মতামত

সাজেক কলেজকে স্বাধীনভাবে চলতে দেওয়া হোক

0


সুনয়ন চাকমা, সাবেক সভাপতি, পাহাড়ি ছাত্র পরিষদ



পার্বত্য চট্টগ্রামের সাজেক আজ সমতলের মানুষের কাছে একটি চাকচিক্যময় পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে সমাদৃত। কিন্তু সারি সারি বিলাসবহুল রিসোর্ট আর পর্যটকদের কোলাহলের ভিড়ে লুকিয়ে আছে স্থানীয় পাহাড়িদের চোখের পানি আর দীর্ঘশ্বাস। সেনাবাহিনী ও বহিরাগত প্রভাবশালীদের প্রত্যক্ষ হস্তক্ষেপে পাহাড়িদের জোরপূর্বক নিজেদের ভিটেমাটি থেকে উচ্ছেদ করে, তাদের বংশপরম্পরার জমি দখল করে গড়ে তোলা হয়েছে আজকের এই পর্যটনকেন্দ্র। সরকারের এই তথাকথিত উন্নয়নে স্থানীয়দের কোনো সম্মতি কিংবা অংশীদারিত্ব নেই, বরং আছে নিজ ভূমি থেকে উচ্ছেদ হওয়ার বেদনা।

জোর করে পাহাড়িদের উচ্ছেদ করে গড়ে তোলা এই সাজেকে আজ পর্যন্ত একটি হাসপাতাল নির্মিত হয়নি। সাধারণ মানুষের জন্য নেই সুপেয় পানির ন্যূনতম ব্যবস্থা, নেই কোনো মানসম্মত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। অথচ, সম্প্রতি স্থানীয়দের নিজস্ব অর্থায়নে গড়ে তোলা ‘সাজেক কলেজ’ নিয়ে যে জটিলতা তৈরি করা হয়েছে, তা পার্বত্য চট্টগ্রামের দীর্ঘদিনের ভূমি অধিকার হরণ, সামরিকীকরণ এবং স্থানীয় জনগণের উদ্যোগকে দমন করার এক ধ্রুপদী দৃষ্টান্ত।

পাহাড়ে শিক্ষাব্যবস্থার বেহাল দশার নগ্ন চিত্রটি সম্প্রতি প্রকাশিত এসএসসি পরীক্ষার ফলাফলেই স্পষ্ট। যেখানে চট্টগ্রাম মহানগরে পাসের হার ৭৪ শতাংশ এবং চট্টগ্রাম জেলায় ৫৭ দশমিক ১৩ শতাংশ, সেখানে তিন পার্বত্য জেলার ফলাফল রীতিমতো উদ্বেগজনক। রাঙামাটিতে পাসের হার মাত্র ৪১ দশমিক ১৭ শতাংশ, বান্দরবানে ৪৭ দশমিক ৮৮ শতাংশ এবং খাগড়াছড়িতে তা নেমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ৩৪ দশমিক ৯৯ শতাংশে! সমতলের তুলনায় পাহাড়ের এই করুণ ফলাফল প্রমাণ করে যে, সেখানকার প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে পরিকল্পিতভাবে শিক্ষার অধিকার থেকে কতটা পিছিয়ে রাখা হয়েছে।

এমন এক শোচনীয় বাস্তবতায়, ২০২৪ সালে সাজেকের দরিদ্র ও পিছিয়ে পড়া শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষার পথ সুগম করতে স্থানীয় জনগণ নিজেদের উদ্যোগে একটি কলেজ প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্ত নেয়। ২০২৬-২৭ শিক্ষাবর্ষে শিক্ষার্থী ভর্তি এবং শিক্ষক নিয়োগের মাধ্যমে এর কার্যক্রমও শুরু করার উদ্যোগ নেওয়া হয়। রাষ্ট্রের যেখানে উচিত ছিল এই উদ্যোগকে সাধুবাদ জানিয়ে সার্বিক সহযোগিতা দেওয়া, সেখানে শুরু থেকেই এই উদ্যোগটি হোঁচট খাচ্ছে প্রশাসন, বন বিভাগ এবং বিশেষ করে সেনাবাহিনীর বাধার কারণে।

এখানেই সবচেয়ে বড় স্ববিরোধিতা ও কাঠামোগত বৈষম্যের চিত্রটি ফুটে ওঠে। বন বিভাগের দাবি, কলেজটি সংরক্ষিত বনভূমিতে নির্মিত হচ্ছে, যা বেআইনি। অথচ, যে সাজেকে পাহাড়িদের উচ্ছেদ করে পাহাড় কেটে রাতারাতি একের পর এক বাণিজ্যিক রিসোর্ট ও অন্যান্য স্থাপনা গড়ে ওঠে, সেখানে বন বিভাগের কোনো আইনি বাধা দেখা যায় না। আরও বিস্ময়কর ব্যাপার হলো, যে সাজেকে কোনো স্থানীয় মুসলিম জনবসতি নেই, সেখানেও ২০২০ সালের দিকে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ও রাঙামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদের যৌথ উদ্যোগে নির্মিত হয়েছে ঢাউস সাইজের ‘দারুস সালাম জামে মসজিদ’ (সাজেক মসজিদ নামে পরিচিত)। পাহাড়ের জনমিতির সাথে সম্পর্কহীন একটি বিশাল উপাসনালয় বা বাণিজ্যিক রিসোর্ট নির্মাণের বেলায় সংরক্ষিত বনভূমির আইন বাধা হয়ে না দাঁড়ালেও, স্থানীয়দের নিজেদের টাকায় একটি কলেজ নির্মাণের বেলায় বন বিভাগ হঠাৎ করে অত্যন্ত তৎপর হয়ে উঠেছে।

এই তৎপরতার আড়ালে লুকিয়ে আছে নিয়ন্ত্রণের নগ্ন রাজনীতি। বাঘাইহাট জোন থেকে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও কলেজ পরিচালনা পর্ষদকে স্পষ্ট শর্ত দেওয়া হয়েছে, জোনের সেকেন্ড ইন কমান্ড (টু-আইসি) মেজর বা লে. কর্নেল পদমর্যাদার কর্মকর্তাকে কলেজ পরিচালনা পর্ষদের সভাপতি করতে হবে। অন্যথায় শ্রেণিকক্ষে পাঠদান বন্ধ থাকবে এবং ইউপি চেয়ারম্যানসহ অন্যদের নামে যে ৫০ লাখ টাকার ক্ষতিপূরণ মামলা ঠুকে দেওয়া হয়েছে, তার আইনি প্রক্রিয়া কঠোর করা হবে। খোদ সাজেক থানার ওসির ভাষ্যমতে, পার্বত্য চট্টগ্রামে পুলিশের দৃশ্যত কোনো ক্ষমতা নেই; সেনাবাহিনীর সাথে বোঝাপড়া করাই স্থানীয়দের জন্য ‘বুদ্ধিমানের কাজ’।

যদি কলেজটি সত্যিই অবৈধভাবে সংরক্ষিত বনভূমিতে নির্মিত হয়ে থাকে, তবে সেনা কর্মকর্তাকে সভাপতি বানালেই কি সেই ‘অবৈধ’ স্থাপনা ‘বৈধ’ হয়ে যাবে? শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিচালনার মতো একটি সম্পূর্ণ বেসামরিক কাজে সামরিক বাহিনীর সরাসরি হস্তক্ষেপ ও শর্তারোপ কি ‘জোর যার, মুল্লুক তার’ নীতিরই বহিঃপ্রকাশ নয়?

এই ঘটনাকে ধামাচাপা দিতে এবং স্থানীয় উদ্যোগকে কালিমালিপ্ত করতে এরই মধ্যে একটি পরিচিত অপপ্রচারের আশ্রয় নেওয়া হয়েছে। বলা হচ্ছে, এটি ইউপিডিএফ-এর একটি চক্রান্ত এবং কলেজের আড়ালে সেখানে সশস্ত্র সন্ত্রাসীদের প্রশিক্ষণ শিবির গড়ে তোলা হবে। পার্বত্য চট্টগ্রামের রাজনীতি ও মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে যারা কাজ করেন, তারা জানেন এটি অত্যন্ত পুরোনো ও বহুল ব্যবহৃত একটি কৌশল। যখনই পাহাড়ি জনগণ নিজেদের অধিকার, শিক্ষা বা ভূমির ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করে, তখনই ‘সন্ত্রাসী’ বা ‘বিচ্ছিন্নতাবাদী’ তকমা লাগিয়ে সেটিকে দমন করার চেষ্টা করা হয়।

সাজেক কলেজ নিয়ে এই বহুমুখী ষড়যন্ত্র এবং পাহাড়ের শিক্ষাব্যবস্থার এই বেহাল দশার পেছনে মূলত একটি সুদূরপ্রসারী রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সমীকরণ রয়েছে। পৃথিবীর যেকোনো প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, তাদের ভূমির ওপর বহিরাগতদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার সবচেয়ে মোক্ষম হাতিয়ার হলো তাদের শিক্ষার আলো থেকে দূরে রাখা। পাহাড়িরা যদি আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত হয়, তবে তারা প্রথাগত ভূমি আইন, সেটেলমেন্টের মাধ্যমে জনমিতির পরিবর্তন এবং নিজেদের সাংবিধানিক অধিকার সম্পর্কে সচেতন হবে। তখন জাল দলিল তৈরি করে, আইনি মারপ্যাঁচে ফেলে বা পর্যটন ও রাবার বাগানের নামে ইজারা নিয়ে একজন অশিক্ষিত বা স্বল্পশিক্ষিত মানুষের জমি যতটা সহজে কেড়ে নেওয়া যায়, শিক্ষিত মানুষের জমি ততটা সহজে কেড়ে নেওয়া যাবে না। শিক্ষিত সমাজ আদালতে যাবে, আইনি লড়াই করবে এবং সুসংগঠিত রাজনৈতিক প্রতিরোধ গড়ে তুলবে।

শিক্ষা কেবল সার্টিফিকেট দেয় না, এটি মানুষের মধ্যে প্রশ্ন করার প্রবণতা তৈরি করে এবং যোগ্য নেতৃত্বের জন্ম দেয়। অশিক্ষিত বা পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীকে খুব সহজেই ভয় দেখিয়ে, মিথ্যে মামলায় জড়িয়ে বা প্রলোভন দেখিয়ে দমিয়ে রাখা যায়। কিন্তু পাহাড়িরা ব্যাপকভাবে শিক্ষিত হলে তারা গণমাধ্যম, প্রশাসন ও নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে নিজেদের বয়ান বা ন্যারেটিভ শক্তভাবে তুলে ধরতে পারবে। তখন তথাকথিত ‘উন্নয়ন’-এর আড়ালে চলা উচ্ছেদ বা বৈষম্যের ঘটনাগুলো ধামাচাপা দেওয়া রাষ্ট্রের কায়েমি স্বার্থান্বেষী মহলের জন্য কঠিন হয়ে পড়বে।

তাই, সাজেক কলেজের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে নেওয়ার বা এটি বন্ধ করে দেওয়ার যে মরিয়া চেষ্টা, তার মূল উদ্দেশ্য কেবল একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান দখল নয়; বরং পাহাড়িরা যেন স্বাধীনভাবে নিজেদের চিন্তার বিকাশ ঘটাতে না পারে এবং নিজেদের দ্বারা পরিচালিত কোনো প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে না পারে, তা নিশ্চিত করা। এটি তাদের চিরকাল পরনির্ভরশীল ও ক্ষমতাহীন করে রাখার এক সুস্পষ্ট কৌশল।

সাজেক কলেজের এই অচলাবস্থা নিরসন কেবল একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান চালুর বিষয় নয়, এটি পাহাড়ে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠারও একটি বড় পরীক্ষা। অবিলম্বে এই হয়রানিমূলক মামলা প্রত্যাহার করে, অযাচিত হস্তক্ষেপ বন্ধ করে সাজেক কলেজকে তার নিজস্ব পরিচালনা পর্ষদের মাধ্যমে স্বাধীনভাবে চলতে দেওয়া উচিত। পাহাড়ের মানুষকে সুপেয় পানি, চিকিৎসাসেবা ও উচ্চশিক্ষা থেকে দূরে রেখে এবং সর্বোপরি তাদের ভূমিহীন করে পার্বত্য চট্টগ্রামে কোনো টেকসই শান্তি বা প্রকৃত উন্নয়ন কখনোই সম্ভব নয়। (১২ আগস্ট ২০২৬)

[ লেখাটি সুনয়ন চাকমার ফেসবুক থেকে সংগৃহিত ]



This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. AcceptRead More