণের প্রতিবাদে মানিকছড়িতে পিসিপি’র বিক্ষোভ

মানিকছড়ি প্রতিনিধি, সিএইচটি নিউজ
সোমবার, ২৫ মে ২০২৬।
‘‘পার্বত্য চট্টগ্রামসহ সারাদেশে নারী ও শিশু ধর্ষণ ও নিপীড়নের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াও” এই শ্লোগানে রাঙামাটির বিলাইছড়িতে সেটলার কর্তৃক ৯ম শ্রেণীর পাহাড়ি শিক্ষার্থীকে ধর্ষণ চেষ্টা ও বান্দরবানের থানচিতে ৫ বছরের ত্রিপুরা শিশু ধর্ষণ ও ধর্ষকের বিচার চাইতে গিয়ে পুলিশ-বিজিবির নগ্ন হস্তক্ষেপ-বাধা প্রদান করার প্রতিবাদে খাগড়াছড়ির মানিকছড়িতে বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়েছে।
বৃহত্তর পার্বত্য চট্টগ্রাম পাহাড়ি ছাত্র পরিষদ (পিসিপি)-এর মানিকছড়ি, রামগড় ও গুইমারা উপজেলা শাখাসমূহ যৌথভাবে এই বিক্ষোভের আয়োজন করে।
আজ সোমবার (২৫ মে ২০২৬) সকাল ১১টায় মানিকছড়ি কলেজ গেইট থেকে একটি মিছিল বের করা হয়। মিছিলটি মানিকছড়ি উপজেলা পরিষদ হয়ে ঘুরে এসে ধর্মঘরে এসে বিক্ষোভ সমাবেশে মিলিত হয়।

সমাবেশে পাহাড়ি ছাত্র পরিষদের মানিকছড়ি উপজেলার সভাপতি আনু মারমার সভাপতিত্বে ও তৈমাং ত্রিপুরার সঞ্চালনায় বক্তব্য দেন পাহাড়ি ছাত্র পরিষদের কেন্দ্রীয় দপ্তর সম্পাদক অনিমেষ চাকমা, খাগড়াছড়ি জেলা কমিটির সাধারণ সম্পাদক জুয়েল চাকমা ও চট্টগ্রাম মহানগর শাখার সভাপতি অংহ্লাচিং মারমা।
অনিমেষ চাকমা তার বক্তব্যে বলেন, দেশের আইন বিচার ব্যবস্থা ঠিক না থাকায় দেশে একের পর এক নারী-শিশুদের ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে। যা রাষ্ট্রের জন্য অত্যন্ত লজ্জাজনক বিষয়। দেশে রাজনৈতিক নেতা অলিতে-গলিতে পাওয়া যায়, তবে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিতের জন্য আইন তৈরী করার মতো নেতা পাওয়া যায় না। পাহাড় এবং সমতলে ব্যাপক হারে বেড়েছে নারী-শিশু ধর্ষণ, নিপীড়ন নির্যাতন। কিন্তু এসবের সুষ্ঠু বিচার করার জন্য সরকার এখনো আইন ও বিচার ব্যবস্থাকে সেভাবে কার্যকর করতে পারেনি। ফলে দেশের জনগণ বিচারের পরিবর্তে নিপীড়নের শিকার হচ্ছে।

তিনি আরো বলেন, পাহাড়ে প্রতিটি নারী ধর্ষণের ঘটনায় ধর্ষকের পক্ষে হয়ে দাঁড়ায় পুলিশ-বিজিবি-সেনাবাহিনী। এমনও ঘটনা রয়েছে পাহাড়ে সরকারের কাছে বোনের ধর্ষণের বিচার চাইতে গিয়ে সেনাবাহিনীর গুলিতে নিহত হয়েছে পাহাড়ি ছাত্র-যুবকরা। ধর্ষণের বিচার চাইতে গিয়ে খাগড়াছড়িতে সাম্প্রদায়িক হামলা হয়েছে পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর উপর। এই সব ঘটনা কিন্তু মিডিয়াতে প্রচার হয় না। পাহাড়ে গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা না থাকায় পাহাড়ে আজ বিচারহীনতার সংস্কৃতি বিরাজ করছে। কল্পনা চাকমা অপহরণ ঘটনার সুষ্ঠু বিচার না হওয়ায় পাহাড়ে ধর্ষকরা ধর্ষণের লাইসেন্স পেয়েছে। রাঙামাটির বিলাইছড়িতে সেনাসদস্য কর্তৃক দুই মারমা কিশোরী বোনকে ধর্ষণের ঘটনারও কোন বিচার হয়নি। পাহাড়িদের জাতিগতভাবে নিপীড়নের ঘটনাগুলো ধামাচাপা দিতে পাহাড়ে সেনাশাসন জারি করে রাখা হয়েছে।
সরকারকে প্রশ্ন রেখে তিনি বলেন, এই পাহাড় কি বাংলাদেশ ভূ-খন্ড থেকে আলাদা? যদি তাই না হয় তাহলে এক দেশে দুই নীতি কেন? সমতলে গণতান্ত্রিক পরিবেশ আর পাহাড়ে অঘোষিত সেনা শাসন এটাই কি স্বাধীন রাষ্ট্রের সংবিধান? তিনি সমতলের মতো পাহাড়েও একই শাসন প্রতিষ্ঠার এবং অবিলম্বে বান্দরবানে ৫ বছরের শিশুকে ধর্ষণসহ পাহাড়-সমতলে সকল নারী-শিশু ধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ডের বিচার ও দোষীদের কঠোর শাস্তির দাবি জানান।
জুয়েল চাকমা বলেন, সম্প্রতি বাংলাদেশে নারী-শিশুদের ধর্ষণ নিপীড়নের ঘটনা বেড়েছে। পাহাড় এবং সমতলে একতালে ধর্ষকরা নারী-শিশুদের ধর্ষণ করে যাচ্ছে। সরকার ধর্ষকদের বিরুদ্ধে বিশেষ কোন বিচারব্যবস্থা কার্যকর করতে না পারায় ধর্ষকরা রেহাই পেয়ে যাচ্ছে। এই দেশের মানুষের একটাই দাবি ধর্ষকদের মৃত্যুদন্ড দেওয়া। কিন্ত কোন নির্বাচিত সরকার এ ধরনের শাস্তিমূলক পদক্ষে নিতে পারেনি।

তিনি আরো বলেন, বাংলাদেশের ইতিহাসে ক্ষমতার চেয়ারে বসা বড় বড় নেতা মন্ত্রী এমনকি স্বরাষ্ট্র বিভাগের ব্যক্তিরাও নারী-শিশুদের নিরাপত্তার বিষয়ে কোন ভূমিকা রাখতে পারেনি। যার ফলে পাহাড়ে নারী ধর্ষণের ঘটনায় সব সময় ধর্ষকদের পক্ষ হয়ে কথা বলেছে এই দেশের পুলিশ প্রশাসন। পাহাড়ে সেনাবাহিনীর দুঃশাসন চলছে বলেই পাহাড়ে সেটলার বাঙালি কর্তৃক পাহাড়ি শিক্ষার্থী ও নারীরা আজ ধর্ষণের শিকার হয়েও কোন সুষ্ঠু বিচার পায় না। ঘটনা ধামাচাপা দিতে এবং ধর্ষকদের পক্ষ হয়ে ভিকটিমের পরিবারকে টাকা দিয়ে গোপনে সমঝেতার প্রস্তাব দেয়। ধর্ষকদের নিরাপত্তা দিয়ে নাম মাত্র আটক দেখিয়ে পরে তাদের জামিনে ছেড়ে দেওয়া হয়।
তিনি বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামে অপারেশন উত্তরণের নামে পাহাড়িদের ভূমি থেকে উচ্ছেদ এবং নারী ধর্ষণ-নির্যাতন পাহাড়ে দীর্ঘ সময় ধরে চলে আসছে। রাষ্ট্রীয় বৈষম্যমূলক নীতির মাধ্যমে পাহাড়কে বিচ্ছিন্ন করে রাখা হয়েছে। এই রাষ্ট্র-সরকার পার্বত্য চট্টগ্রামে পাহাড়ি জাতিসত্তার ওপর সেনা নজরদারি-খবরদারি জারি রেখে তাদের অস্তিত্ব বিলীন করে দেওয়ার জন্য পরিকল্পনা অনুযায়ী বাঙালি অধ্যুষিত অঞ্চলে পরিণত করতে চায়।

অংহ্লাচি মারমা বলেন, বর্তমান সময়ে পাহাড় এবং সমতলে ধর্ষণের ঘটনা বৃদ্ধি পাওয়ায় নারী-শিশুরা নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে রয়েছে। তারা ঘর থেকে বের হতেও ভয় পাচ্ছে। সমতলে ধর্ষণের ঘটনায় বিচার ও ধর্ষকদের কঠোর শাস্তি দেওয়া হলেও পাহাড়ে কৃত্তিকা ত্রিপুরা, চিংমা খেয়াং থেকে শুরু করে কোন ধর্ষণের ঘটনায় সুষ্ঠু বিচার হয়নি। সরকার চাইলে অনেক আগেই পাহাড়ের সমস্যা সমাধান করতে পারতো, কিন্তু তা না করে সরকার পাহাড়ে রাষ্ট্রীয়ভাবে দমন-পীড়ন চালাচ্ছে। ছাত্রসমাজ যাতে অধিকারের জন্য আন্দোলন করতে না পারে সেজন্য বর্তমান ছাত্র সমাজকে ভয়-ভীতি দেখিয়ে দমিয়ে রাখার চেষ্টা করা হচ্ছে। আর দমিয়ে রাখতে না পারলে সন্ত্রাসী লেলিয়ে দিয়ে হত্যা করা হচ্ছে। পাহাড়ে ধর্ষণের বিচার চাইতে গেলেও বিজিবি-সেনা কর্তৃক বাধা-হামলার সম্মুখীন হতে হচ্ছে বলে তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করেন।
তিনি আরো বলেন, পাহাড়ে ধর্ষণকারীকে শাস্তি না দিয়ে, ধর্ষণের বিরুদ্ধে প্রতিবাদকারীদের উপর গুলি চালানো হয়। কুমিল্লায় তনুকে ধর্ষণ ও হত্যার দীর্ঘ ১০ বছর পর একজন অপরাধীকে হলেও আটক করা হয়েছে। কিন্তু পাহাড়ের ধর্ষণকারীরা প্রশাসনের নাকের ডগায় ঘুরে বেড়ায়। তিনি অবিলম্বে পাহাড় এবং সমতলে ধর্ষণকারী নরপিশাচদের গ্ৰেফতার এবং সুষ্ঠু বিচারের মাধ্যমে দৃষ্টান্তমূলক সাজা নিশ্চিত করার দাবি জানান।

সভাপতির বক্তব্যে আনু মারমা বলেন, অতি সম্প্রতি বান্দরবানের থানচিতে ৫ বছরের এক ত্রিপুরা শিশুকে ধর্ষণ করা হয়েছে এবং রাঙামাটির বিলাইছড়িতে এক স্কুলছাত্রীকে ধর্ষণ চেষ্টা করা হয়েছে। ঢাকায় রামিসা ধর্ষণ-হত্যার ঘটনায় সরকার বিচারের উদ্যোগ নিয়েছে। প্রধানমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্র ও আইনমন্ত্রী সুষ্ঠু বিচারের আশ্বাস দিয়েছেন। কিন্তু পাহাড়ে এ ধরনের বহু ঘটনা ঘটলেও কোন বিচার আমরা পাইনি। সমতলের ধর্ষণ ঘটনায় বিচার-প্রতিবাদ হলেও পাহাড়ে ৫ বছরের শিশু ধর্ষণের ঘটনায় সমতলের কাউকে প্রতিবাদ করতে দেখা যায়নি। তাহলে কি পাহাড় ও সমতলের জন্য আইন আলাদা? একজন শিশুর কান্না কি তার পরিচয় দেখে বিচার করা হবে? আমি এই নীরব সমাজ ও রাষ্ট্রের প্রতি তীব্র ধিক্কার জানাই।
তিনি আরো বলেন, ধর্ষণ কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। যখন অপরাধীরা শাস্তির ভয় পায় না, তখনই এ ধরনের নৃশংসতা বারবার ঘটে। তাই দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে মামলার বিচার সম্পন্ন করে অপরাধীদের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।
সরকারের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, আমরা স্পষ্ট করে বলতে চাই— নীরবতা মানে অপরাধীদের প্রশ্রয় দেওয়া। বান্দরবানসহ পাহাড়ের মাটিতে আর কোনো শিশু, কোনো নারী নিরাপত্তাহীনতায় ভুগবে না সরকারের কাছে তার গ্যারান্টি আমরা চাই। আমরা এই সমাবেশ থেকে দাবি জানাতে চাই, নারী-শিশু ধর্ষণ-নিপীড়ন বন্ধে সরকারকে অতি দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। অন্যথায় আমরা পাহাড়ে ধর্ষণবিরোধী জোরালো আন্দোলন গড়ে তুলতে বাধ্য হবো।
সিএইচটি নিউজে প্রকাশিত প্রচারিত কোন সংবাদ, তথ্য, ছবি ,ভিডিও, কনটেন্ট ব্যবহার করতে হলে কপিরাইট আইন অনুসরণ করে ব্যবহার করুন।
